
হেপাটাইটিস-বি প্রেক্ষিত বাংলাদেশ-(পর্ব-৩)
ক্রনিক হেপাটাইটিস-বি রোগীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা চালিয়ে যাওয়া কি সম্ভব?
ক্রনিক হেপাটাইটিস-বি রোগীদের কিছু কার্যাবলী সম্পাদন করা প্রয়োজন, যা দ্বারা তাদের লিভারকে সুস্থ ও স্বাভাবিক রাখতে পারেন। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আক্রান্ত রোগীকে নিয়মিত একজন লিভার বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে থাকতে হবে। অন্তত: বছরে এক-দু’বার। চিকিৎসক দ্বারা রোগীর নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা, শারীরিক পরীক্ষা এবং আল্ট্রাসনোগ্রাফির মাধ্যমে যকৃতের অবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
ক্রনিক হেপাটাইটিস-বি এবং দপানের যুগপৎ উপস্থিতি রোগীর জন্য ভয়াবহ বিভিন্ন সমীক্ষা এবং পরীক্ষার মাধ্যমে দেখা গেছে সামান্য অ্যালকোহল সেবন ও রোগাক্রান্ত লিভারের অনেক ক্ষতিসাধন করতে পারে। এ ক্ষেত্রে অ্যালকোহল সেবন সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করলে লিভারের পরবর্তী অন্যান্যা ক্ষতিসাধনের আশঙ্কা কমে যায়। সুষম খাদ্য গ্রহণ লিভারকে সুস্থ ও স্বাভাবিক রাখার জন্য খুব সহজতর একটি উপায়। যদিও ক্রনিক হেপাটাইটিস-বি এর ক্ষেত্রে কোনো সুনির্দিষ্ট খাদ্য তালিকা নেই। সমীক্ষায় দেখা গেছে, হলুদ ও সবুজ শাকসবজি লিভারের জন্য উপকারী। আমেরিকান ক্যান্সার সোসাইটির মতে, যেসব খাদ্যে চর্বির পরিমাণ কম, কোলেস্টেরল কম এবং তন্তুজাতীয় খাদ্য লিভারের জন্য উপকারী। ক্রনিক হেপাটাইটিস-বি রোগী ইতোমধ্যেই একটি ভাইরাস দিয়ে সংক্রমিত হয়েছেন, তাই তাকে অন্যান্য হেপাটাইটিস ভাইরাস থেকে মুক্ত থাকা প্রয়োজন এবং এ জন্য তার চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে প্রয়োজনীয় অন্যান্য টিকা গ্রহণ জরুরি। ওইসব ওষুধ পরিত্যাগ করা উচিত যেগুলো লিভারের মাধ্যমেই বিপাক হয়ে থাকে এবং যা লিভারের জন্য ক্ষতিকর। এসব জিনিসের মধ্যে এমন সব ক্ষতিকারক রাসায়নিক পদার্থ থাকে, যা যকৃতের কর্মক্ষমতা নষ্ট করে দেয়।
গর্ভকালীন অবস্থায় হেপাটাইটিস-বি’র পরীক্ষা করা কি জরুরি?
গর্ভকালীন অবস্থায় হেপাটাইটিস-বি এর পরীক্ষা করানো অবশ্যই বাঞ্ছনীয়। গর্ভবতী মা যদি হেপাটাইটিস-বি দ্বারা সংক্রমিত হন তাহলে প্রসবকালীন সময় তিনি তার নবজাতককে সে ভাইরাস স্থানান্তর করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে যদি কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হয় তাহলে শতকরা ৯০ ভাগ শিশুই জন্মের সাথে সাথে হেপাটাইটিস-বি রোগে আক্রান্ত হতে পারে। তাই রোগের সংক্রমণ থেকে নতুন প্রজন্মকে বাঁচাতে হলে প্রত্যেক গর্ভবতী মাকে হেপাটাইটিস-বি’র পরীক্ষা করানো দরকার। গর্ভাবস্থায় কোনো মা যদি হেপাটাইটিস-বি দ্বারা আক্রান্ত বলে প্রমাণিত হয়ে থাকেন, তাহলে তাকে একজন লিভার বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধান থাকতে হবে। যদিও হেপাটাইটিস-বি রোগাক্রান্ত কোনো গর্ভবতী গর্ভকালীন বা প্রসবকালীন কোনো প্রকার ঝুঁকি বা সমস্যার সম্মুখীন হন না। তার পরও একজন লিভার বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে থাকলে মায়ের মানসিক অবলম্বনটা অন্তত মজবুত হওয়ার পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তা মঙ্গল বার্তা বয়ে আনে।
নবজাতককে হেপাটাইটিস-বি থেকে কিভাবে রক্ষা করা যায়?
