জন্মগত রুবেলা সিন্ড্রোম

জন্মগত রুবেলা সিন্ড্রোম

রুবেলা

শিশুর পিঠে রুবেলার ফুসকুড়ি, হামের মত একই জায়গায় কিন্তু কম লাল রুবেলা, জার্মান হাম বা তিন দিনের হাম নামে পরিচিত, রুবেলা ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট একটি রোগ। এই রোগ প্রায়ই মৃদু এবং আক্রান্ত রোগীদের অর্ধেকই অসুস্থতা বুঝতে পারে না। লালচে ফুসকুড়ি সংক্রমণের প্রায় দুই সপ্তাহ পর শুরু হয়ে তিন দিনের জন্য স্থায়ী হতে পারে। এটি সাধারণত মুখের ওপর শুরু হয় এবং শরীরের বাকি অংশে ছড়িয়ে পড়ে। হামের ফুসকুড়ির মত উজ্জ্বল নয় এবং কখনও কখনও চুলকানি হয়। অনেক ক্ষেত্রেই লসিকা গ্রন্থি ফুলে কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে। বড়দের অস্থিসন্ধিতে ব্যাথা সচরাচর হয়। জটিলতাগুলোর মধ্যে রক্তক্ষরণ সমস্যা, অণ্ডকোষ ফোলা, এবং স্নায়ু প্রদাহ অন্তর্ভুক্ত। গর্ভাবস্থার পর্যায়ে প্রাথমিক পর্যায়ে সংক্রমণ থেকে জন্মগত রুবেলা সিন্ড্রোম (সিআরএস) অথবা গর্ভপাত হতে পারে। সিআরএস এর প্রধান উপসর্গ, হৃদপিণ্ড ও মস্তিষ্কের সমস্যা, কানের সমস্যা যেমন- বধিরতা, চোখের সমস্যা যেমন- ছানি অন্তর্ভুক্ত। সমস্যার গর্ভাবস্থার ২০ সপ্তাহের পর বিরল।

রুবেলা সাধারণত সংক্রমিত মানুষের কাশির মাধ্যমে বায়ুতে ছড়িয়ে পড়ে। ফুসকুড়ি ওঠার এক সপ্তাহ আগে ও এক সপ্তাহ পর পর্যন্ত আক্রান্ত ব্যক্তি রোগ ছড়াতে পারে। সিআরএস আক্রান্ত শিশুরা এক বছরের বেশি সময় পর্যন্ত ভাইরাস রোগ ছড়াতে পারে। শুধু মানুষই আক্রান্ত হয়। পোকামাকড়ের মাধ্যমে রোগ ছড়ায় না। একবার উদ্ধার, মানুষ ভবিষ্যতে সংক্রমণ অনাক্রম্য হয়। পরীক্ষা করে অনাক্রম্যতা যাচাই করা যায়। রোগ নির্ণয় রক্ত, গলা, বা প্রস্রাবে ভাইরাস শনাক্ত করে নিশ্চিত করা হয়। রক্তে অ্যান্টিবডি পরীক্ষা সহায়ক হতে পারে।

রুবেলা একটি প্রতিরোধযোগ্য যা একটিমাত্র টিকার মাধ্যমে ৯৫% প্রতিরোধযোগ। প্রায়ই এটা হাম এবং মাম্পস ভ্যাকসিনের সাথে একযোগে দেওয়া হয় যা এমএমআর টিকা হিসাবে পরিচিত। টিকাদানের হার জনসংখ্যার ৮০%-এর কম হলে গর্ভধারণের আগে নারী অনাক্রম্যতা অর্জন করতে পারে না এবং এই সমস্যা বাড়তে পারে। একবার আক্রান্ত হলে কোন নির্দিষ্ট চিকিত্সা নেই। রুবেলা বিশ্বের অনেক অঞ্চলে একটি সাধারণ রোগ। প্রতি বছর জন্মগত রুবেলা সিন্ড্রোম হয় ১০০,০০০ শিশুর। রোগের হার টিকা দেয়ার ফলে অনেক এলাকায় কমে গেছে। বিশ্বব্যাপী রোগ নির্মূল করার চলমান প্রচেষ্টা আডেয়ার। এপ্রিল ২০১৫ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দুই আমেরিকাকে রুবেলা সংক্রমণ মুক্ত ঘোষণা করে। “রুবেলা” ল্যাটিনএ শব্দ যার অর্থ সামান্য লাল। এটা প্রথম ১৮১৪ সালে একজন জার্মান চিকিৎসক একটি পৃথক রোগ হিসেবে বর্ণনা করেন বলেই একে “জার্মান হাম” হিসেবে অভিহিতকরা হয়।

