
প্রাণী-শরীরকে চাঙ্গা রাখে ঘুম। ঘুমের সময় শরীরের গুরুত্বপূর্ণ হরমোন উৎসারিত হয়। এর মাধ্যমে মস্তিষ্ক তার ক্লান্তি দূর করে শক্তি সঞ্চয় করে। চিত, কাত, উপুড়—নানাভাবেই আমরা ঘুমিয়ে থাকি, তবে ভুল ঘুমের অভ্যাসে স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা থাকে। বন্ধুরা আজ আমরা জানব ঘুমের বিভিন্ন ভঙ্গী ও সঠিকভাবে ঘুমানোর পদ্ধতি। তাছাড়া আরও জানব ভাল ঘুমের সহজ নিয়ম। চলুন দেরি না করে শুরু করি।
ইনস্টিটিউশন অব মেডিসিনের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় পাঁচ থেকে সাত কোটি মানুষ ঘুমের সমস্যায় ভোগেন। সহজেই হয়তো ঘুমের সমস্যা থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব নয়। তবে কিছু পদ্ধতি মেনে চললে এ সমস্যা কমিয়ে আনা সম্ভব। স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট ফিটনেস ম্যাগাজিন দিয়েছে এ বিষয়ে কিছু তথ্য।
চিত হয়ে ঘুমানো
ঘুমের সবচেয়ে ভালো অভ্যাস চিত হয়ে ঘুমানো। এভাবে ঘুমালে মাথা সোজা থাকে এবং শরীরের ভারসাম্য বজায় থাকে। এর ফলে শরীরের ভর চমৎকারভাবে বিভাজিত হয় । এটি ঘুমের সবচেয়ে সঠিক উপায় বলে জানান চিকিৎসক মাইকেল ব্রুস। তিনি ‘দ্য স্লিপ ডক্টরস ডায়েট প্ল্যান : লুজ ওয়েট থ্রু বেটার স্লিপ’ বইয়ের লেখক। যাঁরা এসিডিটির সমস্যায় ভুগছেন, তাঁদের জন্য এভাবে শোয়ার অভ্যাস উপকারী। কিন্তু বালিশের মধ্যে মুখ গুঁজে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকলে বুকের দিকে চাপ লাগে, যার ফলে এসিডিটি বাড়ে।
তবে যাঁরা নাক ডাকেন, তাঁদের জন্য কিছু সতর্কবার্তা রয়েছে। এভাবে শোয়ার ফলে শ্বাস নিতে কষ্ট হতে পারে। নাক ডাকার অভ্যাস দূর করতে পাশের সঙ্গীকে বলতে পারেন, নাক ডাকলে আপনাকে ধাক্কা দিতে। এভাবে চিত হয়ে ঘুমানোর অভ্যাস করলে একদিন বিষয়টি ঠিক আয়ত্তে চলে আসবে।
বাঁ পাশে কাত হয়ে ঘুমানো
বাঁ পাশে কাত হয়ে ঘুমানো আরেকটি ভালো অভ্যাস। এভাবে ঘুমালেও শরীরের ভারসাম্য বজায় থাকে। চিকিৎসক ব্রুস বলেন, এভাবে ঘুমানোর অভ্যাস শরীরে রক্ত চলাচলকে সচল রাখতে ভালো কাজ করে এবং ঘুম ভেঙে আপনি বেশ ফুরফুরে অনুভব করবেন। তবে এ ক্ষেত্রে বালিশটিও স্বাচ্ছন্দ্যদায়ক হতে হবে।
ডান পাশে কাত হয়ে ঘুমানো
এই অভ্যাসকে ততটা ভালো বলে মনে করেন না বিশেষজ্ঞরা। এর ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে। এতে হার্ট ফেইলিউর বা এসিডিটি বাড়ার মতো সমস্যা হতে পারে। যেসব নারী গর্ভধারণ করেছেন, তাঁদের ক্ষেত্রেও এভাবে শোয়া সমস্যা তৈরি করতে পারে। তবে আপনি যদি স্বাস্থ্যবান হন, তাহলে চিন্তার কারণ নেই।
পায়ের ওপর পা তুলে ঘুমানো
উপুড় হয়ে পা খাড়া করে ঘুমানোর অভ্যাস বেশ ক্ষতিকর। যদি মাঝরাতে ঘুম ভেঙে দেখেন, এভাবে শুয়ে আছেন এবং এক পা আবার পেঁচিয়ে আছে আরেক পায়ে, তাহলে সোজা চিত হয়ে যান। ডক্টর ব্রুস বলেন, দুই পা উপরে তুলে ঘুমালে কোমরে ভর বেশি পড়ে না এবং এতে কোমর ব্যথায় ভুক্তভোগীদের হয়তো আরামও লাগতে পারে; কিন্তু এক পা ওপর দিকে তুলে ঘুমানো একদমই উচিত নয়।
উল্টো বা উপুড় হয়ে শোয়া
দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, যাঁরা উপুড় হয়ে ঘুমান, তাঁদের অভ্যাসটি ত্যাগ করতে হবে। কেননা বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ঘুমানোর সবচেয়ে খারাপ অভ্যাস। তাঁরা ঘুম ভেঙে ওঠার সময় শরীরে ব্যথা বা টান অনুভব করতে পারেন।
