গর্ভাবস্থায় মাকে সুস্থ রাখার জন্য চারটি জিনিসের ওপর নির্ভর করতে হয়। যেমন সুষম ও পুষ্টিকর খাওয়া-দাওয়া, যথেষ্ট পরিমাণে বিশ্রাম, নিয়মিত মেডিকেল চেক-আপ এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ ও ভ্যাকসিনেশন। প্রয়োজনীয় ওষুধ ও ভ্যাকসিনেশনের মধ্যে প্রেগন্যান্সিতে প্রয়োজনীয় তিনটে ওষুধ লাগে।
ফোলিক অ্যাসিড: প্রেগন্যান্সিতে প্রথম দিকে লাগে। ফোলিক অ্যাসিড দরকার হয় শিশুর নার্ভ সিস্টেম গঠনের জন্য। ফোলিক অ্যাসিডের অভাবে শিশু বিকলাঙ্গ হযে জন্ম নিতে পারে।
আয়রন: ওরাল ক্যাপসুল হিসেবে খেতে দেওয়া হয় প্রেগন্যান্সির সময় ভাবী মাকে। প্রেগন্যান্সির সময় স্বাভাবিকভাবেই রক্তাসল্পতা দেখা দেয়, তাই রক্তসল্পতা প্রতিরোধ করার জন্য আয়রন ক্যাপসুল দেওয়া হয়, তাই রক্তসল্পতা প্রতিরোধ করার জন্য আয়রন ক্যাপসুল দেওয়া হয়। অনেক সময় দেখা যায় রোগী আয়রন ক্যাপসুল খায়নি অথচ ডেলিভারির সময় এসে গেছে কাছাকাচি। আয়রন ক্যাপসুল ইঞ্জেকশন দেওয়া হয় যাতে খুব তাড়াতাড়ি রক্তটা বাড়ে।
ক্যালসিয়াম: ক্যালসিয়াম এই কারণে দেওয়া হয় যাতে মায়ের ক্যালসিয়ামের ঘাটতি হয়ে হাড় পাতলা না হয়ে যায় এবং শিশুর যাতে হাড়ের গঠন ঠিক থাকে।
এছাড়া কারো যদি অন্য কোনো রোগ থাকে তবে সেই রোগের ওষুধ দিতে হয় সতর্কভাবে। কারো থাইরয়েডের সমস্যা থাকতে পারে। সাধারণভাবে গর্ভাবস্থায় থাইরয়েড গ্রন্থির আকার বৃদ্ধি পায়। এই বৃদ্ধির ওপর নজর রেখে অর্থ্যাৎ কতটা বাড়ছে তা পরীক্ষা করে থাইরয়েড গ্রন্থির বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা করা দরকার। অনেক সময় গর্ভাবস্থায় উপসর্গগুলো থাইরয়েড জনিত উসর্গের সঙ্গে গুলিয়ে যায়। যেমন: অনেক মহিলাই গর্ভবতী অবস্থায় ক্লান্ত বোধ করেন। সারা শরীরে বেদনা ও অস্বস্থি লাগে। এই উপসর্গগুলো কিন্তু হাইপো থাইরয়েডিজমের কারণেও হতে পারে।
আবার অনেক সময় সন্তানসন্তবা মায়ের গরমে একটা হাঁসফাঁস অবস্থা হয়, হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায় এগুলো কিন্তু হাইপার থাইরয়েডজমের উপসর্গ হওয়া সম্ভব। তবে পর্যাপ্ত চিকিৎসা পেলে থাইরয়েডর সমস্যায় মায়ের বা সন্তানের কোনো ঝুঁকি থাকার কথা নয়। স্বাভাবিক গতিতেই গর্ভাবস্থা চলতে দেওয়া যায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে মায়ের হাইপার থাইরয়েডিজম আয়ত্তের বাইরে চলে যায়ার উপক্রম হয়, সেক্ষত্রে গর্ভাবস্থায় চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ মাসের মধ্যে থাইরয়েড গ্রন্থির অপারেশনের প্রয়োজন হতে পারে।ডেলিভারির সময় শিশুটির থাইরয়েড স্বাভাবিক, অতিমাত্রায় কার্যকর বা অল্প কার্যকরী- এই তিনটির যে কোনো একটি হতে পারে। প্রয়োজনে জন্মের সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসক বাচ্চার চিকিৎসা শুরু করে দিতে পারেন। এই কারণে বলা হয় থাইরয়েড আক্রান্ত মায়ের ডেলিভারি অবশ্যই কোনো বড় হাসপাতালে বা প্রতিষ্ঠানে হওয়া দরকার, যেখানে মা ও শিশুর আধুনিক চিকিৎসার সবরকম ব্যবস্থা আছে।
