প্রতিবন্ধীদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা

প্রতিবন্ধীদের স্বাস্থ্য

“যার দু’টি চক্ষু নেই তার মতো দুঃখী নেই।” চলতে-ফিরতে পথঘাটে প্রায়ই আমরা শুনি অন্ধ মানুষের এই আকুতি । এই দৃশ্যও প্রতিনিয়ত দেখি যে, গলায় ভিক্ষার ঝুলি লটকে হাত-পা নেই এমন শারীরিক প্রতিবন্ধীদের কাকুতি-মিনতি করে বলছে-সাহেব, আমার খাবারের জন্য দু’টি টাকা দিন, আমার কেউ নেই। মর্মবিদারী আহাজারি শুনে অনেকেই কষ্ট পান, পারলে সাহায্য করেন আবার কেউ অবহেলাও করেন। অনেকের ঘরে এটাও দেখা যায় যে, ফুটফুটে সুন্দর একটি শিশু ঘোরাফেরা করছে, কিন্তু কথা বলতে পারছে না অথবা আচরণে অস্বাভাবিকতা। পিতামাতা এদেরকে লোকচক্ষুর অন্তরালে রাখতে চান, পিতামাতার চোখের করুণ চাহনি দেখে বুঝা যায়, তার সন্তানটি মানসিক অথবা বাকপ্রতিন্ধী। হৃদয় দিয়ে অনুভব করলে এসব প্রতিবন্ধী মানুষের দুঃখ বোঝা যাবে। প্রতিবন্ধীদের দয়া ও আন্তরিকতা দিয়ে ভালোবাসলে মহান সৃষ্টিকর্তা খুশি হবেন নিশ্চই। এই মহিমায় পালিত হোক এবারের প্রতিবন্ধী দিবস।

৩ ডিসেম্বর পালিত হল বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস। এই দিবসের প্রতিপাদ্য হলো-Transformation towards sustainable and resilient society for all. অর্থাৎ সকলের জন্য টেকসই এবং স্থিতিশীল সমাজের রূপান্তর। এটি নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার এই উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই।

WHO (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার) মতে, বিশ্বের অনুন্নত দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও বিবিধ কারণে প্রতিবন্ধীর সংখ্যা দিন দনি বেড়েই চলেছে। এসব প্রতিবন্ধীর বড় অংশই হচ্ছে শারীরিক এবং যথেষ্ট পরিমাণ বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীও রয়েছে। এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নয়। পৃথিবীর দরবারে নিজেদের উন্নত দেশ ও জাতি হিসেবে তুলে ধরতে হলে এসব প্রতিবন্ধীকে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

প্রতিবন্ধী কারা ?

বুদ্ধির দিক থেকে পিছিয়ে থাকা ছেলেমেয়ে যাদের মানসিক গঠন, বিকাশ ও সামাজিক বোধ প্রভৃতি বয়সের চেয়ে কম, তারাই মানসিক প্রতিবন্ধী। মানসিক প্রতিবন্ধী জন্মগতভাবে হয়ে থাকে, কোনো কোনো শিশু জন্মগতভাবে সুস্থ হয়ে জন্মালেও পরবর্তীকালে কোনো অসুখের জন্য মগজে ক্ষতি হয়ে মানসিক প্রতিবন্ধী হতে পারে। আর শারীরিক প্রতিবন্ধীর বহুবিধ কারণ রয়েছে। তন্মধ্যে রয়েছে-প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সড়ক দুর্ঘটনা, অগ্নিকান্ড ইত্যাদি। এ ছাড়া কিছু কিছু রোগের কারণেও মানুষ শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়ে পড়ে। তন্মধ্যে স্ট্রোক, প্যারালাইসিস ও পোলিও ইপিলেপসি, বাতরোগ ইত্যাদি। এসব কারণে দেশে পঙ্গু ও প্রতিবন্ধীদের তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনবদ্য অবদান পোলিও এখন সারা বিশ্ব থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাার অনবদ্য অবদানে পোলিও এখন সারা বিশ্ব থেকে বিদায় নিয়েছে, তেমনি বাংলাদেশেও এখন শতভাগ পোলিওমুক্ত। এজন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বাংলাদেশ সরকারকে সাধুবাদ জানাই।

