ডিমেনশিয়াঃ ভুলে যাবার রোগের নাম

পোস্ট টি ভালো লাগলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন
  • 998
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
    998
    Shares

ডিমেনশিয়াঃ ভুলে যাবার রোগের নাম

 

সাকিব ক্লাসের একজন মেধাবী ছাত্র হিসেবেই বেশ পরিচিত। কিন্তু গত কয়েক মাস যাবত সে কোনো কিছুই মনে রাখতে পারছে না। সবকিছু পড়া সত্ত্বেও পরীক্ষার হলে সে কিছুই লিখতে পারছে না। আস্তে আস্তে তার বন্ধুদের নামও সে ভুলে যেতে লাগলো। অবস্থা আরো বেশি ভয়াবহ হলো যেদিন সে খেয়াল করলো সে নিজের ফোন নাম্বারটাও মনে করতে পারছে না!

এভাবে আস্তে আস্তে সবকিছু ভুলে যাওয়ার সমস্যাটাকেই বলা হয় “ডিমেনশিয়া”।

কী এই ডিমেনশিয়া?

ডিমেনশিয়া হলো মস্তিস্কের এমন একটি বিকৃত অবস্থা যখন আক্রান্ত ব্যক্তির কিছুই মনে রাখতে পারে না, চিন্তাশক্তি লোপ পায় ইত্যাদি এবং ধীরে ধীরে এ সমস্যা বাড়তেই থাকে। প্রধাণত বয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে এর প্রভাব দেখা গেলেও বার্ধক্য মানেই যে ডিমেনশিয়া- তা নয়। মস্তিষ্কের কোষ সংখ্যা (নিউরন) বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নির্দিষ্ট হারে কমতে থাকে। বয়সের সঙ্গে শারীরিক রোগব্যাধি মস্তিষ্কের ক্ষতি করে যদি স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত ঘটায়, একে  চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘ডিমেনশিয়া’ বলা হয়।

কাদের হয় ডিমেনশিয়া?

সাধারণত বয়স ৬৫ বা তার উপরে এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা বেশি। তবে কমবয়সীরা যে ঝুঁকিমুক্ত তা কিন্তু নয়। যেকোনো বয়সেই এটা হতে পারে। বাবা কিংবা মায়ের ডিমেনশিয়া থাকলেও সন্তানের ডিমেনশিয়া হতে পারে অল্প বয়সেই।

পূর্বে ডিমেনশিয়াকে বলা হতো ‘বার্ধক্যজনিত ডিমেনশিয়া’ বা ‘সেনেলিটি’।  ১৯ শতকের শেষের দিকেও  ডিমেনশিয়াকে অনেক বড় একটা ক্লিনিক্যাল কনসেপ্ট হিসেবেই দেখা হতো যাতে মানসিক অসুস্থতা, মনোসামাজিক অক্ষমতা, বা সিফিলিসের মতো রোগগুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করা হতো। বিংশ শতাব্দিতে এসে গবেষণায় দেখা যায় যে এ রোগের সম্ভাবনা বয়সের সাথে বাড়ে, তবে কোন বয়স থেকে শুরু হয় তার কোনো নির্দিষ্ট তথ্য নেই। তাই বার্ধক্যই এর একমাত্র কারণ-তা সুনিশ্চিতভাবে বলা যাবে না।

সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সের বিশেষজ্ঞগণ যে গবেষণালব্ধ তথ্যটি দিয়েছেন তা বেশ উদ্বেগজনক। তথ্যটি হচ্ছে, তরুণদের ডিমেনশিয়া রোগের হার ব্যাপকহারে বাড়ছে। এই বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী গত ৪ বছরে কম বয়সী লোকদের মধ্যে এ রোগের হার ৪ গুণ বেড়েছে।

কেন হয় এই ডিমেনশিয়া?

