
শ্রবণশক্তি হারানো হিয়ারিং এইড বা কানে শোনার যন্ত্র ব্যবহার
মি. মাইকেল বয়স ৬০ বছর, হঠাৎ তার শ্রবণশক্তি লোপ পাওয়ায় আমাদের কাছে আসেন। আমরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখি তিনি ভাইরাসজনিত কারণে দুই কানে শতকরা ৬০ ডেসিবল শ্রবণশক্তি হরিয়েছেন। তাকে আমরা কানে হিয়ারিং এইড ব্যবহারের পরামর্শ দিই। তিনি হিয়ারিং এইড ব্যবহার করে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারেন এবং দৈনন্দিন কাজকর্ম করতে পারেন। হিয়ারিং এইড ব্যবহারে লজ্জার কিছু নেই। আমরা চোখে যেমন চশমা ব্যবহার করি, সে রকম কানে কম শোনার চিকিৎসা হলো হিয়ারিং ব্যবহার করা।
শ্রবণশক্তি হারানো
আমাদের সামাাজিক পারিপার্শিক ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে শ্রবণশক্তি অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রতিদিন ঘরে বাইরে আমাদের অনেক মানুষের সম্মুখীণ হতে হয়, এর মধ্যে কম মানুষ শ্রবণ সুরক্ষাকারী যন্ত্র পরে অথবা শ্রবণ বিশেষজ্ঞের কাছে যায়। শ্রবণ শক্তি হারানো যেকোনো বয়সইে হতে পারে। বয়স বাড়লে আমাদের শরীরবৃত্তীয় অনেক কিছু পরিবর্তন হয়, তার মধ্যে শ্রবণশক্তি অন্যতম। শ্রবণশক্তি হারানো মানে শুধু উচ্চ শব্দ শুনতে না পারা নয়। এর অর্থ হলো যেকোনো কিছু বোঝা এবং বিভিন্ন কথার শ্রবণশক্তি হারানো চিকিৎসা না করা হয় অথবা দেরি হয় তাহলে শিশুদের কোনো কিছু জানার ক্ষমতা, ভাষায় দক্ষতা কমে যায়। শ্রবণশক্তি হারানো মানুষকে বিচ্ছিন্ন, দুর্বল, একাকিত্ব করে দিতে পারে। কানে শোনার ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে ভাব প্রকাশ করার ক্ষমতা কমে যেতে থাকে এবং সাথে বুদ্ধি ও মানসিক ত্রুটি দেখা যায়, যা শিশুদের স্কুলে অথবা যেকোনো বয়সের মানুষের কর্মস্থল ও সামাজিক কার্যকলাপের সমস্যার সম্মুখীণ হতে হয়। শ্রবণশক্তি হারানো মানুষের জীবনে অনেক প্রভাব বিস্তার করে।
শ্রবণশক্তি হারানোর করণ গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলো হলো-
০১. বয়োঃপ্রাপ্তি
০২. ব্যাকটেরিয়া অথবা ভাইরাস সংক্রমণ
০৩. দীর্ঘ দিন উচ্চ শব্দে থাকা
০৪. কানে ময়লা জমা হয়ে কান বন্ধ হয়ে যাওয়া
০৫. কানে ফাঙ্গাল ইনফেকশন
অন্যান্য
জন্মগত ত্রুটি
কানে আঘাত
বংশগত কারণ
কানে ক্ষতিকর কিছু ওষুধ
কানের ব্লাড ব্রেনের টিউমার
অন্যান্য আরও কারণ
কখন উচ্চশব্দ আমাদের জন্য ক্ষতিকর
