শীতের সবজি ও তার গুণাগুণ

শীতের সবজি

শীতে বাংলাদেশে হরেক রকম সবজির সমাগম হয় বাজারে। এসব সবজি যে সুধু সুস্বাদু তা-ই নয়, স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। কিন্তু আমাদের মধ্যে অনেকে এসব সবজি না খেয়ে মাছ ও গোশতের দিকে বেশি আকৃষ্ট হয়। অথচ অধিক লাল গোশত স্বাস্থ্যের জন্য যতটা ক্ষতিকর,সবজি ততটা ক্ষতি করে না, বরং নানা প্রকার রোগ প্রতিরোধ করে। প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে। আসুন জেনে নেই কোন সবজিতে কী উপকার।

লাউ

বিশেষজ্ঞরা বলেন, সবজির মধ্যে লাউ ও পেঁপের কোনো ক্ষতিকর দিক নেই। এ দুটো সবজি কাঁচা, রান্না, পাকা, ভাজা, ভর্তা, তরকারি যেভাবেই খাওয়া হোক কোনো ক্ষতি করে না, বরং উপকার করে। লাউকে অনেকে দুধের সাথে তুলনা করেন। অর্থাৎ দুধের মধ্যে যেসব উপাদান রয়েছে, লাউয়ের মধ্যে তার সবই আছে। লাউ এখন শীতের সবজি নয়, সারা বছরই পাওয়া যায়। লাউয়ের খোসা, বিচি, শাক, ডগা সবই খাদ্য এবং উপকারী।

উপকারিতা : লাউ ঠান্ডা ও মধুর রস। বল-বীর্য বর্ধক। কোষ্ঠ পরিষ্কারক। শরীর, মস্তিষ্ক ঠান্ডা রাখে। লাউয়ের বিচি দিয়ে ওষুধ তৈরি হয়। লাউ হার্টের জন্য উপকারী। পিত্ত ও কফনাশক। গর্ভবর্তী মায়ের জন্য হিতকার। কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। যক্ষ্মা রোগেও লাউ উপকারী। উচ্চ রক্তচাপের রোগীর জন্য ভালো। পিত্ত ও চর্মরোগে উপকারী। অজীর্ণ রোগের জন্য লাউ এক প্রকার ওষুধ । অর্শ রোগীর জন্য লাউ খুবই উপকারী। কচি লাউয়ের পায়েস রক্তপিত্তের জন্য ওষুধ। আসুন শীতের সবজি লাউ খাই।

বিট

গাঁও-গ্রামে বিট খুব কম লোকেই খায়। খেলেও রান্না করে তরকারি হিসেবে খায়, কিন্তিু এর উপকার পাওয়া যায় কাঁচা সালাদ করে খেলে। চাক্ চাক্ করে কেটে লবণ, গোলমরিচের গুঁড়া বা কাঁচামরিচের সাথে পাতি লেবুর রস দিয়ে সালাদ বানাতে হয়। বিটের কচি পাতা শাক হিসেবে খাওয়া যায়। তবে পাতাসহ বিট রান্না করলে বেশিউপকার মেলে। বিট খেলে পেট পরিষ্কার হয়। প্রস্রাব দূষণমুক্ত থাকে। বিট রক্ত পরিষ্কারক, বল-বীর্য বর্ধক ও রোগ প্রতিরোধক। বিট হজম করতে সময় লাগে। তাই যাদের হজমের গোলযোগ আছে তাদের বিট না খাওয়াই শ্রেয়। বেশি প্রোটিন, শর্করা, স্টার্চ, ভিটামিন ‘এ’,‘বি’ ও ‘সি’; লাইম, লোহা ও ফসফরাস আছে।

ফুলকপি:বাঁধাকপি:ওলকপি

শীতের আরেক আকর্ষনীয় সবজি হলো ফুলকপি, বাঁধাকপি ও ওলকপি। পাতাকপিকেই বাঁধাকপি বলা হয়। ওলকপিকে কোনো কোনো এলাকায় শালগম বলে। ফুলকপি মায়েদের স্তনে দুধ বাড়ায়, বীর্যবর্ধক, পিত্ত ও কফ নাশ করে। তবে ঘন ঘন খেলে বাত রোগীদের বাত ব্যথা বাড়তে পারে। বাঁধাকপি হার্টের জন্য ভালো। মূত্রবর্ধক। কিন্তু বাতকারক। পিত্তের প্রকোপ কমায়। লিভারের জন্য হিতকর। বাঁধাকপি প্রোটিন ও আমিষসমৃদ্ধ। ওলকপি বা শালগম সুস্বাদু।রসে মধুর। পেট পরিষ্কার করে। প্রস্রাব বাড়ায়। কফনাশক ও শ্বাসকষ্ঠরোধক। কাশিতে উপকারী। কৃমিনাশক এবং বল বীর্যবর্ধক। ওপরের তিন প্রকার কপিতেই প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও লোহা আছে। ভিটামিন ‘এ’,‘বি’ ও ‘সি’ রয়েছে। আছে পটাশিয়াম ও আয়োডিন।