হেপাটাইটিস-বি পজিটিভ গর্ভবতী মায়ের ক্ষেত্রে তার নবজাতককে প্রসবকালীন ঘরেই দুটো টিকা দেয়া হয়। প্রথমটি হেপাটাইটিস-বি এবং অন্যটি হেপাটাইটিস-বি ইমিউনোগ্লোবিউলিন (Immunoglobulin)। যদি এ দুটো টিকা সঠিকভাবে জন্মের ১২ ঘণ্টার মধ্যে দেয়া যায় তাহলে শতকরা ৯৫ ভাগ নবজাতককে সারা জীবনের জন্য হেপাটাইটিস-বি’র সংক্রমণ থেকে রক্ষা করা সম্ভব। শিশুকে সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষা দিতে হলে তার এক ও ছয় মাসের সময় হেপাটাইটিস-বি’র টিকা অতিরিক্ত হসিবে আরো দুটো ডোজ দেয়া হয়। যদি কোনো মা জেনে থাকেন যে তিনি হেপাটাইটিস-বি রোগে আক্রান্ত, তাহলে তা তার চিকিৎসককে অতি সত্তর জানানো জরুরি। যাতে করে তার প্রসবের সময় টিকা দুটো নবজাতককে দেয়ার জন্য সংগ্রহে রাখা যায়। যদি কোনো কারণে নবজাতককে টিকা দুটো সময়মতো না দেয়া হয় তাহলে তার রোগ সংক্রমণের আশঙ্কা প্রায় শতকরা ৯০ ভাগ দীর্ঘদিনের জন্য স্থায়ী রূপ লাভ করতে পারে। তাই সব নবজাতককে জন্মের সাথে সাথে হেপাটাইটিস-বি এর টিকা দেয়া খুবই জরুরি। এ ছাড়া ভাইরাসের মাত্রা বেশি হলে গর্ভবতী মাকে ওষুধ প্রয়োগ করা লাগতে পারে।
বি-ভাইরাসে আক্রান্ত মা কি শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারবেন?
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা অর্থাৎ WHO-এর অঙ্গসংগঠন CDC (Centre for disease control and prevention)-এর মতে, হেপাটাইটিস-বি রোগাক্রান্ত মা তার নবজাতককে বুকের দুধ নিশ্চিন্তে এবং নিরাপদে খাওয়াতে পারবেন। এ ব্যাপারে মায়েদের নবজাতককে বুকের দুধ খাওয়াতে উৎসাহিত করা হয়। জানা যায়, বুকের দুধের মাধ্যমে হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস ছড়ায় না। অধিকন্তু সব নবজাতককে জন্মের সাথে সাথে হেপাটাইটিস-বি এর টিকা দেয়া আবশ্যক যাতে আগামীতে রোগের জীবাণু নবজাতককে কোনোভাবেই সংক্রমিত করতে না পারে।
পরিবারের কোনো সদস্য যদি হেপাটাইটিস-বি দ্বারা আক্রান্ত হয় তা থেকে কিভাবে শিশুকে রক্ষা করা সম্ভব?
