ডাক্তারের অবহেলায় ২টি কিডনিই নষ্ট হল রোগীর (ভিডিও)

পোস্ট টি ভালো লাগলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন
  • 36
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
    36
    Shares

আগের রিপোর্ট, যেখানে ডান পাশে কিডনি আছে দেখা যাচ্ছে

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসকের ‘অসর্তকতা’য় চিকিৎসাধীন থাকার রোগীর দু’টি কিডনিই হারাতে হয়েছে । বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ঘটনা তদন্ত করার জন্য কমিটি গঠন করা হয়েছে। চিকিৎসকরাদের মতে, ‘পূর্ব থেকে সতর্ক থাকলে এ ধরনের ঘটনা ঘটতো না। দে ক্যান সেইভ ইফ দে প্ল্যানড আর্লিয়ায়।’ ‘কিডনি যাবে কোথায়, অবশ্যই আছে’ এরকম মন্তব্য করেন চিকিৎসক অধ্যাপক হাবিবুর রহমান।

ভোক্তভোগীর ছেলে রফিক সিকদার বলেন, বাম পাশের কিডনির জটিলতা নিয়ে তার মাকে গত ২৬ আগস্ট ২০১৮ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করেন। মূত্রথলির নালিতে পাথর হয়ে ব্লক হয়ে গিয়েছিল। রোগী ভর্তি করার পর বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর গত ৫ সেপ্টেম্বর অস্ত্রোপচার করার সিদ্ধান্ত নেন চিকিৎসকরা। ঐ সময়ের রিপোর্ট অনুসারে বাম কিডনি তখনো কিছুটা সচল ছিল, আর ডান পাশের কিডনি সম্পূর্ণ ভালো ছিল।

ভোক্তভোগীর ছেলে রফিক বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসক ইউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক আমাকে বলেন, ‘বাম পাশের কিডনি রাখতেই চাই না, একটা কিডনি নিয়ে মানুষ বছরের পর বছর বেঁচে থাকে।’ এরপর গত ৫ সেপ্টেম্বর তার অস্ত্রোপচার হয়। এরপর মাকে পোস্ট অপারেটিভে নেওয়া হলে দেখতে পাচ্ছিলাম মায়ের শরীর ফুলে যাচ্ছে, তার জ্ঞান ছিল। কিন্তু তার প্রস্রাব হচ্ছিল না, ক্যাথাটার লাগানো ছিল, কিন্তু তিনি প্রস্রাব করছিলেন না-এরকমটাই দায়িত্বরত চিকিৎসক আমাকে জানালেন।’

এদিকে ‘৮.৩০ আটটার পর বলা হলো, আইসিইউ সার্পোট লাগবে। তখন বিএসএমএমইউতে আইসিইউ না থাকায় তারা আমাদের বেসরকারিতে খোঁজ নিতে বলেন। হাসপাতাল থেকে বলা হলো, রোগীর ইউরিন তৈরি হচ্ছে না, যেকোনও সময় তার অবস্থা খারাপ হতে পারে, আইসিইউ লাগতে পারে। দেখলাম বমি হচ্ছে যা দেখে আমি চিন্তিত হই এবং আইসিইউতে নিতে বলায় আমার সন্দেহ হয়।

পরামর্শ মোতাবেক এরপর আমার মাকে মগবাজারের ইনসাফ বারাকা হাসপাতালের আইসিইউতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানকার চিকিৎসকরা দেখে তাকে সিটিস্ক্যান করার পরামর্শ দিলে ধানমন্ডির একটি বেসরকারি হাসপাতালে তখনই নিয়ে তার সিটি স্ক্যান হয়’, বলে বলেন রফিক।