শিম

শিম সম্পর্কে কেউ কেউ বলেন, এ্টা গরম এবং হজমে দেরি হয়। আবার কেই কেই হজম করতে পারে না বলে পেটের গোলমাল হয়। কিন্তু কবিরাজ বলেন, শিম রান্নার সময় যদি রসুন ফোড়ন দেয়া হয়, তাহলে কোনো অসুবিধা হয় না। হেকিমরা বলেন, শিম গরম নয় ঠান্ডা । শিশ বলদায়ক, বায়ু ও পিত্ত ঠান্ডা করে। তবে আয়ুর্বেদ মতে শিম গুপাক, কফ বদ্ধি করে। বাত ব্যথা হতে পারে। শুক্র উৎপাদন হ্রাস করে। তবে শিমের বিচিতে প্রচুর আমিষ রয়েছে। পুষ্টিবিদরা বলেন, শিম প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, ফসফরাস, সোডয়াম, পটাশিয়াম ও লোহা রয়েছে। কাজেই শিশ পুষ্টিকর।

গাজর

গাজর অত্যন্ত পুষ্টিসমৃদ্ধ সবজি। কাঁচা, রান্না ও সালাদ করে খাওয়া যায়। এটা নানা গুণে সমৃদ্ধ। গাজারের শাক মুলাশাকের মতো রান্না ও ভাজা খাওয়া চলে। গাজরের হালুয়া ও পায়েস রান্নাও সুস্বাদু। ক্ষিধে বাড়ায়। অর্শ, পেটের অসুখ ভালো করে। তবে গর্ভবতীরা অধিক গাজর খেলে গর্ভপাত হতে পারে। গাজর খেলে শক্তি বাড়ে। হার্টের জন্য ভালো। ক্ষয়রোগ ভালো করে। মস্তিষ্কের জন্য হিতকর। শিশুদের পুষ্টি ও বৃদ্ধির জন্য কাঁচা গাজর খাওয়ানো ভালো। প্রস্রাবে জ্বালা, গ্যাস্ট্রিক, আলসার ভালো হয়। গাজর খেলে রঙ ফর্সা হয়। এতে প্রচুর পরিমাণে ক্যারোটিন ও ফসফরাস আছে।

মুলা

মুলা একটি সস্তা সহজলভ্য শীতের সবজি। সস্তা বলে মুলা অনেকে হেলাফেলা করে খায় না। কিন্তু মুলার অনেক গুণ। মুলা দুই প্রকার যথা-সাদা ও লাল মুলা। কেউ কেউ বলে সাদা অপেক্ষা লাল মুলার পুষ্টিগুণ বেশি। কচি মুলার সালাদ ক্ষুধা বাড়ায়। মুলার মধ্যে জ্বর সারানোর গুণ রয়েছে। কারো প্লীহা বেড়ে গেলে মুলার তরকারি খেলে কমে যায়। মুলা হজমশক্তি বৃদ্ধি করে ও কাজে উৎসাহ বাড়ায়। শরীরে পুষ্টি বাড়ায়। অর্শরোগে মুলাশাক উপকারী। মুলা, শ্বাসরোগ, নাক ও গলার সমস্যা এবং চোখের সমস্যাদূর করে। বড় মুলার চেয়ে কচি মুলা বেশি উপকারী।

কবিরাজ বলে,মুলা রান্না করলে হজম করতে সময় লাগে এবং গরম হয়ে যায়। কাঁচা মুলা ঠান্ডা । তাই মুলার সালাদ খাওয়া ভালো। মুলা পেটের কৃমি বের করে দেয়। বাত সারে। মুলাশাক খেলে প্রস্রাব পরিষ্কার করে। কিডনি ও গলব্লাডার রোগে মূলা উপকারী। মুলা কোষ্টকাঠিন্য দূর করে। মুলাতে প্রোটিন, কার্বহাইড্রেট, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও লোহা আছে। এ চাড়া ভিটামিন ‘এ’, ‘সি’ ও পটাশিয়াম রয়েছে। হেকিম মতে, মুলা সেদ্ধ পানি খেলে কাশি সারে। মুলা অন্ত্রের জমাকৃত মল বরে করে দেয়।

বেগুন

বেগুন শীতের সবজি হলেও সারা বছর পাওয়া যায়। নানা জাতের বেগুন পাওয়া যায় বাজারে। সব বেগুনই নানা গুণে সমৃদ্ধ। বেগুনরান্না, ভর্তা ও পোড়া খাওয়া হয়। বেগুন অর্থ গুণহীন। কিন্তু এতে নানা গুণ আছ। বেগুন মূত্রকৃচ্ছ সারে। লিভার ভালো রাখে। জন্ডিসে উপকারী । কিডনিতে জমাকৃত ছোট ছোট পাথর থাকলে বেগুন খেলে তা প্রস্রাবের সাথে বেরিয়ে যায়। অর্শ রোগে বেগুন উপকারী। পুরুষত্ব ও বীর্য বর্ধক। পিত্ত প্রকোপ হ্রাস করে। মেদ কমায়। ক্ষুধা বাড়ায়। মেয়েদের মাসিক নিয়মিত হয়। এতে কার্বোহাইড্রেট, ফ্যাট,প্রোটিন, ভিটামিন ‘এ’,‘বি’ ও ‘সি’ লোহা আছে।

আরও পড়ুনঃ স্বাস্থ্য সুরক্ষায় জেনে নিন গোলমরিচ সম্পর্কে অজানা তথ্য

গণ সচেতনতায় ডিপিআরসি হসপিটাল লিমিটেড

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*