জন্ডিস কেন হয় ও লক্ষণ এবং প্রতিকার?

পোস্ট টি ভালো লাগলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  

প্রায় আমরা জন্ডিসের রোগী দেখে থাকি। বিশেষত পারিপার্শিক অবস্থার পরিবর্তন বিশেষ করে পানির অভাব হলে ও অনিয়মিত খাদ্যঅভ্যাসের কারণেই জন্ডিস দেখা দেয় বেশি । জন্ডিস  আসলে কোন রোগ নয়, এটি একটি রোগের লক্ষণ মাত্র বা শারীরিক পরিবর্তন মাত্র। জন্ডিস হলে রক্তে বিলরুবিনের মাত্রা বেড়ে যায় এবং ত্বক, চোখের সাদা অংশ এবং অন্যন্য মিউকাস ঝিল্লি হলুদ হয়ে যায়। রক্তের লোহিত কণিকাগুলো স্বাভাবিক নিয়মেই একটা সময় ভেঙ্গে গিয়ে বিলিরুবিন তৈরি করে যা পরবর্তী সময়ে লিভারে প্রক্রিয়াজাত হয়ে পিত্তরসের সাথে পিত্তনালীর সাহায্যে পরিপাকতন্ত্রে প্রবেশ করে।

জন্ডিস কেন হয়?

সাধারণত রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে গেলে জন্ডিস দেখা দেয়। লিভারের রোগই জন্ডিসের প্রধান কারণ। যা কিছু খাই তা লিভারেই প্রক্রিয়াজাত হয়। লিভার বিভিন্ন কারণে রোগাক্রান্ত হতে পারে। হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ডি এবং ই ভাইরাসগুলো লিভারে প্রদাহ সৃষ্টি করে যাকে বলা হয় ভাইরাস হেপাটাইটিস। বিশ্বেই জন্ডিসের প্রধান কারণ এই হেপাটাইটিস ভাইরাসগুলো।

এ ছাড়াও অটোইমিউন লিভার ডিজিজ, বংশগত কারণসহ আরও নানান ধরনের লিভার রোগেও জন্ডিস হতে পারে। তাছাড়া থ্যালাসিমিয়া ও হিমোগ্লোবিন ই-ডিজিজের মত যেসকল রোগে রক্ত ভেঙ্গে যায় কিংবা পিত্তনালীর পাথর অথবা টিউমার হলে জন্ডিস হতে পারে।

উপসর্গ

সাধারণত জন্ডিসের প্রধান লক্ষণ হল চোখ ও প্রসাবের রং হলুদ হয়ে যাওয়া আবার সমস্যা বেশি হলে পুরো শরীর গাঢ় হলুদবর্ণ ধারণ করতে পারে। আর এর থেকেই আমরা বুঝতে পারি যে আমরা জন্ডিসে হয়েছে। এছাড়াও

  • শারীরিক দুর্বলতা
  • বমি বমি ভাব অথবা বমি
  • ক্ষুধামন্দা
  • মৃদু বা তীব্র পেট ব্যথা
  • চুলকানি
  • জ্বর জ্বর অনুভূতি
  • যকৃত শক্ত হয়ে যাওয়া
  • অনেকসময় পায়খানা সাদা হয়ে যাওয়া
  • কি কি পরীক্ষা করা লাগবে
  • রক্ত পরীক্ষা
  • যকৃতের কার্যকারিতা এবং কোলেস্টরল পরীক্ষা
  • প্রোথোম্বিন টাইম
  • পেটের আল্ট্রাসাউন্ড
  • প্রস্রাব পরীক্ষা অথবা যকৃতের বায়োপসি ইত্যাদি
  • চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা করাতে হবে।

যা যা খাবেন

আমাদের দেশে একটা ভ্রান্ত ধারণা আছে যে, বেশী বেশী পানি অথবা তরল জাতীয় খাবার খেলে প্রস্রাবের রং অনেকটা হালকা বা সাদা হয়ে আসে বলে জন্ডিসে আক্রান্ত রোগীরা প্রায়শই বেশী বেশী তরল খাবার খেয়ে থাকেন। সাধারণ মানুষের ধারণা এতে জন্ডিস সেরে যাবে কিন্তু বাস্তবতা হলো, এতে জন্ডিস এতটুকুও কমে না। বেশী বেশী পানি খেলে ঘন ঘন প্রস্রাব হয় বলে এটি কিছুটা হালকা হয়ে এলেও রক্তে বিলিরুবিনের পরিমাণ এতে কিছুমাত্রও কমে না।

