
ডায়াবেটিস নিউরোপ্যাথি রোগে করনীয়
আব্দুস সাত্তার বাঘেরহাট থেকে গত সপ্তাহে বারডেম হাসপাতালে এসেছিলেন পায়ের চিকিৎসার জন্য। দুই পায়ের বুড়ো আঙুল সাদা কাপড়ে মোড়া। চিকিৎসকের প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানালেন, পায়ের বুড়ো আঙুল মাঝেমধ্যে ফেটে যায়। নখ নষ্ট হয়ে আপনা-আপনি পড়ে যায়।
রাজধানীর বারডেম হাসপাতালের নিচতলায় নিবৃত্তিমূলক পায়ের যত্ন (প্রিভেন্টিভ ফুট কেয়ার) বিভাগের সামনে আব্দুস সাত্তার এর মতো এমন সমস্যা নিয়ে আসা রোগীর ভিড় প্রায় প্রতিদিন লেগেই থাকে। বিভাগের জ্যেষ্ঠ চিকিৎসা কর্মকর্তা ফারিয়া আফসানা মেডিকেলবিডিকে বলেন, এরা ডায়াবেটিসের রোগী। এদের প্রত্যেকেরই পায়ে সমস্যা আছে। পায়ের চিকিৎসার জন্য এই বিশেষ বিভাগ।
আঙুল বা গোড়ালির সামান্য ক্ষত সারানো সম্ভব হয়নি বলে পায়ের দু-একটি আঙুল, সব আঙুল, পায়ের পাতা, এমনকি হাঁটু পর্যন্ত কেটে ফেলতে হয়েছে অনেকেরই। এদের করুণ কাহিনী শোনা গেল হাসপাতালের পাঁচতলার ওয়ার্ডে গিয়ে। কেউ বললেন, ঠিক সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া হয়নি। কেউ বললেন, ধারণাই করেননি সামান্য ক্ষতের কারণে গোটা পা ফেলে দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, পা শরীরের প্রান্তিক অঙ্গ। অধিকাংশ মানুষই পায়ের দিকে খেয়াল রাখেন না। যত্ন নেন না। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথের (এনআইএইচ) বিজ্ঞানীরা বলছেন, রক্তে দীর্ঘদিন মাত্রাতিরিক্ত শর্করা থাকলে পা ও পায়ের পাতার স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত স্নায়ুর কারণে সেখানে যন্ত্রণা, ঠান্ডা বা গরম অনুভূত হয় না। অনুভূতির অভাবে ক্ষত বা কাটার যন্ত্রণা বোঝে না বলে অবস্থা আরও খাপার হয়। এটা হয় ক্ষতিগ্রস্ত স্নায়ুর কারণে, একে বলে ‘ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি’।
দ্বিতীয় সমস্যা হচ্ছে, ডায়াবেটিসের কারণে পা ও পায়ের পাতায় যথেষ্ট পরিমাণে রক্ত চলাচল হয় না। দুর্বল রক্ত প্রবাহের কারণে কোনো ক্ষত বা সংক্রমণ সহজে ভালো হয় না। এই অবস্থায় ধূমপান রক্তের প্রবাহে আরও সমস্যা তৈরি করে।
এনআইএইচ বলছে, এই দুটি সমস্যা একত্র হয়ে পায়ের সমস্যা তৈরি করে। উদারহণ হিসেবে বলা হচ্ছে: আকারে খাটে না এমন জুতা পরার কারণে পায়ে ফোস্কা পড়তে পারে। ডায়াবেটিসের রোগীর পায়ের স্নায়ু নষ্ট হওয়ার কারণে তিনি ফোস্কার যন্ত্রণা অনুভব করতে পারেন না। একপর্যায়ে ফোস্কা সংক্রমিত হয়। রক্তে বাড়তি শর্করা রোগজীবাণুর খাদ্যের উৎস হয়। এতে রোগজীবাণু বংশবিস্তার করে এবং সংক্রমণ আরও খারাপ হয়। দুর্বল রক্ত প্রবাহের কারণে ক্ষত দ্রুত ভালোও হয় না। এ থেকে একপর্যায়ে গ্যাংগ্রিন হতে পারে। গ্যাংগ্রিনের কারণে ক্ষত বা সংক্রমিত অংশের চারপাশের ত্বক ও টিস্যু শুকিয়ে বা মরে কালো হয়ে সেখান থেকে দুর্গন্ধ ছড়ায়। গ্যাংগ্রিনের বিস্তার রোধে চিকিৎসক রোগীর একটি আঙুল, গোড়ালি, পায়ের পাতা বা পায়ের একটি অংশ কেটে ফেলেন।
ফারিয়া আফসানা করণীয় হিসেবে আব্দুল কুদ্দুসকে বললেন, আঙুলের ক্ষত পুরোপুরি ভালো না হওয়া পর্যন্ত তিনি যেন সতর্ক হয়ে চলাফেরা করেন। প্রতিদিনের নিয়মিত হাঁটা (ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে প্রতিদিন হাঁটেন কুদ্দুস) বন্ধেরও পরামর্শ দিলেন। বললেন, ‘পায়ে চাপ পড়লে ঘা শুকাতে দেরি হবে।’
ফারিয়া আফসানা জানালেন, ৩৫ বছর বা তার বেশি বয়সী ডায়াবেটিস রোগীদের ৮০ শতাংশ পায়ের সমস্যার কথা বলেন। এরা পায়ের কড়া, ঘা, ফোস্কা, ফাটা নিয়ে আসেন।
এ ক্ষেত্রে পায়ের যত্নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে এনআইএইচ। প্রতিষ্ঠানটি বলছে প্রতিদিন ইশদোষ্ণ পানিতে পা ধুতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে, পানি যেন খুব গরম না হয়। বেশি গরম হলে ফোস্কা পড়ার আশঙ্কা থাকে। পা ভালোভাবে শুকাতে হবে, বিশেষ করে আঙুলের মাঝে যেন ভেজা না থাকে। প্রতিদিন দেখতে হবে পায়ে কোনো ফোস্কা, ক্ষত, কাটা, কড়া আছে কি না। পায়ের ত্বক শুষ্ক হলে লোশন ব্যবহারের কথা বলছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে দুই আঙুলের মধ্যে তা লাগানো যাবে না।
ফারিয়া আফসানাও তাঁর কাছে আসা রোগীদের এসব পরামর্শ দিলেন। মেডিকেলবিডিকে তিনি বলেন, সব জুতা ডায়াবেটিস রোগীর পায়ের সুরক্ষা দেয় না। জুতা-মোজা কেনা ও ব্যবহার চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হতে হবে। এমনকি পায়ের নখ কাটার বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।
medicalbd সাস্থের সকল খবর।
