হাইপো ক্যালেমিয়া বা পটাশিয়াম স্বল্পতা

পোস্ট টি ভালো লাগলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন
  • 414
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
    414
    Shares

হাইপো ক্যালেমিয়া বা পটাশিয়াম স্বল্পতা

হাইপো ক্যালেমিয়ার অর্থ রক্তে পটাশিয়াম স্বল্পতা। পটাশিয়াম একটি মৌলিক রাসায়নিক খনিজ পদার্থ। সূক্ষ্মমাত্রায় হলেও মানবদেহে শরীরের স্বাভাবিক ক্রিয়া-বিক্রিয়ার জন্য এর উপস্থিতি অতীব গুরুত্বপূর্ণ। সোডিয়াম ও (Na) আর একটি মৌলিক রাসায়নিক খনিজ পদার্থ, যা সমানভাবে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয়। সোডিয়াম ও পটাশিয়াম যদিও ক্ষুদ্রমাত্রায় মানবশরিরে বিদ্যমান কিন্তু এদের প্রয়োজনীয় কাজ মহীরুহের মতো। তবে মানবশরীরে  পটাশিয়ামের  তুলনায় সোডিয়ামের মাত্রা ২৫-৩০ গুণ বেশি থাকে।

অন্যথায় একজন মানুষ কিংবা অন্য যোকোনো প্রানীর বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় প্রধান অঙ্গ হচ্ছে হৃৎপিন্ড। তা ছাড়া অন্যান্য (Viral Organ) যেমন মস্তিষ্ক, ফুসফুস, লিভার, কিডনি ও অন্যান্য অভ্যন্তরীন অঙ্গগুলোর স্স্থুতা নির্ভর করেই হৃৎপিন্ড বা হার্টের সুস্থতার ওপর। হৃৎপিন্ডকে নিয়ন্ত্রণ করে হৃদকোষের অভ্যন্তীরণ একটি (System) একটি, যাকে বলা হয় সোডিয়াম পটাশিয়াম পাম্প। এর মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রিত হয় হৃৎপিন্ডের স্পন্দন। যার ফলে শরীরে অন্যান্য অঙ্গের রক্তের আদান-প্রদান ঘটে। ফলে অঙ্গগুলো মানবশরীরে সক্রিয় ও সজীব অবস্থায় থাকে। শুধু হৃৎপিন্ড নয়, শরীরের প্রতিটি অঙ্গের কোষ  এবং তাদের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে এই সোডিয়াম-পটাশিয়াম পাম্প। গাড়ি সঠিকবাবে স্টার্ট ও নিয়ন্ত্রণের জন্য যেমন তার ফুয়েলের ওপর নির্ভরশীল, তেমনিটি মানবদেহের অভ্যন্তরীণ অঙ্গের সচলাবস্থা ও সঠিক নিয়ম নিয়ন্ত্রণের জন্যও প্রয়োজন একধরনের বৈদ্যুতিক চার্জ, যা আমরা পেয়ে থাকি বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য থেকে। এক কথায় বলা যায়, সেই সোডিয়াম-পটাশিয়াম পাম্পের মাধ্যমে শরীরে বিদ্যুৎ চার্জ তৈরি ও নিয়ন্ত্রিত হয়। তবে সোডিয়াম-পটাশিয়াম পাম্প কখনই সক্রিয়ভাবে কার্যক্রম সম্পন্ন করে যখন রক্তে এদের পরিমাণ সঠিক থাকবে।

রক্তে এর (Ratio) যদি কম-বেশি থাকে তাহলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের কাজকর্মে ভারসাম্যহীনতা দেখা দেবে। আমাদের নিত্যদিনের খাদ্য ও পানীয়, যার মধ্যে সোডিয়াম-পটাশিয়াম ও বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য আছে, যা আমাদের শরীরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং তা সব কিছুই স্রষ্টা ঠিক করে দিয়েছেন। শুধু যেকোনো অসুস্থতা বিশেষ করে ডায়রিয়া, বমি বা দীর্ঘ দিনের অনাহারে থাকার কারণে এসব রাসায়নিক দ্রব্য সরবরাহ করতে হয় মুখ বা শিরাপথে।

