মেনোপজাল হটফ্ল্যাশ মানসিক অবসাদ

মেনোপজাল হটফ্ল্যাশ

প্রাকৃতিক কারণে একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর প্রত্যেক মহিলারই নিয়মিত মাসিকচক্র বা পিরিয়ড বন্ধ হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এ অবস্থাটি হলো মেনোপজাল কন্ডিশন। একটু ব্যাখ্যা করতে গেলে বলা যায়, একটি স্বাভাবিক মেয়েশিশু তার ডিম্বাশয়ে প্রায় ৩ থেকে ৫ লাখ ডিম্বাণু নিয়েই জন্মগ্রণ করে। ভৌগোলিক অবস্থান ও আবহাওাগত কারণে বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে শরীরবৃত্তীয় পরিবর্তনে আমাদের দেশে সাধারণত ১২-১৩ বছরের মধ্যেই মেয়েদের পিরিয়ড শুরু হয়। আর প্রতিমাসের ২৮ দিনের চক্রে একটি করে ডিম্বানু পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয়। একটি নির্দিষ্ট সময়ের মাঝে এই পরিণত ডিম্বাণুর নিষেক না ঘটলে মৃত ডিম্বাণু রক্তক্ষরণের সাথে নির্গত হয়ে শরীর থেকে বের হয়ে যায়। এভাবে প্রতি মাসিকচক্রের ২৮ দিনে একটি একটি করে ডিম্বাণু নির্গমনের ফলে ৪৫-৫০ বছর বয়সের মধ্যেই নারীদেহের প্রায় সব ডিম্বাণু নিঃশেষ হয়ে যায়। নারীর শরীর আর নতুন ডিম্বাণু সরবরাহ করতে পারবে না। অর্থাৎ স্বাভাবিক উপায়ে নারী আর সন্তানের জন্ম দিতে পারবে না।এটি নারীদেহের জন্য একটি সরল সমীকরণ এবং স্বাভাবিক ও অবশ্যম্ভাবী জৈবিক ঘটনা। এর ফলে দেহে ইস্ট্রোজেন নামক হরমোনের উৎপাদনও বন্ধ হয়ে যায়।

গবেষণা রিপোর্টের মাধ্যমে জানা গিয়েছে, মধ্যম আয়ুর নারীদের দেহে সারা জীবনে প্রায় পাঁচ শতাধিক ডিম্বাণু পূর্ণতা লাভ করে থাকে। নিয়মিত পিরিয়ড হওয়া নারীদেহের জন্য সুস্থাস্থ্যের প্রতীক এবং শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়াগুলোকে পরিষ্কার রাখার একটি উত্তম পদ্ধতিও এটি। কিন্তু এটি বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে নানাবিধ শারীরিক ও মানসিক সঙ্কট তৈরি হয়। মহিলাদের ক্ষেত্রে মেনোপজকারীন সময়ে যেসব শারীরিক ও মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে, তার মধ্যে অন্যতম প্রধান হলো হটফ্ল্যাশ। নারীদেরে মেনোপজ হওয়ার পরে হটফ্ল্যাশ-সংক্রান্ত সমস্যাটিই সচচেয়ে বেশি লক্ষ করা যায়। একটি আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৭৫-৮০ ভাগ মেনোপজাল মহিলাদের হটফ্ল্যাশের ভোগান্তি পোহতে হয়। আর্থসামাজিক কারণে আমাদের দেশে এ সংখ্যা আরো উল্লেখযোগ্য পরিমাণে রয়েছে।

এর সাধারণ লক্ষণগুলো হলো :

হটফ্ল্যাশ হলো কান ও মাথা হঠাৎ গরম হয়ে যায়, শরীরে অতিরিক্ত ঘাম হতে পারে। এর জন্য সাধারণত কোনো ওষুধ দরকার হয় না। মেনোপজ শুরু হওয়ার দু-এক বছরের মধ্যে এ সমস্যাটি আপনাতেই সেরে যায়। তবে মেনোপজের প্রথম বছরগুলোতে হটফ্ল্যাশের উপসর্গ হিসেবে মুখ-কান-ঘাড়-মাথা দিয়ে গরম ভাপ বের হয়।