অ্যানিমিয়ার কারণে গর্ভাবস্থায় জটিলতা আসতে পারে। গর্ভাবস্থায় রক্তসল্পতার উপসর্গও সাধারণ অ্যানিমিয়ার উপসর্গের মতো। সাধারণভাবে অ্যানিমিয়ায় মহিলারা সহজেই ক্লান্তিবোধ করেন, অল্প কাজ করলেই হাঁপ ধরে, মাথা ঘোরে, নিশ্বাসের কষ্ট হয়, পা ফুলতে থাকে, বুক ধড়ফড় করতে পারে, জিবে ঘা হতে পারে। এর মধ্যে অনেক উপসর্গই মহিলারা গর্ভাবস্থায় সাধারণ অসুবিধে বলে উড়িয়ে দেয়। তা না করে চিকিৎসককে বললে তিনি উপসর্গের যথার্থ কারণ বলতে পারবেন। সাধারণত গর্ভাবস্থায় রক্তাসল্পতা ধরা পড়লে লোহ লবণ, ফেরাস সালফেট বা ফেরাস ফিউমারেট উপযুক্ত মাত্রায় দিয়ে চিকিৎসা করা হয়। আয়রন খাওয়ার কারণে যে পাশ্বপ্রতিক্রিয়া হয় তা হল কোষ্ঠকাঠিন্য। এর চিকিৎসাও খুব সহজ। অনেককে গর্ভাবস্থায় অ্যাসিডিটির জন্য অ্যান্টিসিড বড়ি বা লিকুইড খেতে বলা হয়।
গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস এক বিশেষ ধরনের জটিলতা। এক্ষেত্রে এদের হাই রিস্ক-প্রেগন্যান্সি বলে। গর্ভাবস্থায় শরীরের অন্তনিঃসরণকারী গ্রন্থিগুলোর নানা পরিবর্তন ঘটে, তার থেকে শর্করা জাতীয় খাদ্যের মেটাবলিজমের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়, ফলে গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিসের লক্ষণ দেখা যায়। এই ক্ষেত্রে মাকে বিশেষ সর্তকতা ও শিশু কিংবা নবজাতক শিশুর বিপদ হতে পারে।
ঠিকসময়ে ধরা না পড়লে এই রোগে প্রস্রাবের সময় মায়ের গুরুতর বিপদ ঘটতে পারে। পুরোপুরি ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে থাকতে হবে। ডাক্তার যখন বলবেন তখন ইউ.এস.জি করে সন্তানের অবস্থান জেনে নিতে হবে। রোগিনীর মা-বাবার যদি ডায়াবেটিস থাকে তাহলে সন্তানসম্ভবাকে বিশেষ সাবধানে রাখতে হবে। এর সাথে রোগিনীর রক্তচাপ নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। এয়াড়া শরীরে অতিরিক্ত মেদ বৃদ্ধি হচ্ছে কিনা সেদিকেও নজর দিতে হবে। ঠিকমতো খাবার ও বিশ্রামের দ্বারা রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে স্বাভাবিক মাত্রায় রাখতে হবে।
এছাড়া প্রেসার থাকলেও নিয়মিত চেকআপ করতে হবে, ওষুধ খেতে হবে। কারোর অ্যাজমা বা হাঁপানি কিংবা এপিলেন্সি থাকতে পারে। এনসব রোগে কিছু ওষুধ প্রেগন্যান্সিতে অ্যালাউ করা হয় আবার কিছু ওষুধ বন্ধ রাখতে হয়।
যে সব ওষুধ প্রেগন্যান্সিতে খাওয়া যেতে পারে সেগুলো খেতে হবে, অন্য ওষুধের ব্যাপারে চিকিৎসকের মতামত মেনে চলতে হবে। এয়াড়া আছে ভ্যাকসিনের হল টিটিনাস। টিটেনাস মাকে দেওয়া হয় যাতে শিশুর জন্মের সময় টিটেনাস না হয়্ দুটো ইঞ্জেকশন নিতে হয়্ একটা চার মাস প্রেগন্যান্সির পর, অন্যটা পাঁচ মাস পর।