বরং বিশ্রাম যেখানে জন্ডিসের রোগীদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বার বার টয়লেটে যেতে রোগীকে বারতি পরিশ্রম করতে হয়।  আমাদের দেশে আখের রস জন্ডিসের একটি বহুল প্রচলিত ওষুধ হিসেবে পরিচিত। অথচ রাস্তার পাশের যে দূষিত পানিতে আখ ভিজিয়ে রাখা হয় সেই পানি মিশ্রিত আখের রস খেলে হেপাটাইটিস এ বা হেপাটাইটিস ই ভাইরাস মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পরতে পারে। আরো একটি প্রচলিত বিশ্বাস হচ্ছে জন্ডিসের রোগীকে হলুদ দিয়ে রান্না করা তরকারি খাওয়ানো যাবে না কারণ এতে রোগীর জন্ডিস আরও বাড়তে পারে। রক্তে বিলিরুবিন নামক একটি হলুদ পিগমেন্টের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার কারনেই জন্ডিস দেখা দেয়। এর সাথে হলুদের কোন সম্পর্ক নেই। তাই জন্ডিসের রোগীকে সব সময় এমন খাবার দেয়া উচিত যা তিনি খেতে পছন্দ করেন। তবে অবশ্যই বাইরের খাবার সব সময় পরিহার করতে হবে। বিশেষ করে একটু বেশি সাবধানে থাকতে হবে পানির ক্ষেত্রে। জন্ডিস থাক বা না থাক, কোনভাবেই না ফুটিয়ে পানি পান করা যাবে না।

প্রতিরোধে করণীয়

  • হেপাটাইটিস এ ও ই খাদ্য ও পানির মাধ্যমে সংক্রমিত হয়। আর হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি এবং হেপাটাইটিস ডি দূষিত
  • রক্ত, সিরিঞ্জ এবং আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের মাধ্যমে ছড়ায়। তাই সব সময় বিশুদ্ধ খাবার ও পানি খেতে হবে।
  • হেপাটাইটিস এ এবং হেপাটাইটিস বি হওয়ার আশংকা মুক্ত থাকতে হেপাটাইটিস এ এবং হেপাটাইটিস বি এর ভ্যাকসিন গ্রহণ করুন।
  • মদ পান ও নেশাদ্রব্য গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকুন।
  • শরীরে রক্ত নেয়ার প্রয়োজন হলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় স্ক্রিনিং করে নিতে হবে।
  • নিরাপদ যৌন মিলন করুন।
  • সেলুনে সেভ করার সময় অবশ্যই নতুন ব্লেড ব্যবহার করতে বলবেন।
  • ডিসপোজেবল সিরিঞ্জ ব্যবহার করতে হবে।
  • জন্ডিস অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণও হতে পারে তাই এই রোগ থেকে বাঁচতে সচেতন হতে হবে।
  • কল কারখানার নির্গত রাসায়নিক পদার্থ থেকে দূরে থাকুন।

জন্ডিস ও লিভার

লিভারের রোগই মূলত জন্ডিসের অন্যতম প্রধান কারণ। যা কিছু খাই, তা লিভারে প্রক্রিয়াজাত হয়। লিভার নানা কারণে রোগাক্রান্ত হতে পারে। হেপাটাইটিস এ, হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি, হেপাটাইটিস ডি এবং হেপাটাইটিস ই ভাইরাসগুলো লিভারে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে, যাকে ভাইরাল হেপাটাইটিস বলা হয়। এছাড়াও অটোইমিউন লিভার ডিজিজ এবং বংশগত কারণসহ আরও বেশকিছু কারণে জন্ডিস হতে পারে। ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ফলেও জন্ডিস হতে পারে। সবসময় লিভারের রোগের কারণেই জন্ডিস হয় এমন নয়, এটাও পুরোপুরি সঠিক নয়। তবে যাইহোক জন্ডিস হলে ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নেই চিকিৎসা নিলে সুস্থ হয়ে যাবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

8 + one =