গড়ে শতকরা ৭৫ ভাগ মহিলা এ হটফ্ল্যাশে ভুগে থাকেন এবং সেই সাথে শরীর ঘামার ইতিহাস তো থাকেই। সাধারণত রাতের বেলায় ঘাম নিঃসরণ বেশি হয়। প্রথম বছরে সবচেয়ে বেশি ঘামে আর এটি সাধারণত পাঁচ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। শরীর অবসাদবোধ হয় এবং মেজাজও খিটখিটে হয়ে যায়। অনিদ্রায় শরীরে ক্লান্তি নেমে আসে। এই মেনোপজাল হটফ্ল্যাশের পুরো অবস্থাটি সম্পন্ন হয় আমাদের দেহের জৈব রাসায়নিক, বিশেষ করে হরমোনজনিত পরিবর্তনের ফলে। শিষেষজ্ঞদের অভিমত হলো মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো এটি দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ভূমিকা রাখা। যখন শরীরে ইস্ট্রোজেন লেভেল কমে আসে তখন হাইপোথ্যালামাসের স্বাভাবিক কাজের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। দেহের ইস্ট্রোজেন হরমোন মিস্তষ্কের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের গ্রন্থিগুলোকে প্রভাবিত করায় দেহে অতিরিক্ত তাপের সৃষ্টি করে। আর এজন্যই মেনোপজ হলে ইস্ট্রোজেন হরমোনের ঘাটতির কারণে হটফ্ল্যাশ হয়।

হটফ্ল্যাশে অনিদ্রা আরেকটি আতঙ্কের নাম। রাতে ঘামের কারণে অনেকের ভালো ঘুম হয় না। এ ছাড়াও রাতে একবার ঘুম ভেঙে গেলে আর ঘুম আসেত চায় না। ফলে অনিদ্রার সাথে সাথে নানা রকম টেনশন, উদ্বেগ ও উৎকন্ঠা বাড়তে থাকে। সারা রাত অস্বাস্তিকর মানসিক অস্থিরতা বয়ে বেড়াতে হয়। যার ফলে পরদিন সরারক্ষনই ক্লান্তিবোধ হয়।

মেনোপজ যেহেতু ইস্ট্রোজেন হরমোনের ঘাটতিজনিত সমস্যঅ, তাই এই মেনোপজাল হটফ্ল্যাশ ব্যবস্থঅপনার জন্য এইচআরডি (হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি) দেয়া হয়। সুনির্দিষ্টভাবে হইস্ট্রোজেন হরমোন প্রতিস্থাপন করে এর চিকিৎসা করা হয়। তবে প্রচলিত চিকিৎসায় হরমোন প্রতিস্থাপন থেরাপিতে বেশ কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়। তাই বিশেষজ্ঞের পরামর্শক্রমে দেখা যায়। তাই বিশেষজ্ঞের পরামর্শক্রমে নেয়া আবশ্যক। তবে আশার কথা হলো, বিজ্ঞানের ধাবাহিক অগ্রযাত্রায় বর্তমানে মেনোপজাল সিনড্রোমের চিকিৎসার জন্য উপযোগী বেশ কিছু সহনশীল ও দেহবান্ধব অর্গানিক কম্পাউন্ডসের সন্ধান পাওয়া গেছে। এগুলোর মধ্যে ব্লাককোহস অন্যতম একটি উদ্ভিজ্জ উৎস। এর বোটানিক্যাল নাম Actaea racemosa এবং পরিবার Ranunculaceae. জৈব রাসায়নিক বিশ্বেলষণে এতে অনেক উপকারী উপাদান পাওয়া যায়।