ডায়রিয়া বা বমিতে রোগীর সঙ্কটাপন্ন হওয়ার মুখ্য কারণই হলো শরীরে এসবের মারাত্মক স্বল্পতা। স্বাস্থ্য জ্ঞানের এই মৌলিক কিছু বিষয় অজানা থাকার কারণে অকালেই ঝরে পড়ে অনেক জীবন। মৃতপ্রায় অবস্থা থেকে বেঁচে যাওয়া এমন একজন রোগীকে নিয়েই আমাদের এ লেখাটি।

রোগীর নাম : করিম উদ্দীন

বয়স: ৭৩ বছর।

ওই রোগীর ছেলে তাকে নিয়ে এসেছেন। নিম্নলিখিত সমস্যা নিয়ে

রোগীর জ্ঞান আছে কিন্তু অসংলগ্ন কথাবার্তা পুরোপুরিই অসংলগ্ন ২৪ ঘন্টায় বিছানায় তেকে প্রস্রাব-পায়খানা করছেন হাঁটতে পারছে না স্মরণশক্তি বিলুপ্তপ্রায় তবে শরীরের সব জায়গায় বোধশক্তি আছে বছরখানেক আগে একবার স্ট্রোক করেছিলেন।

রোগীর পরিবার ধরেই নিয়েছিল, রোগী হয়তো আবারো স্ট্রোক করতে যাচ্ছেন, যদিও তাদের ধারণাটি মোটে ও মানসিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলাম। স্ট্রোকের ব্যাপারে একমত হতে পারলাম না।

ইতোমধ্যে সিটিস্ক্যানও করে ফেলেছি। কিন্ত উল্লেখ করার মতো কিছুই পেলাম না। রোগীর ব্লাডপ্রেসারও স্বভাবিক। সচেতন রোগী। হাত-পা চারটিই দুর্বল। স্ট্রোকের রোগী এমন হয় না। শুরু করলাম খোঁজাখুজি। অন্যান্য পরীক্ষা নিরীক্ষার সাথে (Serum Electrolytes) পরীক্ষার জন্য দিলাম। প্রথম দিন মৌলিক কোনো চিকিৎসা না দিয়ে কিচু সিম্পট মেটিক চিকিৎসা দিলাম এবং রোগীকে মুখে প্রচুর তরল খাবার খেতে দিলাম। পরদিন আসল ঘটনা খুঁজে পেলাম রিপোর্টের হুবহু মিল। তার (Sodium bicarbonate) স্বভাবিক এবং (NACI) স্ববাবিকের চেয়ে সামান্য কম। কিন্তু পটাশিয়াম মাত্রই ২.০৪ । ব্যস! ডায়াগনোসিস ১০০% কনফার্ম হাইপো ক্যালেমিয়া অর্থাৎ পটাশিয়ামের স্বল্পতা। রোগীর লক্ষণের সাথে রিপোর্টের হুবহু মিল। রোগীকে মুখে পটাশিয়াম সাইট্রেট সিরাপ খেতে দিলাম আর শিরাপথে (Hartsol solution) ৩ দিনের জন্য দিলাম। চতুর্থ দিন আবার (Electrolyte) পরীক্ষা করে দেখলাম, রিপোর্টও স্বাভাবিক এবং রোগীও স্বাভাবিক। এবার আমার পরীক্ষা! কেন এমন হলো? রোগীর ছেলেকে বিভিন্ন প্রশ্ন উত্তরের মাঝে একপর্যায়ে বলল, সপ্তাহানেক আগে তার বাবার পাতলা পায়খানা ও বমি হয়েছিল এবং ফার্মেসি থেকে কিচু ওষুধ ও সেবনে তা ঠিক হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তখন তেখেই রোগীর খাওয়া-দাওয়া অপরিমিত। সুতরাং বুঝতে অসুবিধা হলো না।

