
কনভার্সন থেরাপি, চিকিৎসাশাস্ত্রীয় বিস্ময় !!
কনভার্সন থেরাপি হচ্ছে একপ্রকার অপবিজ্ঞানের চর্চা যার মাধ্যমে ব্যক্তির সমকামিতা অথবা উভমকামিতা নামক যৌন অভিমুখিতা থেকে বিষমকামী যৌন অভিমুখিতায় পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়। যার যৌন অভিমুখিতা পরিবর্তনের জন্য এই চর্চা করা হবে, সেই চর্চায় তাকে নানাবিধ ধর্মীয় ও মনস্তাত্ত্বিক চাপের মধ্যে নিয়ে যাওয়া হয়। এমন কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই, যা থেকে বলা যেতে পারে, যৌন অভিমুখিতা পরিবর্তনশীল এবং চিকিৎসা শাস্ত্রীয় বই গুলো সতর্ক করেছে যে, এই ধরনের চর্চা একইসাথে অকার্যকর ও গুরুতরভাবে ক্ষতিকর। তা সত্ত্বেও এর প্রবক্তা ও এর সমর্থনকারীরা কল্পিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দাবী করেছেন, এই চর্চার ফলে কেও কেও আসলেই বিষমকামীতে পরিবর্তিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের চিকিৎসাশাস্ত্রীয়, বিজ্ঞানভিত্তিক সরকারী সংস্থা ও যুক্তরাষ্ট এই ধরনের থেরাপির উপর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকার কিছু স্থানের বিচার ব্যবস্থায় এই থেরাপির বিরুদ্ধে আইন পাস করা হয়েছে।
মার্কিন মনস্তাত্বিক সংগঠন (এপিএ) সমকামিতা মানসিক রোগ- এমন অনুমানের ভিত্তিতে সমকামিতার চিকিৎসার বিরোধিতা করেছে এবং ব্যাখ্যা করেছে সমকামিতার চিকিৎসা করা নৈতিকতাবর্হিত কর্মকান্ড। এটি আরো বলেছে যে, পুরুষ ও নারী সমকামীদের এভাবে বিষমকামীতে পরিণত করার জন্য কনভার্সন থেরাপির প্রয়োগ; প্রকৃত বিজ্ঞানের সাথে সাংঘর্ষিক। এর প্রয়োগে ব্যক্তির ক্ষতি হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সার্জন জেনারেল ডেভিড স্যাচার ২০০১ সালে একটি প্রতিবেদনে বলেন, এমন কোনো তত্ত্ব নেই যা থেকে বলা যায় যৌন পরিবর্তন করা যেতে পারে।
আধুনিক সময়ের ধর্মীয় কট্টোরবাদী গ্রুপগুলো সমকামিতাকে রোগ বলার চেয়ে এর থেরাপি দেওয়ার প্রতিই ধর্মীয় ন্যায্যতা দেয়।
ইতিহাস
কনভার্সন থেরাপির ইতিহাস সম্প্রসারিতভাবে তিন কল্পে বিভক্ত। একটি হলো ফ্রয়েডীয় যুগের প্রথমার্ধে, যেখানে কনভার্সন থেরাপি মুলধারায় সংযুক্ত হয়ে যায়। যেখানে ভাবা হত, যৌনতার জন্য মানসিক স্বাস্থ্যই মুলত দায়ী। এবং আরেকটি হলো স্টোনওয়াল যুগের পরবর্তী সময়; যেখানে মুলধারার চিকিৎসা পেশা কনভার্সন থেরাপিকে বাতিল করে দেয়।
মনবিশ্লেষৈনিক ইতিহাসের প্রথমার্ধে বিশ্লেষণকারী এটা মেনে নিয়েছিলেন যে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে সমকামিতা কিছু কিছু ক্ষেত্রে ঠিক রোগ নয়। কিন্তু যে নৈতিক প্রশ্নটা তাদের সামনে এসে হাজির হয়েছিল, তা হলো আলোচনা করলে, যৌন অভিমুখিতা কী পরিবর্তন করা যায়? ১৯২০ সালে বিশ্লেষণকারীরা অনুমান করেছেন যে, সমকামিতা এক প্রকার রোগ এবং তা ভালো করার চেষ্টা করাটাই যথার্থ, যদিও মনোবিশ্লেষনকারীদের বক্তব্য ছিল, সমকামীদের যৌন অভিমুখিতা পরিবর্তন করতে চাওয়া বৃহৎ পরিসরে ঝুকিঁপূর্ণ।
“পুরুষ ও নারী সমকামীরা কী তাদের যৌন অভিমুখিতা পরিবর্তন করতে পারবে ?”
