যৌনরোগ থেকে বেঁচে থাকার উপায়

যৌনরোগ থেকে বেঁচে থাকার উপায়

সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশেও যৌনরোগ উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে এসব রোগের বৃদ্ধি দ্রুত রোধ করতে না পারলে দেশ ও জাতি মারাত্মক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে। যৌন অসংযম ও যৌন অনাচারের মাধ্যমে যৌনরোগে আক্রান্তরা তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনকে বিপর্যন্ত করে তোলে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনকেও ঠেলে দেয় মারাত্মকহুমকির মখে। আজ তাই বড় প্রয়োজন অধিকতর যৌন সচেতনতা এবং সেইসাথে অর্জন করা দরকার সুষ্ঠু যৌন জ্ঞান।

যৌনরোগ একটি সামাজিক ব্যাধি। দেশের বর্তমান আর্থ-সামাজিক পরিবেশে যে হারে যৌনরোগ ও যৌন রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা চিকিৎসক ও সমাজ বিজ্ঞানীদের কাচে সত্যিই উদ্বেগজনক। আরো উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, উন্নত বিশ্বের মতো আমাদের দেশে যৌন রোগীর কোন সঠিক পরিসংখ্যান নেই।

আজ সমাজের চারিদিকে বিরাজ করছে হতাশা, ও অনিশ্চয়তা। বিশেষ করে যুব সমাজ আজ বেকারত্বের অভিশাপ, শিক্ষা জীবন সময় মতো শিক্ষা জীবন সময় মতো শিক্ষা শেষ করতে না পারার অনিশ্চয়তা, অসৎ রাজনীতির শিকার হওয়া, মুর্খতা, অজ্ঞানতা, নৈতিক অবক্ষয়, ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের অভাব, সুষ্ঠু বিনোদনের অভাব,সঠিক যৌন জ্ঞানের অভাব ইত্যাদি নানা কারণে হতাশাগ্রস্ত। আর এই পরিস্থিতিই যৌন রোগ প্রসারে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষবাবে সহায়তা করছে। আর্থিক অভাব-অনটন ও প্রতারণার শিকার হয়ে পতিতা ও পতিতালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি, চিকিৎসা সেবার অপ্রতুলতা ইত্যাদি বহুবিধ কারণও যৌনরোগের বিস্তার ঘটাতে সহায়তা করছে। তাই সঠিক যৌন শিক্ষা, সুষ্ঠু বিনোদন ও যৌন রোগের প্রতিকার করা উচিত। প্রতিকারের পূর্বে অবশ্যই যৌনরোগেও তার কুফল সম্পর্কে ধারণা থাকা আবশ্যক। তা না হলে রোগের লক্ষণ সনাক্ত করা যাবে না এবং এর সঠিক চিকিৎসা গ্রহণও সম্ভব হবে না।

যৌনরোগ বলতে আমরা কি বুঝি? কোন রোগগুলোকে আমরা যৌনরোগ বলবো? যৌন রোগে আক্রান্ত পুরুষ বা মহিলার সাথে যৌন সংক্রমিত হয় সেগুলোকেই যৌন রোগ হিসিবে আখ্যায়িত করা যায়। যৌন রোগগুলোকে আমরা দু’ভাগে ভাগ করতে পারি। বড় ধরনের যৌনরোগ, যেমন- সিফিলিস, গানোরিয়া, এইডস, শ্যাংকরয়েড ইত্যাদি। আর ছোট ধরনের যৌনরোগ সম্পর্কে সাধারণ পাঠকদের বুঝতে অসুবিধা হবে বিধায় এখানে উল্লেখ রাখা হলো। এ রোগগুলো শুধুমাত্র চিকিৎসকরাই সনাক্ত করতে সক্ষম।

যৌনরোগ সম্পর্কে কিছু কথাঃ

১. যেহেতু কিছু কিছু যৌনরোগের বেশিরভাগ লক্ষণ কয়েক সপ্তাহের মধ্যে লুপ্ত হয়ে যায়, তাই অনেকে মনে করেন যে, এটা বোধহয় ভালো হয়ে গেছে। ফলে রোগীরা তাদের অজান্তেই দেহে যৌন রোগের জীবাণু লালন করে।

২. যৌনরোগ কারো যৌন ক্ষমতার উপর কতটুকু প্রভাব বিস্তার করতে পারে ? রোগ সঠিকভাবে নির্ণয় করে চিকিৎসা করা হতে তা যৌন আচরণের উপর খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারে না। তবে যৌনরোগ সঠিকভাবে চিকিৎসা না করালে এবং তা দীর্ঘদিন যাবৎ থাকলেও যৌন ক্ষমতার ওপর প্রভাব বিস্তার করার কথা নয়।