রফিক সিকদার আরো বলেন, ‘ঐহাসপাতালে সিটি স্ক্যান রির্পোট দেখে সেখান থেকেই আমাকে বলা হয়, কোন কিডনীই নেই। আমি তাদের বলি, একটা ফেলে দিয়েছেন ডাক্তারা নষ্ট হওয়ার কারণে কিন্তু আরেকটি আছে। কিন্তু ডাক্তাররা জোর দিয়ে বলেন, আপনার মায়ের পেটে একটি কিডনিও নেই। সেখানে বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা বিষয়টি নিয়ে বোর্ড করে এবং আমি অস্ত্রোপচারের আগের সব পরীক্ষা-নিরীক্ষার রির্পোট দেখাই ওনাদের। এরপরই তারা নিশ্চিত হন, তার দুটি কিডনিই ছিল, বাম পাশেরটি একটু খারাপ ছিল কিন্তু ডান পাশেরটি একেবারেই ভালো ছিল।’

ঐ রিপোর্ট নিয়ে আবার ইনসাফ বারাকা হাসপাতালে গেলে সেখান থেকে বলা হয়, যেহেতু তার কোন কিডনিই পাওয়া যাচ্ছে না, তাই যেখানে তার অস্ত্রোপচার হয়েছে সেখানেই ফিরিয়ে নিয়ে যেতে। ওখানে অধ্যাপক ফখরুল আমার সামনেই কথা বলেন অধ্যাপক হাবিুর রহমানের সঙ্গে। যখন তিনিও যেতে বললেন তখন আমরাও যাই। সেখানে যাওয়ার পর তার সমস্যা এবং ক্রিয়েটিনিন বেড়ে যাবার বিষয়টি জানালে ডা. অধ্যাপক হাবিবুর রহমান জানালেন ডায়ালাইসিস করার জন্য। আমার মায়ের যে ভাল কিডনীটি ছিল তা রিপোর্ট এ আসতেছে না সে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি আমাকে বলেন, ‘আপনি অন্য ডাক্তারদের সঙ্গে পরামর্শ করে বিভ্রান্ত হবেন না, অন্য কোন
হাসপাতালের রির্পোট নিয়ে বিভ্রান্ত হওয়া যাবে না, ধৈর্য্য ধরেন আপনি’।

তারা আমাকে বলেন যে, আমরা চেষ্টা করছি এবং ডায়ালাইসিস করবো। যেহেতু কোন কিডনিই পেটে নেই তাহলে ডায়ালাইসিস করে কয়দিন তাকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে এমন প্রশ্ন করলে তিনি আবারও জবাবে বলেন, আপনার মায়ের পেটে কিডনি আছে এরকম উত্তর দেন এবং যদি কিডনি কাজ না করে তাহলে ডায়ালাইসিস করে কতদিন বাঁচিয়ে রাখা যাবে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, তখন আমরা কিডনি প্রতিস্থাপন করে দেব। তাকে আবারো কিডনি প্রতিস্থাপনের জটিলতার কথা জানালে তিনি উত্তরে বলেন, সেটা তখন দেখা যাবে।

ভোক্তভোগীর ছেলে রফিক আরও বলেন, সেদিন থেকে তার ডায়ালাইসিস শুরু হলেও তার ক্রিয়েটিনিন কমছিল না, বরং আরও জটিলতা তৈরি হয় এবং তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। এ রকম অবস্থা দেখে আমরা অধ্যাপক ডা. এম এ সামাদ সাহেবের কাছে আমার মাকে নিয়ে যাই । তিনি আগের সব রির্পোট দেখলেন এবং আরও কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বললেন যে, কোন কিডনী নেই আমার
মায়ের পেটে।’

এমটা কীভাবে হতে পারে প্রশ্ন করলে তিনি জোর দিয়ে বলেন, এটাই হয়েছে। চিকিৎসা দিয়ে ভালো করতে পারবো না কিন্তু যারা অস্ত্রোপচার করেছে তাদের কাছে জবাব চাইতে। এরপর আমি তখনই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে আবার চলে আসি। সকল প্রকার হাসপাতালের রিপোর্ট নিয়ে পরিচালকের সঙ্গে কথা বলি। অধ্যাপক হাবিবুর রহমানে সঙ্গে তিনি আমার সামনেই কথা বলেন । তারা কথা বলেন এবং সেই সঙ্গে উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করতে পরদিন যাই কিন্তু তাকে পাওয়া যায় নি।’

