বয়স্কদের সাধারন রোগ ক্লান্তি

পোস্ট টি ভালো লাগলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন
  • 69
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
    69
    Shares

বয়স্কদের সাধারন রোগ ক্লান্তি

বয়ঃবৃদ্ধ রোগীদের সাধারণ সমস্যা হলো ক্লান্তি। অন্তর্নিহিত অসুখ কিংবা মানসিক অশান্তির কারণে ক্লান্তি আসতে পারে। ক্যান্সার, হৃদরোগ, দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের অসুখ, থাইরয়েড গ্রন্থির অকার্যকারিতা মাল্টিপল স্কোরোসিস ও রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস ক্লান্তির কারণ হতে পারে। ক্লান্তি মন ও শরীরের ওপর প্রভাব বিস্তার করে থাকে। ক্লান্তির পেছনে যদি স্পষ্ট কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া না যায়, তবে মনে করতে হবে অনেক ফ্যাক্টর একসাথে মিলে এই ক্লান্তির সৃষ্টি হতে পারে। ক্লান্তির পেছনের কারণগুলো সমন্ধে ধারণা করতে পারলে চিকিৎসাকে সেভাবে সাজানো যায়। মোটের ওপর ক্লান্তিকে যদি বিশেষভাবে ব্যাখ্যা করা যায়, যেমন- মানসিক ক্লান্তি, শারীরিক ক্লান্তি; তবে বুঝতে ও চিকিৎসা করতে সহজ হয়।

ক্লান্তি পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের কয়েক গুণ বেশি আকারে দেখা যায়। বয়স কোনো কোনো ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ক্লান্তির কারণ হয়ে দেখা দিতে পারে। বৃদ্ধ বয়সে যাদের চিন্তাশক্তি মৃদ্যু লোপ পেয়েছে, দুশ্চিন্তা, যাদের ক্যান্সার বা বাতের সমস্যা আছে কিংবা শ্বাসকষ্ট আছে তাদের ক্ষেত্রে ক্লান্তি দেখা দেয়ার আশঙ্কা বেশি। অবসাদ, অসুস্থ অবস্থা ও কর্মে অক্ষমতা ইত্যাদি মিলে শেষ জীবনে ক্লান্তি দেখা দেয়।

ক্লান্তি অন্তর্নিহিত মেডিক্যাল রোগের উপসর্গ হতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অন্তর্নিহিত এই অসুখগুলো যেমন- ক্যান্সার, মাল্টিপল স্কে¬রোসিস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, লোপাস, ঘুমের সমস্যা, এইচআইভি/এইডস, অবসাদ, হার্ট ফেইলিউর, দীর্ঘমেয়াদী ব্যথা, স্ট্রোক ও মাথায় আঘাতজনিত সমস্যা ইত্যাদি দেখা যায়।

ক্যান্সার:

ক্যান্সারের ক্ষেত্রে ক্লান্তি দেখা যায় উপসর্গ হিসেবে, চিকিৎসার পার্শ্বপ্রক্রিয়া হিসেবে এবং চিকিৎসা সম্পূর্ণ করার পর দীর্ঘমেয়াদী উপসর্গ হিসেবে। রক্তশূণ্যতা, কর্মহীনতা, ক্যান্সার চিকিৎসার স্নায়ুবিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, পরিবর্তিত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং ক্যান্সারের উপসর্গ হিসেবে ক্লান্তি দেখা দিতে পারে।

মাল্টিপল স্কে¬রোসিস ও অন্যান্য  স্নায়ুবিক সমস্যা: কেন্দ্রীয়  স্নায়ুতন্তের অসুখ যেমন- মাল্টিপল স্কে¬রোসিস, পারকিনস ডিজিজে এবং বহিস্থ  স্নায়ুতন্ত্রের অসুখ, যেমন- মাংসপেশির অসুস্থতা, এসবের কারণে উপসর্গ হিসেবে ক্লান্তি দেখা দিতে পারে।

অবসাদ ও ঘুমের সমস্যা:

