
“আজ বিশ্ব ক্যান্সার দিবস – আসুন ক্যান্সারকে না বলি”
আজ “বিশ্ব ক্যান্সার” দিবস। প্রতিবছরের ন্যায় আজকেও দিবসটি পৃথিবী ব্যাপী পালিত হচ্ছে। ক্যান্সার থেকে বাঁচতে একটু সচেতনতাই যথেষ্ট। সচেতনতাই পারে বাঁচিয়ে দিতে অনেক জীবন! আজকে বিশ্ব ক্যান্সার দিবসে আমরা নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জনবো:
ক্যান্সার কী?
কেন হয়?
কীভাবে হয়?
কীভাবে ডায়াগনোসিস করা হয়?
মানুষের শরীরে ক্যান্সারের প্রভাব কী?
ক্যান্সার প্রতিকারের উপায় কী?
এবং চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো।
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর অনেক জটিল। তারপরেও যথাসাধ্য চেষ্টা করব সহজবোধ্য করে উপস্থাপন করতে। রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে অনেকগুলো টেক্সট বই আর লেকচার!
০১. ক্যান্সার কী?
ক্যান্সার সবচেয়ে ভয়ংকর রোগগুলোর একটি। এ পর্যন্ত প্রায় ২৫০ ধরণের ক্যান্সার আবিষ্কৃত হয়েছে। বলা হয়ে থাকে আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে বড় ঘাতক এই ক্যান্সার। বিজ্ঞানের এত অগ্রগতির পরেও এখনো ক্যান্সার নিরাময়ে সে অর্থে তেমন কোনও অগ্রগতি নেই। চিকিৎসাও অনেক ব্যয়বহুল।
০২. কেন হয়?
ক্যান্সারের মূল কারণ অনিয়ন্ত্রিত কোষ বিভাজন। আপনি জেনে থাকবেন জীবের ক্ষুদ্রতম একক হচ্ছে কোষ আর এই কোষ প্রতিনিয়ত বিভাজিত হয়ে থাকে। যখন কোনও কারণে এই বিভাজন নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যায় তখন সৃষ্টি হয় টিমার। কিন্তু সকল টিউমার ক্যান্সারে রূপান্তরিত হয় না। কিছু টিউমার থাকে খুব আক্রমণাত্মক, তারাই ক্যান্সারে রূপান্তরিত হয়, যার অপর নাম ম্যালিগনেন্ট টিউমার!
০৩. কোষ বিভাজনের কারণ?
এই অনিয়ন্ত্রিত কোষ বিভাজনের কারণ কী? তা অনেক জটিল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হয়। এর জন্যে একটু গভীরে যেতে হবে। কোষ বিভাজনের জন্যে কিছু জিন দায়ী। তার মধ্যে কিছু জিন আছে যারা কোষ বিভাজনে সহায়তা করে তাদের বলা হয় প্রোটো-অনকোজিন, আর কিছু জিন রয়েছে যাদের কাজ হল কোষ বিভাজন নিয়ন্ত্রন করা বা থামিয়ে দেয়া যাতে তারা নিয়ন্ত্রনের বাইরে গিয়ে টিউমার সৃষ্টি করতে না পারে, তাদের বলা হয় টিউমার সাপ্রেসর জিন অথবা অ্যান্টি অনকোজিন! এখানে প্রণিধানযোগ্য যে, জিন হল আমাদের জিনোমের একটি নির্দিষ্ট অংশ। যারা মূলত সবকিছুর জন্যে দায়ী।
পৃথিবীতে এ পর্যন্ত প্রায় দুহাজারের অধিক জিন আবিষ্কৃত হয়েছে। তবে ধারণা করা হয়ে থাকে প্রায় বিশ হাজারের মত জিন রয়েছে মানব জিনোমে। ক্যান্সারের কারণের সাথে এই জিনগুলো ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। ক্যান্সার মূলত দুভাবে হতে পারে এক হল, প্রোটো-অনকোজিনের আধিক্য অথবা অ্যান্টি অনকোজিনের অনুপস্থিতি। এদের আধিক্য বা অনুপস্থিতিই মূলত ক্যান্সারের জন্যে দায়ী। এর পেছনে মূল কারণ হল জিনগুলোর মিউটেশন বা পরিবর্তন। মিউটেশন কী তা সহজে বুঝানোর জন্যে একটি উদাহরণ দেয়া যাক। আমাদের মানব জিনোম যদি হয় একটি বই, জিনগুলো হল এক একটি অধ্যায়।
আর সে অধ্যায়ের যদি কোনও শব্দ পরিবর্তিত-পরিবর্ধিত-সংযুক্ত-বিয়োগ হয় তাকে মিউটেশন বলে। আর জিনোমের সেই শব্দগুলো হচ্ছে ডিএনএ বেস যাদের সহজ ভাষায় A T G C দ্বারা বুঝানো হয়। তবে একটি মিউটেশনই যথেষ্ট নয়। গবেষণায় দেখা গেছে ৩-২০ টা মিউটেশন লাগে। এর বাইরেও রয়েছে অনেকগুলো কারণ। যারা সব একসাথে হয়ে সৃষ্টি কর মরণব্যাধি মহাঘাতক ক্যান্সার! এই মিউটেশনের সবচেয়ে বড় কারণ সিগারেট, যার মধ্যে প্রায় ষাটটির বেশি ক্যামিকেল পাওয়া গেছে যার জন্য মিউটেশন হতে পারে। আরও রয়েছে বিভিন্ন কেমিকেল, বিকিরণ, অতি বেগুনী রশ্মি, ভাইরাস ইত্যাদি।
০৪. কীভাবে ডায়াগনোসিস করা হয়?
