রক্তস্বল্পতার কারণ, প্রতিকার ও প্রতিরোধ

বর্তমান সময়ে বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর মেয়েদের একটি প্রধান ও বড় সমস্যা রক্তস্বল্পতা বা লৌহস্বল্পতা । এর ফলে শরীরে অক্সিজেন ঘাটতি হয়, যা একজন নারীকে অসুস্থ ও দূর্বল করে তোলে। এর সুদূরপ্রসারী প্রভাবে পরবর্তী সময়ে সন্তান ধারণেও জটিলতার সৃষ্টি করে থাকে।

কাদের এই সমস্যা হয়: বাংলাদেশে শতকরা প্রায় ৪২ ভাগ মেয়ে বা মহিলা আয়রন বা রক্তে লৌহ-স্বল্পতায় ভুগছেন।  প্রতি ১০ জন মেয়ের মধ্যে ৪ জন আনিমিয়া বা রক্তস্বল্পতার শিকার।

আপনার স্বাস্থ্য বিষয়ক যেকোন তথ্য জানতে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন।
লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করে সাথেই থাকুন

রক্তস্বল্পতার লক্ষণ:

১. অল্পতেই হাঁপিয়ে যাওয়া

এক ঘর থেকে অন্য ঘরে যেতেই হাঁপিয়ে উঠছেন? বা সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় উঠতেই আর চলছে না শরীর, দূর্বল হয়ে পড়ছেন। যখন আয়রনের অভাব হয় রক্তে তখন প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের চাহিদা পূরণ না হওয়ার কারণেই শরীর হাঁপিয়ে ওঠে।

২. ক্লান্তিবোধ বোধ করা

রক্তের একটি অন্যতম প্রধান উপাদান হিমোগ্লোবিন । এই হিমোগ্লোবিনের কাজ হল শরীরের অক্সিজেন সরবরাহকে নিশ্চিত করা। শরীরে আয়রনের কমতি হলে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ কমে যায়। আর হিমোগ্লোবিন কম হওয়া মানেই হল শরীরে অক্সিজেনের সরবরাহে ব্যঘাত ঘটা। যখন প্রয়োজনের তুলনায় কম অক্সিজেন পায় তখন শরীর নিস্তেজ বোধ করে।

কোনো কিছুতেই উৎসাহ আসে না। তাই যদি দেখেন যে কিছুদিন ধরেই আপনার মধ্যে ক্লান্তিবোধের উপসর্গ দেখা দিচ্ছে, খুব বেশি দুর্বল লাগছে, তবে রক্তের হিমোগ্লোবিন পরিমাপ করতে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা করান।

৩. আলসেমি বা কুঁড়েমি ভাব

ছুটির দিনে  বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াতে বা পরিবারের সঙ্গে রেস্তোরাঁয় খেতে সবারই কম বেশি  ভালো লাগে । হয়তো কেনাকাটা করতে ভালোবাসতেন! কিংবা বই পড়তে বা মুভি দেখে সময় কাটাতে পছন্দ করতেন। হঠাতই খেয়াল করলেন এসব কিছুই করতে আর ভালো লাগছে না। জীবন এক আলসেমিতে পেয়ে বসেছে। দিনের পর দিন আলেসেমি কাটাতে যদি না পারেন তবে, রক্তের হিমোগ্লোবিন মাপতে ভুল করবেন না যেন।

৪. মাংসপেশির জড়তা

মাংসপেশির স্বাভাবিক সংকোচন প্রসারণের ক্ষমতা বাধা প্রাপ্ত হয় যদি শরীরে আয়রনের অভাব হয়। ফলে সামান্য ব্যায়াম বা হঠাৎ অতিরিক্ত পরিশ্রমে মাংসপেশিতে টান পড়ে। আর পেশিতে ব্যথা লাগে।

৫. মনোযোগের অভাব বা স্মরণশক্তি কমে যাওয়া

শরীরে আয়রনের ঘাটতি হলে নিউরোট্রান্সমিটার সিন্থেসিস- এর পরিবর্তন ঘটে যার ফলে মনোযোগের অভাব দেখা দেয় এবং এক পর্যায়ে এর প্রভাব তীব্র আকার ধারণ করতে পারে।

