
শিশুর জ্বর আপনার করণীয়-(পর্ব-১)
আমাদের দেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ৯৮.৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৩৭০ সেন্টিগ্রেড (সেলসিয়াস)। তাপমাত্রা যখন এর চেয়ে বেশি হয়, তখন আমরা তাকে জ্বর বলি। জ্বর নিজে কোনো রোগ নয়, অন্য কোনো রোগের উপসর্গ মাত্র। উল্লেখ্য, ভাইরাস কিংবা ব্যাক্টেরিয়াজনিত সংক্রমণ হলে সাধারণত জ্বর হয়। জ্বর হলো একটা প্রতিরক্ষাব্যবস্থা যা শিশুকে সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাহায্য করে। তবে জ্বর যে কারণেই হোক জ্বরের চিকিৎসা করা প্রয়োজন। জ্বরের চিকিৎসার সাথে সাথে আসল রোগ নির্ণয় করে তার সঠিক চিকিৎসা করতে হবে। পাশাপাশি শিশুর সঠিক যত্ন নিতে হবে।
জ্বরের সাথে সাথে রোগের অন্যান্য উপসর্গ দেখা দিতে পারে। যেমনঃ
১. এ সময় শিশু একটু বেশি কান্না করতে পারে।
২. সর্দি, কাশি, পেট ব্যথা, পাতলা পায়খানা হতে পারে।
৩. খাওয়ার প্রতি রুচি কমে যেতে পারে।
৪. জোর করে খাওয়াতে গেলে বমি করতে পারে।
৫. দেহের তাপমাত্রা বেশি বেড়ে গেলে শিশু জ্বরের ঘোরে অচেতন হয়ে পড়তে পারে, আজেবাজে বকতে পারে।
৬. ঘুম নষ্ট হতে পারে, অনর্থক ঘুম থেকে জেগে চিৎকার করতে পারে।
৭. অনেক সময় শিশুর খিঁচুনিও হতে পারে। শরীরে লাল দানাদার র্যাশ বা দাগ হতে পারে।
জ্বরের বিভিন্ন ধরন রয়েছে। কোনো কোনো জ্বর সারা দিন রাত একই রকম থাকে কখনো তাপমাত্রা তস্বাভাবিক বা তার নিচে নামে না। কোনো কোনো জ্বর দিনে এক বা একাদিকবার আসে মাঝখানে শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকে। অনেক জ্বর ধীরে ধীরে বাড়তে তাকে এবং কয়েক দিনের ভেতর তা বেড়ে প্রায় ১০৩০-১০৪০ ফারেনহাইটের মতো হয়। কোনো কোনো জ্বর শুরু থেকেই অনেক বেশি হয়ে আসে। অনেক সময় আবার জ্বর যেদিন কয়েক দিন পর আবার একই নিয়মে বাড়তে ও কমতে থাকে। কিচু জ্বর ওঠার সময় শীত শীত অনুভূত হয় এমনকি কাঁপুনিও হতে পারে। আবার জ্বর ছেড়ে যাওয়ার সময় বেশ ঘাম দিয়ে ছেড়ে যায়। অনেক সময় ঘুসুঘুসে অর্থাৎ কম মাত্রার জ্বর অনেক দিন ধরে চলতে থাকে। কোনো প্রদাহজনিত জ্বর হলে শিশু কয়েক দিনের ভেতর বেশ দুর্বল হয়ে যেতে পারে। যে কারণেই জ্বর হোক না কোন তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে দেয়া ঠিক নয়। কারণ এতে মিমু অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে এবং শিশুর মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। তাই যেকোনো ধরনের জ্বরই হোক না কেন, অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ খাওয়াবেন। নিজে নিজে ওষুধ খাওয়াতে গিয়ে আপনার শিশু ক্ষতির কারণ হবেন না।
আপনার করণীয়:
সঠিকভাবে তাপমাত্রা পরিমাপ: শরীরের তাপমাত্রা সারাদিন ওঠানামা করে। তাপমাত্রা সাধারণভাবে শেষ বিকেলে বা সন্ধ্যার শুরতে সবচেয়ে বেশি থাকে। আর সবচেয়ে কম থাকে সকালবেলা। বিভিন্ন অসুখে জ্বরের ওঠানামা বিভিন্ন রকম, তাই জ্বরের এই ওঠানামা লক্ষ করে সঠিক সময়ে তাপমাত্রা মাপা খুবই জরুরি। ব্যায়াম করলে এবং গরম খাবার বা পানীয় পান করলে তাপমাত্রার পরিবর্তন ঘটতে পারে। তাই শিশু গরম দুধ বা পানীয় পান করে থাকলে তার ৩০ মিনিট