যে ১০টি কারনে স্মৃতিশক্তি লোপ পায়।  

১০টি কারনে স্মৃতিশক্তি লোপ পায়

যে ১০টি কারনে স্মৃতিশক্তি লোপ পায়ঃ

পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষই মনে হয় তাদের স্মরণশক্তি নিয়ে সন্তুষ্ট নন। কারও কারও মধ্যে সবসময়ই একটি ধারণা কাজ করে, তার স্মরণশক্তি কম। অনেক স্কুল-কলেজগামী ছাত্রছাত্রী আছে যারা একটি বিষয় দুয়েকবার পড়ে স্মরণ রাখতে না পেরে অগত্যা স্মরণশক্তিকে দায়ী করে।
অনেকে ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়। কিছু কিছু অভিভাবক আছেন যারা তাদের সন্তানদের স্মরণশক্তির ব্যাপারে অতি উৎসাহী এবং এ সংক্রান্ত কোনো সমস্যা না থাকার পরও তা বৃদ্ধি করার মহৌষধ খুঁজতে ডাক্তারের শরণাপন্ন হন।

কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে স্মরণশক্তি বৃদ্ধি করার সেরকম কোনো মহৌষধ নেই। কোনো মানুষ যদি নিজের স্মরণশক্তির ব্যাপারে সন্তুষ্ট না হন এবং যদি সবসময়ই একটি ধারণা করেন যে তার স্মরণশক্তি কম, তাহলে এটা থেকে ধীরে ধীরে হতাশা এবং বিশন্নতা দেখা দিতে পারে। আর এ হতাশা এবং বিষণ্ণতা দীর্ঘস্থায়ী হলে স্মরণশক্তি লোপ পেতে পারে । অবশ্য এ সমস্ত ক্ষেত্রে হতাশা এবং বিষণ্ণতার সঠিক চিকিৎসা করলে স্মরণশক্তি এবং বুদ্ধিমত্তা আগের অবস্থায় ফিরে আসে। স্মরণশক্তিহীনতা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একটি বৃদ্ধ বয়সের রোগ। তবে ক্ষেত্রবিশেষে কম বয়সেও এ রোগ দেখা দিতে পারে। যাদের বয়স ৬৫ বছরের বেশি তারা অধিকহারে স্মরণশক্তি লোপজনিত সমস্যায় ভুগে থাকেন। বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে স্মরণশক্তি হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৬৫ বছরের অধিক বয়সের মানুষ কমপক্ষে ১০ শাতংশ স্মৃতিশক্তি লোপজনিত সমস্যায় ভুগে থাকেন। বয়স বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে এ সংখ্যাটিও আরও বৃদ্ধি পায়। আশি বছরের অধিক বয়সী বৃদ্ধরা ২০ শতাংশ স্মৃৃতিশক্তি লোপজনিত সমস্যায় ভুগে থাকেন। স্মৃতিশক্তি লোপ সমস্যা সাধারণত দুই ধরনের। একটি হলো মস্তিষ্কের নিজস্ব কারণজনিত সমস্যা। অপরটি মস্তিষ্কের বাইরের অন্য কোনো অঙ্গ বা সিস্টেম আক্রান্ত হওয়ার ফলে মস্তিষ্কে সৃষ্ট সমস্যা।

মানুষের মস্তিষ্কে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। বাইরের স্তরকে বলে কর্টেক্স এবং ভেতরের স্তরকে বলে মেডুলা।
মানুষের স্মৃতিশক্তি নিয়ন্ত্রণ করে প্রধানত বাইরের কর্টেক্স স্থরটি। যে সমস্ত অসুখে কর্টেক্স ক্ষতিগ্রস্ত হয় সে সমস্ত অসুখেই স্মরণশক্তি লোপ পায়। স্মরণশক্তি লোপ পাওয়া শুধু একটি রোগ নয় এটি একটি সামাজিক সমস্যাও।

স্মৃতিমক্তি লোপ পেলে মানুষের আচার-আচরণ, আবেগ-ব্যক্তিত্ব সবকিছুতে সমস্যা দেখা দেয়। ফলে নানাবিধ সামাজিক সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। অনেক কারণেই স্মরণশক্তি লোপ পেতে পারে। নিচে স্মরণশক্তি লোপ পাওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ১০টি কারণ নিয়ে আলোচনা করা হলো।

