
মোটাসোটা থেকে হালকা পাতালা
আমার বিয়ে হয় ১৬ বছর বয়সে। দশম শ্রেনীর ছাত্রী আমি। মফস্বল শহরে থাকি স্বামীর সাথে। ওখানে ভালো ভালো খাবার পাওয়া যেত। যেমন- চায়নিজ, পিজা, বার্গার, আইসক্রিম। আরো কত কিছু. আমি এগুলো মজা করে খেতাম। আমার স্বামীও তাই প্রায়ই আদর করে এগুলো বাসায় এনে খাওয়াতেন। কিন্তু তিনি নিজে খেতেন না। আনন্দ অার হাসিগানে জীবন চলে। ইতিমধ্যে আমি গর্ভবতী হলাম। শুনেছি গর্ভবতী মাদের একটু বেশি বেশি খেতে হয়।বাসায়তো কোন মুরব্বী নেই যে, তিনি পরামর্শ দেবেন। অামি একটু বেশি বেশি খেতে থাকি।এই বেশি বেশি নানা খাবার খেতে খেতে আমার ওজন বাড়তে বাড়তে ৮৬ কেজি হলো। কোনো ডাক্তারের পরামর্শ নেই না। ১৬ বছর বয়সে ৮৬ কেজি ওজন অস্বাভাবিক ব্যাপার। আমার আকার-আকৃতি দেখে লোকে ভাবে ২৫-৩০ বছর বয়স। এক শুভ সকালে আমার সন্তান হলো। কিন্তু তখনো আমার ওজন ৭৬ কেজি। স্বামীর আদরের ফল।
শুনেছি মেয়েদের প্রসবের পর তারা মোটা হয়ে যায়। আমি আর কত মোটা হবো। আমি তখন হালকাপাতলা হতে দিশেহারা। অবশেষে একজনের পরামর্শ মোতাবেক এক বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হই। তিনি আমার দৈনন্দিন খাওয়াদাওয়ার কথা শুনলেন। বললেন নিম্নমাত্রায় ক্যালোরিযুক্ত খাবার খান। বেশি বেশি প্রটিনযুক্ত খাদ্য গ্রহন করুন। নিয়মিত ব্যয়াম অত্যাবশ্যক। সর্বপ্রকার ফাস্টফুড ও চর্বিযুক্ত খাবার নিষিদ্ধ। বেশি বেশি কাঁচা ফলমুলের সালাদ ও শাকসবজি খান। সপ্তাহে একদিন উপবাস করুন।তিনি একটি খাদ্য তালিকা দিলেন। আমি তার পরামর্শ মোতাবেক চলতে থাকি। ফলে ধীরে ধীরে আমার ওজন ৬৫ কেজিতে নেমে এলো। এখন আমি মোটামুটি সুন্দরী ও যুবতী। কিন্তু আড়াই বছর পর দ্বিতীয়বার গর্ভধারন করি। দুর্ভাগ্যবশত অজ্ঞাত কারনে আমার গর্ভপাত হয়ে যায়। তখন আমি মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ি। খাওয়া দাওয়া প্রায় ছেড়েই দিয়েছি। ফলে ওজন কমতে থাকে। সাত মাস পর আবার গর্ভবতী হই। তখন বেশী বেশী খাওয়ার কারণে আবার ওজন বেড়ে ৯০ কেজি হয়ে যায়।অবার মহাসমস্যা। কী করব বুঝতে পারি না। ডাক্তার জানালেন, আরো কিছু জটিলতা রয়েছে সেবার ডাক্তার সিজার করে সন্তান প্রসব করাল। ফুটফুটে এক ছেলে হয়। তাতে কি হলো আমার ওজন তখণ দ্বিগুণ। বন্ধুবান্ধব বলে আমার স্বামীর চেয়ে আমাকে দ্বিগুণ বয়সের মনে হয়। স্বামী রীতিমত সক্ষম যুবক। অামি হতাশায় ভুগতে থাকি। মা, আমাকে খাওয়া-দাওয়া নিয়ন্ত্রণ করতে এবং শারীরিক পরিশ্রম করার উপদেশ দেয়।
অগত্যা আমি মাছ, ডিম, গোশত বাদ দিয়ে শাকসবুজ, সালাদ, ফলমুল খেতে থাকি। রাতে দুটো রুচি ও সবজি ও এক বাটি সালাদ আর এক বাটি ডাল খাই। আর এক বাটি সালাদ। সকাল নাস্তা এক কাপ চা ও দুটো আটার রুটি ও সবজি।দুপুরে এক কাপ ভাত আর এক বাটি সালাদ আর এক বাটি ডাল। সকাল-বিকেল জিমে মেতে থাকি। বাড়ির ঘর মোছা, কাপর কাঁচা, ঝাঁট দেওয়া, রান্নাবান্না সব করতে থাকি। সকালে আমার ছেলেকে স্কুলে দিয়ে ১৫ কিমি পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরি। ফলে তিন চার মাসের মধ্যে আমর ওজন ৬০ কেজিতে নেমে আসে। কিন্তু আরেক সমস্যার সৃষ্টি হলো। হাঁটুতে ব্যথা হতে থাকে। ডাক্তার বেশি হাঁটাহাঁটি বন্ধ করে দিলেন।
কিন্তু তিন মাস পর আবার ওজন বাড়তে থাকে। চার মাস পর আবার ওজন ৭৫ কেজি হয়ে গেল। আবার ডাক্তারের সাথে পরামর্শ। ডাক্তার আমাকে থাইরয়েড টেস্ট করাতে বলেন। গেলাম ল্যারেটরিতে। তারা আমার থাইরয়েড টেস্টের সব ব্যবস্থা করলেন। রির্পোট এলো। রিপোর্ট দেখে ডাক্তার চিকিৎসা দেন। সাথে পরামর্শ আপনার খাদ্য নিয়ন্ত্রণ। সর্বপ্রকার চর্বি জাতীয় খাবার ও মিষ্টান্ন দ্রব্য নিষিদ্ধ করেন। শাক সবজি কাঁচা ফলমুল, সালাদ খেতে থাকি।মাঝে মাঝে উপবাস। সকাল বিকেল হাঁটাহাঁটি। ধীরে ধীরে আবার ওজন কমতে থাকে। ভাত ছেড়ে দুপুরে রাতে দুটো করে আটার রুটি খাই।সাথে প্রচুর সবজি, সালাদ আর ডাল। এর ফলে তিন চার মাসের মধ্যে আমার ওজন ৫৮ কেজিতে নেমে আসে। শরীর এখন ছিমছাম। এখন কেউ বিশ্বাসই করতে চায় না যে, আমার দুটো সন্তান আছে। আমার বান্ধবী সেদিন রসিকতা করে বলে, তোকে তো অবিবাহিতা বলে আরেকবার বিবাহ দেওয়া যায়। সবাইকে বলি, স্বাস্থ্য ভালো রাখা খুব সহজ ব্যাপার। শুধু সচেতনতা প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে আমরা বাঁচার জন্য খাই। খাওয়ার জন্য বাঁচিনা।
medicalbd সাস্থের সকল খবর।