ডিমেনশিয়ার প্রধান কারণগুলো  হলো–

  • এইডস
  • হাইপো-থাইরয়েডিজম
  • ভিটামিন বি-১২ এর অভাব
  • লাইম (Lyme disease) বা এক ধরণের ব্যাক্টেরিয়ার দ্বারা সংক্রামক রোগ
  • নিউরোসিফিলিস
  • কার্বন মনোক্সাইড বিষক্রিয়া
  • ডিপ্রেশন
  • অনিয়মিত ঘুম
  • ওষুধের পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া
  • অতিরিক্ত মদ্যপান

তবে ডিমেনশিয়ার সর্বপ্রধান কারণ হিসেবে বলা হয় ব্রেইন ড্যামেজ।

ডিমেনশিয়ার লক্ষণ:

ডিমেনশিয়ার প্রাথমিক বিস্তার খুবই ধীরে হয়, এমনকি মাস কিংবা বছর ধরেও হতে পারে। যার ফলে রোগী নিজেও বুঝতে পারে না সে ডিমেনশিয়া আক্রান্ত ।

ডিমেনশিয়ার ধরন অনুযায়ী এর লক্ষণ বিভিন্ন হতে পারে। তবে সাধারণভাবে যে লক্ষণগুলো দেখা যায় সেগুলো হলো–

– স্মৃতিশক্তি হ্রাস পাওয়া: স্মৃতিশক্তি কমতে থাকা পাওয়া বিশেষ করে স্বল্প মেয়াদি স্মৃতি হারানো ডিমেনশিয়ার সবচেয়ে সাধারণ লক্ষন।

– কথা বলার সময় সঠিক শব্দ খুঁজে না পাওয়া: একজন ডিমেনশিয়া রোগী  অতি সাধারন কথাটিও মনে করতে পারেন না অথবা তার পরিবর্তে এমন সব কথা বলেন বা লিখেন যেসব বুঝতে পারাই বেশ কঠিন হয়ে যায়।

– অন্যের কথা বুঝতে অসুবিধা হওয়া: ডিমেনশিয়া রোগী আপনি কি বলছেন তা শুনবে ঠিকই কিন্তু বুঝতে পারবে না ।

– দৈনন্দিন কাজকর্ম করতে না পারা বা ভুলে যাওয়া: ডিমেনশিয়া আক্রান্ত ব্যক্তি তার দৈনন্দিন কর্ম সম্পাদনে, যেমন চা–নাস্তা বানানো, জামাকাপড় পরা এধরণের সাধারণ মামুলি ব্যাপার মনে রাখতে পারেন না ।

– ব্যক্তিত্ব ও মেজাজের পরিবর্তন: একজন ডিমেনশিয়া আক্রান্ত ব্যক্তি তার দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ভিন্ন মানুষের মত আচরণ করতে পারেন। ব্যক্তিচরিত্রে পরিবর্তনের বিষয়গুলি সুক্ষভাবে নির্দেশ করা বেশ কঠিন। তিনি সন্দেহপ্রবন, খিটখিটে, বিষন্ন, উদাসীন, উদ্বিগ্ন কিংবা বিক্ষুদ্ধ হতে পারেন। বিশেষ করে এমনসব পরিস্থিতিতে যেখানে স্মৃতিসমস্যা তার অসুবিধা ঘটায়।

– মনোযোগ দিতে না পারা: ডিমেনশিয়া আক্রান্ত ব্যক্তি পড়াশুনা বা নিজের কাজে মনোযোগ দিতে পারেন না । কোন কিছুতেই তার ফোকাস থাকে না ।

– ডিপ্রেশন: ডিমেনশিয়া আক্রান্ত ব্যক্তি অধিকাংশ সময়ই ডিপ্রেশনে ভুগতে থাকেন যার ফলে স্মৃতিশক্তি কমতে থাকে ।

– ঘুমের সমস্যা:  ডিমেনশিয়া আক্রান্ত ব্যক্তি  নিয়মিত ঘুমাতে পারে না। রাতের পর রাত জেগে থাকেন । তাদের ইনসমনিয়া রোগীও মনে করা হয়।

ডিমেনশিয়ার ধরন:

বেশ কয়েক ধরনের ডিমেনশিয়া দেখা যায়। যেমন–

অ্যালঝেইমার (Alzheimer’s disease) –  ডিমেনশিয়াকে অ্যালঝেইমার হিসেবেই ধরে নেয়া হয়। প্রায় ৬০–৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে এটি দেখা যায়। এ রোগের শুরুর দিকে আক্রান্ত ব্যক্তি নাম মনে রাখতে পারে না, সাম্প্রতিক ঘটনাসমূহ মনে রাখতে পারে না, কথা বলতে বলতে ভুলে যায়। ধীরে ধীরে আরো কিছু সমস্যা দেখা দিতে থাকে, যেমন– চিন্তাধারায় সমস্যা, কনফিউশন,  আচরণে অসামঞ্জস্য,  কথা বলতে গেলে কি বলবে বুঝতে না পারা , বিড়বিড় করা ইত্যাদি। মূলতঃ মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ নষ্ট হয়ে যাওয়া এবং স্নায়ুকোষের মৃত্যু এর প্রধান কারণ।

হান্টিংটন ( Huntington’s disease) – ক্রোমোজোমের ৪নং জোড়ার একটিতে ত্রুটির  কারণে ধীরে ধীরে মস্তিষ্কের ডিসঅর্ডার সৃষ্টি হতে থাকে। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে অনিয়ন্ত্রিত গতিবিধি, চিন্তায় অসামঞ্জস্য, ডিপ্রেশন এবং মুড চেঞ্জ হতে দেখা যায়। সময়ের সাথে সাথে সমস্যাগুলো বাড়তে থাকে।

ভাস্কুলার ডিমেনশিয়া (Vascular Dementia) – যুক্তি ও বিচারক্ষমতা হ্রাস পাওয়া, কোনো একটা কাজ সম্পন্ন করতে সামঞ্জস্যতা রাখতে না পারা  ইত্যাদি এ রোগের প্রাথমিক লক্ষণ। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা আঘাতের কারণে এ সমস্যার সৃষ্টি হয়ে থাকে। এ ধরণের ডিমেনশিয়া অনেকক্ষেত্রে অন্য ডিমেনশিয়াও সৃষ্টি করে মিশ্র ডিমেনশিয়াতে রূপ নিতে পারে।

লিউয়ি বডি ডিমেনশিয়া (Lewy Body Dementia) – স্মৃতি লোপ পাওয়া, চিন্তাভাবনায় সমস্যা,  ঘুমের সমস্যা, ধীরগতির হয়ে পড়া, মাংসপেশির সচলতা কমে যাওয়া ইত্যাদি এ রোগের লক্ষণ। ব্রেইন করটেক্সে যখন প্রোটিন–আলফা–সাইনুক্লেইন এর অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটে তখন ডিমেনশিয়া হয়ে থাকে।

ডিমেনশিয়ার চিকিৎসা:

রোগটি নিয়ে বিপদ হলো, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ ভুলে যাবেন—এমনটি ধরেই নেওয়া হয়। ফলে ডিমেনশিয়া রোগটি সম্পর্কে বেশির ভাগ মানুষ সচেতন থাকেন না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এখন পর্যন্ত এ রোগের কোনো চিকিৎসা নেই। কিন্তু বেশির ভাগ রোগী আসেন একেবারে শেষ পর্যায়ে। তখন আর কিছুই করার থাকে না ।

তবে প্রাথমিক স্টেজে ধরা পড়লে ওষুধের মাধ্যমে রোগের লক্ষণগুলোকে কিছুটা ইম্প্রুভ করা সম্ভব। এখন এমন অনেক ওষুধ আবিষ্কার হয়েছে, যেগুলো সেবন করলে ডিমেনশিয়া তীব্র হওয়া রোধ করা যায়। তবে ধূমপান থেকে বিরত থাকা ও সুস্থ জীবনযাপন করাটা বেশ জরুরি।

পরিবারের সদস্যদের ভূমিকা এ রোগে আক্রান্ত রোগীর জন্য সবচেয়ে দরকারি। কেননা একটা সময়ে গিয়ে রোগী খাওয়া, ঘুম কিংবা শারীরিক যত্ন নিতেও ভুলে যায়। তখন অন্যের সাহায্য ও সহযোগিতার প্রয়োজন পড়ে। তাদেরকে যত্ন করতে হবে একেবারে বাচ্চাদের মতো।

ডিমেনশিয়ার পরিসংখ্যান:

ডিমনেশিয়ার সমস্যাটি গোটা বিশ্বজুড়েই রয়েছে। বিশ্বে প্রতি ৩ সেকেন্ডে একজন করে মানুষ নতুনভাবে ডিমনেশিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন। পুরো বিশ্বে ২০১৩ সাল পর্যন্ত এ জাতীয় রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ৮০ লক্ষ। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালে এই সংখ্যা দাঁড়াবে ৭ কোটি ৬০ লক্ষ। আর ২০৫০ সালে এর সংখ্যা ছাড়িয়ে যাবে ১৩ কোটি ৫০ লক্ষেরও বেশী।

বর্তমানে বিশ্বের মোট ডিমনেশিয়া রোগীর  প্রায় ৬২ শতাংশই নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে বাস করে। আর ২০৫০ সাল নগাদ তা বেড়ে ৬৮ শতাংশে দাঁড়াবে বলে আশংকা করা হচ্ছে যার মূল কারণ হচ্ছে এসকল দেশের জনগণ খুব দ্রুত বৃদ্ধ হয়ে যায়। ২০ সেপ্টেম্বর ‘বিশ্ব ডিমেনশিয়া সচেতনতা দিবস’। ডিমেনশিয়া সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে এ সচেতনতা দিবস আয়োজিত হয়।

ডিমেনশিয়া প্রতিরোধ:

১। দুশ্চিন্তা মুক্ত থাকুন: চেষ্টা করুন নিজেকে দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত রাখতে। দুশ্চিন্তা মানুষের স্মৃতিশক্তিকে দূর্বল করে দেয়।

২। অন্য কারো সাহায্য নিন: গুরুত্বপূর্ণ কাজের বেলায় সময়মতো মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য কাছের কাউকে আগেই বলে রাখতে পারেন। এতে করে আপনার ভুলে যাওয়ার ফলে কাজে কোন সমস্যা হবে না।

৩। মনোযোগ দিয়ে শুনুন:কোনোকিছু শোনার সময় মনোযোগী হওয়ার চেষ্টা করুন। মনোযোগী মানুষেরা সহজে ভুল করে না।

৪। স্মার্ট ফোনটি কাজে লাগান: আজকাল প্রায় সবাই বিভিন্ন ডিভাইসের ওপর নির্ভরশীল। মোবাইলে কিংবা কম্পিউটারে বিভিন্ন দিবস, উৎসব, পার্টি, উপলক্ষ কিংবা জরুরি তথ্য সংরক্ষণ করে অ্যালার্ম দিয়ে রাখুন। নির্দিষ্ট দিনের নির্দিষ্ট সময়ে অ্যালার্মটি বেজে উঠবে। তাই ভুলে যাওয়ার মাত্রাটা কমে আসবে। তা ছাড়া বর্তমানে বহুল জনপ্রিয় ওয়েবসাইট ফেসবুকের মাধ্যমেও আপনি অনেক কিছু জানতে পারবেন, বিভিন্ন ইভেন্টে ‘গোয়িং’ কিংবা ‘ইন্টারেস্টেড’ দেয়া থাকলে আপনার মোবাইলটিতে নোটিফিকেশন যাবে।

৫। খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করুন: ডিমেনশিয়া প্রতিরোধে শুরুতেই খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন প্রয়োজন। রক্তচাপ, কোলেস্টেরল এবং সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

৬। নিয়মিত ব্যায়াম করুন: প্রতিদিন শারীরিক ব্যায়াম করা মস্তিষ্কের কোষগুলোকে সতেজ রাখতে সাহায্য করে। তাই প্রতিদিন ৩০ মিনিট ব্যায়াম করুন।

সবশেষে বলা যায়, যদিও ডিমেনশিয়া রোধের কোনো ওষুধ নেই কিন্তু বিজ্ঞানীরা প্রতিনিয়তই গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন কীভাবে এই রিস্ককে কমিয়ে আনা যায় এবং প্রতিরোধ করা যায়। তাই এখনই সময় সচেতন হওয়ার। একমাত্র সচেনতাই পারবে ডিমেনশিয়ার রিস্ক ফ্যাক্টরগুলোকে কমিয়ে নিয়ে আসতে। ডিমেনশিয়া আক্রান্ত ব্যক্তি পাগল নন, সময় মতো চিকিৎসা এবং পরিচর্যা একজন ডিমেনশিয়া রোগীকে সুস্থ করতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

one × 2 =