যৌনরোগ (এইডস ছাড়া) পূর্বের মতো বর্তমানে আর তেমন ভীতিকর কোন রোগ নয়। অনেক রোগীই যৌনরোগকে নানা ইনফেকশনের তুলনায় একটু ভিন্ন প্রকৃতির মনে করে থাকে। কেননা এ রোগ শুধু যৌন সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে সংঘটিত হয় এবং যৌনঙ্গগুলো আক্রান্ত হয়। নিচে কিছু নির্দেশিকা দেওয়া হলো যা যৌনরোগে আক্রান্ত হওয়া ও করা থেকে বিরত রাখতে সহায়তা করবে।

(১) যৌনরোগ সম্পর্কে জ্ঞান থাকতে হবেঃ যৌন রোগগুলোর লক্ষণ সম্পর্কে জ্ঞান বা সুস্পষ্ঠ ধারণা থাকলে যৌন সঙ্গী থেকে যৌনরোগে আক্রান্ত হওয়া থেকে বিরত থাকা যাবে এবং এই যৌন লক্ষণই রোগী বা আপনাকে যৌনরোগের চিকিৎসা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতে সাহায্য করবে।

(২) যৌনরোগের প্রতি লক্ষ রাখাঃ শুধু যৌন জ্ঞান থাকলেই চলবে না, সেই সাথে নিজের অথবা সঙ্গীর শরীরে, অঙ্গ-প্রতঙ্গে যৌন রোগের লক্ষণাদি ভালো করে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। দেখতে হবে যৌনাঙ্গে কোন রকম ক্ষ তবা ক্ষরণ ইত্যাদি রয়েছে কিনা।

(৩) পতিতালয়ে বা বহু নারী গমন বন্ধ করতে হবেঃ কারণ অনেক ক্ষেত্রেই পতিতালয়ের যৌন সঙ্গীদের মধ্যে যৌন রোগ থাকা সত্ত্বেও লক্ষণ নাও থাকতে পারে। তাই কার যৌন রোগ আছে বা কার নেই তা সনাক্ত করা সম্ভব নয়। কাজইে যৌনরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ও বিপদ থেকেই যায়।

(৪) সৎ হতে হবেঃ যদি আপনার যৌন রোগ থেকে থাকে তাহলে আপনার সঙ্গীকে তা জানানো উচিত। এর ফলে অপর পক্ষ সচেতন হবে। অন্যদিকে যৌন সঙ্গীর রোগ থাকলে তা জিজ্ঞেস করতে হবে। কারণ আবেগপ্রবণ হয়ে নিজের বিপদ ডেকে আনা সমীচীন হবে না।

(৫) সাবধান হতে হবেঃ কনডমের ব্যবহার যৌনরোগে আক্রান্ত হওয়া ও সংক্রমণে কিছুটা কমাবে।

(৬) দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং সঠিক ও সুষ্ঠু চিকিৎসাঃ আপনাকে যৌনরোগের কিছু ভয়াবহ জটিলতা থেকে মুক্তি দেবে। চিকিৎসা গ্রহণের পরে পুনরায় পরীক্ষা করাতে হবে যে, রোগ সমপূর্ণভাবে নির্মূল হয়েছে কিনা।সেই সাথে স্ত্রী বা যৌন সঙ্গীরও চিকিৎসা করানো উচিত।

যৌন রোগের প্রতিকারার্থে কিছু উপদেশ ও প্রস্থাবনা নিন্মলিখিত বিষয়গুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত করতে পারলে যৌন রোগের বিস্তার অনেকাংশে লোপ পাবে বলে আশা করা যায়।

(১) বিয়ের পূর্বে পাত্র-পাত্রীর রকত্ পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া উচিত। এটা বিয়ের রেজিস্ট্রেশন হওয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। তাহলে প্রাক-বিবাহকালীন যৌন সম্পর্ক স্থাপন থেকে বিরত থাকা সহজ হবে।

(২) প্রয়োজনে চাকরি বা কর্মস্থলে যোগদানের পূর্বে অথবা কলেজ/ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার পূর্বে মেডিকেল চেকআপ করা প্রয়োজন যাতে কোন যৌন রোগ ধরা পড়লে তার যথাযথ চিকিৎসা করা যায় এবং চিকিৎসা পরবর্তীতে রোগ আরোগ্য হওয়ার পর ভর্তির সুযোগ বা কর্মস্থলে যোগদানের সুযোগ পেতে পারে।

(৩) সব ধরনের পতিতাবৃত্তি নিষিদ্ধ করতে হবে।

(৪) জনসাধারণের মধ্যে যৌন রোগের কুফল স্মপর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন সুষ্ঠু যৌন শিক্ষার প্রচলন। কলেজ/ইউনিভার্সিটিগুলোতে যৌনরোগ স্মপর্কে সিলেবাস থাকা উচিত, যাতে ছাত্র-ছাত্রীরা বিপদগামী হতে না পারে।

