
এভোক্যাডো নিয়ে বিস্তারিত
এভোক্যাডো (ইংরেজি: avocado) (বৈজ্ঞানিক নাম:Persia Americana) হচ্ছে মেক্সিকো এবং মধ্য আমেরিকার স্থানীয় উদ্ভিদ, যেটির লরেসি পরিবারের একটি সপুষ্পক উদ্ভিদ। ফলটির খোসা কুমিরের গায়ের মত অমসৃণ হওয়ায় এটা কুমির নাশপাতি হিসেবেও পরিচিত। অ্যাভোক্যাডো থেকে পাওয়া ক্যালরির প্রায় ৮০% ভাগই আসে চর্বি থেকে। আপাতঃদৃষ্টিতে এভোক্যাডো চর্বি সমৃদ্ধ খাবার বলে মনে হলেও এই চর্বি আমাদের শরীরের জন্য হিতকর।
এভোক্যাডোর এই অসাধারণ চর্বি তিন প্রকারেরঃ
১। ফাইটোস্টেরলঃ অ্যাভোক্যাডোর চর্বির বেশীর ভাগই এই ফাইটোস্টেরল। এভোক্যাডোর চর্বিতে বিভিন্ন ফাইটোস্টেরলের সমন্বয় ঘটায় ফলটি প্রদাহ নিরাময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখে।
২। পলিহাইড্রওক্সিল্যাটেড ফ্যাটি অ্যালকোহল (PFA) যদিও এই উপাদানটি সামুদ্রিক গাছেই সচারাচর পাওয়া যায় কতিপয় স্থলজ উদ্ভিদেও এটা বিদ্যমান। ফাইটোস্টেরলের মত PFA ও প্রদাহ নিরোধে সহায়তা করে। অ্যাভোক্যাডোতে এই উপাদানটি যথেষ্ট পরিমানে থেকে ফলটিকে অসাধারন করেছে।
৩। অলেইক (oleic) এসিডঃ অ্যাভোক্যাডোতে প্রচুর পরিমানে অলেইক (oleic) এসিড থাকায় এই ফলটি ওজন, হৃদরোগ এবং স্ট্রোক এর ঝুকি কমাতে সহায়তা করে। অলেইইক এসিড monounsaturated fatty acid যা কিনা শরীরের খারাপ কোলেস্টেরল (LDL; low-density lipoprotein) কমায় ও ভাল কোলেস্টেরল (HDL; high-density lipoprotein) বাড়ায়। রক্তে LDL বেশী হলে তা ধমনীর নালীতে জমা হয়ে নালীপথকে সরু করে হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোক এর ঝুঁকি বাড়ায়। অন্যদিকে HDL রক্ত থেকে LDL সরিয়ে যকৃৎে নিয়ে তা নষ্ট করে ফেলে।
সম্পৃক্ত চর্বি (saturated fatty acid) LDL বাড়িয়ে plaque তৈরিতে সহায়তা করে বিধায় রুল অফ থাম্ব হল, সম্পৃক্ত চর্বি (প্রানী-চর্বি) যথাসম্ভব কম খেয়ে উদ্ভদ-চর্বি (অসম্পৃক্ত চর্বি) বেশী অথচ পরিমিত পরমাণে খেতে হবে। অ্যাভোক্যাডোতে পটাশিয়ামের মাত্রাধিক্য থাকায় ফলটি হৃদপিণ্ড সবল ও সুস্থ রাখতেও সাহায্য করে। এছাড়া অ্যাভোক্যাডো প্যান্টোথেনিক এসিড, ডাইটারি ফাইবার, তামা, ফলিক এসিড, ভিটামিন B6, ভিটামিন K এবং ভিটামিন C এর ভাল উৎস। মহিলা মহলে ত্বকের পরিচর্যার জন্য মুখে এভোক্যাডোর পেস্ট (avocado face masks) এর প্রলেপ দেয়ার রেওয়াজ আছে। এভোক্যাডোর খনিজদ্রব্য ও ভিটামিনসমূহ ত্বকের ভেতর যেয়ে তত্বককে সতেজ ও মস্রিন রাখে।

পৃথিবীতে পুষ্টিকর ফলগুলোর মধ্যে অ্যাভোকাডো একটি। কেননা, এর মধ্যে আছে নানা ঔষধি গুণও। অ্যাভোকাডো সম্পর্কে কৃষিবিদদের মন্তব্য এমনই। বাংলাদেশে অ্যাভোকাডোর গাছ আছে মাত্র ৮-১০টি। এর মধ্যে দুটি আছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ হর্টিকালচার সেন্টারে। হর্টিকালচার সেন্টারের দুটি গাছের মধ্যে একটি গাছে চার বছর থেকে ফল ধরছে। এবার বিশেষ যত্নে এ গাছের ৫৮টি পরিপক্ব ফল পাওয়া গেছে বলে জানালেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ হর্টিকালচার সেন্টারের উদ্যানতত্ত্ববিদ সাইফুর রহমান।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ হর্টিকালচার সেন্টারে উদ্যানতত্ত্ববিদ হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে এস এম কামরুজ্জামান ২০০২ সালে একটি ফলের বিচি রোপণ করেন। সেই রোপণ করা বিচির গাছে ফল ধরেছে। ঢাকার একটি অভিজাত ডিপার্টমেন্টাল স্টোর থেকে তিনি ৫০০ গ্রামের ফলটি কেনেন ৪০০ টাকা দিয়ে। ফলের গাছটি তিনি লাগান চাঁপাইনবাবগঞ্জের হর্টিকালচার সেন্টারে।
