রক্তচাপ হচ্ছে রক্তনালীর উপরে রক্তের প্রদেয় চাপ। স্বভাবিক ভাবে সমস্ত দিনে বিভিন্ন সময়ে রক্তচাপ বাড়তে বা কমতে পারে। যখন এই রক্তচাপ দীর্ঘ সময় ধরে একই ভাবে বৃদ্ধি পেয়ে থাকে তখন এই রক্তচাপকে উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন বলে। সকল বয়সের লোকরেই এই উচ্চ রক্তচাপ হতে পারে। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ লোকই জানে না যে তাদের উচ্চ রক্তচাপ আছে। দৈনন্দিন জীবন যাপনের অথবা প্রয়োজন ভেদে ঔষদের মাধ্যমে উচ্চ রক্ত চাপ প্রতিরোধ অথবা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। রক্ত চাপ সাধারণতঃ দুইটি পরিমাপের মাধ্যমে প্রকাশ বা লিপিবদ্ধ করা হয়। প্রথম এবং উপরের পরিমাপকে সিস্টোলিক (Systolic) এবং শেষ বা নীচের পরিমাপ ডায়স্টলিক (Diastolic) ব্লাড প্রেসার বলা হয়।
পূর্ণ বয়স্কদের ক্ষেত্রে সিস্টোলিক রক্তচাপ ১৪০ মিমি মার্কারী অথবা এর উপরে অথবা ডায়াস্টলিক রক্তচাপ ৯০ মিমি মার্কারী অথবা এর উপরে হলে উচ্চ রক্তচাপ ধরা হয়ে থাকে। সিষ্টোলিক রক্তচাপ ১২০ মিমি মার্করী এর কম এবং ডায়াস্টলিক রক্তচাপ ৮০ মিমি মার্কারীর কম রাখাটা কাম্য সিস্টোলিক রক্তচাপ ১২০-১৩৯ মিমি মার্কারী অথবা ডায়াস্টলিক রক্তচাপ ৮০-৯০ মিমি মার্কারী হলে,এই গ্রুপের রুগীদের ভবিষ্যতে উচ্চ রক্তচাপ হওয়া সম্ভাবনা বেশী।
যদিও সিস্টোলিক এবং ডায়স্টলিক রক্তচাপ দুটি ভিন্ন জাতের রক্তচাপ তথাপিও যে কোন একটির বৃদ্বিকে উচ্চ রক্ত চাপ বলা হয়। যেমন কোন ব্যক্তির সিস্টোলিক রক্তচাপ স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেশি হলেও তাকে উচ্চ রক্তচাপ বলা হয়। এক্ষেত্রে একে সিস্টেলিক উচ্চ রক্তচাপ বলা হয়। উচ্চ রক্তচাপ রোগী নির্ণয়ের পুর্বে বিভিন্ন সময়ে কমপক্ষে দুই বা ততোধিকবার উচ্চ রক্তচাপ পাওয়া বাঞ্চণীয়।
উচ্চ রক্ত চাপ প্রকারভেদ:
ক) এসেশিয়াল হাইপারটেনশন (Essential hypertension): শতকরা প্রায় ৯৫ ভাগ রোগীর উচ্চ রক্তচাপের কোন কারণ খুজে পাওয়া যায় না। এই ধরণের উচ্চ রক্তচাপকে এসেনশিয়াল হাইপারটেনশন বলে।
খ) সেকেন্ডারী হাইপারটেনশণ (Secondary hypertension): কিছু ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপের সুনির্দিষ্ট কারণ খুজে পায় যায়। এই জাতীয় উচ্চ রক্তচাপকে সেকেন্ডারী হাইপারটেনশন বলে। এই জাতীয় উচ্চ রক্তচাপ কিডনী রোগ, জন্মগত ত্রুটি অথবা অন্যান্য কারণে হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এই জাতীয় রক্তচাপের সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা সম্ভব।
রক্তচাপ পরিমাপ:
রক্তচাপ সাধারণত, রক্তচাপ মাপার যন্ত্র (Sphygmomanometer) এর মাধ্যমে মাপা হয়। এই যন্ত্র রক্তচাপকে মিমি মার্কারী (mm of Hg) হিসাবে প্রকাশ করে। বিভিন্ন প্রকার যন্ত্রের সাহায্যে রক্তচাপ যেমন-মার্কারী, অ্যানরয়েড, ডিজিটাল।
সঠিকভাবে রক্তচাপ পরিমাপের জন্য নিন্মলিখিত বিষয়গুলো খেয়াল রাখা প্রয়োজন :
✪ সঠিক যন্ত্র ব্যবহার করতে হবে।
✪ বসে বা শুয়ে রক্তচাপ মাপতে হবে। বৃদ্ধ, ডায়াবেটিক রোগী এবং যাদের (Posturalhypotension) আছে বলে মনে হয় তাদের ক্ষেত্রে দাঁড়ানো অবস্থাতেও রক্ত চাপ মাপতে হবে।
✪ বাহু থেকে শক্তভাবে এটে থাকা কাপড় সরাতে হবে
✪ বাহুকে হার্টের সমান সমতলে রাখতে হবে।
✪ যথাযথ মাপার কাফ (Cuff) ব্যবহার করতে হবে। রক্ত চাপ মাপার যন্ত্রের ব্লাডার, বাহুর দুই তৃতীয়াংশের বেশি জায়গা জড়িয়ে থাকতে হবে।
উচ্চ রক্তচাপের উপসর্গগুলি কি?
উচ্চ রক্ত চাপকে অনেক সময়ে “নিরব ঘাতক” বলা হয়, কারণ বেশিরভাগ সময় তেমন কোনো উপসর্গই থাকে না। তাই অনেকে মনে করে তার কোনো উচ্চ রক্ত চাপ সমস্যা নেই। তাই নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করার মাধ্যমেই এই রোগ নির্ণীত হয়ে থাকে।
ল্যাবরেটরী পরীক্ষাঃ
উচ্চ রক্তচাপ নির্ণয়ের জন্য কোনো ল্যাবরেটরী পরীক্ষার প্রয়োজন নেই। সেকেন্ডারী হাইপারটেনশন সন্দেহ হলে ল্যাবরেটরী পরীক্ষা করতে হবে। তাছাড়া উচ্চ রক্তচাপের কারণে শরীরে কোনো ক্ষতি হয়েছে কিনা তা নির্ণয়ের জন্য নিম্নলিখিত পরীক্ষগুলো করা যেতে পারেঃ
১. প্রস্রাবের রুটিন পরীক্ষা
২. রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ
৩. রক্তে ক্রিয়াটেনিন মাত্রা
৪. রক্তে কোলেস্টেরল মাত্রা
৫. বুকের এক্স-রে
৬. ইসিজি (ইলেকট্রোকর্ডিওগ্রাম)
এছাড়া কিছু ক্ষেত্রে অন্যান্য পরীক্ষা নিরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে।
উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসা:
উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসা প্রধানত দুই প্রকার :
১. জীবন শৈলীর পরিবর্তনের মাধ্যমে
২. ঔষধের মাধ্যমে
জীবন যাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপ চিকিৎসার সাফল্য সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। এজন্য ঔষধ লাগুক কিংবা না লাগুক, সকল উচ্চ রক্তচাপ রোগীর জীবনযাত্রার পরিবর্তন প্রয়োজনীয়। এই বিষয়ে নিচের ছকটি দেখুন।
উচ্চ রক্ত চাপ ব্যবস্থাপনায় জীবন যাত্রার মানের পরিবর্তনের কার্যকর পদ্ধতি সমূহ :
| পরিবর্তন | নির্ধারিত মাত্রা |
| ওজন কমানো | শারীরিক স্বভাবিক ওজন বজায় রাখা ১৮.৫-২৪.৯( কেজি/মিটার) |