যেসব রোগীর অবসাদগ্রস্থতা আছে তাদের প্রথম অভিযোগ হলো ক্লান্তি। ক্লান্তির কারণে সামাজিক কাজকর্মে সম্পৃক্ততা কমে যায় এবং কর্মক্ষমতাও কমে যায়। ক্লান্তি, অবসাদ ও ঘুমের সমস্যা ওৎপ্রোতভাবে জড়িত।

অবসাদের কারণে কাজকর্ম কমে যায় এবং ঘুমের সমস্যা দেখা দেয়, যা ক্লান্তির কারণ হয়ে থাকে। অপর দিকে অবসাদ ও ক্লান্তি এক অন্যের পরিপূরক। উভয়ে একই কারণ থেকে উৎপত্তি লাভ করতে পারে।

স্ট্রোক:

স্ট্রোক হওয়ার পর যেসব রোগী বেঁচে থাকে, তাদের ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। স্ট্রোকের পর অনেক সময় অবসাদগ্রস্থতা দেখা যায়।

ক্লান্তিকে অবসাদগ্রস্থতা থেকে পৃথক করা যায়। অর্ধেকেরও বেশি স্ট্রোকের রোগীর ক্লান্তি দেখা যায় এবং এতে রোগীর দৈনন্দিন কাজকর্মের নির্ভরশীলতা অনুমান করা যায়।

দীর্ঘমেয়াদী ব্যথা:

সমাজে বৃদ্ধদের অর্ধেকেরও বেশির দীর্ঘমেয়াদী ব্যথা দেখা দেয়। বয়স্কদের বাতের ব্যথা অসামর্থ্যরে একটি অন্যতম কারণ।

দীর্ঘমেয়াদী ক্লান্তি সমস্যা:

মহিলাদের অল্পশিক্ষিত, যাদের আয় কম, সংখ্যালঘুদের সাধারণত দীর্ঘমেয়াদী ক্লান্তি দেখা যায়। পা কাড়ানো, ব্যথা, আশপাশের শ্বদ বা গোলমালের কারণে, মানসিক সমস্যা থাকলে এবং অনেক ওষুধ সেবন করলে রাতে ঘুম কম হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদী ক্লান্তির রোগীদের ৩ থেকে ৫ শতাংশেরও বেশি মানসিক সমস্যা থাকে।

কী পরিস্থিতিতে শরীরে ক্লান্তি দেখা দেয়, সেটাও বিবেচনায় আনতে হবে। যেমন- পরিবেশ, পরিবার, সমাজ, কাজ ও ব্যক্তিগত বিষয় এবং মানসিক চাপ ইত্যাদি ক্লান্তিতে ভোগে, তাদের একটা ক্ষুদ্র অংশ দীর্ঘমেয়াদি ক্লান্তিতে ভোগে। দীর্ঘমেয়াদি ক্লান্তি অন্যান্য অসুখের সাথে যুগপৎভাবে থাকতে পারে। যেমন- ফাইব্রোমায়ালজিয়া, অস্ত্রের সংবেদনশীলতা, বিভিন্ন ধরণের কেমিক্যাল সংবেদনশীলতা, দুশ্চিনতাযুক্ত মাথাব্যাথা, দীর্ঘস্থায়ী কোমরের ব্যথা। এদের অনেকেরই ক্লান্তি, ঘুমের সমস্যা, ব্যথা ও অসামর্থ্যতা থাকতে পারে।

দৌবল্য:

ক্লান্তি বয়স্ক দুর্বল রোগীদের একটি অপরিহার্য অংশ।

অসামর্থ্য:

যদি কোনো বয়স্ক লোকের দৈনন্দিন কাজকর্মে দুর্বলতা দেখা দেয়, তবে বুঝতে হবে তার অসার্মথ্যতা দেখা দিয়েছে। তার হাঁটাহাঁটিতে সীমাবদ্ধতা চলে আসবে, তার শরীরিক কাজকর্ম কমে আসবে। সে স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সেবা গ্রহণ করবে এবং তার মৃত্যু চলে আসবে।

