মানবশিশু পৃথিবীতে আসার পর প্রথম এক মাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর নতুন আলো, পরিবেশ-সব কিছুর সাথ খাপ খাইয়ে শিশুর শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে সুস্থ ও সুন্দরভাবে বিকাশ ঘটাতে হয়। মা ও অভিভাবকের শিশুর যত্ন সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান এবং সে অনুযায়ী শিশুকে পালন করার মাধ্যমে নবজাতক সুস্থ্য ও সুন্দরভাবে বেড়ে উঠতে পারে।
শিশুর জন্মের সাথে সাথে যা করণীয় :
- শশিুকে গরম রাখতৈ হবে।
- মায়ের কাছে রাখতৈ হবে।
- শালদুধ খাওয়াতে হবে ( শিশুর জন্মের ১ ঘন্টার মধ্যে) ।
- শিশুকে ছয় মাস পর্যন্ত শুধু বুকের দুধ খাওয়াতে হবে।
মায়ের দুধ
মানবশিশু ভুমিষ্ঠ হওয়ার সাথে সাথে প্রথম যে খাবারের প্রয়োজন তা হলো মায়ের দুধ। মায়ের দুধ শিশুর জন্মগত অধিকার। মায়ের দুধের চেয়ে শ্রেষ্ঠ খাবার আর কিছুই নেই। মায়ের দুধ সর্বোৎকৃষ্ট। মায়ের দুধের বিকল্প নেই। মানবশিশুসুস্থ ও সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন মায়ের দুধ। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত আছে-তোমরা সন্তাকে পুরো দুই বছর বুকের দুধ পান করাবে। কথায় আছে- ‘শিশুকে মায়ের বুকের দুধ হবে খাওয়াতে, এমনকি ঝড় বৃষ্টি বন্যাতে।’
বুকের দুধ খাওয়ানোর নিয়ম :
শিশুকে সাধরণত মায়ের যেকোন অবস্থায় বুকের দুধ খাওয়ানো যায়। অর্থাৎ মা উপুড় হয়ে শুয়ে থাকা, এক দিকে কাত হয়ে শোয়া অবস্থা অথবা মা বসা অবস্থায় শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারেন। প্রতিটি ক্ষেত্রে নিন্মোক্ত বিষয় স্মরণ রাখতে হবে।
- শিশুকে মায়ের শরীরের কাছাকাছি রাখতে হবে।
- শিশুকে মায়ের শরীরের কাছাকাছি রাখতে হবে।
- শিশুকে পরিপূর্ণভাবে হাত দিয়ে ধরে রাখতে হবে।
- মা যে দিকের বুকের দুধ খাওয়াতে চান, সেদিকে শিশুর মুখ স্তন বরাবর রাখতে হবে।
- স্তনের বোঁটা ও কালো অংশ পুরোপুরি শিশুর মুখে দিতে হবে।
বুকের দুধ কতবার খাওয়াবেন :
শিশু যখনই খেতে চায় তখনই বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। তবে শিশু যদি ৩ ঘন্টার বেশি ঘুমায় তবে তাকে জাগিয়ে খাওয়াতে হবে। মনে রাখতে হবে, ২৪ ঘন্টায় শিশু যদি ছয়বারের বেশি প্রস্রাব করে তবে বুঝতে হবে শিশুটি পর্যাপ্ত পরিমাণে বুকের দুধ পাচ্ছে।
গোসল
শিশুকে জন্মের পরপরই শরীর মুছে ও শুস্ক করে গরম রাখতে হবে। এর পর কুসুম গরম পানি দিয়ে কমপক্ষে তিন দিন পর গোসল করাতে হবে। শিশুকে গোসলের পানিতে অ্যান্টিসেপ্টিক ওষুধ মিশিয়ে গোসল করানো যেতে পারে।
নাভির যত্ন
নাভিরজ্জু শুকনো ও পরিষ্কার রাখতে হবে। নাভি কাটার পর সে স্থানে ৭.১ শাতাংশ ক্লোরোহেক্সিডিন সলিউিশন একবারই লাগাতে হবে। অ্যান্টিসেপ্টিক ওষুধ সাধারণত ব্যবহার করা লাগে না। তবে নাভির কোনো ইনফেকশন হলে সেক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তা ব্যবহার করতে হবে।
চুল কাটা
শিুশুর মাথার চুল জন্মের পর পরিষ্কার হবে। চুল শিশুর শরীর ঠান্ডা হওয়া থেকে রক্ষা করে। তাই চুল ফেলে দিতে হবে, এমন বাধ্যবাধকতা নেই। পরিষ্কার রাখাই যথেষ্ঠ। একটু দেরি করে কাঠলে অসুবিধা নেই।
ন্যাপি
শিশুর পরনের ন্যাপি বা নেংটি ভেজামাত্রই পাল্টে দিতে হবে। শিমুকে শুকনো ও পরিষ্কার পোশাক মাঝে মাঝে পাল্টে পরাতে হবে।
শরীরে তেল দেয়া
শিশুর শরীরে নারিকেল তেল, অলিভ অয়েল বা বেবি লোশন দেয়া যায়। তবে তেলে যেন জবজবে না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
