
চিকিৎসা ও করনীয়
কোন উত্তেজক বস্তুর আর্বিভাব হলে ম্সানালীতে যে স্বাভাবিক প্রতিকিক্রয়া হয়, সেটাই যখন কাশি ওঠে তখন একটি যসত্ন লালিত সাড়ার (Refled) সৃষ্টি হয় যা একসাথে অংশ নেয় মস্তিষ্ক, গলার কতিপয় পেশী ও অঙ্গ, বুক ও তলপেট। এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশ সময়ের মধ্যে এমন এক ধাপ কার্যক্রম শুরু হয় যার ফলে সংকুচিত বায়ু কাশি হিসেবে নির্গত হয় যার গতি ঘন্টায় ৫০০ মাইল। শ্বাসনালিতে এই প্রবল বায়ু নির্গমনের ক্রিয়াও সামন্য নয়।কাশি বুকে জমে থাকা শ্লেষ্মা ও অন্যাণ্য পদার্থ বায়ুনালী থেকে বের করে দেয়। মাঝে মধ্যে কাশি দেয়া দেহের প্রতিরক্ষা পদ্ধতিরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু কাশি যখন পুরোনো (Chronic) হয়ে যায় অর্থ্যাৎ তা যখন তিন সপ্তাহ বা তারও অধিক কাল স্তায়ী হয়, এটাকে তখন অন্তনিহিত কোন সমস্যার বাহ্যিক লক্ষণ হিসেবেই ধরে নিতে হবে। আরন জোর করে কাশি দিতে গিয়ে যে শক্তি খাটাতে হয় তাতে করে যে কেবল দৈহিক সমস্যা হয় তাই নয় এটা যে কারো স্বাচ্ছন্দময় জীবনকেও ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্থ করে তোলে।
দৈহিক জটিলতা:
একবার মাত্র কাশি দিলেই শরীরের উপর দিয়ে বেশ ধকল যায়। এ থেকে সহজেই অনুমান করা যায় যে দীর্ঘদীন অব্যাহত কাশির ফলে দেহের উপর যথেষ্ট প্রভাব পদে। পুরনো কাশিযদি চলতেই থাকে তাহলে বায়ুনালী কোষে ক্ষতের সৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে স্বরতন্ত্রী (Vocal Card) ক্ষতিগ্রস্থ হয়, বায়ুনালীস্থ রক্তনালীতে ফাটল ধরে এবং এজন্যই কাশির সঙ্গে রক্ত উঠে আসে। গলনালীতে প্রচন্ড ব্যাথা হয়।
কাশি উঠলে বুক এবং তলপেটে প্রচন্ড চাপ পড়ে, ফলে হৃদপিন্ডের গতিতে আসতে পারে স্থবিরতা। একারণে কাশির সময় প্রায়ই অন্কেকে মূর্ছা যেতে দেখা যায়। দুর্বল হাড় বিশিষ্ট লোকদের ক্ষেত্রে বিশেষ করে বৃদ্ধা মহিলাদের ক্ষেত্রে প্রবল কাশি পাঁজরের হাড় ভেঙ্গে দিতে পারে এছাড়া প্রবল কাশির কারণে মল-মূত্র ধারণে অসামর্থতা ঘটে এবং হার্নিয়া হয়।
জীবনের মান:
প্রবল কাশি যে কেবল দৈহিক কষ্ট বাড়ায় তাই নয়, এটা জীবনের মানকেও নিচে নামিয়ে দেয়, যদওি এটাকে খুব একট গুরুত্ব দিতে চান না কেউ। মেয়ো ক্লিনিকের গবেষকরা দেখতে পেয়েছেন যে পুরনো কাশি যাদের রয়েছে, তারা সব সময় ক্রদ্ধ এবং হতাশাগ্রস্থ থাকেন, কারণ সার্বক্ষণিক কাশি তাদের জীবনযাত্রাকে বাধাগ্রস্থ করে। বারবার চিকিৎসকের কাছে গিয়েও তারা কোন উপকার পান না।পাশে তাদের কাশির শ্বদ অন্যের বিরক্তি উৎপাদন করে এটা ভেবে বিব্রতবোধ করেন। কাশির কারণে তারা ক্লান্ত থাকেন, কোন কিছুতে মনসংযোগ করতে পারেন না, সর্বদাই তাদের নিদ্রার ব্যাঘাট ঘটে।
সাধারণ কারণ:
