পাশের বাড়ির মহিলা প্রায়ই গলা-বুক জ্বালা করার কথা বলেন। নিজে তো অস্থির, সাথে বাড়ির লোকও অতিষ্ট হয়ে পড়ে। রাতে নাকি তার ঘুম হয় না, মুখের ভেতরটা টকে ভর্তি হয়ে যায়। অনেক সময় মুখে খাবারও উগরে আসে। এই যে সমস্যা এটা কিন্তু অত্যন্ত পরিচতি সমস্যা।
এর প্রধান কারণ ওবেসিটি এবং পরিশ্রম বিমুখতা। কিংবা যারা শুধুমাত্র ঘরের কাজই করেন তাদের মধ্যে এই রোগ কিন্তু প্রকট ভাবে দেখা যায়। এই ধরনের সমস্যা যে রোগের কারণে হয়ে থাকে তাকে বলে গ্যাস্ট্রো ইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ বা সংক্ষেপে জি.ই.আর.ডি। নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে সমস্যা। গ্যাস্ট্রো অর্থাৎ স্টম্যাক থেকে ইসোফেগাস অর্থাৎ খাদ্যনালীর মধ্যে রিফ্লাক্স অর্থাৎ কোনো বস্তু চলে আসা।
পাকস্থলি থেকে খাদ্যনালীর মধ্যে অ্যাসিড চলে আসার জন্য যে রোগ হয় তাকেই বলে জি.ই.আর.ডি। বিদেশে শতকরা পনেরা ভাগ মানুষের জীবনে কোনো না সময়ে রোগটি হয়ে থাকে। আমাদের দেশেও রোগীর সংখ্যা কম নয়। যদিও বিদেশের তুলনায় আমদের দেশের পরিসংখ্যান সেভাবে মেলে না ঠিকমতো। খাদ্য ও খাবারের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ খুব নিবিড়। খাবার পর খাদ্য যে রাস্তা দিয়ে যায় তাকে বলে খাদ্যনালী বা ইসোফেগাস।প্রাপ্তবয়স্ক মানুষদের ক্ষেত্রে চব্বিশ সেমি (২৪ সে.মি.) লম্বা হয় খাদ্যনালী। বিভিন্ন ধরনের অসুখের কারণে এর কাজ বা গতিপথ ব্যাহত হতে পারে।
খাদ্যনালীকে ইংরেজিতে বলা হয় ইসোফেগাস এবং চলিত কথায় বলে ফুড টিউব। আমাদের দেশে খাদ্যনালীর যে অসুখটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায় তা হল ক্যানসার। এছাড়া অন্যান্য কিছু অসুখের কারণেও ইসোফেগাসের কাজ ব্যাহত হয়। রাত্রিবেলা ঘুম ভাঙে বুক জ্বালায়। যখন-তখন বুক জ্বালা, অ্যাসিডিটি হওয়া, মুখের ভেতরে খাবার চলে আসা এই সমস্যায় কম-বেশি সকলেই ভুগে থাকেন। এর কারণ অ্যাসিডটা বেশি পরিমাণে বেরিয়ে খাদ্যনালীতে চলে আসে। এই ধরনের লক্ষণগুলো হল গ্যাস্ট্রো ইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ, সংক্ষেপে জি.ই.আর.ডির।
এই অসুখটি খুবই কমন। বয়স্কদের ক্ষেত্রে যেমন, বাচ্চাদের ক্ষেত্রেও প্রায়শই এই অসুখটি দেখা যায়। বিশেষত বিদেশে হামেশাই বাচ্চাদের ক্ষেত্রে জি.ই.আর.ডি ডায়াগনোসিস হয়।
জি.ই.আর.ডি বললে কী কী লক্ষনের কথা ভাববেনঃ
* প্রধানত অ্যাসিডিটি।
* বুকজ্বালা এবং পেটের উপরিভাগে জ্বালা।
* মুখের মধ্যে খাবার চলে আসা।
* বমি হওয়া।
এই লক্ষণগুলোই হচ্ছে প্রধান। ইসোফেগাসের মধ্যে যে অ্যাসিড আসে তার তিনটি কমন কারণ আছে। ইসোফেদাস এবং স্টম্যাকের মধ্যে যে ভালভ থাকে সেই ভালভের রিলাক্সসেশন বা শিথিলতার জন্য স্টম্যাক থেকে অ্যাসিডটা ইসোফেগাসে ঢুকতে পারে।
দ্বিতীয় কমন কারণটি হল যখন দেখা যায় ইসোফেগাসের নীচের অংশে টোনটা কমে যায় তখন ভালভটা ঢিলে হওয়ার জন্য পাকস্থলির অ্যাসিড খাদ্যনালীতে ঢুকে পড়ে।
তৃতীয় কারণ হল হায়টাস হার্নিয়া। আমাদের মধ্যচ্ছদার মধ্যে তিনটি ছোট ওপেনিং থাকে, তিনটি ওপেনিং দিয়ে তিনটি জিনিস বুক থেকে পেটের মধ্যে আসে। এদের মধ্যে-একটি দিয়ে ফুড টিউব বা খাদ্যনালীতে আসে, সেখানে এক ধরনের ইন্টারনাল হার্নিয়া অনেক সময় দেখা যায়। এটাকে বলে হায়াটাস হার্নিয়া। হায়াটাস হার্নিয়া। থাকলে জি.ই.আর.ডি বেশি হতে পারে।
অন্য কারণগুলো হল-