(৫) সুষ্ঠু ও নির্দোষ বিনোদনের ব্যবস্থা করা উচিত এবং সেই সাথে অপসংস্কৃতির প্রচার বন্ধ করা উচিত।

(৬) প্রচার মাধ্যম যেমন রেডিও-টিভিতে যৌনরোগ সম্পর্কে স্বাস্থ্যবিষয়ক অনুষ্ঠান থাকা উচিত এবং এর মাধ্যমে জনসাধারণ যাতে প্রতিকার ও প্রতিরোধ সম্পর্কে জানতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখা উচতি।

(৭) অবৈধ ও ভাসমান পতিতাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা উচিত যাতে তারা রোগ ছড়াতে না পারে।

(৮) জনসাধারণের উপযুক্ত শিক্ষা,ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধৈর উপর গুরুত্বারোপ করা উচিত যাতে প্রত্যেকের নৈতিক চরিত্র বিকাশ লাভ করতে পারে। ফলে তারা বিপদগামী হওয়া থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারবে।

(৯) স্বাস্থ্যকেন্দ্র, হাসপাতাল ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানগুলোতে যৌনরোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা নিরীক্ষা সহজলভ্য করা উচিত এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতি সাধন করা উচিত।

(১০) নিজের অথবা জানা মতে অন্য কেউ যৌনরোগে আক্রান্ত হলে সাথে সাথে চিকিৎসা নেওয়া উচিত যাতে পরবর্তীতে যৌনরোগুগলো জটিল হয়ে না পড়ে।

(১১) বিভিন্ন অশ্লীল পত্র-পত্রিকা ছায়াছবির প্রদর্শন বণ্ধ করা উচিত। এ জন্য কঠোর আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করা উচিত। তা না হলে যুব সমাজের অধঃপতন রোধ করা যাবে না।

(১২) জনসাধারণকে সাবধান করা এবং রোগীদেরকে অতিসত্বর চিকিৎসার আওতায় এনে অধিকতর অমঙ্গলের হাত থেকে সমাজ ও শিশুকে রক্ষা করার জন্য তীব্র গণআন্দোলন প্রয়োজন।

(১৩) যৌন অসংযমের পরিণতির বিষয়টি সবাইকে মনে রাখতে হবে। মানসিক অশান্তি, দুর্নাম, দুর্ণীতির প্রসার ইত্যাদি অপেক্ষা ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে সবচেয়ে ভয়অবহ হচ্ছে যৌন রোগে আক্রান্ত হওয়া। তাই আক্রান্ত হওয়ার পূর্বেই যৌন অসংযমতা থেকে বিরত থাকা উচিত।

(১৪) আমাদের দেশে অজ্ঞতা, অবহেলা, স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতা ইত্যাদি কারণে পতিতাদের প্রায় একশত ভাগই নানা ধরনের যৌনরোগে আক্রান্ত। উপযুক্ত প্রতিষেধক ব্যতিরেকে এদের সংস্পর্শে এলে যৌনরোগ সংক্রমণের আশংকা অত্যাধিক। যদি দুর্ভাগ্যবশত কেউ এ রোগে আক্রান্ত হয়েই পড়ে তাহলে কাল বিলম্ব না করে উপযুক্ত চিকিৎসকের শরানপন্ন হওয়া উচিত।

(১৫) এটা মনে রাখতে হবে যে, সংক্রমণ যতই হালকা হোক না কনে তা আপনা আপনি বা নিজ থেকে সেরে যাওয়ার মতো রোগ গনোরিয়া, সিফিলিস নয়। মন্ত্র তন্ত্র, তাবিজ-কবজ, দোয়া-দরুদ যেমন নিস্ফল তেমনি নিস্ফল কবিরাজ, হেকিম ও হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা এবং বিজ্ঞাপণে প্রচারিত তথাকথিত ওষুধ।

(১৬) হাতুড়ে কবিরাজ, হেকিম, হোমিওপ্যাথি ও আদি ডাক্তার যে সমস্ত রোগীকে নিয়ে হাতড়ায় এবং নিজেদের পকেট ভারী করে। তাই যৌনরোগে আক্রান্ত হওয়ার পূর্বেই তার প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। পরিশেষে সেই পুরাতন প্রবাদ বাক্যটিই বলতে চাই-প্রিভেনশন ইজ বেটার দেন কিউর।

আরও পড়ুনঃ পুরোনো কাশির চিকিৎসা ও করনীয়।

 

গণ সচেতনতায় ডিপিআরসি হসপিটাল লিমিটেড

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*