শিশুর জ্বর আপনার করণীয়-(পর্ব-২)

শিশুর জ্বর আপনার করণীয়-(পর্ব-২)

শিশুকে প্রচুর তরল খাওয়ান:

জ্বরের সময় সাধারণত শিশুরা খেতে চায় না। অনেকে শুধু পানি খেতে চায়, অনেকে আবার তাও খেতে চায় না। খাবার সামনে আনলে বলে এটা নয়, ওটা খাবো। অনেক সময় নতুন নতুন খাবারের বায়না ধরে। কিন্তু তা দিলেও খেতে চায় না। এসবই অসুস্থ শিমুর জন্য স্বাভাবিক। তবে যাই হোন না কেন, তাকে যে করেই হোক পানি বা অন্য কোনো তরল খাবার খাওয়াতে হবে। জ্বর হলে শিশুর স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়। ফলে তার শরীর থেকে অতিরিক্ত তরল ক্ষয় হয়, জ্বরের সময় প্রতি এক ডিগ্রি ফারেনহাইটের জন্য পানির চাহিদার শতকরা পাঁচ থেকে সাত ভাগ পানি বেশি দিতে হবে এর সাথে যদি আবার বমি বা পাতলা পায়খানা থাকে, তবে এ চাহিদার সাথে বমি এবং পাতলা পায়খানার জন্য যতটুকু পানি দেহ থেকে বেরিয়ে যাবে। ততটুকু পানি দেহ থেকে বেরিয়ে যাবে। ততটুকু যোগ করতে হবে। তা না হলে দেহে পানির অভাব দেখা দেবে, যা মিমুর জন্য মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

জ্বরের সময় শিশুকে তার পছন্দমতো খাবার দেয়া উচিত তেব এমন খাবার দিতে হবে যা সহজে হজম হয়। এ সময় তাকে আধা তরল অথবা পুরোপুরিভাবে তরল খাবার দিলে সাধারণত সহজেই তা হজম হয়। অনেকের ধারণা জ্বরের সময় দুধ, কলা, ডাবের পানি, গ্লুকোজের পানি ইত্যাদি খাবার খাওয়ানো ঠিক না। অনেকে আবার জ্বর হলে ভাত না দিয়ে রুটি খেতে দেন আসলে এসবের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। জ্বর হলে ভাত খেতে কোনো নিষেধ নেই তেমনি দুধ, কলা, ডাবের বা গ্লুকোজ পানি শিশুকে দেয়া যেতে পারে। তবে তাকে একবারে অনেক পান না করিয়ে অল্প করে কিছুক্ষণ পরপর দেয়া উচিত। আসল কথা হচ্ছে, অসুস্থ অবস্থায় তার পছন্দসই সহজ পাচ্য খাবার তাকে দেয়া উচিত। যেন না খেয়ে সে অতিরিক্ত দুর্বল হয়ে না পড়ে।

শিশুকে ঘরে রাখুন

শিশুর ঐদিন জ্বর থাকে তত দিন তাকে বাইরে বেড়াতে না দিয়ে ঘরের মধ্যে রাখা সবচেয়ে ভালো। শিশুর তাপমাত্রা স্বাভাবিক হওয়ার ২৪ ঘণ্টা পর তাকে স্কুলে যেতে দিতে পারেন। তবে অনেক জ্বর চলে যাবার পরও সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে যায়। সে ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলাই শ্রেয়।

চিকিৎসক জ্বরের ব্যাপারে যেসব পরামর্শ দেন তা মেনে চলা উচিত। প্রয়োজনে জ্বরের কারণ নির্ণয়ের জন্য রক্ত, প্রস্রাব, বুকের এক্স-রে ইত্যাদির পরীক্ষা করা লাগতে পারে। অসুখ ভালো হওয়ার জন্য চিকিৎসক যে মাত্রায় যত দিন ওষুধ সেবনের পরামর্শ দেন ঠিক তত দিনই তা সেবন করা উচিত অন্যথায় সাময়িকভাবে জ্বর ভালো হয়ে গেঔের কিছু দিন পরে শিশুর আবার জ্বর হতে পারে।

জ্বর ও খিঁচুনি

জ্বরের সাথে খিঁচুনি অল্প বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায়। এ ধরনের খিঁচুনি সাধারণত জ্বরের প্রথম দিনেই হয়ে থাকে। তবে জ্বর আসার পরের দিনও খিঁচুনি হতে পারে। শিশুদের জ্বর অত্যাধিক হলে মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ফলে শিশুর খিঁচুনি শুরু হয় এমনকি শিশু অজ্ঞানও হয়ে পড়তে পারে। এই খিঁচুনি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলে মস্তিষ্কের ক্ষতি সাধন হতে পারে। যা পরে শিশুর জন্য কিছু সমস্যা হয়ে থাকে। সাধারণত ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত অত্যাধিক জ্বরের সাথে খিঁচুনি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে শিশুর শরীরের তাপমাত্রা ১০০০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের ওপরে থাকবে। খিঁচুনির সময়কাল কয়েক সেকেন্ড থেকে কয়েক মিনিট পর্যন্ত হতে পারে। সাধারণত ১০-১৫ মিনিটের বেশি স্থায়ী হয় না। পরিবারের অন্য কেউ শৈশবের এ রোগে ভুগলে সেই পরিবারের শিশরও খিঁচুনি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। প্রথম খিঁচুনির পর ১৮ ঘণ্টা থেকে ২৪ ঘণ্টা পর পরবর্তী খিঁচুনি হতেও পারে নাও হতে পারে। এটা জ্বরের ওপর নির্ভর করে।

জ্বরের সাথে শিশুর খিঁচুনি হলে কী করে বুঝবেন?