ওজন : আমাদের দেহের ওজন যখন খুব বেড়ে যায় তখন একদিকে যেমন পেটের মধ্যেকার প্রেসার বেড়ে যায়, তেমনই অন্যদিকে পাকস্থলি ও খাদ্যনালীর যে জাংশন, সেটা ঢিলে হয়ে যায়। তার জন্য পাকস্থলির অ্যাসিড খাদ্যনালীর মধ্যে ঢুকে পড়তে পারে।
খাদ্যভ্যাস : খুব বেশি স্পাইসি ফুড কিংবা খুব বেশি ফ্যাটি ফুড খেলে খাদ্যনালী ও পাকস্থলির সংযোগ যে ভালভটি আছে সেটি ঢিলে হয়ে অ্যাসিডটা জি.ই.আর.ডি করতে পারে।চকোলেট, পিপারমেন্ট বেশি খেলে সে সবের জন্যেও খাদ্যনালী ও পাকস্থলির সংযোগ ঢিলে হয়ে যেতে পারে।
ওষুধ : অনেক সময় ঘুমের ওষুধের জন্যেও খাদ্যনালী-পাকস্থলির ভালভ ঢিলে হতে পারে। পাকস্থলি ও খাদ্যনালীর মুখে যে ভালভ থাকে তার কাজ হল একমুখী, যা নীচের জিনিসকে উপরে আসতে দেয় না কিন্তু উ পরের জিনিসকে নীচে যেতে দেয়। এই ভালভের গন্ডগোলের কারণেই জি.ই.আই.ডি-র আক্রমণ হয়।
তাহলে দেখা যাক কী কী কারণে জি.ই.আর.ডি বেশি হতে পারে
* ওজন বেশি হওয়া।
* খাদ্যাভাসের গোলমাল।
* কিছু ওষুধ বিশেষত ঘুমের ওষুধ অ্যালজোলাম, ব্লাডপ্রেসার কমানোর ওষুধ অ্যামলোডিপাইন, নাইট্রেট জাতীয় কিছু ওষুধ এবং অ্যান্টি ডিপ্রেশনের ওষুধ থেকে ভালভটা আলগা হতে পারে।
কী কী লক্ষণ নিয়ে রোগী ডাক্তারের কাছে যায় ?
গলা-বুক জ্বলা, বমি হওয়া, অ্যাসিড-এই তিনটি হচ্ছে প্রধান লক্ষণ। অন্য লক্ষণ হিসেবে আসতে পারে ওই অ্যাসিডটা ওপরের দিকে এসে ফুসফুসের মধ্যে নার্ভের সাহায্যে বিভিন্ন পরিবর্তন করে। এর ফলে ব্রঙ্কিয়াল অ্যাজমা আসতে পারে। এর ফলে ব্রঙ্কিয়াল অ্যাজমা আসতে পারে। অ্যাসিডটা ওপরের দিকে উঠে ভোকাল কর্ডের কাছে এসে ল্যারিঞ্জাইটিস করতে পারে। খাদ্যনালীর মধ্যে এসে ফ্যারিঞ্জাইটিস বা সাইনুসাইটিস করতে পারে। এছাড়া দেখা যায় অনেকের দাঁত খুব ক্ষতিগ্রস্ত হয়, দাঁত পড়ে যায় অ্যাসিডের জন্য। এটা খুব বেশি মাত্রায় হয়। অ্যাসিড এসে দাঁতে কেরিস সৃষ্টি করে। এছাড়া হতে পারে ওরাল আলসার।
অ্যাসিডি কী কী ক্ষতি করে ?
* কেরিস টুথ।
* ব্রঙ্কিয়াল অ্যাজমা।
* ফ্যারিঞ্জাইটিস।
* ল্যারিঞ্জাইটিস।
* ওরাল আলসার।
সবথেকে গুরুত্বপূর্ন যেটা এবং যা ভুলে গেলে চলবে না, তা হল এই অসুখ দীর্ঘদিন থাকার কারণে খাদ্যনালীর ঝিল্লিতে কিছু পরিবর্তন হয়। এর ফলে স্টম্যাকের খাদ্যনালীর শেষাংশে খুব বেশি রকম ক্যানসার দেখা যায়। যাকে অ্যাডেনো কারসিনোমা বলা হয়। বিদেশে এই ক্যানসার খুব বেশি দেখা যায়। অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে আমাদের দেশেও এই ক্যানসারের প্রভাব কম নয়। তাই একে জি.ই.আর.ডি-র সব থেকে ক্ষতিকর বা মারাত্মক জটিলতা বলে।
জি.ই.আর.ডি দীর্ঘদিন ধরে থাকার কারণে স্টম্যাকে ক্যানসার ডেকে আনতে পারে।
ডায়াগনোসিস কীভাবে হবে ?
* এন্ডোস্কোপি।
* খাদ্যনালীর মধ্যেকার প্রেসার মাপতে হয়। যাকে বলে ইসোফেজিয়াল ম্যানোমেট্রি। চব্বিশ ঘন্টা পি.এইচ. মনিটরিং করতে হবে।
চিকিৎসা
চিকিৎসা তিনরকম হবে –
* লাই ফস্টাইল মডিফিকেশন বা জীবনশৈলি পরিবর্তন।
* কীভাবে শরীরের ওজন কমানো যায় সেদিকে সচেষ্ট হতে হবে।
* এমন খাদ্যদ্রব্যগ্রহণ করতে হবে যা খাবার পরে অ্যাসিডিটি কমে যাবে।
দীর্ঘদিন ধরে রোগভোগ না করে চিকিৎসকের কাছে যান। নিজের চিকিৎসা নিজে করবেন না। ওষুদের দ্বারা কীভাবে, রোগ সারানো যার সেটাও দেখতে হবে। দেখা গেছে ওষুধ রোগ-লক্ষণ কমাতে পারে কিন্তু রোগ যে সারবেই এ কথা বলা যায় না।
medicalbd সাস্থের সকল খবর।