প্রতিবন্ধীদের মধ্যে লুকিয়ে থাকতে পারে বিশ্বসেরা প্রতিভা

প্রতিবন্ধীরা সমাজের সুস্থ সবল মানুষের সহযোগিতা পেলে তারাও করতে পারেন অনেক কিছু। দেশ-জাতি ও সভ্যতার উন্নয়নে তারাও পারেন অবদান রাখতে। বিশ্বসেরা পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংকে কে না চেনেন ? তিনি একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়ার পরও বিজ্ঞান জগতে সাড়া জাগানো অবদান রেখেছেন। শারীরিক অক্ষমতা নিয়ে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন সফলভাবে।

মিসরের প্রখ্যাত লেখক ও কথাসাহিত্যিক ড. ত্বহা হোসাইন ছিলেন একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। তার ঐতিহাসিক লেখা ও অবদানে ধন্য হয়েছে আজকের আধুনিক মিসর। প্রখ্যাত ইসলামী স্কলার শায়খ আবদুল্লাহ বিন বায জীবনের অধিকাংশ সময় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছিলেন। বিশ্বের অন্যতম সেরা ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ বোম্বের টাটা মেমোরিয়াল হাসপাতালের প্রাক্তন চিফ ফিজিশিয়ান ডা. এ এইচ আরকানী একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী। আধুনিক বিজ্ঞানের অন্যতম জনক থমাস আলভা এডিসন শ্রবণ প্রতিবন্ধী ছিলেন। তিনি তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, শ্রবণ প্রতিবন্ধী থাকায় তিনি কোলাহলমুক্ত পরিবেশে বিজ্ঞানচর্চা করতে পেরেছেন। কাজেই প্রতিবন্ধিকতা মোটেই অভিশাপ নয়।

বাংলাদেশেও সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অনেক প্রতিবন্ধী কাজ করেন। প্রতিবন্ধীরা একটুখানি সহযোগিতা পেলে তার মধ্যে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে পারেন। এজন্য ব্যক্তিগত ও সামাজিকভাবে প্রত্যেকের উচিত প্রতিবন্ধী মানুষের পাশে দাঁড়ানো।

প্রতিবন্ধীদের সমস্যা

প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা ও পুনর্বাসনের জন্য বাংলাদেশে খুবই সীমিতসংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, আর যা আছে সেখানে খরচের পরিমাণ এতই বেশি যে, মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তরা এখানে তাদের প্রতিবন্ধী শিশুদের পড়াতে পারে না।

পরিবারে কোনো প্রতিবন্ধী শিশু জন্মালে পিতামাতা বা আপনজনেরা শিশুটিকে লোকচক্ষুর অন্তরালে রাখতে চান। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় প্রতিবন্ধী শিশুটিকে পরিবারের জন্য অসম্মানজনক মনে করা হয়। তাকে কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতে নেয়া হয় না। নিলেও তার পোষাকাদি নিম্নমানের ও অবজ্ঞাভরে তাকে নেয়া হয় এবং অবহেলার চোখে দেখা হয়।

প্রতিবন্ধীদের চলাফেরার জন্য পরিবহনে আসন সংরক্ষিত থাকলেও তা পর্যাপ্ত নয়। এ ক্ষেত্রে কিছু কিছু যনবাহনে এর ব্যবস্থা থাকলেও অনেক যানবাহন রয়েছে, যেকানে তাদের চলাফেরার জন্য আসন সংরক্ষিত নেই।

প্রতিবন্ধীদের প্রতি সামাজিক এসব বৈষম্যের জন্য তারা অনেক ক্ষেত্রে ভিক্ষার ঝুলি হাতে নিতে বাধ্য হয় বা তাদের দিয়ে এক ধরনের অসাধু ব্যক্তিরা ভিক্ষা করায়। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, তারা ভিক্ষা করে যা পায় তা ওই অসাধু ব্যক্তিরা নিয়ে নেয়।

অসুখ-বিসুখে প্রতিবন্ধীরা নিজেদের কথা ভালো করে বলতে পারে না। এ জন্য তাদের ভাগ্যে চিকিৎসা ঠিকমতো জোটে না। আর যেসব প্রতিবন্ধীর কেউ নেই, তারা অসুস্থ হলে চিকিৎসা মোটেই জোটে না। এ অবস্থায়হয়তো সে অসুখে কাতর হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