কারণ-১ মস্তিষ্কের ক্ষয়রোগ

কিছু কিছু অসুখ আছে যাতে মস্তিষ্কের স্মরণশক্তি নিয়ন্ত্রিণকারী কর্টেক্স ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে। ফলে স্মরণশক্তি লোপ পায়। আলঝেইমারস এরকম একটি গুরুত্বপূর্ণ রোগ। আলঝেইমারস একটি দীর্ঘস্থায়ী মস্তিষ্ক ক্ষয়কারী রোগ, যেটি হলে স্মরণশক্তি লোপ পেতে পেতে একজন মানুষ সম্পূর্ণ স্মরণশক্তিবিহীন হয়ে যেত পারে।

আলঝেইমারসের সঠিক কোনো কারণ আবিষ্কৃত হয়নি, তবে জিনগটিত সমস্যা এবং অধিক বয়সকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। আলঝেইমারস ছাড়া আরও কিছু রোগ আছে যেগুলো মস্তিষ্কের ক্ষয়সাধন করে থাকে। এদের মধ্যে হানটিংটনস, পারকিনসন্স, লিউয়িবডি ডিমেনশিয়া প্রভৃতি রোগের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

 

কারণ-২ মস্তিষ্কের রক্তনালীর রোগ

মস্তিষ্কের ছোট অথবা বড় যে কোনো ধরনের রক্তনালী ব্লক হয়ে গেলে স্মৃতিশক্তি লোপ পেতে পারে। রক্তনালী ব্লক হয়ে যাওয়ার ফলে মস্তিষ্কের কর্টেক্স অংশে রক্ত সরবরাহ ব্যাহত হয় এবং স্মৃতিশক্তি লোপ পায়। এছাড়া স্ট্রোক করার পর অথবা মস্তিষ্কে রক্তনালির প্রদাহের ফলে স্মরণশক্তি লোপ পেতে পারে।

 

 

কারণ-৩ ব্রেইন টিউমার

ব্রেইন টিউমারকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। একটি হলো ব্রেইনের নিজস্ব কোষে সৃষ্ট টিউমার এবং অন্যটি শরীরের অন্যকোনো জায়গার টিউমার রক্ত বা লসিকা দ্বারা বাহিত হয়ে ব্রেইনে জমা হওয়ার ফলে সৃষ্ট টিউমার। ব্রেইনের নিজস্ব কোষে টিউমার হলে স্মৃতিশক্তি সাধরণত তেমন লোপ পায় না। কিন্তু রক্ত বা লসিকা দ্বারা বাহিত ব্রেইন টিউমার হওয়ার ফলে স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়ার সম্ভাবনা বহুগণে বেড়ে যায়।
ব্রেইন টিউমার ছাড়াও ব্রেইনের ভেতর রক্তক্ষরণের পর জমাট বাঁধা রক্তের কারণে কের্টেক্সে চাপ পড়লে স্মৃতিশক্তি লোপ পেতে পারে।

 

কারণ-৪ মস্তিষ্কে আঘাত

সড়ক দুর্ঘটনার ফলে অথবা অন্য যে কোনো দর্ঘটনায় মস্তিষ্ক মারাত্মকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হলে স্মৃতিশক্তি লোপ পেতে পারে। অনেক সময় বক্সিং খেলায় একজন বক্সার তার প্রতিফক্ষের মাথায় জোরে আঘাত করে থাকেন। আর এভাবে স্মৃতিশক্তি লোপ পেতে পারে।

 

 

কারণ-৫ ভিটামিনের অভাব

ভিটামিনের অভাবে স্মরণশক্তি লোপ পেঁতে পারে। যে সমস্ত ভিটামিনের অভাবে স্মরণশক্তি লোপ পায় সেগুলো হলো-ভিটামিন বি১ বা থিয়ামিন, ভিটামিন বি১২ এবং নিয়াসিন। যেসব পরিবারের খাদ্যতালিকায় এসব ভিটামিন দীর্ঘদিন ধরে অনুপস্থিত থাকে তাদের পরিবারের সদস্যরা স্মৃতিশক্তি লোপজনিত সমস্যায় ভুগতে পারেন।