| স্বাস্থ্য সম্মত খাবারের অভ্যস্ত হওয়া | তাজা ফলমুল, শাকসবজি বেশী খাওয়া এবং চর্বি জাতীয় খাবার কম খাওয়া |
| খাবারের লবণ কমানো | খাওয়ার লবন কম করে খেতে হবে। প্রতিদিন ৫ গ্রাম এর কম লবণ খেতে হবে। পাতে লবণ পরিহার করতে হবে। |
| শারীরিক পরিশ্রম | নিয়মিত কায়িক পরিশ্রম বা ব্যায়াম করতে হবে। যেমন- দৌড়ানো, হাটা সাতার কাটা ইত্যাদি। দৈনিক কমপক্ষে ৩০ মিনিট করে সপ্তাহে পাঁটদিন হাটলেই যথেষ্ট। |
| ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য পরিহার | বিড়ি, সিগারেট, জর্দা, সাদাপাতা,গুল, ইত্যাদি সকল প্রকার দ্রব্য পরিহার করা। |
| মদ্যপান পরিত্যাগ করা | মদ্যপান পরিত্যাগ করতে হবে। অপরাগতার ক্ষেত্রে প্রতিদিন দুইবার পান করে ১ আউন্স অথবা ৩০মি.লি. ইথানল অর্থাৎ ২৪ আউন্স বিয়ার, ৩ আউন্স হুইস্কি ইত্যাদির কম খেতে হবে। |
প্রাইমারি কেয়ার স্তরে উচ্চ রক্তচাপ নির্ণয় ও রেফারেলের প্রবাহ চিত্র চিকিৎসা সহকারী ও কমিনিউটি হেলথ কেয়ার প্রভাইডার (সি,এইচ,সি,পি) এর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য
| কমিউনিটি ক্লিনিক/ইউনিয়ন সাব সেন্টারে আগত প্রত্যেক প্রাপ্ত বয়স্ক সেবা গ্রহণকারীর রক্তচাপ পরিমাপ করে রেজিস্ট্রারে লিপি বদ্ধ করুন। |
| রক্তচাপ : ১৪০ সিস্টোলিক এবং ৯০ ডায়স্টলিক | রক্তচাপ : ১৪০এবং ১৬০ সিস্টোলিক অথবা ৯০ এবং ১০০ | রক্তচাপ : ১৬০এবং ১৮০ সিস্টোলিক অথবা ১০০ এবং ১১০ ডায়াস্টলিক | রক্তচাপ : ১৮০ সিস্টোলিক এবং ১১০ ডায়স্টলিক |
| ১. রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখার জন্য জীবন শৈলী সম্পর্কে বলুন ২. চল্লিশ (৪০) উর্দ্ধো বয়সের ব্যক্তির জন্য ১২ মাস পর রক্তচাপ পরিমাপের জন্য আসতে বলুন | ১. রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখার জন্য জীবন শৈলী সম্পর্কে বলুন ২. এক (১) মাস পর রক্তচাপ পরিমাপের জন্য আসতে বলুন | জরুরী ভিত্তিতে চিতিৎসকের পরামর্শ গ্রহন করার জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স/ হাসপাতালে পাঠান । |
| এক(১) মাস পর এর রক্তচাপ : ১৪০ সিস্টোলিক এবং ৯০ ডায়স্টলিক | এক(১) মাস পর এর রক্তচাপ : ১৪০ সিস্টোলিক অথবা ৯০ ডায়স্টলিক | ১. রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখার জন্য জীবন শৈলী সম্পর্কে বলুন ২. চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহন করার জন্য ইউনিয়ন সাব সেন্টার / উজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স/হাসপাতালে পাঠন। |