ক্লান্তির কারণ:

বিভিন্ন ধরণের জৈবিক ও মানসিক ফ্যাক্টর ক্লান্তি বৃদ্ধি করতে পারে বা ক্লান্তির ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে। জৈবিক কারণগুলোর মধ্যে মাংসপেশির কাজের পরিবর্তন, হার্ট ও রক্তনালীর অসামর্থ্যথা, রক্তশূণ্যতা, শরীরে পানিশূন্যতা, ইলেকট্রোলাইটের অস্বাভাবিকতা ও পুষ্টির অভাব। মানসিক কারণগুলোর মধ্যে অবসাদ, ব্যথা, ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক চিন্তাভাবনা এবং অন্যান্য ব্যক্তির সাথে আচরণ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

মাংসপেশির পরিবর্তন:

শরীরের ৪৫ শতাংশ হলো মাংসপেশি। মাংসপেশির ভেতর প্রোটিন হিসেবে শক্তি সঞ্চিত থাকে। কাজেই, মাংসপেশির পরিমাণ যদি কমে যায়, তবে শক্তির প্রাপ্যতা কমে যায়। কাজ করার ক্ষমতা কমে যায় এবং কাজ করার সময় ক্লান্তি দেখা দেয়।

বয়সের সাথে সাথে শরীরে মাংসপেশির পরিমাণ কমে যায়। পঞ্চাশ বা ঘাটের ওপর বয়স হলে মাংসপেশি কমা শুরু হয়। অপুষ্টি, ক্ষুধামন্দা, অসুস্থ অবস্থায় শরীর শুকিয়ে যাওয়া, টেস্টোস্টেরনের পরিমাণ কমে যাওয়া ইত্যাদি হরমোনের পরিমাণ কমে যাওয়া ইত্যাদি কারণে মাংসপেশি কমে যায়।

মাংসপেশি কমা আর শক্তি কমা একসাথে হয় না। আগে মাংসপেশি কমে, পরে শরীরে শক্তি কমে যায়। শরীরে কী পরিমাণ অক্সিজেন দরকার তা নির্ভর করে শরীরে মাংসপেশির কাজের পরিমাণ কত।

মাইটোকন্ড্রিয়া:

মাইট্রোকন্ড্রিয়া শরীরে শক্তির প্রধান উৎস। শরীরে সব ধরণের বিপাকে যে এটিপি (ATP) দরকার হয় তা মাইটোকন্ড্রিয়াতে তৈরি হয়। মাইট্রোকন্ড্রিয়া অকার্যকর হলে শরীরে শক্তি তৈরি হয় কম, ফলে ক্লান্তি দেখা দেয়।

মাইট্রোকন্ড্রিয়াতে শক্তি তৈরি কম হলে অন্য উপায়ে শক্তি তৈরি হয় তখন শরীরে ল্যাকটিক এসিডের  (LACTIC ACID) পরিমাণ বেড়ে যায়। মাংসপেশিতে এসিডের পরিমাণ বেড়ে গেলে ক্লান্তি দেখা দেয়। ব্যায়াম করলে এই মাইটোকন্ড্রিয়া আকারে ও সংখ্যায় বৃদ্ধি পায়।

শরীরে পানিশূণতা ও ইলেকট্রোলাইটের অসার্থ্যতা:

বেশির ভাগ রোগীর ক্ষেত্রে সামান্য লবণ ও পানিশূতা দেখা দেয়। বয়সের সাথে সাথে এর প্রবণথা বাড়ে এবং মৃত্যুর ঝুঁকিও বেড়ে যায়।

মানসিক প্রতিরোধ বিষয়ক:

