শরীরে লবণশূন্যতা (পর্ব – ১)

শরীরে লবণশূন্যতা

শরীরের লবণশূন্যতা বলতে বোঝায় যখন রক্তে সোডিয়ামের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়। সোডিয়াম এক ধরনের ইলেকট্রোলাইট, যা কোষের ভেতর ও বাইরে পানিকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। শরীরের কোনো অন্তর্নিহিত অসুখের কারণে বা অতিরিক্ত পানি পান করার কারণে শরীরে লবণশূন্যতা দেখা দিতে পারে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে শরীরে পানির পরিমাণ বেড়ে যায়। এবং শরীরের কোষগুলো ফুলতে শুরু করে। কোষের এই বেড়ে যাওয়া মৃদু থেকে তীব্র অনেক ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি করতে পারে।

শরীরের লবণশূন্যতা চিকিৎসা করতে গেলে অন্তর্নিহিত অসুখের চিকিৎসা করতে হবে। শরীরে লবণশূন্যতার কারণের ওপর নির্ভর করে কতটুকু পানি খেতে হবে। শরীরে লবণশূন্যতার অন্যান্য কারণে শিরার ভেতর পানি ও ওষুধ নিতে হয়।

শরীরের লবণশূন্যতায় নিম্নলিখিত লক্ষণ দেখা যায়:

বমি বমি ভাব এবং, মাথাব্যথা, অনিশ্চয়তা, ক্লান্তি, অস্থিরতা ও রুক্ষতা, মাংসে দুর্বলতা, সঙ্কোচন ও কামড়ানো, খিঁচুনি, অচেতনতা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া সোডিয়াম শরীরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এটা রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। স্নায়ু ও মাংসের কাজকর্মে সমর্থন জোগায় এবং শরীরের পানীয় অংশের সমতা রক্ষা করে।

যখন শরীরের রক্তে সোডিয়ামের পরিমাণ বেশি কমে যায় তখন কোষের ভেতর পানি ঢুকে ও তা ফুলে যায়। মস্তিষ্কের কোষ যখন ফুলে যায় তখন ভীষণ বিপদ দেখা দিতে পারে। কারণ মস্তিষ্ক শক্ত খোলের মধ্যে থাকে এবং এটা ফুলে গেলে বিভিন্ন লক্ষণ দেখা দেয়।

রক্তে সোডিয়ামের স্বাভাবিক মাত্রা ১৩৫ থেকে ১৪৫ মিলি ইকুয়েভেলেন্ট পার লিটার, যখন সোডিয়াম ১৩৫-এর নিচে নেমে আসে তখন শরীরে লবণশূন্যতা দেখা দেয়। তিন কারণে রক্তে সোডিয়াম ও পানির অসমতা দেখা দিতে পারে-

১.শরীরে যখন পানির পরিমাণ বেড়ে যায়। এটা সাধারণত কিডনি, হার্ট ও লিভার ফেইলিউরে দেখা যায়।

২.শরীরে পানির পরিমাণ মারাত্মক আকারে বেশি হতে পারে- কোনো কোনো ক্ষেত্রে যেমন দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্য সমস্যা, ক্যান্সার ও বিশেষ বিশেষ ওষুধ ইত্যাদি।

৩.কোনো কোনো ক্ষেত্রে রোগীর শরীরে সোডিয়াম ও পানি দু’টিরই স্বল্পতা দেখা দেয়। এটা দেখা দিতে পারে যখন কেউ অতিরিক্ত গরমের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ ব্যায়াম করে, কিন্তু কোনো পানীয় পান করে না বা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে।

অনেক সম্ভাব্য কারণে এবং জীবনধারণের উপায়গুলোও অনেক সময় শরীরে লবণশূন্যতার কারণ হতে পারে

বিশেষ বিশেষ ওষুধ: কোনো কোনো ওষুধ যেমন মানসিক রোগের ওষুধ এবং ব্যথার ওষুধের কারণে বেশি বেশি প্রস্রাব ও ঘাম হতে পারে, যা শরীরে লবণশূন্যতার কারণ হিসেবে দেখা দিতে পারে।

পানির বড়ি (ডাইইউরেটিক্স): বিশেষ করে থায়াজাইড ডাইইউরেটিক্স।ডাইইউরেটিক্স শরীর থেকে অনেক সোডিয়াম প্রস্রাবের সাথে বের করে দেয়।