| উচ্চ রক্তচাপে ঔষধ গ্রহনকারীদের নিয়মিত রক্তচাপ পরিমাপ করুন এবং রেজিস্ট্রারে লিপি করুন। |
উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ঔষদসমূহ :
উচ্চ রক্তচাপ চিকিৎসায় বিভিন্ন ধরনের ঔধষ ব্যবহতৃ হয়ে থাকে। প্রায়শই একর অধিক ঔষধ প্রয়োজন হয়ে থাকে। ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্র অনুসারেই এই ঔষধ নিয়মিত সেবন করা উচিৎ।
প্রথম সারির ব্যবহৃত ঔষধসমূহ :
(ক) ডাইইউরেটিক্স (Diuretics): এটা কিডনীর উপর কাজ করে শরীরের অতিরিক্ত পানি এবং লভণ নিস্কাশন করে উচ্চ রক্তচাপ কমায়। ফ্রুসেমাইড (Frusemide) থায়াজাইড, স্পাইরোনোলেকটোন, ইনডেপামাইড ইত্যাদি একক ভাবে অথবা অন্য ওষুধের সঙ্গে ব্যবহার করা যেতে পারে।
(খ) বিটা ব্লকার (Betablockers): ইহা হাটের স্পন্দন কমায় যেমন- প্রোপানোলল, এটিমোলাল, কার্ভিডিলোন ইত্যাদি। হাঁপানি, (COPD) এবং হার্ট ফেইলিওর রুগীর এই ঐষধ ব্যবহার করা উচিত নয়।
(গ) এনজিওটেনসিন-কনভারটিং এনজাইম ইনহিবিটর (ACE inhibitor): এ ঔষধ সমূহ অত্যন্ত কার্যকর। রেমিপ্রিল, লিসিনোপ্রিল, ক্যঅপটোপ্রিল, ইনালোপ্রিল, ইনালাপ্রিল, বেনাজাপ্রিল, মেনিটোপ্রিল ইত্যাদি গর্ভবস্থায় এই ওষুধ দেয়া যাবে না।
(ঘ) এনজিওওটেনসিন রিসেপটর ব্ল কার (ARB): এই ওষুধ সমূহ অত্যন্ত কার্যকর ও নিরাপদ লোসারটন, ভালসারটান, কেন্ডেসারট ান ইত্যাদি। গর্ভবস্থায় এই ওষুধ সমূহ নিষিদ্ধ।
(ঙ) ক্যালসিয়াম চ্যানেল ব্লকারস (Calcium channel blocker): রক্তনালী প্রসারণের মাধ্যমে এই ওষুধগুলো রক্তচাপ কমায়। যেমন- নিফিডিপন, এমলোডিপিন, ভেরাপমিল ইত্যাদি হার্টফেইলিওর রূগীকে এই সাবধানে ব্যবহার করা উচিত।
উচ্চ রক্তচাপের ফলাফল :
অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ ব্রেইন ষ্ট্রোক, ইস্কোমিক হার্টডিজিজ, হার্ট এটাক, হার্ট ফেইলিওর, কিডনী রোগ, কিডনী ফেইলিওর, অন্ধত্ব ইত্যাদি রোগের ঝুঁকি বহুলাংশে বৃদ্ধি করে। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করলে উপরোক্ত রোগসমূহ হওয়ার হার এবং মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। উচ্চ রক্তচাপ চিকিৎসার ফলাফল জাতি, ধর্ম, গোষ্টি, বয়স নির্বিশেষে অত্যন্ত কার্যকর।
| অনেক রক্তচাপ নিয়ন্ত্রন (Normal) হয়ে গেলে ঔষধ ছেড়েদেন যার ফলে কিছুদিন পর আবার রক্তচাপ বেড়ে যায়। কাজেই উচ্চ রক্তচাপ একবার ধরা পড়লে, এর উপসর্গ এবং ক্ষতি থেকে বাঁচতে হলে মাঝে মাঝে রক্তচাপ পরীক্ষা করিয়ে নিয়মতি ঔষধ সেবন করতে হবে। একমাত্র ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ঔষধ পরিবর্তন অথবা বন্ধ করা যাবেনা। |
medicalbd সাস্থের সকল খবর।