কখন শব্দ উচ্চ শব্দ হিসেবে প্রতিপন্ন হয় তা নির্ভর করে একেক জনের শ্রবণশক্তির ওপর ভিত্তি করে। যখন শব্দ অস্বচ্ছন্দ হয় বা কানে বিরক্ত লাগ, তখনই আপনি এর প্রতিক্রিয়া করবেন। আপনার কানে শোনার ক্ষমতা বলে দেবে কখন শব্দ আপনার জন্য ক্ষতিকর। এটাই আমাদের মানবদেহের সতর্কীকরণ পদ্ধতি।
শব্দ শোনার ক্ষমতাকে প্রতিরক্ষা
উচ্চ শব্দের উৎস থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হবে।
কানে প্লাগ ব্যবহার করা
যেখানে শব্দের সীমা অনেক বেশি যেমন কোনো গানের অনুষ্ঠানে, কনসার্ট সেখানে কানের প্লাগ ব্যবহার করা উচিত।
শ্রবণশক্তি হারানোর প্রকারভেদ
বহিঃকর্ণ থেকে অন্তঃকর্ণের শব্দ কমে যায় কনডাকটিভ বধিকার জন্য সাধারণত মেডিসিন অথবা সার্জারির চিকিৎসার মাধ্যমে কনডাকটিভ বধির লোকেরা উপকৃত হয়। যদি সার্জারি করা সম্ভব না হয় সেখানে হিয়ারিং এইডের (Hearing Aid) মাধ্যমে উপকৃত হতে পারে। অন্তঃকর্ণের সেনসরি কোষ ও নার্ভ ফাইবার ক্ষতির কারণে সেনসরি নিউসারি নিউরার শ্রবণশক্তি হারায়। অন্যদিকে কর্ধ্যকর্ণ ইয়ার কেনেল ও বহিঃকর্ণের ক্ষতির কারণের কনডাকটিভ শ্রবণশক্তি হারায়। মেডিসিন ও সার্জারিতে এ ধরণের শ্রবণশক্তি চিকিৎসা করা যায় না। হিয়ারিং এইড এখানে কার্যকারী। ওপরের দুই ধরণের শ্রবণশক্তি হারানো মানে মিশ্র শ্রবণশক্তি হারানো।
কী ধরণের হিয়ারিং এইড পাওয়া যায়, সাধারণত প্রকারগুলো হলো:
কানের পেছনে (বিটিই): এগুলো ব্যবহারকারীর কানের পেছনে দেয়া হয় এবং ইয়ার মোল্ডের সাথে প্লাস্টিক দ্বারা সংযোগ করা হয় এবং ইয়ার মোল্ডের সাথে প্লাস্টিক দ্বারা সংযোগ করা হয়। সম্পূর্ণ শ্রবণশক্তি হারানো লোকদের জন্য বিটিই ব্যবহার করা।
কর্ণের ক্যানেলের ভেতরে (আইটিই): এ ধরণের মডেলগুলো ইয়ার মোল্ডের ভেতর ইলেকট্রনিক্যালি তৈরি একটা নির্দিষ্ট সাইজ দরকার।
স্মপূর্ণভাবে কানের ভেতর (সিআইই): এগুলোর সবচেয়ে ছোট ও সর্বশেষ হিয়ারিং এইড কানের ক্যানেলের ভেতর কানের পর্দার কাছে স্থাপন করা হয়। যেসব রোগী হিয়ারিং এইড দেখাতে চান না, তখন সিআইসি হিয়ারিং এইড কসমেটিক হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। সিআইসি হিয়ারিং এইডেসর মূল্য খুব বেশি এবং এটা বাহির থেকে দেখা যায় না। এগুলো সাধারণ থেকে মাঝামাঝি শ্রবণশক্তি হারানোনর জন্য ব্যবহৃত করা হয়।
বডি ওর্ন হিয়ারিং এইড: এই হিয়ারিং এইডগুলো মাইক্রোফোনের এমপ্লিফায়ার একটা কর্ডবিশিষ্ট রিসিভার এবঙ ইয়ার মোল্ড এই হিয়ারিং এইডগুলো সম্পূর্ণ শ্রবণশক্তি হারানোর জন্য ব্যবহার করা হয় অথবা অন্যান্য হিয়ারিং এইড যদি কেউ ব্যবহার করতে না পারে তাহলে এই হিয়ারিং এইড ব্যবহার করা হয়।
হিয়ারিং এইড বলতে কী বোঝায়?
