মাইগ্রেন প্রচন্ড মাথা ব্যাথা

মাইগ্রেন

মাথা ব্যথা(Headache) একটি উল্লেখযোগ্য উপসর্গ। মাথা ব্যথা মাথা ও তার পাশ্ববর্তী অঙ্গসমূহের প্রদাহের ফলে হয় থাকে। মস্তিষ্কের বিভিন্ন রোগেও মাথা ব্যথা দেখা যায়। মাঝে মাঝে মাথা ব্যথা কারো কারো বেলায় পিরিয়ডিকভাবে হয়ে থাকে, এটাকেই মাইগ্রেন বলা হয়। ঐ ব্যথা ছোটবেলা থেকে শুরু করে প্রায় বয়োবৃদ্ধ অবস্থা পর্যন্ত স্থায়ী থাকে। উন্নত বিশ্বের পরিসংখ্যান অনুযায়ী শতকরা প্রায় ১০-১২ ভাগ লোক মাইগ্রেনে ভুগে থাকে। সাধারণত যুবতী বয়সের মহিলাদের মধ্যে পুরুষের তুলনাযয় এ রোগ প্রায় ৩ গুণ বেশি।

মাইগ্রেনের সত্যিকার কারণ এখনো জানা যায় নি। তবে এটা বংশানুক্রমে হয়ে থাকে বলে আত্নীয়স্বজনদের প্রায় ৫০ ভাগ এ রোগে আক্রান্ত হয়ে হতে পারে। ছাড়া, টাইরামিন যুক্ত খাবার যেমন- চকলেট, পনির ইত্যাদির অতিমাত্রায় খেলে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এলকোহল অতিমাত্রায় খেলেও এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কারো কারো ক্ষেত্রে প্রখর আলো বা দীর্ঘক্ষণ টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে থাকলেও এই রোগের আক্রমণ হতে পারে। অতিমাত্রায় দুশ্চিন্তার ফলেও এই রোগ হতে পারে।

প্রচন্ড মাথা ব্যথা দেখা দেয়াকেই মাইগ্রেনের এটাক বলা হয়। মাথা ব্যথা দেখা দেওয়ার পূর্বে রোগী অনেক ক্ষেত্রে অন্যান্য উপসর্গ যেমন চোখে ঝাপসা ধোক, বমি বমি ভাব ইত্যাদি অনুভব করে থাকে।

মাথা ব্যথা বিহীন অবস্থায় রোগীর তেমন কোন উপসর্গ থাকে না। রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ জীবন যাপন করতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মাথা ব্যথা শুরু হয়ে মাথায় ডান/বাম দিকে ছড়াতে থাকে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মাথার সর্বত্র ব্যথা ছড়ায় বলে রোগী খুব অস্বস্তি বোধ করে।

প্রকারভেদ:

মাথা ব্যথা ও অন্যান্য উপসর্গের সম্পর্ক হিসেবে মাইগ্রেনকে নিম্নভাবে ভাগ করা যেতে পারে। যেমন:

১. সাধারণত মাইগ্রেণ(Common Migrain)

এই ধরনের রোগীর মাথঅ ব্যথাটাই আসল উপসর্গ। কোন কোন ক্ষেত্রে রোগীর বমি বমি ভাগ হয়/বমি করে থাকে। এই ধরণের রোগীর সংখ্যাই অধিক।

২. স্নায়ুবিক মাইগ্রেন(Classical Migrain)

এই ধরনের মাথা ব্যথা শুরুর কয়েক ঘন্টা আগে চোখের উপসর্গ যেমন ঝাপসা দেখা, আলোর ঝলকানী লাগ, বিভিন্ন ছবি দেখা ইত্যাদি শুরু হয়। ব্যথা শুরুর কয়েক ঘন্টা পূর্বে রোগী অন্যান্য উপসর্গ যেমন অতিরিক্ত পিপাস, ক্ষুধা, ঘুম ঘুম ভাব ইত্যাদি পরিলক্ষিত হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে রোগী কাজকর্ম ছেড়ে চুপচাপ বসে থাকে। এই ক্ষেত্রে মাথা ব্যথা বেশি তীব্র হয় এবং রোগী অন্ধকার রুমে কিছুটা আরাম বোধ করে থাকে।

৩. জটিল মাইগ্রেন(Complicated Migrain)

মাথা ব্যথার সাথে সাথে রোগীর স্নায়ুবিক উপসর্গ যেমন ঠোট, মুখ, হাত-পা জ্বালা করা শুরু করে। শরীরের কোন এক দিক হঠাৎ দুর্বল হয়ে অবচেন হয়ে যায়। অনেক সময় রোগীদের চেতনা শক্তি লোপ পেয়ে যায় এবং রোগীর মাথা ঘোরা, মাথায় জড়তা, চোখে একের অধিক ছবি দেখা ইত্যাদির উপসর্গ দেখা দেয়।

৪. ব্লাসটার মাথা ব্যথা:

