গর্ভবতী মায়ের জন্য খেজুর

গর্ভবতী মায়ের জন্য খেজুর

মহান আল্লাহ আমাদের কল্যাণের জন্য তার সমগ্র সৃষ্টি জগৎকে নিয়োজিত করেছেন। মানুষের উপকারের জন্য তিনি দিয়েছেন সবুজ বৃক্ষ, নান বর্ণের ফুল ও ফল। আল্লাহর দেয়া অসংখ্য নিয়ামতের মধ্যে খেজুর অতি পরিচিত এবং সাধারণ একটি ফল। কিন্তু সাধারণ এই ফলের বর্ণনায় কুরআনে এসেছে বিশেষভাবে। এমনকি একে বেহেশতবাসীদের জন্য বিশেষ অনুগ্রহ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। যেমন- পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, ‘সেখানে আছে ফলমূল, খেজুর ও আনার। অতএব তোমরা উভয়ে তোমার পালকর্তার কোন কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে?’ (সূরা আর রহমান)।

বর্তমান যুগের আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায়ও খেজুর সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। পৃথিবীর প্রাচীনতম উদ্ভিদের মধ্যে খেজুর একটি। শুধু ফল হিসেবেই নয়, পুষ্টিমানের জন্যও খেজুর আজ অগ্রগণ্য একটি ফল। ভিভিন্ন গবেষণায় এর নতুন নতুন গুণাগুণ আবষ্কৃত হচ্ছে এবং ওষুধ ও খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। খেজুর সম্পর্কে সূরা মারিয়ামে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘প্রসব বেদনা তাঁকে খেজুর বৃক্ষমূলে আশ্রয় নিতে বাধ্য করাল। তিনি বললেন হায়! আমি যদি কোনোভাবে এর আগে মরে যেতাম এবং মানুষের স্মৃতি থেকে বিলুপ্তি হয়ে যেতাম! অতঃপর ফেরেশতা তাঁকে নিম্নদিক থেকে আওয়াজ দিলেন যে, তুমি দুঃখ করো না। তোমার পালনকর্তা তোমার পাদদেশে একটি নহর সৃষ্টি করেছেন। আর তুমি নিজের দিকে খেজুরগাছের কা-ে নাড়া দাও। তা থেকে তোমার ওপর সুপক্ব খেজুর পতিত হবে। এখন আহার করো ও চক্ষু শীতল করো। (সূরা মারিয়াম)। হজরত মারিয়াম আ:কে এভাবে এই ফল খাওয়ার নির্দেশ দেয়ার পেছনে যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তাহলে জেনে নিই এই নির্দেশের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। গর্ভবতী ও সদ্যপ্রসূতী মায়েদের জন্য খেজুর অত্যন্ত উপাদেয় একটি ফল। এটি সর্বজনবিদিত একটি বৈজ্ঞানিক তথ্য। খেজুরে সুগার থাকে ৬০-৬৫ ভাগ, যা প্রায় সব ফল থেকে বেশি। আধুনিক চিকিৎসকেরা সদ্যপ্রসূতী মাকে সন্তান জন্মদানের দিন থেকেই প্রচুর পরিমাণে ফল খাওয়ার নির্দেশ দিয়ে থাকেন। তাদের এ দুর্বলতা কাটিয়ে দ্রুত সুস্থ ও সবল করার জন্য ফলে বিদ্যমান সুগার কার্যকর ভূমিকা রাখে। সেই সাথে দুগ্ধ হরমোন উৎপাদনে সহায়তা করে মাতৃদুগ্ধের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়, যা নবজাতক শিশুর জন্য অত্যাবশ্যক।

সন্তান জন্মদান করার কারণে মায়ের দেহের সুগার রক্তের সুগারের মাত্রা স্বাভাবিক রাখে এবং রক্তচাপ কমে যাওয়া প্রতিরোধ করে।

খেজুর বিদ্যমান অপর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান অক্সিটোসিন (Oxytocin), যা আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে সন্তান জন্মদান প্রক্রিয়াকে অধিকতর সহজ করার জন্য প্রয়োগ করা হয়। Oxytocin শব্দের অর্থ হলো Rapid birth, যার বাংলা অর্থ হলো দ্রুত প্রসব। অক্সিটোসিন হচ্ছে মস্তিষ্কের পিটুইটারি গ্লান্ড থেকে নির্গত একটি হরমোন, যা সন্তান জন্মদানের সময় মাতৃগর্ভের (Uterus বা জরায়ু) সঙ্কোচন ও প্রসার ঘটায়। উল্লেখ্য, এ প্রক্রিয়াটি ছাড়া স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সন্তান জন্মদান সম্ভব নয়। অক্সিটোসিন মাতৃদুগ্ধ নির্গমন প্রক্রিয়ারও সূচনা করে থাকে।

এভাবে মহান আল্লাহ তায়ালা হযরত মারিয়াম (আ:) কে খেজুর খেতে নির্দেশ দেয়ার মাধ্যমে পৃথিবীর সব গর্ভবতী ও প্রসূতি মাকে সুস্থ ও সবল থাকার এবং নবজাতক শিশুর একমাত্র আহার ব্যবস্থাপনার প্রেসক্রিপশন দিলেন। (সুবহান আল্লাহ!)