হাঁচি
শিশুর হাঁটি হওয়া স্বাভাবিক। এটি প্রতিরোধমূলক অবস্থা। এতে নাক পরিষ্কার হয়। মাঝে মাঝে শিশুর নাক পরিষ্কার করা ভালো।
কান্না
শিশু খাওয়ার জন্য কান্নাকাটি করে। তবে পায়খানা-প্রসাব, পরিবেশ অত্যধিক ঠান্ডা বা গরম বা মায়ের স্পর্শ পাওয়ার জন্যও একটি সুস্থ্য শিশু কান্নাকাটি করতে পারে। তবে এসব কারণ ছাড়াও শিশু যদি অত্যধিক কান্নাকটি করে, তবে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।
হেঁচকি
শিশুর হেঁচকি তোলা স্বাভাবিক। এটি এমনিতেই সেরে যায়।
বমি
সাধারণত শিুশুর পেটের বাতাস বের না করলে বমি হয়। এ ছাড়া প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খাওয়ালে বা বদহজম হলেও বমি হতে পারে। এজন্য শিশুকে খাওয়ানোর পর মাথার দিক একটু উঁচু করে রাখতে হবে এবং শিশুকে ঢেঁকুর তুলতে সাহায্য করতে হবে। শিশুকে কাঁধের ওপর রেখে, শিশুর পেট কাঁধের সাথে লেপটে রেখে শিশুর পিঠে হালকাভাবে চাপড় দিলে পেটের বাতাস বের হয়ে যায়।
প্রস্রাব
জন্মের পর শিশুর সাধরণত ২৪ ঘন্টার মধ্যে প্রথম প্রস্রাব হয়। এর পর প্রস্রাব না হলে বুকের দুধ বারবার খাওয়াতে হবে। তারপর প্রস্রাব না হলে চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করতে হবে।
মলত্যাগ
শিশু সাধরণত ২৪ ঘন্টার মধ্যে মলত্যাগ করে। যেসব শিশু শুধু মায়ের দুধ খায় তাদের মল হলুদ পেস্টের মতো হয়। যারা ফর্মুলা দুধ খায়, তাােদর কোষ্ঠকাঠিন্য হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অনেক সময় দুধ ফেটে যাওয়ার মতো মলত্যাগ করে, যেটা স্বাভাবিক।
জন্ডিস
শিশুদের তৃতীয় দিনে জন্ডিস হওয়া স্বাভাবিক। এটি সাধারণত পাঁচ-ছয় দিন পরে কমতে শুরু করে। এর জন্য শিশুকে রোদে রাখলেই জন্ডিস কমে যায়। যদি শিশুর জন্ডিস জন্মের পর প্রথম দিন শুরু হয় বা ১৪ দিনের বেশি থাকে, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
গায়ে লাল লাল দানা
শিশুর চামড়ায় অনেক সময় আলপিনের ডগার মতো লাল লাল দানা দেখা দিতে পারে। এটি সাধারণত জন্মের দুই-এক দিনের মধ্যে দেখা যায়, চার-পাঁচ দিন পর তা শেরেও যায়। এটি সাধরদণ অ্যালার্জি। বিভিন্ন বস্তু, যেমন-কাপড়চোপড়, কাঁথা প্রভৃতির সংস্পর্শে আসার জন্য এটি হয়। এর জন্য কোনোরূপ ওষুধ দরকার হয় না।
চোখে অতিরিক্ত পানি পড়া
অনেক সময় শিশুর চোখে অতিরিক্ত পানি দেখা যায়। চোখের পানির সাধারণত চোখের কোনায় নাকের ভেতরে একটি নালা দিয়ে বের হয়।
যখন এই নালাটি সঠিকভাবে খোলা না থাকে তখনই চোখের পানি বের হয়। চোখে কোনায় নাকের মূলে হাতের আঙুল দিয়ে ওপর থেকে নিচে দিনে কয়েকবার ঘষলেই কয়েক দিনের মধ্যে এটি সেরে যায়। তারপরও যদি ভালো না হয় তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
মুখে সাদা প্রলেপ (ওরাল থ্রাস)
অনেক সময় শিশুদের মুখের ভেতর সাদা প্রলেপ দেখা যায়। যদি এটি আঙুল দিয়ে ঘষলে দূর করা না যায়, তবে বুঝতে হবে এটি ফাঙ্গাস ইনফেকশন। এটি সাধারণত ওষূট দিলেই সেরে যায়।
মনে রাখতে হবে, শিশুর যত্ন সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান নিয়ে এবং সে অনুযায়ী শিশুকে যত্ন নিলে শিশু সঠিকভাবে বেড়ে ওঠে। সেজন্য গর্ভাবস্থায় মাকে ও অভিভাবকদের সঠিকভাবে শিশুর যত্ন সম্পর্কে পরামর্শ দিতে হবে।
গণ সচেতনতায় ডিপিআরসি হসপিটাল লিমিটেড
medicalbd সাস্থের সকল খবর।