সিরোসিস: লিভারের অসুখের কারণে শরীরে পানি জমতে পারে।

কিডনিতে সমস্যা: কিডনি ফেইলিউর এবং কিডনির অন্যান্য অসুখে শরীর থেকে পানি বের করা কঠিন হয়ে পড়ে।

কার্ডিয়াক ফেইলিউর: এই অবস্থায় শরীরে ADH-এর পরিমাণ বেশি থাকায় শরীর থেকে পানি বের করার পরিবর্তে শরীর বেশি পানি ধরে রাখে।

ব্যায়ামের সময় অতিরিক্ত পানি পান করা (পরিশ্রমজনিত লবণশূন্যতা) যেহেতু মানুষ ঘামের মধ্যে শরীর থেকে লবণ হারায়, সেহেতু পরিশ্রমের পর অতিরিক্ত পানি পান করলে রক্তে লবণের ঘনত্ব কমে যায়, যেমন- ম্যারাথন দৌড়ের সময়। এড্রিনাল গ্রন্থির অসমর্থতার জন্য- হরমোনের পরিবর্তন (এডিসন্স রোগ) এড্রিনাল গ্রন্থি যে হরমোন তৈরি করে তা শরীরের সোডিয়াম পটাশিয়াম ও পানির ব্যালেন্স রক্ষা করে।

থাইরয়েড গ্রন্থির অক্ষমতার জন্য হরমোনের পরিবর্তন (হাইপোথাইরয়েডিজম) হাইপোথইরয়েডিজমের কারণে রক্তে সোডিয়ামের মাত্রা কমে যেতে পারে।

মৌলিক অতিক্তি পানি পিপাসা: এ অবস্থায় পানি পিপাসা অত্যন্ত বৃদ্ধি পায়, ফলে রোগী বেশি পানি পান করে।

চিত্ত বিনোদনকারী ওষুধ একটাসি: এই এমফিটামিন তীব্র এমনকি মৃত্যু ঘটাতে পারে। এমন হাইপোনেট্রেমিয়া করতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদি তীব্র বমি: ডায়রিয়ার ফলে শরীর থেকে পানি ও ইলেকট্রোলাইট বের হয়ে যায়, যেমন- সোডিয়াম

ডিহাইড্রেশন: এই অবস্থায় শরীর থেকে পানি ও ইলেকট্রোলাইট বের হয়ে যায়।

খাবার: যেসব খাবারে লবণ কম থাকে, কিন্তু পানি বেশি থাকে সেসব খাবার কখনো কখনো রক্তে সোডিয়ামের মাত্রার তারমত্য করতে পারে।

বয়স: রক্তে লবণশূন্যতা বয়স্ক লোকদের বেশি হয়ে থাকে। শরীরে বার্ধক্যজনিত যে পরিবর্তন হয় এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বয়সকালে শরীরে যে দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা দেখা দেয় সেগুলোর কারণেই শরীরে লবণশূন্যতা দেখা দেয়।

কোনো কোনো ওষুধ: যেসব ওষুধ শরীরে লবণশূন্যতার ঝুঁকি বাড়ায় তার মধ্যে থায়াজাইড অন্যতম। কোনো কোনো বিষণ্ণতার ওষুধ এবং ব্যথার ওষুধ, যার কারণে রোগী স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ঘামে কিংবা প্রস্রাব করে। এ ছাড়াও যেসব ওষুধ শরীরে উত্তেজনা বাড়ায় সেগুলোর কারণেও শরীরে লবণশূন্যতা দেখা দিতে পারে।

যেসব কারণে শরীর থেকে পানি বেশি নিঃসৃত হয় যেসব মেডিক্যাল কারণে শরীরে লবণশূন্যতা দেখা তার মধ্যে কিডনির অসুখ, SIADH ও হার্ট ফেইলিউর অন্যতম।

খাদ্য: যদি রোগী খাবারে কম লবণ খায়, তবে তার শরীরে লবণশূন্যতা দেখা দিতে পারে।

অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম: সেব খেলোয়াড় বিশেষ করে ম্যারাথন দৌড়ের সময় বেশি পানি পান করে তাদের শরীরে লবণশূন্যতা দেখা দিতে পারে।

জলবায়ু: যখন কোনো লোক নতুনভাবে গরম আবহাওয়াতে ব্যায়াম করে তখন তার অতিরিক্ত ঘাম হয়, ফলে শরীরে লবণশূন্যতা দেখা দিতে পারে।

আরও পড়ুনঃ শরীরে লবণশূন্যতা ও চিকিৎসা (পর্ব – ২)

গণ সচেতনতায় ডিপিআরসি হসপিটাল লিমিটেড

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*