প্রশবের সময় জন্মপথ খুঁজে পায়না যেসকল শিশু

রিতুর (ছদ্মনাম) বিয়ে হয়েছে বছর কয়েক।  পড়াশোনা শেষ করে বিয়ে করতে করতে একটু দেরীই হয়ে গেছে।  ত্রিশের পরে মা হওয়া ঝুঁকিপূর্ণ এটা ও জানে সে।  তাই বিয়ের পরপর আর দেরি করতে চায়নি।  রিতুর বরও ওর আকুতি দেখে মায়ায় আচ্ছন্ন হয়। ভাবে একটা বেবি হলে মন্দ হয় না।  সো বিয়ের পর থেকেই একটা বেবির জন্য ওদের প্রতীক্ষা।  জনম জনম ধরেই এই প্রতীক্ষায় থাকে প্রাণীকূল।  টিকিয়ে রাখে সভ্যতা। তিন তিনটা বছরের ক্লান্তিকর চেষ্টার পর সুবাতাস বয় ওদের! স্বপ্নরা বড় হয়।  আকাশ ছুঁতে চায়। কিন্তু সে স্বপ্ন হুড়মুড় করে ভেঙে পড়তে সময় লাগে না এক বিন্দুওে।  রিতুর বাচ্চা এসেছে ঠিকই কিন্তু সে বাচ্চা জরায়ুতে নাই ও  টিউবেও নাই। টিউবে বাচ্চা আসাকে বলি এক্টোপিক প্রেগন্যান্সি।  ভয়াবহ কন্ডিশন!  টিউব ফেটে গেলে রোগী বাঁচাতে ইমার্জেন্সি অপারেশন করা লাগে।  না হলে মৃত্যু অনিবার্য।যা বলছিলাম, রিতুর বাচ্চা তাহলে কোথায় গেলো! অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর পাওয়া গেলো পাঁজি বাচ্চা জরায়ুকে বাদ দিয়ে টিউব পেরিয়ে অন্য বাড়িতে চলে গেছে।  অর্থাৎ নাড়ি ভুড়ির পিছনে ওমেন্টাম নামক এক ঝুঁপড়ি আছে যার কাজ নাড়িভুড়িকে সুরক্ষা দেওয়া, সেখানে দোলনা বানিয়েছে পাঁজিটা।

তা তুই বাঁচবি কিভাবে, খাবার কোথায় পাবি? বেচারা তখন পরে বিপদে।  আসলেই তো।  জরায়ুর যে রক্ত তার জন্য বরাদ্দকৃত ছিল তাতো সেখানে নেই।  ফলে  পৃথিবীর রং রূপ দেখার আগেই একটা সময় খাবারের অভাবে মৃত্যুবরণ করে ভ্রুণ।  আর লাখে কিংবা দশ লাখে একজন এমনি বেয়াড়া যে মায়ের নাড়িভুড়ির রক্ত মাংস ঝোঁকের মতো চুষে চুষে বেঁচে থাকে। সে যেহেতু জরায়ুজ না, সে জন্য জন্মের সময় মায়ের জন্মপথ খুঁজে পায় না বের হওয়ার জন্য।  কাজেই বের হতে অনেক চেষ্টা করে কিন্তু পারে না।  ফলে উথাল পাথাল ব্যাথা নিয়ে মা হাসপাতালে ভর্তি হয়।  রিতু পুরো প্রেগন্যান্সি পিরিয়ডে একবারও ডাক্তার দেখায়নি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা তো দূরের কথা। তার উপর লোকাল দাই দিয়ে দুদিনের জীবন মরণ চেষ্টা।

দুএকটা পরীক্ষার কাগজ যদি থেকেও থাকে তাড়াহুড়োয় সেটাও নিয়ে আসার সময় পায়নি, না হয় ভুলে যায় আনতে।  গাছ বাঁচলে ফল ধরবেই থিওরি মেনে সরাসরি ওটি রুমে ঢুকাতে হল।  পেট খুলে দেখা গেলো জরায়ুতে বাচ্চা নেই! কোথায় গেলো? আঁতিপাতি খুঁজে অবশেষে নিয়ে আসেন কাঙ্ক্ষিত ধনকে। কিন্তু তার আগেই সে পাড়ি জমিয়েছে ওপাড়ে।  আহারে মা তোমার চাঁদের কনা বুকে এলো না ।  আহারে ডাক্তার! সোনার টুকরাকে মায়ের বুকে তুলে দেয়ার অপার্থিব আনন্দ তুমি পেলে না।  উল্টো পেলে অপবাদ।

তো চলুন জেনে নিই- ==) এই প্রেগন্যান্সিকে কি বলে?
হেটারোজেনাস প্রেগন্যান্সি অথবা এবডোমিনাল প্রেগন্যান্সি।
==) শতকরা কয়জনের হয়?
শতকরা না, লাখে একজন দুজনের হয়।
==) কিভাবে ডায়াগনোসিস হয়?

বাচ্চা পেটে আসার প্রথম ৩ – ৪ মাসের মধ্যে আল্ট্রা করলে। শেষের দিকে আল্ট্রাতে আলাদা করে জরায়ুর ভিতর না বাহির অতটা ভালো বুঝা যায় না। অথবা এমআরআই করলে। প্রেগন্যান্ট রোগীদের সাধারনত এমআরআই করা হয়না কারণ এই পরীক্ষায় নয় হাজার টাকার মতো লাগে। যেখানে রোগীরা নয়মাসে একবার ডাক্তার মুখো হতে পারেনা, সেখানে এই পরীক্ষা তো অনেক দূরের  কথা! তাই ম্যাক্সিমাম ই ধরা পড়ে সিজারের সময়। ফেট কী? প্রতি ২০ জনের ১৯ জন বাচ্চাই মারা যায় খাবারের অভাবে। একজন হয়তো ডেলিভারি পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। আর এই বাচ্চা বেঁচে থাকলেও অনেক সমস্যা হয় পরবর্তিতে। আর মায়ের যে কী সমস্যা হয় তা বলে শেষ করা যাবে না। শুধু এইটুকু বলি, মায়ের জীবন বাঁচাতে গর্ভফুলটা ভেতরেই রেখে আসতে হয় কখনো কখনো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*