আমাদের পারস্পারিক যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হলো কণ্ঠ বা কথা বলা। আমরা কণ্ঠস্বর নিয়ে খুব বেশী সচেতন নই। এবং মারাত্মক কণ্ঠনালীর রোগ বা ক্যান্সারে আক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয় না। বিশ্ব কণ্ঠ দিবসের উদ্দেশ্য হচ্ছে কণ্ঠ ও কণ্ঠনালীর সমস্যা এবং সেই সাথে কীভাবে কণ্ঠকে সুস্থ রাখা যায় ও তার প্রতিকার সম্পর্কে জনগণকে জানানো। বিশ্ব কণ্ঠ দিবস এবছরের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে Educate Your Voice প্রতি বৎসর ১৬ই এপ্রিল বিশ্ব কণ্ঠ দিবস পালন করা হয়। ২০০৮ সাল থেকে বিগত সাত বৎসর ধরে বাংলাদেশে বিশ্ব কণ্ঠ দিবস উদযাপন করে আসছে। সমগ্র বিশ্বে ২০০২ সাল হতে বিশ্ব কণ্ঠ দিবস পালিত হচ্ছে।
ব্রাজিলে ১৯৯৯ সালের এপ্রিল মাসে প্রথম মানুষের কণ্ঠ ও কণ্ঠনালীর সমস্যা এবং নাক কান গলা রোগ বিষয়ে জনগণকে সচেতন করার জন্য জাতীয় কণ্ঠ সপ্তাহ পালিত হয়। অ্যামেরিকান ক্যান্সার সোসাইটির এক গবেষণায় দেখা যায় যে, ‘২০১২ সালে ১২৩৬০ জন কণ্ঠনালীর ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়, এরমধ্যে পুরুষ ৯৮৪০ এবং মহিলা ২৫২০ জন। অ্যামেরিকায় গত বছর কণ্ঠনালীর ক্যান্সারে আক্রান্ত ৩৬৫০ জন রোগী মারা যায়। অ্যামেরিকান ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডেফনস এন্ড কমিউনিকেশনের সূত্র মতে ৭.৫ মিলিয়ন সব বয়সের জনগণ কোনো না কোনো কণ্ঠস্বর জনিত সমস্যায় ভুগছে।
শব্দযন্ত্র দ্বারা কীভাবে কথা বলা যায়
আমাদের গলার সামনে গ্যারিংস বা শব্দ যন্ত্র অবস্থিত। ল্যারিংস বা শব্দ যন্ত্রে দু’টি ভোকাল কর্ড থাকে। এই কর্ড দু’টির কম্পনের মাধ্যমে শব্দ তৈরি হয়। শ্বাস-প্রশ্বাসের সময় ফুসফুস থেকে প্রবাহিত বাতাস ভোকাল কর্ডে কম্পনের সৃষ্টি করে। কথা বলা বা গান গাওয়ার সময় এই পরিমাণ প্রতি সেকেন্ডে ১০০ থেকে ১০০০ বার। একজন বয়স্ক মানুষের দিনে এক মিলিয়ন বার ভোকাল কর্ড দু’টির সংস্পর্শ হয়। অতএব চিন্তা করুন ভোকাল কর্ডের উপর আমরা কতটুকু নির্ভরশীল – কাজে, গৃহে ও সব সময় সবখানে। তাই কণ্ঠকে সুস্থ স্বাভাবিক রাখা খুবই দরকার। কণ্ঠনালীর সমস্যার কারণ সমূহ: কণ্ঠনালীর সমস্যার জন্য উপসর্গ হল, গলা ব্যাথা, কণ্ঠস্বর পরিবর্তন, কাশি, কিছু গিলতে অসুবিধা, শ্বাসকণ্ঠ ইত্যাদি। যদি ঘন ঘন কণ্ঠস্বর পরিবর্তণ হয় বা দীর্ঘ দিন বা দুই সপ্তাহে ভাল না হয়, তবে নাক, কান ও গলা বিশেষজ্ঞ দেখাতে হবে। বিভিন্ন কারণে কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন হতে পারে। কণ্ঠস্বর বা কণ্ঠনালীর বিভিন্ন সমস্যা নিম্নে আলোচনা করা হলোঃ