এর আগে ডায়রিয়া ও বমির সময় তার শরীর থেকে  প্রচুর পটাশিয়াম বের হয়ে গিয়েছিল, যা আর পূরণ করা হয়নি। ওই সময় যদি তাকে সুষ্প্রাপ্য কলেরা স্যালাইন দেয়া হতো তাহলে পরিস্থিতির এতটুকু অবনতি হতো না। আমাদের দেশের গ্রামগঞ্জে এমনকি শহরে কিছু কেমিস্ট আছেন, যারা ডায়রিয়া বুঝলেও (Body Electrolytes) সম্পর্কে খুব একটা বোঝেন না। তাই ইচ্ছেমতো (Normal saline/Dextrose saline) নিয়ে চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। কিন্তু যদি বারবার বমি হতে থাকে তাহলে প্রয়োজনীয় পটাশিয়াম, সোডিয়াম খাদ্য পরিপাক নালী থেকে রক্তে পৌছানোর সুযোগ পায় না। ফলে এ ধরনের অঘটন বিশেষ কারণে অপ্রয়োজনীয় একগাদা পরীক্ষা-নিরীক্ষা না দিয়ে সর্বপ্রতম দ্রুত কোন রোগীর কোন পরীক্ষার প্রয়োজন তা করা দরকার। এতে করে রোগীর কোন চিকিৎসা প্রয়োজন তা জানা যায়। অপরপক্ষে বার্ধক্যের সময় অনেক মানুষই (Dementia) স্মৃতিভ্রম রোগে ভোগেন। নিজেরাই তাদের ডায়রিয়া বা বমির কথা মনে রাখতে পারেন না। কিছুই বলতে  পারেন না পরিবারের সদস্যদেরও । তাই পরিবারের সব সদস্যের দায়িত্ব এসব অবলা মানুষের পায়খানা-প্রস্রাব পরিষ্কার করা এবং নিয়মিত খাবারদাবারের ব্যাপারে  জ্ঞাত থাকা। তা না হলে এসব মানুষ যেকোনো সময়  (Cardiac arrest) এ চলে যেতে পারেন অথবা (Paralytic ilias) হতে পারে এর মতো জটিলতা। ডাবে প্রচুর পটাশিয়াম থাকে। এজন্য ডায়রিয়া ও বমির রোগীকে প্রচুর ডাবের পানি পান করানো উচিত। লবণপানি দিয়ে বাসায় যে স্যালাইন তৈরি করা হয় তাতে পটাশিয়াম থাকে না। তাই এ ক্ষেত্রে ডাব হতে পারে রোগীর জীবন রক্ষাকারী প্রাকৃতিক মূল্যবান ওষুধ। এ ব্যাপারে সবার সচেতনতা কাম্য।

আরও পড়ুনঃ হাইপো ক্যালেমিয়া বা পটাশিয়াম স্বল্পতা।

গণ সচেতনতায় ডিপিআরসি হসপিটাল লিমিটেড

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

8 − 1 =

x

Check Also

বিশ্ব এইডস দিবস উপলক্ষে র‌্যালী ও আলোচনা সভা

পোস্ট টি ভালো লাগলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন          আসাদুল ইসলাম সবুজ, লালমনিরহাট: ১লা ডিসেম্বর বিশ্ব ...

জিয়া পরিবারের দুঃসময়ের বন্ধু নোয়াখালী-৩ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেলেন ডা: দোলন

পোস্ট টি ভালো লাগলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন10         10Sharesমোহাম্মদ আলাউদ্দিন, নোয়াখালী: বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ...

মহিলাদের হাড়ক্ষয় প্রতিরোধে ক্যালসিয়ামের ভুমিকা

পোস্ট টি ভালো লাগলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন156         156Sharesবয়সের সাথে সাথে হাড় ক্ষয় একটি অবধারিত ...

বরগুনায় সরকারী হাসপাতালে সম্মানী নিয়ে রোগীর চিকিৎসা

পোস্ট টি ভালো লাগলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন21         21Sharesমোঃ মেহেদী হাসান, বরগুনা: বরগুনায় সরকারী হাসপাতালে ...

ওভারিয়ান সিস্ট নাকি টিউমার? কখন কি করা উচিত….

পোস্ট টি ভালো লাগলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন99         99Sharesওভারিয়ান সিস্ট এবং টিউমার দুটি আলাদা বিষয় ...

বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসা ল্যাপারোস্কপি কখন এবং কেন করা হয়?

পোস্ট টি ভালো লাগলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন140         140Sharesল্যাপারোস্কপি একধরনের সার্জিক্যাল চিকিৎসা পদ্ধতি যার মাধ্যমে ...