সর্বনাশ, পুরুষ প্রজাতির দিন কি শেষ?

সর্বনাশ, পুরুষ প্রজাতির দিন কি শেষ?

আকাশ নামে এক চিকিৎসক আত্মহত্যা করায় পুরুষ জাতির মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। পুরুষ রক্ষা সমিতির ব্যানারে অনেকে বিচারের আগেই রায় ঘোষণা করে ফেললেন। বাংলাদেশ পুরুষ অধিকার ফাউন্ডেশন, ঘাটাইল শাখার ফেসবুক পেজে পোস্ট দেওয়া হলো, ‘পুরুষ পুরুষ ডাক পাড়ি, পুরুষ গেলি কার বাড়ি?’ পরিস্থিতি আসলেই গুরুতর। গভীর উদ্বেগের সঙ্গে এসব ভাই-বেরাদরদের সহমত ভাই বলতে ইচ্ছা করছে। দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ে জানাচ্ছি, পুরুষ জাতি সত্যিই বিপন্ন। অভয়ারণ্য বানানো না গেলে পুরুষ হবে আপদ আর নারীর হবে আরও বিপদ।

এই বিপদের হুইসেল কতজন বাজালেন, কত মাইক বুক ফাটিয়ে চিৎকার করল, পুরুষ রক্ষা সমিতি ফরিয়াদ জানাল; আমরা কান পাতিনি। এখন বিজ্ঞানীরাও যে একই কথা বলছেন! পুরুষের জোর হলো তার কোষের ওয়াই ক্রোমোজম। সে বস্তুটির নাকি বারোটা বেজে গেছে।

Please Subscribe Us!

শরৎচন্দ্রের যুগে শ্রীকান্তরা আত্মহত্যা করত না, বড়জোর রেঙ্গুন শহরে চলে যেত কিংবা কেউ কেউ হতো দেবদাস। আত্মহত্যা বেশি করত মেয়েরাই। কিন্তু এই কলিকালে পুরুষেরা যেভাবে আত্মহত্যা করছে আর নারীরা যেভাবে প্রবল হয়ে উঠে দাঁড়াচ্ছে, তাতে বিপন্ন প্রজাতির সব লক্ষণ ফুটে উঠছে তাদের মধ্যে। যুক্তিবুদ্ধি কমে যাচ্ছে, আবেগ বাড়ছে। পাসের হারে পিছিয়ে পড়ছে নারীদের সঙ্গে। ডাক্তারদের মধ্যেও নারীরাই বেশি। রাজনীতির কথা আর না-ইবা বললাম। বিপন্ন প্রজাতির আচরণ এমনই হয়, মুখে আগ্রাসী মনে কমজোরি। মুদ্রার এক পিঠে পরিবার, আরেক পিঠে শাপলা।

ঘটনাটা হলো এই, প্রকৃতি প্রতিশোধ নিচ্ছে। পুরুষের যে মূলধন Y ক্রোমোজম, তা কমজোরি হতে থাকছে। নারীর কোষের দুটা ক্রোমোজমই হলো X অর্থাৎ XX। আর পুরুষের XY। Y ক্রোমোজম পুরুষালি প্রতীক আর X হলো নারীবাচক । Y ক্রোমোজোমের গুণ একটাই। এতেই আছে সেই ‘মাস্টার সুইচ’ SRY জিন। ভ্রূণের নর বা নারী লিঙ্গ ঠিক করে দেয় এই জিন। এ ছাড়া Y আর সব ব্যাপারে মোটামুটি নির্গুণ। এখন একদল বিজ্ঞানী গবেষণাপত্র প্রকাশ করে বলছেন, জীবনের জন্য Y জরুরি নয়। জানাচ্ছে বিজ্ঞান বিষয়ক জনপ্রিয় পত্রিকা দ্য কনভারসেশন ডটকম। তা ছাড়া এর দিন ফুরিয়ে আসছে। খুব দ্রুত গতিতে Y এর অবনতি হচ্ছে।

Please Subscribe Us!