লক্ষণ ও উপসর্গ

রুবেলার উপসর্গ ফ্লু এর মতো। তবে, রুবেলা ভাইরাস সংক্রমণের প্রাথমিক লক্ষণ র‍্যাশ বা ফুস্কুরি ‍(এক্স্যান্থেম‌‌‌‌) যা মুখ থেকে ধর এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণত তিন দিন পর হাল্কা হয়ে যায়(যজায়জন্য একে প্রায়ই তিনদিনের হাম হিসেবে অভিহিত করা হয়)।শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়তে পড়তে মুখের ফুসকুড়ি সাধারণত চলে যায়। অন্যান্য উপসর্গের মধ্যে অল্প জ্বর, ফোলা লসিকা-গ্রন্থি (উপ-অক্সিপিটাল এবংঘাড়ের পেছনে), গাঁটে ব্যথা, মাথা ব্যাথা, এবং নেত্রবর্ত্মকলাপ্রদাহ অন্তর্ভুক্ত। ফোলা লসিকা গ্রন্থি এক সপ্তাহ পর্যন্ত থাকতে পারে এবং জ্বর খুব কম ক্ষেত্রেই ৩৮ °C (১০০.৪ °F) উপরে উঠে। জার্মান হামের ফুসকুড়ি সাধারণত গোলাপি বা হালকা লাল যা চুলকায় এবং প্রায়ই তিন দিন স্থায়ী হয়। ফুসকুড়ি কয়েক দিনে চলে যায় চামড়া খসানো বা দাগ না রেখে। ফুসকুড়ির জায়গাতে সূক্ষ ফালিতে চামড়া খসতে পারে। ফোরশহেইমার চিহ্ন ২০% ক্ষেত্রে দেখা যায়, নরম তালুতে ছোট, লাল উঁচু স্থান হিসাবে। রুবেলা যে কোন বয়সে হতে পারে, এবং সাধারণত একটি মৃদু রোগ, শিশুদের অথবা চল্লিশোর্ধদে মধ্যে বিরল। বয়সের সাথে লক্ষণ গুরুতর হতে পারে। বয়স্ক মেয়ে বা নারীদের মধ্যে ৬০% -এর গিরায় ব্যাথা বা অস্থি-সন্ধির প্রদাহের অভিজ্ঞতা হতে পারে।

শিশুদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে রুবেলার নিম্নোক্ত উপসর্গগুলি দুই দিন স্থায়ী হয়ঃ

  • শুরুতে মুখে, পরে বাকি শরীরে ছড়িয়ে পড়া ফুসকুড়ি
  • ৩৮.৩ ° সে (১০১ ° ফারেনহাইট)-এর কম জ্বর
  • গলার পেছনের লসিকা-গ্রন্থি ফোলা

বয়স্ক বাচ্চাদের এবং প্রাপ্তবয়স্কদের অতিরিক্ত উপসর্গ হতে পারেঃ

  • ফোলা গ্রন্থি
  • করাইজা (ঠান্ডা মতো উপসর্গ)
  • অস্থি-সন্ধির ব্যাথা (বিশেষত তরুণ মহিলাদের)

নিম্নলিখিত গুরুতর সমস্যা ঘটতে পারেঃ

  • মস্তিষ্ক সংক্রমণ
  • রক্তপাতের সমস্যা
  • জন্ম অপূর্ণতা (জন্মগত)
  • ছানি
  • চোখের গ্লুকোমা
  • হার্ট অপূর্ণতা
  • শ্রবণশক্তি হারানো
  • রুবেলায় করাইজা নিউমোনিয়য়াতে রূপান্তরিত হতে পারে, যা সরাসরি ভাইরাল নিউমোনিয়া বা অতিরিক্ত ব্যাকটেরিয়াল নিউমোনিয়া এবং ব্রঙ্কাইটিস (হয় ভাইরাল ব্রংকাইটিস বা অতিরিক্ত ব্যাকটেরিয়া ব্রংকাইটিস)

জন্মগত রুবেলা সিন্ড্রোম

সি আর এস-এ চোখের ছানিঃ রুবেলায় নবজাতকের মধ্যে জন্মগত রুবেলা সিনড্রোম হতে পারে। সিন্ড্রোমে (সিআরএস) রুবেলা ভাইরাস দ্বারা জরায়ু সংক্রমণ অনুসরণ করে এবং হৃদযন্ত্র মস্তিস্ক , অক্ষি এবং স্রবণ-যন্ত্রের গঠনে অপূর্ণতা হয়। এছাড়া অপূর্ণতা, কম জন্ম ওজন, এবং নবজাতক থ্রম্বোসাইটপেনিয়া, রক্তাল্পতা এবং হেপাটাইটিস হতে পারে. প্রধান অপূর্ণতা বা অঙ্গসংগঠনে ত্রুটির ঝুঁকি প্রথম তিনমাসের মধ্যে সংক্রমণের জন্য সর্বোচ্চ. সিআরএস প্রধান কারণ রুবেলা জন্য একটি ভ্যাকসিন তৈরি করা হয়েছে। অনেক মায়েরা যারা প্রথম তিনমাসের ক্রান্তিকালের মধ্যে রুবেল আক্রান্ত হন তারা গর্ভপাত বা মৃত শিশুর প্রসব ক্রান। ভ্রূণ সংক্রমণ থেকে বেঁচে গেলে তাহলে তা কঠইন হৃদরোগ (পেটেণ্ট ডাক্টাস আর্টারিওসাস সবচেয়ে বেশী), অন্ধত্ব, বধিরতা, বা অন্যান্য জীবন হানিকর বিভন্ন অঙ্গের রোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করতে পারে। ত্বক প্রকাশমান “ব্লুবেরি মাফিন ক্ষত” হয়। এই কারণে, রুবেলা জন্মের সময়ের জটিল সংক্রমণ সন্নিবেশ টর্চের অন্তর্ভুক্ত। প্রতি বছর প্রায় ১০০,০০০ ক্ষেত্রে এই অবস্থাঘটে।