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পুরাতন কাশি কোন মারাত্মক অসুস্থতাজনিত নয়অ ফুসফুসের ক্যান্সার হলে কাশি হয় বটে তবে এ ধরণের কাশি শতকরা ২ ভাগেরও কম ক্ষেত্রে বিদ্যমান থাকে। পুরনো কাশির সাধারণ কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে:
⇒পোষ্টন্যাজাল ড্রিপ (Postnasal Drip) অতিমাত্রায় শ্লেষ্মা উৎপাদি হয়ে তানোকের পশ্চাতদিক দিয়ে গাড়িয়ে গলার দিকে নেমে গেলে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ব্যাপারটা তেমন লক্ষণীয় নয় তবে কখনও কখনো এতে প্রদাহের সৃষ্টি হয় এব্ং ত কাশির কারণ ঘটায়। এলার্জি, ঠান্ডা লাগা, ফ্লু, সাইনাসে প্রদাহ ইত্যাদি কারণেও পোষ্টন্যাসাল ড্রিপ ঘটতে পারে। পুরনো কিংবা নতুন উভয় ধরনের কাশিরই কারণ হতে পারে এটি।
⇒হাঁপানি- হাঁপানি হলে বায়ুপথ সংকুচিত হয় এবং কাশির সৃষ্টি করে, বিশেষ করে রাতে। অনেকেই জানেন রাতের বেলা হাঁপানির টান বাড়ে। ব্যায়াম করার পরে কিংবা রাসায়নিক দ্রব্যের সংস্পর্শে এলেও কাশি হতে পারে। বুক সাঁই সাঁই করাটা হাঁপানির একটা প্রধান লক্ষণ হলেও হাাঁপনির সঙ্গে কাশি অবশ্যই থাকবে। হাঁপানির এই লক্ষণকে বলা হয় Cough Variant asthma ঠান্ডা আবহাওয়ার কারণেও হাঁপানিগ্রস্থ লোকদের কাশি চাঙ্গা হতে পারে।
⇒গ্যাস্ট্রো এসোফেগিয়াল রিফ্ল্যাক্সডিজিজ ডিজেজ (GERD) বুক জ্বালা ও ঢেকুর উঠা হচ্ছে এ রোগের সাধারণ লক্ষণ তবে কারো কারো ক্ষেত্রে এক বিশেষ ধরণের সমস্যা ঘটে যার নাম Laryngopharyngeal reflux(LRP) বাংলায় বলা যেতে পারে গলবিল- স্বরযন্ত্রীয় প্রতিবর্ত। এটা হলে রোগীর কাশতে থাকে। এসিড দমনকারী ওষুধের সাহায্যে এর চিকিৎসা করা হয়।
GERD হলে পাকস্থীর এসিড ও হজমী এনজাইম খাদ্যনালী বেয়ে স্বরযন্ত্রে (Voice box) পর্যন্ত পৌঁছে এবং কখনো কখানো ফুসফুস পর্যন্ত উঠে আসে। এসব পদার্থ শ্বাসনালীর স্নায়ুধারককে উদ্দীপ্ত করে ফলে কাশির সৃষ্টির হয়। কাশি এবং এসিড এ দুটো এক সময় এক দুষ্টচক্রের জন্ম দেয় অর্থ্যাৎ একটি আরেকটিকে চাঙ্গা করে তোলে।
⇒উর্ধ্ব শ্বাসনালীর সংক্রমণ কাশি হচ্ছে ঠান্ডা এবং ফ্লু এর একটি সাধারণ লক্ষণ, যা সাধারণত পোষ্টন্যঅসাল ড্রিপ এর কারণে ঘটে। অন্যান্য লক্ষণ নিরাময় হলেও কাশি কখনো কখনো সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে চলতে পারে।
⇒নাছোড়বান্দা সংক্রামনের পর পুরনো কাশি হুপিং কাশিতে রুপ নিতে পারে।
⇒ACE Inhibitors- রক্তচাপ কমাতে ব্যবহৃত হয় ACE Inhibitors নমক ওষধ। যারা এটা গ্রহণ করেন, তাদের শতকরা ১০ থেকে ২০ ভাগ রোগীর মধ্যে কাশি হতে পারে, যা এই ওষুধের পার্শ্বপ্রক্রিয়া।
ফুসফুসের সমস্যার কারণেও কাশি হতে পারে। সমস্যাগুলো নিম্নরুপ:
⇒পুরনো ব্রঙকাইটিস। ধুমপায়ীদের বেশি হয়। এটি বায়ুনালী প্রদাহজনিত রোগ।
⇒ফুসফুসের পুরাতন সংক্রমণ, যথা যক্ষা।
⇒ক্লোমনালী প্রসারণ (Bronchectasis) সংক্রমণের কারণে বায়ুপথের ক্ষত এটি।