এদিকে অধ্যাপক ডা. এম এ সামাদ বলেন, ‘অস্ত্রোপচারের পর সিটিস্ক্যানে কিডনি শো করবে, কিডনি কাজ না করলেও । কিন্তু এ ক্ষেত্রে কোন কিডনিই শো করছে না। অধ্যাপক আরো জানান, আমাদের কাছে মানুষ তাহলে চিকিৎসার জন্য যখন পরীক্ষা করায় তখন তো খারাপ কিডনিও শো করে সিটিস্ক্যানে, নয়তো আমরা চিকিৎসা কিভাবে করবো।’

এদিকে ২২ সেপ্টেম্বর, প্রতিবেদনকারী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে চিকিৎসাধীন রওশন আরার সঙ্গে কথা বলেন। তার মতে, ‘অপারেশন করার আগে প্রস্রাব হয়েছে, অথচ এই এতোদিন ধরে প্রস্রাব হচ্ছে না। পাশে থাকা তার বোন জাহেদা বলেন, রওশন আরার পুরো শরীর ফুলে গিয়েছে, ফুলে গিয়েছে পা।’

একাধিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সঙ্গে কিডনি থাকা না থাকা এবং প্রস্রাব না হওয়া নিয়ে কথা হয়। বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘যদি কিডনি থাকতো তাহলে রোগীর প্রস্রাব হতো, কিডনি নেই বলে প্রস্রাব উৎপন্ন হচ্ছে না। কাউন্সিলিং, ম্যানেজমেন্ট কোথাও না কোথাও অবশ্যই এ ঘটনায় ঘাটতি রয়েছে।’

অনুসন্ধান থেকে জানা যায়, রওশন আরা জন্ম থেকেই ‘ঘোড়ার খুর’ আকৃতির কিডনীর অধিকারী। চিকিৎসা বিজ্ঞানে সাধারণত এ ধরনের কিডনির কোনো একটি ফেলতে হলে দুটিই ফেলে দিতে হয়। তাই এই ক্ষেত্রে প্রয়োজন পড়ে কিডনি প্রতিস্থাপনের- এ ধরনের কোন পূর্ব প্রস্তুতি না থাকায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

দুই কিডনি একসঙ্গে লাগানো ছিল জন্মগতভাবে। কিডনী যখন একসঙ্গে জোড়া লাগানো থাকে, তখন একটি কিডনি অস্ত্রোপচার করে ফেলে দেওয়ার সময় অন্য কিডনির রক্তপাত হতে পারে। কিডনি রাখলে কাজ করবে না এবং রক্তপাত থামানো যাবে না। তখন তার ভালো ডান পাশের কিডনিটিও ফেলে দিতে হয়।

কিন্তু এই বিষয়ে তখন কর্তব্যরত চিকিৎসকের উচিত ছিল রোগীর অভিভাবকদের সঙ্গে এ বিষয়ে কাউন্সিলিং করানো এবং তাদের বিষয়টি সম্পর্কে ভালোভাবে জানানো যে, ‘জোড়া কিডনি বলে সেটি রাখা সম্ভব না। জোড়া কিডনি হলেও যদি কোন প্রকার চিকিৎসারজটিলতার তৈরি না হয় তাহলে বছরের পর বেঁচে থাকতে পারে, কিন্তু চিকিৎসকরা সেটি জানায় নি।’