এখন থেকে সাড়ে চৌদ্দ শ’ বছর আগে কেউ কি জানতেন খেজুরে অক্সিটোসিন থাকে? কেউ কি জানতেন এটি গর্ভবতী ও প্রসূতী মায়ের জন্য কতটা উপকারী? খেজুরে বিদ্যমান অতীব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান অক্সিটোসিন সাক্ষ্য দেয়, পবিত্র কুরআন মানুষের প্রভু সর্বজ্ঞানী মহান আল্লাহরই বাণী।

চিকিৎসাবিজ্ঞান খেজুরের উপকারিতা সাম্প্রতিক সময়ে জানতে পেরেছে; অথচ পবিত্র কুরআনে চৌদ্দ শ’ বছর আগেই মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন। খেজুর একটি বিশেষ ধরনের সুগার বহন করে, যা শরীরে চলনক্ষমতা ও তাপশক্তি উৎপাদন করে। এই বিশেষ সুগারকে বলা হয় ফ্রক্টোজ। এই সুগার গ্লুকোজের মতো নয়। গ্লুকোজ খুব দ্রুত রক্তে সুগারের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, যা ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য ক্ষতিকর। ডায়াবেটিক রোগীদের ক্ষেত্রে গ্লুকোজ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ; যেমন- চোখ, কিডনি, হৃৎপিন্ডএবং রক্ত সংবহন তন্ত্রের ক্ষতিসাধন করতে পারে। অন্যদিকে ফ্রুক্টোজ, যা খেজুর ও অন্যান্য ফল থেকে পাওয়া যায় তাতে এ ধরনের ক্ষতিকর সম্ভাবনা থাকে না।

খেজুরে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন ও মিনারেল। এ ছাড়াও এতে রয়েছে ফাইবার, পোটিন ও ফ্যাট। খেজুরে বিদ্যমান ফলিক এসিড (ভিটামিন বি১২) নতুন রক্তকোষ উৎপাদনে সাহায্য করে। গর্ভকালীন সময়ে ফলিক এসিডের চাহিদা বাড়ে ২ গুণ। ফলিক এসিডের অভাবে গর্ভবতী মায়েরা এনিমিয়া বা রক্তশূন্যতায় ভোগেন এবং শিশুর স্নায়ুতন্ত্র সঠিকভাবে গঠিত হয় না। খেজুর খেলে ফলিক এসিডের এ চাহিদা সহজেই পূরণ করা যায়।

অন্যদিকে গর্ভবতী মায়ের যে বমি ভাব হয়, তার অন্যতম কারণ পটাশিয়ামের অভাব। খেজুর খেলে এর অভাব সহজেই পূরণ হয়ে যায়। খেজুরে প্রচুর পটাশিয়ামের পূরণ হয়ে যায়। খেজুরে প্রচুর পটশিয়াম থাকে। পটাশিয়াম শরীরে পানিশূন্যতা বজায় রাখে, মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ করে, মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা ও চিন্তাশক্তিকে শাণিত করে। পটাশিয়াম কিডনির মাধ্যমে শরীরের বর্জ্য দূর করে। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে। ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় পটাশিয়ামের অভাব পূরণের জন্যও খেজুর পথ্য হিসেবে খাওয়া হয়।

খেজুরে অনেক বেশি পরিমাণে আঁশ থাকে। তাই কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিকারে খেজুর খাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। যারা ওজনহীনতায় ভুগছেন, তাদের শরীরে ওজন বৃদ্ধির জন্য খেজুর খুবই কার্যকর।

খেজুরের আয়রন রক্তের লোহিত কণার হিমোগ্লোবিন তৈরি করে। রক্তে লোহিত কণার সংখ্যা স্বাভাবিক রাখে। এভাবে গর্ভকালীন রক্তশূন্যতা প্রতিরোধ করে এবং শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি বজায় রাখে। লোহিত কণা রক্তোর খুব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। রক্তের অক্সিজেন ও কার্ব ডাই-অক্সাইড পরিবহনের মাধ্যমে দেহের প্রতিটি কোষকে লোহিত কণা জীবিত রাখে। খেজুরে যে পরিমাণ আয়রন থাকে তাতে মাত্র ১৫টি খেজুর খেলেই একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের দৈনিক আয়রনের চাহিদা পূরণ হয়।

এক নজরে খেজুরের খাদ্যমান:

পুষ্টিগুণ: ক্যালরি- ২২৭ কিলো ক্যালোরি (১৪%), কার্বোহাইড্রেট- ৭৪৩৯৭ গ্রাম (৫৮%), ফ্যাট- ০.১৫ গ্রাম (০.২-০.০৫%), প্রোটিন- ১.৮১ গ্রাম (২.৩-৫.৬%)

ভিটামিন: প্যান্টোথ্যানিক এসিড- ০.৮০৫ মি. গ্রাম (১৬%), নিয়াসন- ১.৬১০ গ্রাম (১০%), ফলেট- ১৫ মাইক্রো গ্রাম (৪%), রিবোফ্লাভিন- ০.০৬০ মি.গ্রাম (৪.৫%), ভিটামিন এ- ১৪৯ আইইউ (৫%), ভিটামিন কে- ২.৭ মাইক্রো গ্রাম (২%)

খনিজ উপাদান: পটাশিয়াম- ৬৯৬ মি. গ্রাম (১৯%), ম্যাঙ্গানিজ- ০.২৯৬ মি. গ্রাম (১৩%), সোডিয়াম- ১ মি. গ্রাম, কপার- ০.৩৬২ মি. গ্রাম (১০%), ম্যাগনেসিয়াম- ৫৪ মি. গ্রাম (১৩%), আয়রন- ০.৯০ মি. গ্রাম (১১%), ফসফরাস- ৬২ মি. গ্রমা (৯%), জিংক- ০.৪৪ মি. গ্রাম (৪%)।

খেজুরে পাওয়া যায় জৈব সালফার। এ জৈব সালফার অ্যালার্জিক রি-অ্যাকশন প্রতিকার করে। বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, এটি সাধারণত অন্য কোনো খাবারে পাওয়া যায় না। শরীরকে সুস্থ ও সবল রাখার জন্য যে উপাদানগুলো অতি প্রয়োজন তার দশটিরও বেশি পাওয়া যায় খেজুরে। আধুনিক যুগের বিজ্ঞনীরা বলেন, শুধু পানি ও খজুর খেয়েই একজন মানুষের পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব।

খেজুরে বিদ্যামান ক্রালসিয়াম ও ফসফেট হাড় ও দাঁত গঠনের সহায়তা করে। এভাবে হাড়ের দুর্বলতা রোধ করে এবং হাড়ের অন্যান্য রোগ প্রতিরোধ করে।

বিজ্ঞানী আরো দেখিয়েছেন খেজুর খেলে মানসিক চাপ কমে। গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী খেজুরে রয়েছে উচ্চমাত্রায় ভিটামিন বি৬, যা স্নায়ুকে সুস্থ রাখে। ভিটামিন বি১  স্নায়ুতন্ত্রকে স্বাভাবিক কর্মক্ষম রাখে। ভিটামিন বি১ ও বি২ কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট ভেঙে শক্তিতে রূপান্তরিত করে এবং দেহের ক্ষয়পূরণ করে। গর্ভকালীন সময়ে ভিটামিন ‘এ-এর চাহিদা বেড়ে যায়। খেজুরে ভিটামিন ‘এ’ পাওয়া যায়, যা এই চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম। এ ছাড়া ভিটামিন ‘এ’ রাতকানা রোগ প্রতিরোধ করে। খেজুরে রয়েছে ফ্ল্যাভোনয়েড পলিফিনলিক অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, যা ট্যানিন নামে পরিচিত। ট্যানিনে রয়েছে জীবাণু সংক্রমণ, প্রদাহ ও রক্তপাত প্রতিরোগী গুণ। এ ছাড়াও খেজুরে বিটাক্যারোটিন ক্যান্সার প্রতিরোধ করে।

খেজুর প্রটিনেরও একটি ভালো উৎস। একটি কথা না বললেই নয় যে, খেজুর ছাড়া আর কোনো ফলেই এত বেশি পরিমাণ প্রোটিন থাকে না। আলহামদু লিল্লাহ! আল্লাহ আমাদের এ নিয়ামত দান করেছেন, যা আমাদের অসুস্থতা ও রোগ সংক্রমণ থেকে আল্লাহর ইচ্ছায় নিরাপদ রাখেন।

খেজুর মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দেয়া অসংখ্য নিয়ামতের মদ্যে মাত্র একটি। খেজুরের উপকারিতা কেবল কিছু দিন আগে আধুনিককালের বিজ্ঞানীরা জানতে সক্ষম হয়েছেন, যা কুরআনে নির্দেশিত হয়েছে অনেক বছর আগে। বিজ্ঞান যত বেশি বিকশিত হচ্ছে, কুরআনের সত্যতা ততই প্রমাণিত হচ্ছে। আল্লাহ আমাদের পবিত্র কুরআন শুদ্ধরূপে পাঠ করার তৌফিক দিন।

আরও পড়ুনঃ গর্ভবতী মায়েদের করনীয়।

গণসচেতনায় ডিপিআরসি হসপিটাল লিমিটেড

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*