⇒ইয়োসিনোফিলিক ব্রংকাইটিস। এতে ফুসফুসের কার্যক্রম সঠিক থাকে কিন্তু হাঁপানির লক্ষণ দেখা দেয়।
⇒ফুসফুসের ক্যান্সার। ধুমপায়ীদের এটা হয়ে থাকে। পুরনো কাশির ধরণ সহসা বদলে যায়। স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি থুথু উৎপন্ন হয়। কাশি দীর্ঘস্থায়ী হয়ে। অনেক সময় কফের সাথে রক্ত উঠে আসে, কন্ঠস্বর বদলে যায়। এসব লক্ষণ পরিদৃষ্ট হলে আপনি যদি ধূপপায় না-ও হন, আপনার ফুসফুসের ক্যান্সার হলো কিনা পরীক্ষা করিয়ে নিন।
কারণ নির্ণয়:
দুর্ভাগ্য এটাই যে, পুরনো কাশির কারণ নির্ণয় একটি মাত্র নির্দাশিক পরীক্ষায় সম্ভাব্য কারণগুলো খুজে বের করতে হবে। এদের চিকিৎসাও হতে পারে বিভিন্ন ধরণের। এজন্য বারবার চিকিৎকের কাছে যেতে হবে, যথেষ্ট সময় লাগবে, পরিশ্রমও হবে অনেক। এ ধরণের পদক্ষেপ হতাশাব্যঞ্জক মনে হলেও এতে করে সঠিক রোগনির্ণয় এবং যথাযথ চিকিৎসা সম্ভব হয়। আপনি যদি ধুমপায়ী না হন, তাহলে চিকিৎসক সম্ভবত আপনার পোষ্টন্যাসাল ড্রিপ, হাঁপানি কিংবা এঊজউ হয়েছে কিনা সেটাই খুঁজে দেখবেন। শতকরা ৯০ ভাগ ক্ষেত্রেই এগুলো হচ্ছে পুরনো কাশির কারণ। তবে পুরনো কাশির একাধিক কারণ থাকাও অসম্ভব নয়। আপনি ধূমপায়ী হলে আপনার পরীক্ষারও বিভিন্ন রকমের হবে কারণ এক্ষেত্রে ক্রান্সারের মত রোগের ঝুকিও বয়ে আনে এই ধূমপান।
চিকিৎসক আপনার নাক, কান ও গলা পরীক্ষা করে দেখবেন। কারণগুলো খোঁজার পরও স্পষ্ট রোগনির্ণয় না হলে কেবলমাত্র কাশি সরানোর চিকিৎসার প্রতিই গুরুত্ব দিতে হবে। চিকিৎসক আপনাকে একজন নাক, কান , গলা বিশেষজ্ঞের কাছেও প্রেরণ করতে পারেন।
স্বাস্থ্য পরামর্শ:
ঘাযুক্ত গলা সারাতে আপনার কাশির কারণে ঘাযুক্ত হয়েছে?
♦ এটা কোন অস্বাভাবিক বিষয় নয়। ভাইরাস সংক্রমণে গলা ঘা যুক্ত হয় এবং এর সঙ্গে ঠান্ডা কিংবা ফ্লুও থাকে।
কখনো কখনো ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণেও গলা ঘাযুক্ত হয়, বিশেষ করে ষ্ট্রেপটোকক্কাস সংক্রমণে। একই সঙ্গে গলা ব্যথা, লসিকগ্রন্তি (Lymph gland) ফুলে উঠা, জ্বর মাথাব্যাথা ইত্যাদির লক্ষণ থাকতে পারে। এধরণের সংক্রমণে অবশ্য ভাইরাস সংক্রমণের ন্যায় কাশি, কফ জমে উঠা, ইত্যাদি থাকে না। ভাইরাস সংক্রমণে গলায় ঘা হলে সপ্তাহ খানেকের মধ্যে নিজে নিজেই সের যায়। Strep Caused thoat হলে এন্টিবায়োটিকের দরকার হয়।
ঘাযুক্ত গলা উপশমে:
⇒পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন
⇒আধা চামচ লবণ মেশানো গরম পানি দিয়ে কুলকুচি করুন, পানি কিন্তু গিলবেন না।
⇒গলার স্প্রে কিংবা লজেন্স ব্যবহার করুন।
⇒আপনার গলার পক্ষে সহনীয় খাদ্য যথা দুধ, সরবত কিংবা স্যুপ খান।
⇒ব্যথানাশক ওষুধ যথা অ্যাসিটামিনোফেন (প্যারাসিটামল, টিলেনল, অন্যান্য) ইবুপ্রোফেন, মট্রিন, অন্যান্য গ্রহণ করুন।
⇒আপনার নিঃশ্বাস আর্দ্র রাখার জন্য একটি মুখোশ ব্যবহার করুন।
medicalbd সাস্থের সকল খবর।