আমাদের সমাজে এটাও হয় যে, প্রতিবন্ধী তাই তার সম্পদের কী-বা প্রয়োজন? তাকে বঞ্চিত রেখেতার সম্পদ অন্য কোনো ভাইবোনকে দিয়ে তার দেখাশোনার ভার তাকে দেয়া হয়। এতে অনেক ক্ষেত্রে তাকে অবহেলায় দিনাতিপাত করতে হয়।

প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য করণীয়

প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের পথ সুগম করা : পর্যাপ্ত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের অভাবে যেহেতু প্রতিবন্ধীরা পিছিয়ে পড়ছে, এ জন্য সরকারি উদ্যোগ এ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়ানো প্রয়োজন। দেশের বিত্তশালীরা মানবতার কল্যাণে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারেন। তাহলে প্রতিবন্ধীরা প্রশিক্ষিত হয়ে জাতীয় উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারবেন।

চাকরি ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীদের কোটা নিশ্চিত করা : সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীদের কোটা বাড়ানোসহ দেশের প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানগুলোতেও চাকরির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীদের একটি কোটা থাকা আবশ্যক এবং তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে কি না তা দেখার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

প্রতিবন্ধীদের অবহেলার চোখে না দেখা : পথঘাটে চলতে-ফিরতে প্রতিবন্ধীদের চোখে পড়ে। তাদের আমরা সালাম দিতে পারি, কুশলাদি জানতে পারি, রাস্তা পারাপারে সাহায্য করতে পারি, যানবাহনে সিট ছেড়ে বসার ব্যবস্থা করতে পারি, তাদেরকে নিয়ে চা খেতে পারি, তাদের সাথে বন্ধুত্ব করতে পারি। এমনটি হলে তারা সম্মানিত বোধ করবেন, এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা পাবেন। আপনি যদি প্রতিবন্ধীদের সাহায্য করতে নাও পারনে তবে অনুগ্রহ করে তুচ্ছজ্ঞান করবেন না।

দান-সাদকা, জাকাত ও ফিতরা দিয়ে প্রতিবন্ধীদের পুনর্বাসিত করা যায় : আমরা অনেকেই দানকরি এবং জাকাত প্রদান করি। যার একটি অংশ যদি দুস্থ অসহায় প্রতিবন্ধীদের পুনর্বাসনের কাজে ব্যয় করি তাহলে প্রতিবন্ধীরা উপকৃত হবে।

বাংলাদেশে প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা ও পুনর্বাসনের রোলমডেল সিআরপি

বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চিকিৎসা, প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসনের লক্ষ্যে সত্তর দশকের শেষের দিকে ১৯৭৯ সালে ১১ ডিসেম্বর মানবতার কল্যাণের মহিমায় ভাস্বর ব্রিটিশ মহীয়সী নারী মিস ভেলরি এ টেইলর গড়ে তোলেন সিআরপি। বর্তমানে সাভারে অবস্থিত বাংলাদেশে প্রতিবন্ধীদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের রোলমডেল।

সিআরপির গুরত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে, পক্ষঘাতগ্রস্ত মহিলাদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্বনির্ভর করে সমাজের মূল ¯্রােতধারায় ফিরিয়ে আনতে সহযোগিতা করা।

সিআরপির আছে একটি শিশু ইউনিট। মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে বাধাগ্রস্ত ও অন্যান্য শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য একটি আদর্শ শিক্ষালয়। এখানে মা ও শিশুদের একই সাথে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এমনভাবে উপযোগী করে তোলা হয়, যা ওই শিশুর দৈনন্দিন জীবনযাপন ও কর্মকান্ডে অত্যন্ত সহায়ক হয়। এছাড়াও প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা ও পুনর্বাসনে রয়েছে তাদের বহুমুখী কার্যক্রম।

পরিশেষে : সমাজে সিআরপির মডেল অনুসরণ করে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান প্রতিটি জেলা ও থানা সদরে হলে প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য কল্যাণ বয়ে আনতে পারে। আসুন সিআরপির স্লোগানটি আমরাও উচ্চারণ করি আন্তরিকতার সাথে – ‘Service to Sufferers is service to God’.

আরও পড়ুনঃ পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য

গণ সচেতনতায় ডিপিআরসি হসপিটাল লিমিটেড

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*