
ডায়াবেটিস মূলত শরীরের বিপাকজনতি এক জটিল সমস্যা, যার ফলে ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তির রক্তে দীর্ঘ সময় ধরে গ্লকোজের (শর্করা) মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশী থাকে। আমরা দৈনন্দিন কাজের জন্য যে শক্তি পাই তা মূলত কোষের ভেতর গ্লুকোজের বিপাক ক্রিয়া (Metabolism) র মাধ্যমে উৎপন্ন হয়। আমরা শর্করা জাতীয় খাবার গ্রহণ করার পর তা পরিপাকৃত হয়ে সরল অণূ (গ্লুকোজ, ফ্লুক্টোজ ইত্যাদি) তে পরিণত হয়। অতপর অন্ত্র হতে এই গ্লুকোজ রক্ত রসে মিশে যায়। ইনসুলিন নামক হরমোনের উপস্থিতিতে গ্লুকোজ রক্তরস হতে দেহের পেশীকোষ (Muscle Cell) ও এডিপোজ টিস্যু (Adipose Tissue) তে ভেতর প্রবেশ করে। পরবর্তীতে এই গ্লুকোজ বিপাকের ফলে দেহের প্রয়োজনীয় শক্তি (ATP) এবং (CO2) উৎপন্ন হয়।
মানবদেহে পাকস্থলীর পাশে একটি মাংস পিন্ডাকার গ্রন্থি আছে যার নাম প্যানক্রিয়াস বা অগ্ন্যাশয়। এই প্যানক্রিয়াসে কিছু গুচ্ছকোষ রয়েছে, যেগুলো একত্রে আইলেটস অব ল্যাংগারহ্যান্স (Islets of langerhans) নামে পরিচিত। এই আইলেটস অব ল্যাংগারহ্যানসের বিটা কোষ হতে প্রাকৃতিকভাবে দেহের গ্লুকোজ বিপাকের জন্য প্রয়োজনীয় ইনসুলিন তৈরি হয়। কিন্তু বিটা কোষ যখন পর্যাপ্ত পরিমাণ ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না বা কোষ ইনসুলিনের প্রতি সঠিকভাবে সাড়া দেয় না তখন রক্তরস হতে গ্লুকোজ কোষের ভিতর প্রবেশে বাধাপ্রাপ্ত হয়। ফলে রক্তরসে গ্লুকোজের পরিমাণ বাড়তে থাকে এবং দেহের এই অবস্থার নামই ডায়াবেটিস।
ডায়াবেটিসের প্রকারভেদ: প্রাথমিকভাবে ডায়াবেটিসকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা:-
০১. ডায়াবেটিস ইনসিপাইডাস (Diabetes Insipidus) এই প্রকারের ডায়াবেটিসের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এতে প্রস্রাসে কোনো শর্করা নির্গত হয় না, অতিমাত্রায় প্রস্রাব হয় এবং ঘন ঘন পিপাসা লাগে।
০২. ডায়াবেটিস মেলাইটাস (Diabets Mellitus) এই প্রকার ডায়াবেটিক রোগীর প্রস্রাবে গ্লুকোজের উপস্থিতি পাওয়া যায়। ডায়াবেটিস মেলাইটাস আবার তিন ধরনের হয়ে থাকে। যথা:-
ক) ইনসুলিন নির্ভর ডায়াবেটিস, যখন দেহের মধ্যকার ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষগুলো মোটেই কাজ করে না অর্থ্যাৎ দেহে ইনসুলিন উৎপন্ন হয় না, তখন কোষের ভিতর গ্লুকোজ প্রবেশ করতে পারে না। এ ধরণের ডায়াবেটিসকে ইনসুলিন নির্ভর অথবা প্রথম শ্রেণীর (Type-1) ডায়াবেটিস বলে। এ ধরণের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের অধিকাংশকেই তখন বেঁচে থাকার জন্য তাদের অবশিষ্ট জীবনে ইনসুলিন ইনজেকশনের উপর নির্ভরশীল থাকতে হয়। সব ডায়াবেটিক রোগীর প্রায় ২০ ভাগ ইনসুলিন নির্ভর হয়ে থাকে। এ ধরণের ডায়াবেটিস সাধারণত শৈশব বা যুবক বয়সে গুরুত্ব হয়।
খ) ইসুলিন অনির্ভর ডায়াবেটিস (NIDDM or Type 2 Diabetes) এ ধরণের ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে প্যানক্রিয়াস অল্প পরিমাণে ইনসুলিন উৎপাদন করে অথবা দেহের পেশৗকোষ ও এডিপোজ কোষের ইনসুলিন গ্রাহণকসমূহ সঠিক মাত্রায় ইনসুলিনের প্রতি সাড়া দেয় না। ফলে গ্লুকোজ পরিপাক বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়াতে থাকে। এ ধরণের ডায়াবেটিসকে ইনসুলিন নির্ভর ডায়াবেটিস বা ২য় শ্রেণীর (Type 2) ডায়াবেটিস বলা হয়। যাদের বয়স ৩০ উর্ধ্বে বা পূর্ণবয়স্করাই এ ধরনের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়। ডায়াবেটিস রোগীদের ৯০ শতাংশই এ ধরনের ডায়াবেটিস আক্রান্ত হয়ে থাকে।