১৬৬ মিলিয়ন বছর আগে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের আবির্ভাবের সময় X ও Y ক্রোমোজমের আকার ও গুণাগুণ সমান ছিল, দুটোতেই ছিল একইরকম জিন। কিন্তু পুরুষের কপাল এমন খারাপ, জন্ম থেকেই সেটা জ্বলছে। পুরুষের কোষে যেখানে অন্য ক্রোমোজমের দুটি করে কপি আছে, সেখানে Y আছে কেবল একটি। এই একটিই পিতা থেকে পুত্রের মধ্যে চলে আসে। একটি মাত্র হওয়ায় অন্য জিনের সঙ্গে আদান-প্রদানের মাধ্যমে আরও বিকশিত হওয়ার সুযোগ তার নেই। ফলে তার অবনতিই হচ্ছে। বর্তমানে এর আকার X ক্রোমোজমের চেয়ে অনেক ছোট। এভাবে চললে সাড়ে চার মিলিয়ন বছরে এটা গায়েব হয়ে যাবে। আপনি ভাববেন, সে ঢের দূর। কিন্তু প্রাণের জন্ম হওয়ার বিগত সাড়ে তিন বিলিয়ন বছরের তুলনায় শেষের সেই দিন বেশি দূরে নয়।

এ অবস্থায় পুরুষের পক্ষের বিজ্ঞানীরা বলছেন, Y সাহেব পতনের রাশ টেনে ধরছেন। ভালো Y এর কপি দিয়ে নাকি ক্ষতিগ্রস্ত Y-কে বদলিয়ে নিতে পারছে ক্রোমোজমটি। কিন্তু আশার গুড়ে বালি ঢেলেছেন অস্ট্রেলিয়ার নারী বিজ্ঞানী, লা ট্রোব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জেনি গ্রেভস। তিনি বলছেন, Y সাহেব দম ধরে থাকতে পারলেও শেষমেশ হারিয়ে যাবেন। তা-ই যদি হয়, তাহলে সন্তান উৎপাদনের কী হবে? তাঁদের উত্তর, সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রজাতির উদয় হবে। তখন সন্তানের পুত্র বা কন্যা হওয়া ঠিক করে দেয় যে SRY, তা অন্য ক্রোমোজমে চলে যাবে। অথবা কৃত্রিমভাবে সন্তান উৎপাদন চলবে—নারীরা পুরুষ ছাড়াই বাচ্চা জন্ম দিতে পারবেন।

আরেকটা সম্ভাবনা হলো পুরুষের খামার। যেখানে হারকিউলিস টাইপ পুরুষদের সংরক্ষণ করে রাখা হবে। কিন্তু এ রকম বীরপুরুষেরা কি তাতে রাজি হবেন? মোদ্দা কথা হলো, X সাহেবার সামনে অনেক সুযোগ খোলা, কিন্তু মিস্টার Y-এর কপালে অনেক খারাবি অপেক্ষমাণ।

Please Subscribe Us!

Y ক্রোমোজমের বিলুপ্তি দূরঅস্ত হলেও বাঙালি পুরুষের তাতে ভরসা করার কিছু নাই। ইতিমধ্যে খারাপ আলামত দেখা যাচ্ছে।