যেকোনো নবজাতক এবং শিশুই হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হতে পারে তার রোগাক্রান্ত পিতামাতা, ভাইবোন অথাবা পরিবারের অন্য যেকোনো সদস্যের মাধ্যমে যারা নিত্যব্যবহার্য একই জিনিস ব্যবহার করেন। সংক্রমিত রক্ত অথবা শারীরিক বিভিন্ন তরল পদার্থের মাধ্যেমে নবজাতক আক্রান্ত হয়। হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসের বিস্তার রোধে টিকা প্রদানই সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিরোধকারী ব্যবস্থা। পরিবারেরর কোনো সদস্য যদি হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস দ্বারা রোগাক্রান্ত হন, তাহলে ওই পরিবারের সব সদস্যেরই টিকা নেয়া বাঞ্ছনীয়। বিশেষ করে তা নবজাতক ও শিশুদের বেলায় বিশেষ গুরুত্বের দাবিদার। কারণ তারা যদি জীবনের প্রাথমিক পর্যায়েই বি-ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয় তাহলে ভবিষ্যতে তাদের লিভার দীর্ঘ দিনের রোগ সংক্রমণের ফলে ধীরে ধীরে অকার্যকর হয়ে যাবে। তাদেরকে ছয় মাসের মধ্যে তিনটি টিকা দেয়া হয়, য তাদের সারা জীবনের জন্য বি-ভাইরাস থেকে রক্ষা করবে।
যত দিন পর্যন্ত টিকার সম্পূর্ণ ডোজ নেয়া শেষ না হবে, তত দিন পর্যন্ত তাকে অন্যের ব্যবহার্য জিনিস ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। সেভিং রেজার, টুথব্রাশ, কান পরিষ্কারক যন্ত্র ইত্যাদির মাধ্যমে এবং অসাবধানতাবশত আক্রান্ত রোগীর রক্ত অন্যের দেহে যাওয়া যেকোনো ক্ষতস্থানকে সতর্কতার সাথে ঢেকে রাখতে হবে। রক্ত লাগানো যন্ত্রপাতি বা ব্যবহার্য জিনিস ১০ শতাংশ ব্লিচিং পাউডার দ্রবণ দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে এবং গ্লোবস ব্যবহার করতে হবে। রোগাক্রান্ত কোনো ব্যক্তির হাঁচি, সর্দি, কাশি ও তার দ্বারা তৈরি করা খাদ্য গ্রহণ করলে হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা নেই। মনে রাখবেন আপনি আপনার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটির জন্য হেপাটাইটিস-বি’র সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা করবেন।
হেপাটাইটিস-বি’র বিপক্ষে কি কোনো প্রতিরক্ষামূলক নিরাপদ ব্যবস্থা আছে?
অবশ্যই রয়েছে। হেপাটাইটিস-বি’র বিপক্ষে খুবই কার্যকর ও নিরাপদ ব্যবস্থা হিসেবে টিকা আবিষ্কৃত হয়েছে। এটি একটি ভালো সংবাদ তাদের জন্য যাদের বি-ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে। প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী এক বিলিয়নের ওপর টিকা দেয়া হয়। টিকাটি ছয় মাসের মধ্যে তিনটি পর্যায়ে দেয়া হয়, যা তাদের সারা জীবনের জন্য হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস থেকে সুরক্ষা প্রদান করে।
হেপাটাইটিস-বি’র বিপক্ষে প্রতিরক্ষা সম্পূর্ণ হয়েছে কি না তা কিভাবে জানা যাবে?
যদি কেউ হেপাটাইটিস-বি’র টিকা পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ করে, তারপর একটি সহজ রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে বলা যাবে যে তার দেহে প্রতিরক্ষামূলক অ্যান্টিবডি সম্পূর্ণ সাফল্যের সাথে তেরি হয়েছে কি না। হেপাটাইটিস-বি’র টিকা সম্পূর্ণ শেষ করার এক মাস পর ওই রক্ত পরীক্ষা করা হয়। যদি হেপাটাইটিস-বি’র টিকা গ্রহণের ফলে তার শরীর প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা সম্পন্ন করতে সমর্থ হয়, তাহলে ওই রক্ত পরীক্ষায় হেপাটাইটিস-বি সারফেস অ্যান্টিবডি পজিটিভ হবে। টিকা গ্রহণের এক মাসের মধ্যে প্রত্যেকে অবশ্যই তাদের রক্তে অ্যান্টিবডির মাত্রা নিরূপণ করবেন।
টিকা শুরু করার সময় পরে প্রতিরক্ষা গড়ে ওঠে?