ক্যান্সার মূলত ডায়াগনোস করা হয়ে থাকে বায়েপসির মাধ্যমে, যার মাধ্যমে ক্যান্সারের ধরণ নির্ণয় করা হয়। এর বাইরেও বিভিন্ন রকমের পদ্ধতি রয়েছে। তারমধ্যে ইমিউনো-হিস্টোকেমিস্ট্রি, সিটি স্ক্যান, এমআরআই, পিইটি সিটি প্রণিধানযোগ্য! বিভিন্ন ধরণের ক্যান্সারের বিভিন্ন রকমের উপসর্গ রয়েছে। মূলত খুব অল্প সময়ে অনেক বেশি ওজন হারানো, অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ, ক্ষুধামন্ধা, টিউমার এসব প্রধান। কারো এধরনের কোন উপসর্গ থাকলে যতদ্রুত সম্ভব ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া উচিত।
০৫. মানুষের শরীরে ক্যান্সারের প্রভাব কী?
ক্যান্সার মূলত শুরুতে একটি বিশেষ স্থান থেকে শুরু হয়ে থাকে। এরপর ছড়িয়ে পড়তে থাকে দেহজুড়ে। ক্যান্সারের এই ছড়িয়ে পড় বিষয়টি বেশ জটিল। মূলত এর কারণেই মানুষের মৃত্যু ঘটে থাকে। অতিদ্রুত বাড়তে থাকা টিউমারের দরকার পড়ে অতিরিক্ত পুষ্টির যা সে চুষে নেয় আশেপাশের ভালো কোষগুলো থেকে, তার ফলে মরতে থাকে সেইসব কোষও। আর শরীরের বিভিন্ন অংঙ্গে ছড়িয়ে পড়লে অকেঁজো হয়ে যায় সেগুলোও। যার পরিণতি অনিবার্য মৃত্যু।
০৬. ক্যান্সার প্রতিকারের উপায় কী?
যেহেতু ক্যান্সারের সেই অর্থে প্রতিকার নেই, তাই প্রতিরোধই উত্তম। শুধুমাত্র ধূমপান ছেড়ে দিলেই ক্যান্সারে আক্রান্ত্র হওয়ার সংখ্যায় আসবে আমূল পরিবর্তন। এর সাথে আমাদের খাদ্যাভাসও পারে ক্যান্সার থেকে রক্ষা করতে। অতিরিক্ত মাংস বাদ দিয়ে সবজি ফলমূল এসবের দিকে জোর দিতে হবে। অ্যালকোহলসহ অন্যান্য নেশা থেকে মুক্ত থাকা। মেয়েদের ক্ষেত্রে এখন সারভাইকাল ক্যান্সারের জন্যে রয়েছে টিকা। এছাড়া যদি সতর্ক থাকেন শুরুর দিকে ক্যান্সার নির্ণয় করা সম্ভব, সেক্ষেত্রে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। সর্বোপরি আপনার সচেতনতা আপনাকে অনেকাংশে মুক্তি দিতে পারে ক্যান্সার থেকে।
০৭. চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো
ক্যান্সারের সবচেয়ে উত্তম চিকিৎসা হল অস্ত্রপাচার বা সার্জারি। কেঁটে ফেলে দিলেন আপনি মুক্ত। তবে বিষয়টি জটিল হয়ে যায় যখন ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ে। সেক্ষেত্রে সার্জারি খুব একটা কার্যকর না। রেডিয়েশন থেরাপিও এখন বহুল প্রচলিত, তবে সাইড ইফেক্ট প্রচুর। কেমোথেরাপি দেয়া হয় যখন ক্যান্সার যদি শরীরের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে।
তবে এক্ষেত্রেও সাইড ইফেক্ট প্রচুর। যত না ক্যান্সারের কারণে মৃত্যু হয় তার চেয়ে বেশি দায়ী রেডিও আর কেমো। এ নিয়ে সারাবিশ্বে অনেক বিতর্ক। বিজ্ঞানের এত অগ্রগতির পরেও ক্যান্সার চিকিৎসায় সেই অর্থে কোনও সাফল্য নেই। যদিও সারাবিশ্বে চলছে অসংখ্য গবেষণা। হাজারো বিজ্ঞানী দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন। ব্যয় হচ্ছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার! হয়ত একদিন সাফল্য আসবে। বিশ্ব মানব জাতির কাছে হার মানবে এই মরণব্যাধি মহাঘাতক ক্যান্সার!
ডাঃ মোঃ রহমতউল্যাহ (শুভ)
ডিপিআরসি হাসপাতাল ও ডায়াগ্নেস্টিক ল্যাব লিঃ
medicalbd সাস্থের সকল খবর।
