হেপাটাইটিস-বি প্রেক্ষিত বাংলাদেশ-(পর্ব-১)

হেপাটাইটিস-বি প্রেক্ষিত বাংলাদেশ-(পর্ব-১)

প্রায় ১৬ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশে জনসংখ্যার ঘনত্বও অত্যন্ত বেশি। শিক্ষার হারও কম। অর্থনৈতিক সচ্ছলতাও আশানুরূপ নয়। ফলে স্বাস্থ্যসচেতনতা, স্বাস্থ্যসেবা নেয়ার সামর্থ্য ও মানসিকতা অনেকাংশেই বিজ্ঞানসম্মত নয়। ফলে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার যে অবকাঠামো গ্রামের ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত বিস্তৃত, বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে সেটুকু নেয়ার আগ্রহ ও বিভিন্ন কারণে গ্রামীণ জনপদের অনেকের নেই। অন্য দিকে উচ্চবিত্তরা দেশের স্বাস্থ্যসেবার প্রতি আস্থার সমস্যাসহ, নিজের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনে- অপ্রয়োজনে চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। এক জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালগুলোর মেডিসিন বিভাগে যে পরিমাণ রোগী ভর্তি হয়, তার শতকরা ১০-১২ ভাগ রোগী লিভার রোগে আক্রান্ত। বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি লোক বি-ভাইরাসের আক্রমণের শিকার, প্রায় ১৫ লাখ লোক সি-ভাইরাসে আক্রান্ত।

বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি লোক বি-ভাইরাসের আক্রমণের শিকার, প্রায় ১৫ লাখ লোক সি-ভাইরাসে আক্রান্ত। স্যানিটেশন জন্ডিসসহ লিভারের বিভিন্ন রোগে সাধারণ মানুষের ধারণা বিজ্ঞানসম্মত নয়। কবিরাজি, টোটকা চিকিৎসাসহ বিভিন্ন অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসা রোগীদের আরো মারাত্মক পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে অথচ লিভার রোগের আধুনিক প্রায় সব চিকিৎসাই বাংলাদেশে সম্ভব। এর বেশির ভাগই এমনকি অত্যন্ত ব্যয়বহুলও নয়। তবে অনেক ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি ধারাবাহিক চিকিৎসার প্রয়োজন হয়, যা বারবার বিদেশ গিয়ে সম্ভব নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, এই মুহূর্তে পৃথিবীতে প্রায় ৪০ কোটি মানুষ হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসে ভুগছে। প্রতি বছর মারা যাচ্ছে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ। সাইলেন্ট কিলার হিসেবে পরিচিত এই ব্যাধি। এই ব্যাধি থেকে সতর্কতা ও প্রতিরোধ অপরিহার্য। তাই এখনই সময়, আমাদের সবাইকে পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে হবে, আমরা কেউ কি হেপাটাইটিস-বি কিংবা সি-তে আক্রান্ত? দেশের জনসাধারণকে সচেতন ও সতর্ক করতে আমাদের এই রচনা।

সাধারণ তথ্য:

বি-ভাইরাসের জন্য লিভারে যে প্রদাহ হয় তাকে হেপাটাইটিস-বি বলা হয়। রোগটি দুই রকমের হতে পারে। ছয় মাসের কম সময় হেপাটাইটিস থাকলে একিউট বি-ভাইরাস হেপাটাইটিস আর ছয় মাসের বেশি সময় থাকলে তা ক্রনিক বি-ভাইরাস হেপাটাইটিস হিসেবে গণ্য করা হয়। ভাইরাসটি জন্ডিস উপসর্গ ছাড়াও রোগ তৈরি করতে পারে। অতএব জন্ডিস, হেপাটাইটিস, হপাটাইটিস-বি ভাইরাস সমার্থক শব্দ নয়। প্রথমটি উপসর্গ, দ্বিতীয়টি রোগরে নাম ও তৃতীয়টি ভাইরাসের নাম।

একটি পরিসংখ্যান:

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রায় ৪০০ মিলিয়ন মানুষ হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস দ্বারা ক্লিনিক্যালি ইনফেকটেড। প্রতি বছর এই ঘাতক ব্যাধি প্রায় এক মিলিয়ন আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু ঘটায়। আমাদের দেশে প্রায় এক কোটি লোক বি-ভাইরাস বহন করে চলেছে। উদ্বেগের বিষয় হলো এরাই রোগ ছড়ানোর উৎস হিসেবে কাজ করে। আরো বিস্ময়ের বিষয় হলো, আমাদের দেশে চার-পাঁচ কোটি লোক কোনো না কোনোভাবে বি-ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তবে তাদের বেশির ভাগই ভাগ্যক্রমে সুস্থ হয়ে গেছেন। এর অর্থ হলো অনেকেই বি-ভাইরাস বহন করে যাচ্ছে এবং অন্যদের মাঝে ছড়াচ্ছে।