শক্তিমান বাঙালি পুরুষের প্রতীক যে সুন্দরবনের বাঘ, সে বেচারার জিনও দুর্বল হয়ে পড়ছে, সুন্দরবনের আয়তন ছোট হয়ে যাওয়া এবং বনের ভেতর বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ও উন্নয়নকর্মের জন্য বাঘেদের মেলামেশা কমে যাচ্ছে। তাই জিনের আদান-প্রদানও ঘটতে পারছে না। বাঙালি বাঘের এই অবস্থা দেখে বাঙালি পুরুষের অবস্থাও অনুমান করা যায়। আমাদের ৮০ লাখ পুরুষ প্রবাসে। তাদের অধিকাংশের জিনেরই ভিন্ন জাতির জিনের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ কম। মিশলেও তার সুফল সেই জাতি পাবে, বাঙালিরা পাবে না। বাংলাদেশি পুরুষদের ৯৯.৯৯ ভাগ কেবল বাংলাদেশি নারীই বিয়ে করে বলে ভিন্ন জাতির জিন দিয়ে আমাদের জিন ব্যাংক সমৃদ্ধ হচ্ছে না। যে বিদেশি নারীরা বাংলাদেশি পুরুষের টানে ছুটে আসেন, তাঁরাও তো কাঙ্ক্ষিত পুরুষটাকে নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন স্ব স্ব দেশে। পরিবেশদূষণ, অপুষ্টি ইত্যাদি কারণেও নাকি বাংলাদেশের প্রাণীকুলের জিন দুর্বল হচ্ছে। পুরুষের চতুর্দিকে এ রকম দুর্যোগের ঘনঘটা। ওদিকে জনসংখ্যায় পুরুষের চাইতে নারী বেশি, জন্মহারেও নারী সন্তান বেশি, ক্ষমতায়নেও নারীর বিজয় বেশি। কী আর বলব, জাতীয় পুরুষ হ্যান্ডবল দলের ঢাকা জেলার কোচও একজন নারী—ডালিয়া আক্তার। ফুটবলে পুরুষ খেলোয়াড়দের চাইতে এগিয়ে মেয়েরা।

Please Subscribe Us!

অথচ একদা এই বাংলাদেশ ছিল আর্য-অনার্য, আরব-ইরান-তুরান এবং ইংরেজ-মগ-পর্তুগিজসহ হরেক জাতির জিনের মেল্টিং পট বা গলনপাত্র। সেই দিন বা দুর্দিন আর নেই। বাঙালি এখন আটকে পড়েছে নিজ মানচিত্রের মধ্যে ক্ষুদ্রস্বার্থের খাদে। এর মধ্যে অন্যতম হলো বিসিএসে পাওয়া চাকরি। প্রখ্যাত পণ্ডিত নীরদ সি চৌধুরী তাঁর আত্মঘাতী বাঙালিতে পশ্চিমের বাঙালির পতনের জন্য চাকরিভক্তিকে দায়ী করেছিলেন। বিসিএসের জন্য ৩৫ বছর বয়স পর্যন্ত প্রস্তুতি নিতে নিতে যুবকের আর থাকে কী? নতুন খবর হলো, ঢাকার ৬০ লাখ লোক প্রতিদিন বাইরের খাবার খাচ্ছেন, যার বেশিটাই অস্বাস্থ্যকর এবং খাদকদের বেশির ভাগই পুরুষ। এ ছাড়া ইয়াবা থেকে মদ, ঘুষ থেকে তেল খানেঅলাদের বড় অংশও পুরুষ। আকেলমান্দ কি লিয়ে ইশারাই কাফি হ্যায়।

নারীদের মধ্যে হৃদরোগ ও বিষণ্নতার হার কম, দুর্নীতি কম। ঔপনিবেশিক আমল থেকে চালু হওয়া দুর্নীতিময় এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনে পুরুষের চেয়ে নারী বিচরণ করতে পেরেছে কম; যেহেতু তাদের ঘরেই থাকতে হতো বেশি। দ্বিতীয়ত, সন্তান ধারণসহ বিভিন্ন কারণে প্রকৃতি নারীদের দিয়েছে বেশি সহ্যক্ষমতা, বেশি ধৈর্য এবং নারীদের মধ্যে রয়েছে চমৎকার ভগ্নী সংহতি। এসবের ওপরে আছে গুণাগুণে ভরা শক্তিশালী দুটো X ক্রোমোজোম।

Please Subscribe Us!

অহংকার পতনের মূল। Y ক্রোমোজম ভেবেছিল সে অনন্য, তার যা আছে তা X এর নাই। কিন্তু Y যে ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে আর গুণাগুণ সব X-এ চলে যাচ্ছে, তা বুঝতে জিনবিজ্ঞানী হওয়ার দরকার নাই। চোখ সরু করে চারপাশে তাকালেই দেখা যায়। নারীদের ছোট করতে গিয়ে পুরুষ ভাইরা নিজেরাই যে ছোট হয়ে যাচ্ছেন, সেই হুঁশ আছে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*