ব্লাককোহস নিয়ে মেনোপজাল সিনড্রোম নিরোসনে এযাবৎ অসংখ্য গবেষণা হয়েছে। সম্প্রতি ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ায় ন্যাশনাল সেন্টার ফর কমপ্লিমেন্টারি অ্যান্ড ইন্টিগ্রেটিভ হেলথের (এনসিসিআইএইচ) সমন্বিত ডিজাইনকৃত Phase 4 Clinical trial- এর গবেণণা ফলাফলে মহিলদের মেনোপজাল কন্ডিশনে একটি উচ্চমানের Anti-anxietydrug হিসেবে কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। তা ছাড়া আমেরিকায় ব্লাককোহস পেইনফুল মিনিস্ট্রেশন, মিনিস্ট্রুয়াল ক্রাম্স, হটফ্ল্যাশ, অ্যাংজাইটি, ডিপ্রেশন ও ভ্যাজাইনাল ড্রাইনেস চিকিৎসায় ধারাবাহিক গবেষণা হয়েছে এবং একটি উপযোগী প্রাকৃতিক আদর্শ হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি ড্রাগ হিসেবে রয়েছে নিরাপদ ব্যবহার। হটফ্ল্যাশসহ বিভিন্ন প্রি ও পোস্ট-মেনোপাজল সিনড্রোম তথা মেয়েলি সমস্যা নিরসনে ব্লাককোহসের মূলের শুকনো চূর্ণ নিরাপদভাবে ব্যবহার হচ্ছে। আজকাল বাজারে এর স্ট্যান্ডারাইজড এক্সটাক্ট হিসিবে বিভিন্ন ডোজেস ফর্মে বাজারে ওষুধ ও সাপ্লিমেন্ট পাওয়া যাচ্ছে। সাধারণত ৪০ মিগ্রা. করে দিনে দু’বার ৬-৮ সপ্তাহব্যাপী সেবন করা যায়।

তবে তা হতে হবে অবশ্যই চিকিৎসকরে পরামর্শক্রমে। এর চিকিৎসার জন্য ওষুধের পাশাপাশি বিভিন্ন পুষ্টিকর ডায়েট যেমন ভিটামিন ‘বি’ সমৃদ্ধ খাবার- আটা, ওটমিল, ব্রকলি, ফুলকপি, মাশরুম, বাদাম, সূর্যমূখী বীজ, মটরশুঁটি, কিশমিশ, কলা, লাল আলু, পালংশাক ইত্যাদি খাবার খাওয়া উচিত। দৈনন্দিন খাওয়ার তালিকায় কিছু পরিবর্তন আনেত হবে। লবণ খাওয়া কমিয়ে দিতে হবে। বেশি ভাজাপোড়া ও তৈলাক্ত খাবার এড়িয়ে চ লতে হবে। প্রাণীজ প্রোটিনের পরিবর্তে উদ্ভিজ্জ উৎস থেকে প্রোটিন গ্রহণ করা তুলনামূলকভাবে বেশ উপকারী। নিয়মতি প্রতিদিন হাঁটা ও হালকা ব্যায়ামের অভ্যাস করা দরকার। আর মানসিক উৎকর্ষতা বাড়াতে সব সময় হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করা। কারণ এটি সব নারীর জন্য একটি প্রাকৃতিক পরিবর্তন; সবার ক্ষেত্রে এটি ঘটবেই। এজন্য পূর্বপ্রস্ততি হিসেবে এর উপসর্গগুলো মোকাবেলার জন্য আগে থেকেই মানসিক প্রস্তুতি অর্জন করা। বিশেষ করে মেনোপজাল সিড্রোমগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করা এবং তা অ্যাডজাস্ট করার মানসিক শক্তি সংগ্রহ করা দরকার। এজন্য দরকার হলে ঘন ঘন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের সাথে কাউন্সিলিং করা যেতে পারে।

আরও পড়ুনঃ জেনে নিন কি ভুলের জন্য বাচ্চা হয় প্রতিবন্ধী

গণ সচেতনতায় ডিপিআরসি হসপিটাল লিমিটেড

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*