মে মাসের ২০০১ সালে নিউ অরলিনে মার্কিন মনোরোগ-সংক্রান্ত সংগঠনের সম্মেলনে রবার্ট স্পিটজার সমকামী পুরুষ ও নারীরা কী তাদের যৌন অভিমুখিতা পরিবর্তন করতে সক্ষম? এমন প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। এখানে ২০০ জন অংশগ্রহণকারী বলেছিল, তারা পুর্বে সমকামী থাকলেও বর্তমানে বিষমকামী। The study was partly a response to the APA’s 2000 statement cautioning against clinical attempts at changing homosexuality, and was aimed at determining whether such attempts were ever successful rather than how likely it was that change would occur for any given individual. স্পিটজার লিখেন প্রথম দিকের প্রমাণগুলো থেকে এটা অনুমেয় হয়েছিল, যৌন অভিমুখিতা পরিবর্তনকারী এই থেরাপির উপকারিতা আছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এসব থেরাপি গুলোর পদ্ধতিগত সমস্যা ছিল।
২০১২ সালে স্পিটজার তার গবেষনাটিকে প্রত্যাহার করে নেন এবং বলেন, আমি আমার উপসংহারে যা বলেছি, তা হয়তো ভুল ছিল। এই গবেষনা কোনোভাবে প্রমাণ করতে পারবে না, পুরুষ সমকামীরা নিজেদের যৌন অভিমুখিতা পরিবর্তন করতে পারে। তিনি অপ্রমাণিত এই থেরাপি প্রয়োগের জন্য সমকামী সম্প্রদায়ের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তিনি একে পেশাগত ভুল বলে অভিহিত করেন। স্পিডযার এনএআরটিএইচ, পিফক্স, মার্কিন কলেজ অব পেডিয়াট্রিসিয়ান এবং ফোকাস অন দ্য ফ্যামিলীর মত সকল পুর্বের গে কনভারসেশন থেরাপি প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে অনুরোধ করেন তারা যেন নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র হিসেবে তার গবেষনাটিকে ব্যবহার না করেন।
চিকিৎসাশাস্ত্রে, বৈজ্ঞানিক ও আইনত দৃষ্টিভঙ্গি
যুক্তরাষ্ট্রে এর অবস্থা
যদিও কনভার্সন থেরাপির উপর কোনো জাতীয় পর্যায়ের স্থগিতাদেশ নেই, তবুও যৌন অভিমুখিতা পরিবর্তনের এই প্রচেষ্টাকে বেশ কিছু দেশে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নিচের মানচিত্রে তা দেখানো হলো।

- যুক্তরাষ্ট্রের মানচিত্র যেখানে সংখ্যালঘুদের যৌন অভিমুখিতা ও লিঙ্গ পরিচয় পরিবর্তনের প্রচেষ্টাকে রহিতকরণ দেখানো হয়েছে।
- যৌন সংখ্যালঘুদের লিঙ্গ পরিচয় ও যৌন অভিমুখিতা পরিবর্তনের জন্য কনভার্সন থেরাপি নিষিদ্ধকরণ।
- যৌন সংখ্যালঘুদের উপর কনভার্সন থেরাপি চাপিয়ে দেওয়া নিয়ে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।
স্বাস্থ্য-সংগঠনের অবস্থা
বিশ্বজুড়ে থাকা অনেক স্বাস্থ্য সংগঠন যৌন অভিমুখিতা পরিবর্তনের সমালোচনা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বাস্থ্য সংগঠন ঘোষণা দিয়ে বলেছে, এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই, যা থেকে বলা যায় গত ৪০ বছরের কনভার্সন থেরাপি থেকে কেও উপকৃত হয়েছে, বা এই ধরনের থেরাপির কোনো কার্যক্ষমতা আছে। তারা অন্বেষণে মাধ্যমে বুঝতে পেরেছে যে, এই থেরাপি অকার্যকর, বিপজ্জনক ও ক্ষতিকর। সমকামিতা থেকে মুক্তির যে দাবী করা হয়, তা ভিত্তিহীন এবং তা যদি বিশ্বাসও করা হয়, তবে একই সাথে এই ধরনের থেরাপির জন্য ক্ষতি হয়েছে; এমনটাও শুনা যায়। মার্কিন মনোরোগ সংগঠন (এপিএ) হিপোক্রেটিক শপথের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছে, যারা এই শপথ নিয়েছে, তাদের এই চর্চা থেকে দূরে থাকা উচিত।
মুলধারার চিকিৎসা সংগঠন গুলো বিবৃতিতে কনভার্সন থেরাপিকে ক্ষতিকর বলেছে, কারণ এটা উদ্বেগ আর অপরাধকে কাজে লাগায়, পাশাপাশি এটা ব্যক্তির আত্মবিশ্বাসকে নষ্ট করে, হতাশাগ্রস্থ করে তুলে যার ফলে ব্যক্তি আত্মহত্যাও করতে পারে।
medicalbd সাস্থের সকল খবর।