৬. ত্বক মলিন হয়ে যাওয়া

চেহারায় জৌলুস কমে যাচ্ছে দিন দিন। ত্বক আর আগের উজ্জ্বল না হয়ে মলিন হয়ে যাচ্ছে। শুষ্ক মলিন ত্বকের প্রধান কারণ একটিই, তা হল শরীরে লোহিত রক্ত কণিকার অভাব। শরীরে লোহিত রক্ত কণিকার পরিমাণ কম হলে চামড়ার উজ্জ্বলতা নষ্ট হয় খুব তাড়াতাড়ি।

৭. অসুস্থতা অনুভব

প্রায়শই হঠাৎ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়াটাও রক্তস্বল্পতার আরও একটি কারণ বড় কারণ। ছোটখাটো সর্দি-কাশি থেকে শ্বাসতন্ত্রের অসুখ— এ সবের অন্যতম প্রধান কারণ আয়রনের ঘাটতি। এখানে বলে রাখা ভালো— এই উপসর্গগুলো যদি কোনো ছেলের ক্ষেত্রেও মিলে যায় তবে বুঝে নিতে হবে তারও রয়েছে আয়রনের অভাব।

৮. ভঙ্গুর নখ

শরীরে আয়রনের অভাব আছে কিনা, তা নখ খেয়াল করলেও বোঝা যায়। রক্তস্বল্পতার কারণে পাতলা ও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে নখ। অনেকের নখ চামচের মতো বেঁকে যেতে থাকে। এটাও আয়রনের অভাবের একটা সাধারণ লক্ষণ।

তো চলুন প্রতিকারগুলো জেনে নিই- প্রতিকার:

==) শরীরে আয়রনের ঘাটতি যদি খুব মারাত্মক আকার ধারণ করে তবে, চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। রক্তস্বল্পতার তীব্রতা অনুযায়ী চিকিৎসা ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে।

==) তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে শুধু খাবার ও পথ্য দিয়ে রক্তস্বল্পতার চিকিৎসা সম্পূর্ণ হয় না। পথ্যের পাশাপাশি আয়রন, ফলিক এসিড ট্যাবলেট দিয়ে থাকেন চিকিৎসক।

==) যদি মৃদু রক্তস্বল্পতা হয় তবে সুষম, আয়রন সমৃদ্ধ ও ভিটামিন সি’জাতীয় খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

==) তাই অন্য সব অসুখের মতোই রক্তস্বল্পতার ক্ষেত্রেও প্রতিকারের চাইতে প্রতিরোধই ভালো।

==) ডিমের কুসুমও আনিমিয়া রোধে কার্যকর।

==) ক্ষেত্র বিশেষে তীব্র রক্তস্বল্পতায় রোগীকে রক্ত দেওয়া হয়ে থাকে।

প্রতিরোধগুলো জেনে রাখুন:

==) আয়রনের ঘাটতি পূরণে প্রাণীজ প্রোটিনের ভূমিকা অসাধারণ। ‘রেডমিট’ আয়রনের সবচেয়ে ভালো উৎস। পাশাপাশি কলিজা, ডিমের কুসুমও আনিমিয়া রোধে সমান কার্যকর।

==) উদ্ভিজ্জ খাবারের মধ্যে লৌহের প্রধান উৎস তরমুজ।

==) ফুলকপির ডাটাতেও আয়রন আছে প্রচুর। তবে উদ্ভিজ্জ খাবার থেকে আয়রন পেতে হলে শাক বা কপির সঙ্গে ভিটামিন সি’জাতীয় খাবারও খেতে হবে।

==) এছাড়া উদ্ভিদ-জাতীয় খাবারের মধ্যে কচুশাক, কাঁচকলা থেকেও আয়রন পাওয়া যায়।

==) পুষ্টিবিজ্ঞানিরা বলে থাকেন, খাবারের আয়রনকে পুরোপুরি ব্যবহার করার জন্য ভিটামিন সি’জাতীয় খাবার যেমন- পেয়ারা, আমলকি, বাতাবিলেবু, কমলা ইত্যাদি খেতে হবে। কারণ ভিটামিন সি’ জাতীয় খাবার উদ্ভিজ্জ উৎসের আয়রনকে খুব ভালোভাবে শরীরে শোষণ করতে সাহায্য করে। তাই লক্ষণ বুঝে চিকিৎসা নিন, ‍সুস্থ থাকুন।

ডা. আরবি বিনতে আজাদ
মেডিকেল অফিসার
চেম্বার: ডিপিআরসি হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনোস্টিক ল্যাব লি:
(১২/১ রিং রোড, শ্যামলী, ঢাকা-১২০৭)
ফোনঃ ০৯৬৬৬ ৭৭ ৪৪ ১১

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*