হেপাটাইটিস-বি টিকার প্রথম ডোজ দেয়ার পর এ রোগ থেকে প্রতিরক্ষা পওয়ার সম্ভাবনা ৫০ শতাংশের বেশি হয়ে থাকে, যা শতকরা ৮০ ভাগের ওপরে উঠে যায় টিকার দ্বিতীয় ডোজ দেয়ার পর এবং সর্বোপরি টিকার তৃতীয় ডোজ দেয়ার পর সারা জীবনের জন্য রোগটির বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, যা নেয়া খুবই জরুরি। এ ক্ষেত্রে যদি সম্ভব হয় তাহলে টিকা নেয়া শেষ করার এক মাস পরে চিকিৎসকের মাধ্যমে রক্ত পরীক্ষার দ্বারা অ্যান্টিবডির উপস্থিতি দেখে নেয়া ভালো, যা রোগটির বিপক্ষে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থার মানদ-কে নির্দেশ করে।
সব রোগীরই কি চিকিৎসা কার বাঞ্ছনীয়?
ক্রনিক হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসে আক্রান্ত সব রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসার প্রয়োজন পড়ে না, এটা আমাদের জানা থাকা জরুরি। যেসব রোগীর লিভার রোগাক্রান্ত হওয়ার বিভিন্ন উপসর্গ বর্তমান থাকে, তারাই প্রচলিত চিকিৎসার মাধ্যমে উপকৃত হন। যা হোক যারা দীর্ঘ দিন ধরে এ রোগ ভুগছেন তারা তাদের চিকিৎসকের মাধ্যমে বছরে অন্তত একবার পরামর্শ নেয়া প্রয়োজন। যার ফলে রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট পথনির্দেশনা পাওয়া সম্ভব। আক্রান্ত রোগী তার চিকিৎসকের সাথে পরামর্শের মাধ্যমে যা তার জন্য উপকারী সে রকম প্রয়োজনীয় চিকিৎসার মাধ্যমৈ নিজেকে সুস্থতার পর্যায়ে উন্নীত করতে প্রাণান্তকর প্রচেষ্ট চালাবেন এটাই স্বাভাবিক আশা।
হেপাটাইটিস-বি এর চিকিৎসা:
যারা হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস দ্বারা দীর্ঘ দিন ভুগছেন তাদের বেদনাময় অসুস্থ ভবিষ্যৎ আশার নতুন আলোতে উদ্ভাসিত হয়েছে যেখানে আজ থেকে ১৫ বছর আগেও লিভার রোগের বিভিন্ন চিকিৎসার জন্য কোনো প্রকার দিকনির্দেশনা আবিষ্কৃত হয়নি। কিন্তু বর্তমানে কিছু আবিষ্কৃত হয়েছে যা গ্রহণের ফলে ভাইরাসটি দ্বারা লিভারের ক্ষয় ধীরগতিসম্পন্ন হবে। এ ক্ষেত্রে লিভারের ক্ষয়সাধন আগের তুলনায় কম হবে এবং পরবর্তীকালে লিভারের বিভিন্ন জীবননাশকারী রোগ হওয়ার আশঙ্কা কমে যাবে। বর্তমান প্রচলিত সব নতুন গবেষণা আমাদের আশা দিয়েছে যে, ক্রনিক হেপাটাইটিস-বি নিয়ে যারা বেঁচে আছেন তাদেরপূর্ণ সুস্থতার মাধ্যমে স্বাভাবিক সুন্দর জীবনে প্রত্যাবর্তন চিকিৎসা ক্ষেত্রে তো বটেই, এমনটি আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে নবদিগন্তের সূচনা করবে বৈকি। এমনকি সব আধুনিক ওষুধই বাংলাদেশে পাওয়া যাচ্ছে।
অতএব বি-ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করলে রোগের বিভিন্ন জটিলতা তৈরি হয়। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এমনিতেই নিরাময় হয়। কিন্তু ক্রনিক হেপাটাইটস, সিরোসিস ও ক্যান্সারের মতো মারাত্মক পরিণতি হতে পারে। নিরাময় হচ্ছে কি না তা লিভার বিশেষজ্ঞের তত্ত্ববধানেই বুঝতে হবে। ক্রনিক হেপাটাইটিস ও সিরোসিসের আধুনিক সব চিকিৎসাই আমাদের দেশে সম্ভব।
medicalbd সাস্থের সকল খবর।