এ ছাড়া বয়সভেদেও ঘুমের চাহিদা ভিন্ন হয়। ১৯ থেকে ৫৫ বছরের মানুষের জন্য দৈনিক আট ঘণ্টা, ৬৫ বছরের ওপরের মানুষের জন্য ছয় ঘণ্টা, শিশুদের ক্ষেত্রে ১৬ ঘণ্টা, ৩ থেকে ১২ বছরের শিশুদের ১০ ঘণ্টা এবং ১৩ থেকে ১৮ বছরের কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে ১৩ ঘণ্টা।
ভালো ঘুমের জন্য সহজ যত নিয়ম
সাপ্তাহিক ঘুমের সময়ের একটি তালিকা তৈরি করুন
প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়ার চেষ্টা করুন। ছুটির দিনগুলোতে যদিও অলসতা এসে ভর করে, তবুও নিয়ম মেনে ঘুমান। ছয় থেকে আট ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টা করুন। গবেষকেরা পরামর্শ দেন, টানা এক সপ্তাহ ধরে আট ঘণ্টা করে ঘুমানোর অভ্যাস গড়ে তুলুন এবং নিয়মিত চালিয়ে যেতে পারলে ভালো ঘুমের অভ্যাস তৈরি হবে। প্রয়োজনে সকাল সকাল বিছানায় যেতে পারেন এবং সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠতে পারেন। যাঁদের ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়, তাঁরা সকাল সকাল ঘুমাতে যান।
বেলা দুইটার পর কফি পান বাদ দিন
অনেকেই বিকাল হলে ক্লান্তি অনুভব করেন এবং ক্লান্তি দূর করতে চা-কফি পান করেন। সাময়িক ক্লান্তি দূর করলেও ঘুমের সমস্যার কারণ হতে পারে অতিরিক্ত চা বা কফি।
রাতে ল্যাপটপ, মোবাইল থেকে বিরতি নিন
রাতে ঘুমাতে যাওয়ার এক ঘণ্টা আগে ল্যাপটপ, মোবাইলের মতো যন্ত্রের ব্যবহার বন্ধ করে দিন। রাত জেগে সামাজিক ট্যাব, ল্যাপটপ, ডেস্কটপ, মোবাইলে সময় কাটালে তা শরীরের ওপর প্রভাব ফেলে এবং ঘুম নষ্টের কারণ হতে পারে।
বিছানা হোক শুধু ঘুমের
বিছানা শুধু ঘুমের জন্যই নির্দিষ্ট করে রাখুন। বিছানায় বসে টিভি দেখা, আড্ডা দেওয়া, খাবার খাওয়া, বুকে ভর দিয়ে ল্যাপটপ ব্যবহার বন্ধ করুন।
পেটে থাক অল্প কিছু
খালি পেটে কখনো শুতে যাবেন না। আবার রাতে গুরুপাকও খাবেন না। ভরা পেটে শুতে যাওয়া ঠিক নয়। ঘুমাতে যাওয়ার বেশ কিছু আগেই রাতের খাবার খেয়ে নিন।
ঘুমানোর আগে এক গ্লাস দুধ
শোয়ার আগে এক গ্লাস দুধ খেতে পারেন। দুধে থাকে ট্রিপটোফ্যান যা আপনাকে ঘুমাতে সাহায্য করবে। দুধ খুব বেশি গরম না হওয়া ভালো।
শরীরের ক্লান্তি ঝেড়ে ঘুমাতে যান
রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে গোসল করে নিতে পারেন। যদি গোসল করা সম্ভব না হয় ঘাড়, মুখ, হাত-পা পানি দিয়ে ধুয়ে মুছে নিতে পারেন। এতে ক্লান্তি দূর হতে পারে। ঘুমাতে যাওয়ার সময় সারা দিনের ক্লান্তি, উত্তেজনার কারণগুলো মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন।
অসময়ে ঘুম নয়
অনেকেই ঘুমের জন্য সময়-অসময় মেনে চলেন না বলে রাতের ঘুম ঠিকমতো হয় না। দুপুরে লম্বা সময় ঘুমাবেন না। বিশেষজ্ঞরা বলেন, দুপুরের ঘুম আপনার শুধু কর্মক্ষমতাই কমাতে পারে, আপনার রাতের ঘুমও নষ্ট করে।
ঘুমকে হ্যাঁ ওষুধকে না
রাতে ঘুম এলে অন্য চিন্তা বাদ দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন। ঘুমাতে যাওয়ার আগে সিগারেট, তামাক, চা, কফি না খাওয়াই ভালো। দুই-এক দিনের ঘুম না হওয়াতেই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হবেন না। ঘুম না হলে চিকিত্সকের পরামর্শ ছাড়া ঘুমের ওষুধ সেবন করবেন না।
medicalbd সাস্থের সকল খবর।