সাধারণত এই ধরনের জটিলতা চাইলেই এড়ানো যেত, শুধুমাত্র দায়িত্বরত চিকিৎসকের অসর্তকতার জন্যই রোগী রওশন আরার এ অবস্থা হয়েছে। অধ্যাপক ডা. হাবিবুর রহমান দুলাল বলেন, ‘২০১৬ সালে রওশন আরার বাম দিকের কিডনিতে একবার পাথরের অস্ত্রোপচার হয়। ৭ মাসে আগে তার বাম পাশের কিডনিতে আবার অস্ত্রোপচার করে পুঁজ বের করে নল লাগিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু তার ইনফেকশন কমলেও বাম কিডনি কাজ করছিল না।’

গত সেপ্টেম্বরের ৫ তারিখ অস্ত্রোপচার নিয়ে তিনি জানান যে, ‘রক্তনালি, খাদ্যনালি, কিডনি বোঝা খুব কঠিন হয়ে গিয়েছিল যখন বামদিকে ইনফেকশন হয়েছিলো । তখন খুব খারাপ অবস্থা হয়ে যায় তার প্রচণ্ড রক্তপাতের ফলে। কিন্তু পরে রক্তক্ষরণ বন্ধ করা হয়।

পোস্ট অপারেটিভে নেওয়ার পর তার প্রস্রাব না হওয়া বিষয়টি আমাকে জানানো হয়। চিকিৎসকদের বলি, এরকম রক্তক্ষরণ হলে কিডনির রক্তসরবরাহ বন্ধ হয়ে কিডনি সাময়িক অকেজো হয়ে যায়। রাত ১টার দিকে তার শ্বাসকষ্ট হচ্ছে বলে আবার জানানো হয়। তাদের আইসিইউতে স্থানান্তরের কথা বলি, কিন্তু রোগীর স্বজনরা বোধহয় এখানে সাড়া না পেয়ে বাইরে চলে যায়।’

‘বেসরকারি হাসপাতালে সিটি স্ক্যান করা হয়েছে। পরীক্ষাতে কিন্তু ‘নন ভিজ্যুয়ালাইজেশন অব রাইট কিডনি’ এসছে, আর বাম পাশের কিডনি তো ফেলেই দিয়েছি। রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে কিডনি সাময়িক বিকল হয়ে যেতে পারে অনেক সময় স্থায়ীভাবেও বিকল হয়ে যেতে পারে। বর্তমানে আমরা আপাতত ডায়ালাইসিস করছি’, যোগ করেন ডা. হাবিবুর।

অধ্যাপক ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘রোগীর স্বজনদের মাথায় কেউ ঢুকিয়েছে আমরা ডান দিকের কিডনিও ফেলে দিয়েছি। কিন্তু ডান দিকের কিডনি অপারেশনের জন্য আলাদা অস্ত্রোপচারের প্রস্তুতি নিতে হয়।’

‘ডান দিকের কিডনি আছে নাকি নেই’ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘রির্পোট অনুযায়ী নন ভিজ্যুয়ালাইজেশন, এখানে আইদার অবসেন্ট অথবা কাজ করছে না, নন ভিজ্যুয়ালাইজেশন মানে তাই’- বলেন অধ্যাপক ডা. হাবিবুর রহমান।

এখন কী তার কিডনি আছে নাকি নেই আবার প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘আমরা পরীক্ষা করি নাই।’ কেন করেননি প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘যখন শরীরের কোনও অর্গানের অস্ত্রোপচার করা হয় তখন দুই থেকে তিন সপ্তাহ আগে থেকে সেখানে ভালোভাবে বোঝা যায় না।’রোগীর কিডনি ‘হর্স শু শেপ’ ছিল কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এরকম একটা সম্ভবনা হতে পারে, কিন্তু তাতেও ডানদিকে কিডনিতে আমাকে যেতে হবে।’

‘কিডনি তাহলে আছে কিনা’ ফের প্রশ্নে অধ্যাপক হাবিবুর রহমান বলেন, ‘অবশ্যই কিডনি আছে। যাবে কোথায় প্রশ্ন করে তিনি বলেন, ‘আমরাতো বাম দিকে অস্ত্রোপচার করেছি।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

11 + 20 =