বয়স্কদের বিভিন্নভাবে ক্লান্তি দেখা দেয়, যেমন- মানসিক চাপ ও অবসাদগ্রস্থা ও ব্যক্তিগত আচরণের তারতম্যের কারণে। এসব কারণে প্রদাহের মাধ্যমে শরীরে ক্লান্তি দেখা দেয়। ক্লান্তি ও প্রদাহ একে অপরের সাথে যুগপৎভাবে অসুখের আচরণের কারণ হয়ে দেখা দেয়। অসম্পূর্ণ ঘুম, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, একাকিত্ব, কম সামাজিক কাজকর্ম ইত্যাদি অবসাদের কারণ এবং এতে ক্লান্তি দেখা দেয় তখন তা অবসাদের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

মানসিক ও সামাজিক প্রভাব:

ক্লান্তি বলতে সাধারণত শরীরে শক্তির অভাব বুঝায় এবং এই অভাবের কারণে শরীর ও মানসিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটে, তাকেই বুঝায় । ক্লান্তিকে সম্পূর্ণরুপে বুঝতে হলে অন্তর্নিহিত অসুখ, মানসিক অবস্থা ও সামাজিক অবস্থার বিষয়ে খোঁজখবর নিতে হবে।

যদি অস্টিও-আর্থ্রাইট্রিস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস ও ফাইব্রোমায়ালজিয়ায় আক্রান্ত মহিলাদের বলা হয় দিনের যে সময়ে তারা সবচেয়ে বেশি ক্লান্তিতে ভোগে তা লিখে রাখতে তবে, দেখা যাবে যে ফাইব্রোমায়ালজিয়া রোগীরাই সবচেয়ে বেশি ক্লান্তিতে তারতম্যও বেশি। শরীরিক কর্মক্ষমতা নির্ভর করে শরীরের ক্লান্তি ও ব্যথার ওপর। পক্ষান্তরে ক্লান্তি নির্ভর করে ঋণাত্বক মনোভাবের ওপর ও ধনাত্বক মনোভাবের অনুপস্থিতর ওপর।

অবসাদহীন রোগীর তুলনায় অবসাদগ্রস্থ রোগীরা প্রতিদিন অধিক ব্যথা অনুভব করে, জীবনের দৈনন্দিন ঘটনাগুলোকে কম উপভোগ করে এবং তাদের ওপর দৈনন্দিন ঋণাত্বক প্রভাব বেশি। মানসিক চাপ ও সামাজিক চাপের কারণে অনেক সময় ব্যথা, অবসাদ হতে পারে। এবং ঘুমেরও ব্যাঘাত ঘটতে পারে। এছাড়াও ক্লান্তি অনুভব হতে পারে। রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের রোগী,  যাদের ক্লান্তি দেখা দিয়েছে, তারা যদি বিভিন্ন ধরণের সামাজিক কাজকর্মে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখে, তবে তাদের ওপর ঋণাত্বক প্রভাব কম পড়বে। ফাইব্রোমায়ালজিয়া ও রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস রোগী যদি সামাজিক আচার অনুষ্ঠানে বা কাজকর্মে সম্পৃক্ত থাকে, তবে ওইদিন তাদের ক্লান্তি কম হবে কিন্তু পরের দিন ক্লান্তি বেড়ে যেতে পারে। রোগী মানসিক চাপ যত বেশি অনুভব করবে, ততই তার ক্লান্তি বেড়ে যাবে। কিন্তু যদি সে ধনাত্বক মানসিক অবস্থায় বজায় রাখতে পারে, তবে তার ক্লান্তি অনুভব হবে কম।

চিকিৎসা:

নিয়মিত ব্যায়াম।

বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা গেছে, রোঘী যদি নিয়মিত ব্যায়াম করে তবে ধীরে ধীরে তার ক্লান্তি কমে আসে।

ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা:

ওষুধের মাধ্যমে ক্লান্তির তেমন কোনো ভালো চিকিৎসা নেই। Fluoxetine নামক ওষুধ ক্লান্তি কিছুটা দূর করতে পারে।

আরও পড়ুনঃ হাই হিল সাস্থের অনেক ক্ষতিকর।

গণ সচেতনতায় ডিপিআরসি হসপিটাল লিমিটেড

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

16 + 15 =