 

 

কারণ-৬ মস্তিষ্কে বিষক্রিয়া

যারা দীর্ঘদিন ধরে অ্যালকোহল সেবন করেন তাদের দেহে ভিটামিন বি১ বা থিয়ামিনের অভাব দেখা দেয়। ফলে স্মরণশক্তি হ্রাস পায়। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে অ্যালকোহল সেবন করলে মস্তিষ্কের কর্টেক্সের আকার হ্রাস পায়। ফলে স্মৃতিশক্তি লোপ পায়। অ্যালকোহল ছাড়াও যারা র্দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন রাসায়নিক কারখানায় কাজ করেন তাদের মস্তিষ্কে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ জমা হয়ে বিষক্রিয়র সৃষ্টি করতে পারে এবং স্মরণশক্তি হ্রাস পেতে পারে। যারা সিসার ফ্যাক্টরিতে কাজ করেন তাদের মস্তিষ্কে সিসা জমা হওয়ার ফলে স্মরণশক্তি লোপ পেতে পারে।

 

 

কারণ-৭ মস্তিষ্কে রোগজীবাণুর আক্রমণ

ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাক দ্বারা মস্তিষ্কে প্রদাহের সৃষ্টি হতে পারে। ফলে স্মরণশক্তি লোপ পেতে পারে। সিফিলিস হলে যদি সময়মতো চিকিৎসা না করা হয় তাহলে দুই থেকে তিন বছর পর মস্তিষ্ক আক্রান্ত হতে পারে। এটিকে বলা হয় ‘নিউরোসিফিলিস’। নিউরেসিফলিসে আক্রান্ত ব্যক্তির স্মৃতিশক্তি লোপ পেতে পারে। তাছাড়া এইডসে আক্রান্ত ব্যক্তিরাও স্মরণশক্তি লোপজনিত সমস্যায় ভুগতে পারেন।

 

 

কারণ-৮ মস্তিষ্কে অক্সিজেনের ঘাটতি

যেসব রোগ হলে মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ কমে যায়, সেসব রোগে স্মরণশক্তি লোপ পেতে পারে। হার্টফেইলর এরকম একটি রোগ। তাছাড়া ফুসফুস বিকল হয়ে গেলে কিংবা কার্বন মনোক্সাইড বিষক্রিয়ার ফলে মস্তিষ্কে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। ফলে এ থেকে স্মরণশক্তি লোপ পেতে পারে।

 

 

কারণ-৯ হরমোনের ঘাটতি

থাইরয়েড এবং প্যারাথাইরয়েড হরমোনের অভাবে স্মৃতিশক্তি লোপ পেতে পারে তাই হাইপোথাইরয়েডিজম বা থাইরয়েড হরমোনের স্বল্পজনিত রোগ এবং হাইপোপ্যারাথাইরয়েডিজম বা প্যারাথাইরয়েড হরমোনের স্বল্পতাজনিত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির স্মরণশক্তি হ্রাস পেতে পারে।

 

 

কারণ-১০ প্রিয়ন রোগ

প্রিয়ন রোগ মানুষসহ অন্যান্য প্রানীরও হয়ে থাকে। এরোগ হলে মস্তিষ্ক স্পঞ্জের মতো হয়ে যায় এবং মস্তিষ্কের নিউরনের সংখ্যা হ্রাস পায় মানুষ আক্রান্ত হয় এ রকম একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রিয়ন রোগের নাম হলো ক্রোজফেল্ট জ্যাকব রোগ।

বিশ্বব্যাপী রোগটির প্রাদুর্ভাব রয়েছে। প্রতি দশলাখে একজন লোক এই রোগে আক্রান্ত হয়। এরোগ হলে খুব দ্রুত স্তৃতিশক্তি হ্রাস পায়। এর কোনো চিকিৎসা নেই। আক্রান্ত ব্যক্তি সাধারণত ৪-৬ মাসের মধ্যে মৃত্যুমুখে পতিত হয়।

 

গণ সচেতনতায় ডিপিআরসি হসপিটাল লিমিটেড

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*