পর তাপমাত্রা পরিমাপ করবেন। ছোট শিশুদের তাপমাত্রা বগলের নিচে বা কুঁচকির মাঝে মাপুন। কখনোই ছোট শিশুদের মুখে থার্মোমিটার দেবেন না। কারণ তারা কামড় দিয়ে থার্মোমিটার ভেঙ্গে ফেরতে পারে যাতে করে মুখের ভেতর কেটে যেতে পারে। বড় মিশুদের মুখে জিহ্বার নিচে অথবা বগলের নিচে তাপমাত্রা মাপতে পারেন। কাচ পারদ থার্মোমিটার ব্যবহারের আগে ঝাঁকিয়ে পারদ স্তম্ভ নামিয়ে দিয়ে বগলের নিচে, কুঁচকির মাঝে অথবা মুখে তিন মিনিট ধরে রাখতে হবে। ডিজিটাল থার্মোমিটার দ্রুত ও সঠিকভাবে তাপমাত্রা মাপা যায় এবং কাচ পারদ থার্মোমিটারের চোয়ে নিরাপদ। যদি আপনার শিশুর তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার বেশি হয় তাহলে বুঝবেন আপনার শিশুর জ্বর হয়েছে। শিশুকে হালকা পোশাক পরান।
জ্বর হলেই ঠান্ডা লাগবে এ ধারণাটা ঠিক নয়। তাই একগাদা কাপড় কাঁথা দিয়ে শিশুকে জড়িয়ে রাখা যাবে না। কারণ এতে জ্বর বাড়বে ছাড়া কমবে না। ছোট একটা উদাহরণ দিলে জিনিসটা বোঝা যাবে। রান্না করা খাবার গরম রাখার জন্য ঢেকে রাখা হয়। যতক্ষণ ঢাকা থাকে, ততক্ষণ খাবার সহজে ঠান্ডা হয় না। তেমনি যতক্ষণ শিশুকে ঢেকে রাখা হবে, বা কাপড়-কাঁথা দিয়ে বেশি জড়িয়ে রাখা হবে, ততক্ষণ শিশুর জ্বর কমবে না। জ্বর হলে শিশুর গায়ে হালকা কাপড় রাখুন, জ্বর বেশি হলে শিশুর সব জামাকাপড় খুলে দিন। জ্বর কমতে সহায়তার জন্য ঘরের জানালা-দরজা খোলা রাখুন। ফ্যান হালকা করে ছেড়ে রাখুন বা হাতপাখা দিয়ে শিশুর সমস্ত শরীরে বাতাস করুন। তবে শিশুর জ্বর কমে যাওয়ার পর সাথে সাথে তার গায়ে হালকাপাতলা কাপড় দিয়ে ঢেকে দিন। শীত বোধ হলে চাদর বা কাঁথা গায়ে দিয়ে দিতে পারেন।
শিশুকে স্পঞ্জবাথ করান:
জ্বর কমানোর জন্য শিশুর শরীরে স্পঞ্জ করে দেয়া উচিত। স্পঞ্জ করার জন্য গরমকালে স্বাভাবিক পানি আর শীতকালে ঈসৎ উষ্ণ পানি ব্যবহার করা ভালো। বেশি ঠাণ্ডা পানি ব্যবহার না করাই ভালো, এতে শিশুর কাঁপুনি উঠে যেতে পারে। পানি শরীর থেকে বাষ্পীভূত হয়ে যাওয়ার সময় শরীরকে ঠান্ডা রাখে। এ ছাড়াও স্পঞ্জ কারার পর দেহের লোমকূপগুলো খুলে যায় এবং সহজেই দেহের তাপমাত্রা বাইরে তাপমাত্রার সমান হতে চেষ্টা করে, যার ফলে জ্বর কমে যায়, স্পঞ্জ করার জন্য একটি পরিষ্কার তোলে, গামছা বা সুতির কাপড় নিন। কাপড়টি পানিতে ভিজিয়ে বেশির ভাগ পানি নিংড়ে ফেলে দিন। তারপর এই ভেজা কাপড় দিয়ে প্রথমে কপাল, মুখ পরে এক এক করে হাত, পা, শরীর, ভালো করে মুছে নিতে হবে। ভেজা কাপড়া দিয়ে মোছার পরপরই শুকনো কাপড় দিয়ে শরীর মুছে ফেলতে হবে। যেন শরীর বেশিক্ষণ ভিজে না থাকে। এমনি করে জ্বর না কমা পর্যন্ত বারবার সমস্ত শরীর মুছে দিতে হবে।
একই সাথে শিশুর মাথায় পানি দেয়া উচিত। কিছুক্ষণ মাথায় পানি ঢাকালার পর শুকনো কাপড় দিয়ে মাথা ও চুল ভালোভাবে মুছে দিতে হবে, যেন ভেজা চুলে বেশিক্ষণ থেকে শিশুর ঠান্ডা লাগে। মাথায় পানি দেয়ার সময় খেয়াল রাখতে হবে, যেন কানে পানি না যায়। অনেকে শরীর স্পঞ্জ না করে শুধু মাথায় পানি দিয়ে থাকেন। এতে জ্বর কমতে অনেক বেশি সময় লাগে। দ্রুত জ্বর কমানোর জন্য স্পঞ্জ করা ও মাথায় পানি দেয়া উভয় করা উচিত।
medicalbd সাস্থের সকল খবর।