কামরুজ্জামান জানালেন, এর মধ্যে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ প্রোটিন, খনিজ পদার্থ, ভিটামিন এ, সি, ই ও কে। আছে প্রচুর পটাসিয়াম, যা কলার চেয়ে ৬০ ভাগ বেশি। ১৮ ধরনের অ্যামাইনো অ্যাসিড, ৩৪% স্যাচুরেটেড ফ্যাট। উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভালো কোলেস্টেরল, যা শরীরের জন্য ক্ষতিকর কোলেস্টেরল কমায়। অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবেও কাজ করে। অর্থাৎ শরীর থেকে দূষিত পদার্থ বের করতে সহায়তা করে। এটি শিশুদের জন্য একটি উৎকৃষ্ট মানের খাবার। শিশুদের পুষ্টি শোষণে সহায়তা করে। যকৃৎকে সুরক্ষা দেয়। জন্ডিস প্রতিরোধে সহায়তা করে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ফল বিজ্ঞানী উইলসন পোপেনোর মতে, অ্যাভোকাডো হচ্ছে পৃথিবীর মানুষের জন্য ঈশ্বরের একটি বড় উপহার।
উদ্যানতত্ত্ববিদ সাইফুর রহমান জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ হর্টিকালচার সেন্টারে দ্বিতীয় গাছটি লাগানো হয়েছে ২০০৮ সালে। এটির চারা দিয়েছিলেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কম্পোনেন্ট প্রকল্পের উপদেষ্টা কৃষিবিদ সামশুল আলম। তিনি এ ফলটির দারুণ ভক্ত। সাইফুর রহমান বলেন, এ সেন্টারে যে ফলগুলো ধরেছে, তার ওজন ৫৫০ থেকে ৬০০ গ্রাম। দেখতে বড় আকারের লম্বাটে কাঁচা পেয়ারার মতো। গাঢ় সবুজ রঙের। পাকলে রঙের পরিবর্তন হয়। ফলের ভেতরে বড় একটি বিচি থাকে। বিচিটি আস্ত রেখে ফালি করে কেটে পাতলা খোসা ছড়িয়ে খেতে হয়। ফলটি মাখনের মতো মোলায়েম, স্বাদ হালকা মিষ্টি ধরনের।
হর্টিকালচার সেন্টারে চারা দিয়েছিলেন যিনি, সেই সামশুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে আমি এ ফলটির স্বাদ গ্রহণ করি। ফল খেয়ে আমি বিচি নিয়ে এসে বাড়িতে চারা তৈরি করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ হর্টিকালচার সেন্টারে দিই।’ ফলটি ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়ায় দারুণ চাহিদাসম্পন্ন ও দামি ফল। অনেকে এ ফল দিয়ে নাশতা করে। সালাদ করেও খায়। ঢাকার কোনো কোনো অভিজাত ডিপার্টমেন্টাল স্টোরেও অ্যাভোকাডো ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। বাংলাদেশে খাগড়াছড়ি, মধুপুর মিশন, সারদা পুলিশ একাডেমিতে মাত্র কয়েকটি গাছ রয়েছে।
উদ্যানতত্ত্ববিদ কামরুজ্জামান বলেন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ইতিমধ্যে ১২টি জাত সংগ্রহ করা হয়েছে। এগুলোর চারা কলম তৈরি করা হচ্ছে। সাধারণত ছয়-সাত বছরের একটি গাছে ফল ধরে। ফল পাকে আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে। কাঁচা ফল সবজি হিসেবেও খাওয়া যায়। ভবিষ্যতে অ্যাভোকাডো সম্প্রসারণের কর্মসূচি হাতে নেওয়া হবে।
অ্যাভোকাডোর স্বাস্থ্য উপকারিতা সমুহঃ
![]()
হৃদপিণ্ডের জন্য