বর্তমানে শুরু হয়েছে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিন। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি- এই সময়টায় ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রকোপ বেশি। প্রেগন্যান্সিতে যাতে মা আক্রান্ত না হয় তার জন্যই দেওয়া হয়। মায়ের সাথে সাথে শিশুর রক্ষা পায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ, নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে একটা ডোজ যেন দেওয়া হয়।
যদি কুকুরে কামড়ায় তাহলে অ্যান্টির্যাবিস ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়। লাইভ সেভিং ড্রাগ যদি দেওয়া দরকার হয় তাহলে দিতে হবে।
যথেষ্ট বিশ্রাম: প্রেগন্যান্সিতে রাতে আট ঘন্টা, দুপুরে দু ঘন্টা সম্পূর্ণ বিশ্রাম নেওয়া দরকার। পরিশ্রমের কাজ, সিঁড়ি ভাঙা, পেটে চাপ পড়া, উবু হয়ে বসা বা জাকিং থেকে দূরে থাকতে হবে।
সুষম খাদ্য: যথেষ্ট পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া উচিত। ভিটামিন, মিনারেলও খাবারে থাকা দরকার।
প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেটের জন্য যারা নিরমিষাশী তারা দানা শস্য বেশি খাবেন। যেমন বিভিন্ন ধরনের ডাল, রাজমা, পনির, ছানার তরকারি, সয়াবিন বেশি করে খেতে হবে।
যারা আমিষাশী তারা মাছ, চিকেন ইত্যাদি খাবেন। তবে খাবার-দাবার এমন করে তৈরি করবেন যাতে সহজে হজম হয়।
ভিটামিনের জন্য বিভিন্ন ধরনের মৌসুমি ফল খাওয়া দরকার। তবুও তার মধ্যে সাইট্রাস ফল বেশি খেলে সর্দি কাশি রেজিস্ট্যাল হবে। টক ফলে ভিটামিন সি আছে। যেমন কমলালেবু, মুসন্বি ইত্যাদি। বেশি করে আতা খেতে পারলে ভালো। কারণ আতাতে হাইয়েস্ট ডোজে ক্যালসিয়াম আছে। আতার সশয় নিয়মিত আতা খাওয়া ভালো। পেয়ারা, কলা খেলে কনস্টিপেশন হয় না। প্রেগন্যান্সিতে কনস্টিপেশন খুব কমন।
সব ধরণের ফলই মিলিয়ে-মিশিয়ে খাওয়া যেতে পারে। সব ধরণের সবজি প্রেগন্যান্সিতে খাওয়া যায। শাক-সবজি বেশি খেলে কনস্টিপেশন হবে না। এয়াড়া প্রেগন্যান্সিতে প্রচুর পরিমাণে জল খাওয়া উচিত।
নিয়মিত মেডিকেল চেপআপ করতে হবে। মায়ের প্রেসার, অ্যানিমিয়া বা অন্য কোনো সমস্যা থাকলে ঠিকঠাক চিকিৎসা নেওয়া উচিত। বাচ্চার গ্রোথ ঠিকমতো হচ্ছে কিনা দেখা দরকার। আজকাল গর্ভস্থ বাচ্চার বিভিন্ন ধরণের পরীক্ষা বেরিয়ে গেছে। মায়ের রক্ত ও সোনোগ্রফি পরীক্ষার সাহায্যে বাচ্চার গঠনগত কোনো ত্রুটি আছে কি না বা ক্রোমোজোমাল সমস্যা আছে কি না সেগুলো দেখে নিতে হয়।
প্রথমদিকে ত্রিশ সপ্তাহ অবধি মাসে একবার বা তিন সপ্তাহে একবার দেখালেই চলবে। কিন্তু ত্রিশ সপ্তাহের পর প্রতি সপ্তাহে নিয়মিত চেপ-আপ করা দরকার। যদি কোনো সমস্যা দেখা দেয় তা শুরুতেই মোকাবিলা করে ঠিক করে ফেলা যায়।
গর্ভসঞ্চারের সঙ্গে সঙ্গে এই সমস্ত জিনিসগুলোর দিকে বেশি নজর দিতে হবে যাতে মা এবং শিশুর দুজনই ভালো থাকে।
medicalbd সাস্থের সকল খবর।