এক্ষেত্রে হঠাৎ করে রাত্রিবেলা মাথা ব্যথা শুরু হয়। মাথা ব্যথার সাথে সাথে রোগীর নাক ও চোখ দিয়ে পানি এবং মাঝে মাঝে নাক বন্ধ অনুভুত হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মাথা ব্যথা না থাকলে রোগীর স্বাভাবিক অবস্থা বজায় থাকে না।

৫. মাইগ্রেন সমতুল্য:

মাথা ব্যথা ছাড়াও মাইগ্রেন বিশেষ করে বাচ্চাদের বেলায় হঠাৎ করে বাচ্চাদের বেলায় পেট ব্যথা, বমির ভাব এবং মাথা ঘোরা ইত্যাদি দেখা দেয়। এইসব থাকতে পারে রোগীর হাত পা ও বুক ব্যথা থাকতে পারে। মাঝে মাঝে মনোভাবেরও পরিবর্তন পরিরক্ষিত হয়।
মাইগ্রেন এটাকের সময় রোগীর মস্তিষ্কের ও তার বাইরে শিরার কলেবর ছোট ও বড় হয়ে থাকে। কলেবর ছোট বা সংকুচিত হলে রোগীর স্নায়ুবিক উপসর্গ দেখা দেয়। কলেবর বৃদ্ধির ফলেই মাথা ব্যথা দেখা দেয়। এই ধরনের রোগীদের রক্তে কিছু রাসায়নিক পদার্থ যেমন সিরোটোনিন, নর-ত্রপিনেফ্রিন ইত্যাদির মাত্রা বৃদ্ধি পায়।

চিকিৎসা:

চিকিসার মাধ্যমে মাইগ্রেনের নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। কিন্তু পুরোপুরি আরোগ্য লাভ সম্ভব নয়। তবে আশার কথা বয়োঃবৃদ্ধির সাথে সাথে মাথা ব্যথা এমনিতেই কমে যায়।

১. এটাকের সময় চিকিৎসা:

এই সময় রোগীকে ব্যথানাশক ওষুদ( NSAID) যেমন প্যারাসিটামল, এসপিরিন, ইন্ডোমিথসিন ইত্যাদি জাতীয় ওষুধ দিলে মাথা ব্যথা কমে আসে। তবে জটিল মাইগ্রেন বা স্নায়ুবিক মাইগ্রেনে আরগট জাতীয় ওষুধ প্রয়োজন হয় এই আরগটি জাতীয় ওষুধ ব্যবহার না করাই ভালো। কারণ এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অত্যাধিক। অবশ্যই ঝুঁকিপূর্ণ কারণসমূহের চিকিৎসা করাতে হবে। যেমন আলো থেকে দূরে থাকতে হবে। টাইরামিন যুক্ত খাবার পরিহার করতে হবে ইত্যাদি।

২. এটাকবিহীন অবস্থায় চিকিৎসায়:

এটাকবিহীন অবস্থায় রোগীর তেমন কোন ওষুধ সাধারণত প্রয়োজন হয় না। তবে যদি রোগীর মাথা ব্যথা ঘন ঘন হয়(৩-৪ বার মাসে) এবং রোগীর স্বাভাবিক কাজকর্মের অসুবিধা হয়, ঐসব ক্ষেত্রে মাইগ্রেনের প্রতিকার অবশ্যই নেওয়া উচিত। যেমন প্রোপ্রানোলল ২০-৪০ মিলিগ্রাম রেজ ২-৩ বার ব্যবহার করলে প্রায় ৫০ ভাগ ক্ষেত্রে মাথা ব্যথার তীব্রতা কমে যায় এবং মাথা ব্যথাও খুব কম দেখা দেয়। এমট্রিপটাইলিন জাতীয় ওষুধ প্রত্যহ রাতে ২৫-৫০ মিলিগ্রাম দীর্ঘ সময় ব্যবহার করলেও ভালো ফল পাওয়া যায়।

জটিল বা দীর্ঘ সময় যেসব রোগীর মাথা ব্যথা থাকে ঐ ধরনের রোগীদের বেলায় নিফিন বা ভেরাপামিল জাতীয় ওষুধ বব্যহার করলে রোগীর মাথা ব্যথা কমে আসে। অনেক সময় ল্যরগেগটিল জাতীয় ওষুধ ৭-১০ দিন খেলে ভালো ফল দেখা যায়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রেডনিসিলি জাতীয় ওষুধও ভালো কাজ করে। তবে প্রোপানোলল ও এমিট্রিপটাইলিন দীর্ঘ সময় ব্যবহার করলেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভালো ফল পাওয়া যায়, তবে দীর্ঘ সময় ওষুধ খাওয়া প্রয়োজন।

আরও পড়ুনঃ শরীর সুস্থ রাখতে ঘুমের প্রয়োজনীয়তা।

গণ সচেতনতায় ডিপিআরসি হসপিটাল লিমিটেড

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*