রেজিস্টার্ড ডায়েটিশিয়ান Patricia Groziak, Ms, RD ও Hass Avocado Board এর মতে, প্রতি আউন্স অ্যাভোকাডোতে ২৫ মিলিগ্রাম বিটা সাইটোস্টেরল থাকে। নিয়মিত বিটা সাইটোস্টেরল ও অন্য উদ্ভিজ স্টেরল গ্রহণ করলে কোলেস্টেরলের মাত্রা স্বাস্থ্যকর পর্যায়ে থাকে।
দৃষ্টিশক্তির জন্য
অ্যাভোকাডোতে চোখের স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় দুটি ফাইটোকেমিক্যাল লুটেইন ও জেনান্থিন থাকে। এই দুটি উপাদান চোখে অ্যান্টি অক্সিডেন্টের কাজ করে যা চোখের ক্ষতি কমাতে পারে এবং বয়স জনিত চোখের সমস্যা ম্যাকুলার ডিজেনারেশন হওয়ার ঝুঁকি কমায়।
অ্যান্টি-ইনফ্লামেটরি এজেন্ট
অ্যাভোকাডোতে অ্যান্টি-ইনফ্লামেটরি উপাদান, ক্যারোটিনয়েড অ্যান্টিওক্সিডেন্ট, ওমেগা ৩ ফ্যাটি এসিড এবং পলিহাইড্রক্সিলেটেড ফ্যাটি অ্যালকোহল আছে যা রিউম্যাটয়েড ও অষ্টিও আরথ্রাইটিস এর নিরাময়ে সহায়তা করে।
ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণ
অ্যাভোকাডোর মনোস্যাচুরেটেড ফ্যাট ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্টকে বন্ধ করে এবং অ্যাভোকাডোর দ্রবণীয় ফাইবার রক্তের সুগার লেভেলকে সুস্থিত করে। অন্য ফলের তুলনায় অ্যাভোকাডোতে চিনি ও শর্করার পরিমাণ কম থাকে বলে রক্তের সুগার লেভেল নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
ইমিউন সিস্টেম
অ্যাভোকাডোতে গ্লুটাথায়ন নামের শক্তিশালী অ্যান্টি অক্সিডেন্ট থাকে যা ইমিউন সিস্টেমের সাথে সম্পর্কিত।
জন্মগত ত্রুটি রোধ করে
ক্যালিফোর্নিয়া অ্যাভোকাডো কমিশনের মতে, হবু মায়েদের জন্য অ্যাভোকাডো অনেক ভালো। অ্যাভোকাডোতে পর্যাপ্ত ফলিক এসিড থাকে যা জন্মগত ত্রুটি যেমন- স্পিনা বিফিডা, নিউরাল টিউব ডিফেক্ট ইত্যাদি প্রতিরোধ করে।
ক্যান্সার
মুখ, ত্বক ও প্রোস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায় অ্যাভোকাডো। অ্যান্টি অক্সিডেন্ট ও অ্যান্টি ইনফ্লামেটরি উপাদানের মিশ্র ক্রিয়ার জন্য এবং অ্যাভোকাডোর ফাইটোকেমিক্যাল ক্যান্সার কোষ উৎপন্ন হওয়া বন্ধ করে এবং মেরে ফেলে।
পরিপাক
অ্যাভোকাডোতে উচ্চমাত্রার ফাইবার থাকে, একটি অ্যাভোকাডোর অর্ধেক অংশে ৬-৭ গ্রাম ফাইবার থাকে। ফাইবার সমৃদ্ধ ফল খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়, কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে এবং পরিপাক নালী সুস্থ থাকে।
তাছাড়া অ্যাভোকাডোতে ভিটামিন থাকায় ত্বকের জন্য উপকারী, ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, ডিটক্সিফিকেশনে সাহায্য করে, ডিপ্রেশনের ঝুঁকি কমায় ও বিভিন্ন প্রকার ক্রনিক ডিজিজ ঝুঁকি কমায়।
সম্ভাব্য স্বাস্থ্য ঝুঁকিঃ
অন্যান্য ফলের মতই অ্যাভোকাডো ও বেশি খেলে সমস্যা হতে পারে। কারণ এতে ফ্যাট আছে, তাই অনেক বেশি পরিমাণে অ্যাভোকাডো খেলে ওজন বৃদ্ধির সমস্যা হতে পারে। কারো কারো ক্ষেত্রে অ্যাভোকাডো খেলে অ্যালার্জির সমস্যা হতে পারে, যদিও এটা বিরল।
যদি একটি অ্যাভোকাডো খাওয়ার পর নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া, কাশি, জোড়ে নিঃশ্বাস ফেলা ও শরীর ফুলে যাওয়া ইত্যাদি উপসর্গ গুলো দেখা দেয় তাহলে অ্যাভোকাডো খাওয়া বাদ দিয়ে দেখুন উপসর্গ গুলো চলে যায় কিনা। যদি সমস্যা বেড়ে যায় তাহলে চিকিৎসকের সাথে কথা বলুন।
medicalbd সাস্থের সকল খবর।