হিয়ারিং এইডের সংজ্ঞা হলো এখানে একটা মিনি মাইক্রোফোনসহ একটা লাউড স্পিকার থাকবে এবং একটা রিসিভার থাকবে। এটার কাজ হলো আমাদের কানে শব্দ এনটিনসিফাই এবং এমপ্লিফাই করা। মাইক্রোফোনের কাজ হলো শব্দতরঙ্ককে ইলেকট্রনিক সিগন্যালে পরিণত করা। এমপ্লিফিটারের কাজ হলো এই ইলেকট্রনিক সিগন্যালকে এমপ্লিফাই করা। এই এমপ্লিফাই ভলিভল কন্ট্রোল দিয়ে কন্ট্রোল করা যায়। রিসিভার এমপ্লিফাইড ইলেকট্রনিক্স সিগন্যালকে শব্দে রূপান্তিরিত করে। ইয়ার মোল্ড কানের ভেতরে থাকে আর এটা এমন ভাবে ব্যবহারকারীর কানে প্রতিস্থাপন করা হয় যাদে শব্দ ঠিকমতো কানে পৌঁছে।
কখন হিয়ারিং এইড দরকার?
যদি কারো প্রতিদিন সংযোগ রক্ষা করা অথবা সমস্যা হয় তখন হিয়ারিং এইড দরকার হয়। অনেক সময় ভূক্তভোগীরা বুঝতে পারে না তার শ্রবণ এইড দরকার। পরিবারের লোকেরা এবং সহকর্মীরা তার সাথে সংযোগ রক্ষা করতে পারে না। যদি আপনি অথবা আপনার কাছের লোক মনে করে আপনার শ্রবণশক্তি কমে গেছে, তাহলে আপনি একজন নাক-কান, গলা বিশেষজ্ঞ দিয়ে পরীক্ষা করে নেবেন।
কী ধরনের এইড চেনা দরকার?
কী ধরণের শ্রবণশক্তি হারিয়েছে তার ওপর নির্ভর করে শ্রবণ এইড কিনতে হয়। সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো কী ধরণের যোগাযোগ রক্ষা করা রোগীর দরকার। একজনের একটা অথবা দুটো হিয়ারিং এইড ব্যবহার করা দরকার হতে পারে।
মস্তিষ্কের সাথে দুই কানেরই যোগাযোগ:
অ্যাকাডেমিক লিটারেচারের সাপোর্ট করে দুই কানের এমপ্লিফিকেশন যখন আপনি দুই কানে হিয়ারিং এইড ব্যবহার করবেন।
০১. তখন আপনা কম পাওয়ার লাগবে।
০২. রোগী ভালো বুঝতে পারবেন বিশেষ করে উচ্চ শব্দের সময়।
০৩. হিয়ারিং এইড ব্যবহারকারী ভালো পারসেপশন পাবেন।
০৪. আপনি নিরাপদ থাকবেন কারণ আপনি বুঝতে পারবেন কোথা থেকে শব্দ আসছে।
০৫. আপনি ভালো শব্দের গুণাগুণ পাবেন। চূড়ান্তভাবে বলতে হয় আপনার কতটা এবং কী টাইপের শ্রবণক্ষমতা হারিয়েছে এবং কী ধরণের সংযোগ করা দরকার।
হিয়ারিং এই কি সাধারণ শ্রবণশক্তি ফিরিয়ে দেয়?
না হিয়ারিং এইড সাধারণ শ্রবণশক্তি ফেরাতে পারে না এবং সবধরণের শ্রবণ বিশেষ করে শব্দের ব্যাকগ্রাউন্ড এবং দূরের ক্ষেত্রে হিয়ারিং এই হলো একটা কমপেনসেশন।
হিয়ারিং এইড লাগানোর পরে ফলোআপ দরকার আছে কি না অথবা দরকার থাকলে কত দিন পরপর দরকার?
হ্যাঁ, ফলোআপের দরকার আছে। কারণ শ্রবণ পরিবর্তন হতে পারে এবং শ্রবণক্ষমতা কম-বেশি হতে পারে, এগুলো যত তাড়াতাড়ি সম্ভব করতে হবে যাতে শ্রবণশক্তি হারানো প্রতিরোধ করা যায়। যখন আপনি হিয়ারিং এইড নেবেন আপনাকে একটা পুর্নমূল্যায়ণ করতে হবে নিয়মিতভাবে। আপনার হিয়ারিং এই ও পরীক্ষা করতে হবে। আপনার এই চেকআপ প্রতি বছর করতে হবে। আপনার শ্রবণ বিশেজ্ঞ অথবা ডাক্তারের পরামর্শ অনুসারে।
medicalbd সাস্থের সকল খবর।