কণ্ঠনালীর প্রদাহ
কণ্ঠনালীর প্রদাহ দু’ধরনের যেমন, তীব্র ও দীর্ঘ মেয়াদী ল্যারিনজাইটিস। কণ্ঠস্বর পরিবর্তনের প্রধান কারণ হলো কণ্ঠনালীর ভাইরাস জনিত তীব্র প্রদাহ। শ্বাসনালীর ভাইরাস প্রদাহে কণ্ঠনালী ফুলে যায় যাতে কণ্ঠনালীর কম্পনের সমস্যা সৃষ্টি করে, ফলে স্বর পরিবর্তন হয়। আবহাওয়া পরিবর্তন, পরিবেশ দূষণের কারণেও কণ্ঠনালীর প্রদাহ বা ল্যারিনজাইটিস হতে পারে। প্রচুর পরিমাণ পানি পান করলে এবং কণ্ঠনালীকে বিশ্রাম দিলে ইহা ভাল হয়ে যায়। তীব্র প্রদাহ অবস্থায় যদি কেউ জোরে কথা বলে তা কণ্ঠনালীর উপর চাপ সৃষ্টি করে। যেহেতু তীব্র কণ্ঠনালীর প্রদাহ ভাইরাস জনিত রোগ তাই এরোগটিতে এন্টিবায়োটিক খাওয়া কোনো প্রয়োজন নেই।
যদি ব্যাকটেরিয়া জনিত কণ্ঠনালীর ইনফেকশন হয় এবং এর সাথে শ্বাস কষ্ট হয় তখন বিশেষ চিকিৎসা দরকার এবং পূর্ণমাত্রায় সঠিক এন্টিবায়োটিক লাগে। তীব্র কণ্ঠনালীর ভাইরাস জনিত প্রদাহ ঠিকমতো চিকিৎসা না করা হলে, দীর্ঘ মেয়াদী ল্যারিনজাইটিস হতে পারে। পাকস্থলীর এসিড রিফ্লাক্সের জন্য দীর্ঘ মেয়াদী কণ্ঠনালীর প্রদাহ হতে পারে। ধুমপান, অতিরিক্ত গরম চা বা পানীয় পান করলে, হাঁপানীর জন্য ইনহেলার ব্যবহার বা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম তাদের দীর্ঘ মেয়াদী ল্যারিনজাইটিস হতে পারে।
কণ্ঠস্বরের অতি ব্যবহার
আমরা যখন কথা বলি, কণ্ঠনালীর সাথে আশে পাশে অবস্থিত মাংসপেশীরও সাহায্য লাগে। কণ্ঠনালীকে সঠিক ও নিয়মের বাইরে ব্যবহার করা যেমন, অতি উচ্চস্বরে অতিরিক্ত কথা বলা, দীর্ঘ মেয়াদী বা পরিবর্তিত স্বরে কথা বললে কণ্ঠনালীর প্রদাহ দেখা দিতে পারে। যা ভারী জিনিসকে ঠিকভাবে না উঠানোর জন্য পিঠে ব্যথা হওয়ার সমতুল্য। গলা ও শব্দযন্ত্রের মাংস পেশীর সংকোচন এবং কথা বলার সময় ঠিকভাবে শ্বাস না নিয়ে শ্বাসযন্ত্রের অবসাদ হয়, কথা বলতে কষ্ট হয় এবং ফলশ্রুতিতে কণ্ঠস্বর পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে এবং ভোকাল কর্ডে পলিপ বা নডিউল এমনকি রক্ত ক্ষরণও হতে পারে।
medicalbd সাস্থের সকল খবর।