রোগ নিরুপণ

রুবেলা ভাইরাস নির্দিষ্ট আই জি এম অ্যান্টিবডি সম্প্রতি রুবেলা ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত মানুষের মধ্যে থাকে, কিন্তু এই অ্যান্টিবডি বছরের বেশি সময় ধরে থাকতে পারে, এবং ইতিবাচক পরীক্ষার ফলাফল সাবধানতার সাথে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। বরাবর এই অ্যান্টিবডি উপস্থিতির সঙ্গে, অথবা একটি সংক্ষিপ্ত সময় পরে, চরিত্রগত ফুসকুড়ি রোগ নির্ণয়ের নিশ্চিত করে।

রোগ প্রতিরোধ

রুবেলা সংক্রমণ জীবিত, অক্ষম ভাইরাস ভ্যাকসিন ব্যবহার সক্রিয় টিকাদান কর্মসূচির দ্বারা রতিরোধ করা হয়। দুইটি জীবিতক্ষয়িত ভাইরাস ভ্যাকসিন আর এ ২৭/৩এবং সেন্ডেহিল উপপ্রজাতির, যা প্রাপ্তবয়স্কদের রোগ প্রতিরোধে কার্যকর। তবে বয়ঃ সন্ধি-পুর্ব নারীদের ক্ষেত্রে টিকাদান যুক্তরাজ্যে সিআরএস এর সামগ্রিক প্রকোপ হার উল্লেখযোগ্ভাবেয হ্রাস করে না। টিকা এখন সাধারণত এমএমআর টিকার অংশ হিসাবে দেওয়া হয়। বিশ্ব স্সাস্থ্য সংস্থার বিশেষ পরামর্শ অনুযায়ী প্রথম ডোজ ১২ থেকে ১৮ মাস বয়সে একটি দ্বিতীয় ডোজ ৩৬ মাস বয়সে দেওয়া হয়। গর্ভবতী মহিলাদের সাধারণত প্রথম রুবেলা ইমিউনিটি জন্য পরীক্ষা করা হয়। শিশুর জন্ম হয় না হওয়া পর্যন্ত ঝুকিতে থাকা গর্ভবতীকে টিকা দেয়া হয় না, কারণ টিকাতে জীবিত ভাইরাস রয়েছে । টিকাদান কর্মসূচি বেশ সফল হয়েছে. কিউবাতে ১৯৯০ সালে রোগ মুক্তির ঘোষণা, এবং ২০০৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র এর জন্মগত এবং অর্জিত উভয় রুবেলাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে।

টিকার ইতিহাস বা সেরোলজি দ্বারা রুবেলা সংবেদনশীলতার জন্য স্ক্রীনিং প্রজনন বয়সে নারীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে বাঞ্ছনীয় জন্মগত রুবেলা সিন্ড্রোম (সিআরএস) কমাবার জন্য। উল্লেখ করা বাঞ্ছনীয় প্রজনন-বয়সের সব অগর্ভবতী নারীকে প্রথম শিশুর জন্ম-পূর্ব পরামর্শে রুবেলা টিকার প্রাপ্যতার কথা বলা হবে। সম্ভব জন্মবিকৃতি সম্পর্কে উদ্বেগের কারণে, এমএমআর টিকা ব্যবহারের গর্ভাবস্থায় সুপারিশ করা হয়। পরিবর্তে, সমর্থ গর্ভবতী নারীদের প্রসব পরবর্তী সময়ের মধ্যে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব টিকা দিতে হবে।

চিকিৎসা

রুবেলার কোন সুনির্দিল্য নাই, উপসর্গ ও কষ্ট কমানোর উপর ব্যবস্থাপনা নির্ভরশীল। নবজাতকের চিকিৎসা জটিলতা নিরসনের উপর নির্ভরশীল। চোখের ছানির শল্য চিকিৎসা করা হয়। জন্মগত রুবেলা সিন্ড্রোম (সি আর এস) -এর ব্যবস্থাপনা বয়সজনিত ম্যাকুলার ডিজেনারেশনের মতো যার অন্তর্ভুক্ত পরামর্শ, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনে দৃষ্টিসহায়ক যন্ত্রের ব্যবস্থা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*