ইতিহাস:

১৯৬৫ সালে প্রথম বি ভাইরাসের অস্তিত্ব আবিষ্কৃত হয়। ১৯৭৭ সালে বিজ্ঞানী ব্লুমবার্গকে (Bluimbeog) এ জন্য নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়। তখন বি-ভাইরাসের যে অ্যান্টিজেনটি আবিষ্কৃত হয়েছিল তার নাম দেয়া হয় অস্ট্রেলিয়া অ্যান্টিজেন। সেটিই আজকের হেপাটাইটিস-বি’র সারফেস অ্যান্টিজেন (HBsAg) বা এইচবিএসএজি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থ্য (WHO) ২০০১ সালে এই হার ৮০ শতাংশ কমানোর পরিকল্পনা করেছিল, কিন্তু হয়নি। হেপাটাইটিস-বি একটি ক্ষুদ্র ডএিনএ ভাইরাস। এটি একবার শরীরে প্রবেশ করলে লিভার কোষের ভেতরে অবস্থান নেয়। তখন সেলের ভেতর থেকে হাজার হাজার ভাইরাস তৈরি হয়। ভাইরাস আক্রান্ত লিভার কোষগুলো মারা যায়। ফলে লিভারের কর্মক্ষমতা হ্রাস পায়। একবার বি-ভাইরাস প্রবেশ করলে অ্যাকিউট হেপাটাইটিস, ক্রনিক হেপাটাইটিস, সিরোসিস, ক্যান্সার হতে পারে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বি-ভাইরাস শরীরে প্রবেশের পর পরিণতি নির্ভর করে বয়সের ওপর। একজন পূর্ণবয়স্কের ক্ষেত্রে যেখানে ৯০-৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রেই পূর্ণ নিরাময় হয়, সেখানে একজন শিমুর ক্ষেত্রে এটি মাত্র ১০-১৫ শতাংশ। আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এ শিশুরা আক্রান্ত হয় তাদের মায়ের কাছ থেকে। সে জন্য প্রত্যেক গর্ভবতী মায়েরই বি-ভাইরাসের পরীক্ষা করা অতীব জরুরি।

যেভাবে হেপাটাইটিস-বি ছড়ায়:

১. রক্তের মাধ্যমে ছড়ায়।
২. অবৈধ যৌনাচার, যা কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ছাড়াই সংঘটিত হয়।
৩. অন্যের ব্যবহৃত স্যালাইনের সুই ব্যবহার করলে। সিরিঞ্জ যদি যথাযথভাবে জীবাণুমুক্তকারী ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়া একই সিরিঞ্জ বারবার বিভিন্নজন ব্যবহার করে।
৪. রোগাক্রান্ত ব্যক্তির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে বসবাস করলে। নবজাতক তার জন্মের সময় রোগাক্রান্ত মায়ের ভাইরাস দ্বারা।
৪. আক্রান্ত রোগীর শেভিং রেজার, টুথব্রাশ, টুথপেস্ট ইত্যাদি ব্যবহার করলে।
৫. রোগাক্রান্ত ব্যক্তি অন্যকে কামড় দিলে।

যেসবের মাধ্যমে হেপাটাইটিস-বি ছড়ায় না:

১. ঠোঁটে, গালে বা কপালে চুমু দিলে।
২. সর্দি বা কাশির মাধ্যমে।
৩. স্বাভাবিক শারীরিক সংস্পর্শ, যেমন আক্রান্ত রোগীর হাত ধরলে।
৪ আক্রান্ত রোগী দ্বারা প্রস্তুতকৃত খাদ্য গ্রহণ করলে।

কাদের হেপাটাইটিস-বি দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে:

১. ওইসব নবজাতক যাদের মা হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসে আক্রান্ত।
২. যেসব দেশে হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বেশি সেখান থেকে কোনো শিশুকে লালনপালনের জন্য আনা হলে।
৩. অবৈধ যৌনাচার, যা কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়াই সংঘটিত হয় অথবা যাদের একাধিক যৌনসঙ্গী আছে।
৪. যদি কেউ কখনো যৌনাঙ্গের কোনো সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে থাকেন।
৫. সমকামিতায় যারা লিপ্ত।
৬. অন্যের ব্যবহার করা সুই বা সিরিঞ্জ ব্যবহার করলে।
৭. যেসব রোগীর কিডনি ডায়ালাইসিস করা হয়।
৮. ঘনবসতিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বা এলাকায় একসাথে কাজ বা বসত করলে, যেমন- জেলখানা।
৯. স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী বা ত্রাণকর্মীরা যদি কখনো আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত বা শারীরবৃত্তীয় কোনো তরলের সংস্পর্শে আসেন।

আরও পড়ুনঃ হাসপাতালে চিকিৎসা অবহেলায় সাংবাদিকের মৃত্যু।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*