গ) গর্ভকালীন ডায়াবেটিস (Gesteional Diabetes) একটি এক বিশেষ ধরণের ডায়াবেটিস, যা গর্ভকালীন অবস্থায় হয়ে থাকে। এ ধরণের ডায়াবেটিসে মা ও শিশু উভয়ই আক্রান্ত হয়ে থাকে। শতকরা প্রায় ৩.৫ ভাগ গর্ভবতী মায়েদের এ জাতীয় ডায়াবেটিস হয়ে থাকে। গবেষকগণ এ প্রকারের ডায়াবেটিসকে তৃতীয় শ্রেণীর (Type 3) ডায়াবেটিস বলে থাকে যদিও একটি অস্থায়ী এবং বাচ্চা প্রস্রাবের পর সেরে যায় তবুও এর চিকিৎসা জরুরী, অন্যথায় পরবর্তী জীবনে ইনসুলিন নির্ভর ডায়াবেটিস (Type 2 Diabetes) হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
ইসুলিন সম্পর্কে কিছু কথা: উপরোক্ত আলোচনা হতে এ কথা স্পষ্ট যে ডায়াবেটিসের সাথে দেহে ইসুলিন উৎপাদনের পরিমাণ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এর ইনসুলিন হলো এক প্রকার হরমোন বা অন্ত:ক্ষরা রস যা প্রোটিন ধর্মী। ১৯২০ সালে সর্বপ্রথম ইসুলিন পৃথক করা হয়। রাসায়নিকভাবে ইসুলিন তিনটি অংশ নিয়ে গঠিত যা (Chain-A, Chain-B, Ges Connection Chain) নামে পরিচিত। Chain-A ২১টি এমাইনো এসিড, Chain-B ৩০টি এমাইনো এসিড, Connecting Chain ৬৫ টি এমাইনো এসিড নিয়ে গঠিত। Chain-A এবং Chain-B দুটি ডাইসালফাইড বন্ড দিয়ে রেললাইনের ন্যায় যুক্ত থাক্ এই ইসুলিন মানবদেহে স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়ায় প্যানক্রিয়াসের আইলেটস অব ল্যাংগারহ্যারহ্যানসের বিটা কোষে (Beta Cell) তৈরি করে। তবে বর্তমানে রি কম্বিনেন্ট ডি.এন.এ টেকনোলজি (Recombinant DNA Technology)র মাধ্যমে E, coli থেকে বাণিজ্যিকভাবে ইনসুলিন তৈরি করা হচ্ছে। আর এই ইনসুলিন ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হচ্ছে।
ডায়াবেটিস ও এর ভয়াবহতা: বর্তমান বিশ্বে চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে পাল্লা ডায়াবেটিক রোগীর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে ডায়াবেটিস একটি নীরব ঘাতক, এতে যে কোন বয়সের মানুষ আক্রান্ত হতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশে ১ কোটির বেশি মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। ২০০৬সালে ডায়াবেটিস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশর এক জরিপে আরও ভয়াবহ তথ্য পাওয়া যায় যে, বাংলাদেশের শহর অঞ্চলে ডায়াবেটিসের আক্রান্ত হওয়ার গ্রামাঞ্চলের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। WHO কর্তৃক পরিচালিত ২০০৬ সালের এক জরীপ হতে জানা যায়, তখন বিশ্বে প্রায় ২৪টি দেশের ৬০ লক্ষ লোক ডায়াবেটিস আক্রান্ত ছিল এব্ং ধারণা করা হচ্ছে ২০২৫ সালে প্রায় নাগাদ ২৮ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। অর্থ্যাৎ দিন দিন ডায়াবেটিসের ভয়াবহতা কেবল বেড়েই চলেছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, সে দেশে ৬.২ শতাংশ লোক ডায়াবেটিসে আক্রান্ত এবং প্রতি বছর প্রায় ১২ মিলিয়ন ব্যক্তি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে যাদের বয়স ২০ এর উপরে। WHO এর মতে, বর্তমানে বিশ্বে সবচেয়ে মৃত্যু ঘটায় এরকম পাঁচটি কারণের মধ্যে ডায়াবেটিস অন্যতম। পৃথিবীতে প্রতি দশ সেকেন্ডে একজন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে এবং প্রতি দশ সেকেন্ডে দুইজন ডায়াবেটিক রোগী সনাক্ত করা হয়। তাই ডায়াবেটিসের ভয়াবহতা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরী।
medicalbd সাস্থের সকল খবর।