১.  শিশুর হাত-পা ও ঘাড় শক্ত হয়ে যাবে।
২.  শরীর ঝাঁকুনি দেবে।
৩. দাঁতে দাঁত লেগে যাবে।
৪.  শরীর বেঁচে যাবে।
৫.  চোখ ওপরের দিকে স্থির হয়ে থাকবে বা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবে।
৬. মুখ দিয়ে ফেনা বা লালা পড়তে পারে।
৭.  শরীরের তাপমাত্রা বাড়বে ১০১০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা আরো বেশি হতে পারে।

জ্বর থেকে খিঁচুনি হলে কী করবেন

জ্বরের সাথে খিঁচুনি হলে বিন্দুমাত্র দেরি না করে শিশুকে জরুরি ভিত্তিতে নিকবর্তী হাসপাতালে বা শিশুবিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যাবেন। বাসায় রেখে অযথা সময় নষ্ট করলে শিশুর সমূহ ক্ষতি হতে পারে। এমনকি শিশুর মৃত্যুও হতে পারে।

হাসপাতালে বা ডাক্তারের কাছে নেয়ার পথে নিমোক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন

১.  শিশুকে এক দিকে কাত করে শুইয়ে দেবেন, যাতে মুখের লালা গড়িয়ে বেরিয়ে যেতে পারে। এ অবস্থায় মাথার নিচে বালিশ দেবেন না এবং চিত করে শিশুকে শোয়াবেন না। কারণ এতে মুখের লালা বা থুথু শ্বাসনালীতে ঢুকে যেতে পারে। যার ফলে শিশুর শ্বাসকষ্ট হতে পারে।
২.  শিশুর নাক, মুখ পরিষ্কার করে দেবেন যেন কোনো ধরনের থুথু বা লালা না থাকে।
৩. খিঁচুনির সময় শরীরে যেন কোনো আঘাত না লাগে তা লক্ষ রাখবেন।
৪.  খিঁচুনির সময় দাঁতে দাঁত লেগে গেলে অনেকে শিশুর মুখে চামচ বা অন্য কোনো শক্ত জিনিস দিয়ে দাঁত খোলার চেষ্ট করেন। এতে শিশুর মুখে, মাঢ়ি বা চোয়ালে আঘাত লাগতে পারে। তাই চামচ বা শক্ত কিছু মুখে দেবেন না। বরং প্রয়োজনবোধে কাপড় বা এ জাতীয় অন্য কিছু মুখে দেয় যেতে পারে। যাতে দাঁত লেগে জিহ্বা কেনে না যায়।
৫.  জ্বর কমানোর জন্য তোয়ালে বা গামছা পানিতে ভিজিয়ে শিশুর দেহ, হাত-পা বারবার স্পঞ্জ করবেন।
৬.  যদি শিশু খেতে পারে, তাহলে প্যারাসিটামল সিরাপ খেতে দেয়া যেতে পারে অথবা মলদ্বারে সাপোজিটরি ব্যবহার করা যেতে পারে। মলদ্বারে সেডিল বা ফ্রিজিয়াম সাপোজিটরি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দিতে পারেন।

পরবর্তীতে জ্বর হলে কী করবেন

যে শিশুর একবার জ্বরের সাথে খিঁচুনি হয়েছে আবার কোনো কারণে জ্বর হলে তার খিঁচুনি হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। এ জন্য শিশুর জ্বর হলে, জ্বরের প্রকোপ যাতে বেশি না বাড়তে পারে সেজন্য জ্বর আসা মাত্র অল্প জ্বর থাকা অবস্থায় শিশুর বয়স ও ওজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ মতো প্যারাসিটামল ও ডায়াজিপাম (সেডিল) জাতীয় ওষুধ খাওয়ানো উচিত। একবার প্যারাসিটামল ওষুধ খাওয়ানোর চার ঘণ্টা পর পর যদি জ্বর ১০০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার বেশি থাকে তাহলে পুনরায় ওষুধ খওয়াবেন। ওষুধের সাথে সাথে শরীর স্পঞ্জিং করে দেবেন। পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুর জ্বর হলেই মা-বাবা সতর্ক থাকতে হবে। বেশির শিশুর জ্বরের সময়কার খিঁচুনি পাঁচ বছর বয়সের পর থাকে না। জ্বর ও খিঁচুনির ওষুধ সর্বদা বাড়িতে শিশুর নাগালের বাইরে নিরাপদ স্থানে রাখবেন। এমনকি আপনি যদি শিশুকে নিয়ে কোথায়ও বেড়াতে যান যেখানেও আপনার সাথে এসব ওষুধ রাখবেন। আদরের সন্তানটিকে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা করাতে ভুলবেন না। নিয়মিত ওষুধ সেবন ও যত্ন আপনার সোনামণির জীবনকে পরিবর্তন করে দেবে। গড়ে উঠবে সুস্থ, সুন্দর, সুখী জীবন।

আরও পড়ুনঃ শিশুর জ্বর আপনার  করণীয়-(পর্ব-১)

গণসচেতনায় ডিপিআরসি হসপিটাল লিমিটেড

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*