হৃদরোগের চিকিৎসায় এনজিওপ্লাস্টি

হৃদরোগের চিকিৎসায় এনজিওপ্লাস্টি

পিটিকিএ বা পারকিউটিনিয়াস ট্রান্সলুমিনাল করোনারী এনজিওপ্লাস্টি হলো ইসকোমিক হাট ডিজিজের এক ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি। এ চিকিৎসার মাধ্যমে রক্তনালীতে চর্বি জমে বন্ধ প্রায় অথবা সম্পূর্ণ বন্ধ হৃদপিন্ডের রক্তনালী খুলে দেয়া হয়। ফলে হৃদপিন্ডে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক হয়। এ ধরনের চিকিৎসায় বুকে অপারেশনের প্রয়োজন হয় না। দ্ইু থেকে তিনি দিন হাসপাতলে থাকার প্রয়োজন হয়। কিন্তু খরচের পরিমাণ বেশি হয়।

করোনারী এনজিওগ্রাম করার পর করোনারী রক্তনালীর বা ধমনীর রোগের ধরন অনুযায়ী পরবর্তী চিকিৎসা কি হবে বা রোগীর অবস্থা কি হতে পারে তা সম্পর্কে একটা ধারণা করা যায়। এর মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয় কোন রোগীর বাইপাস অপারেশন লাগবে, কোন রোগীর এনজিওপ্লাস্টি লাগবে অথবা শুধু ওষুধ খেলেই হবে।

এনজিওপ্লাস্টি একটি বিশেষ ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি, যেখানে হৃদপিন্ডের ধমনীতে আইওপামিরো নামক ওষুধ প্রয়োগ করে বিভিন্ন এঙ্গেল থেকে এক্সরে করে হৃদপিন্ডের ধমনীর চর্বি জমে যে ব্লক হয়েছে তা দেখো হয় ও স্টেন্ট দিয়ে সারানো হয়। এনজিওপ্লাসিট করার পূর্বে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। সাথে একজন এটেন্ডেস থাকতে হবে। আপনার ডাক্তার আপনাকে বিস্তারিত জানাবেন। আপনার লিখিত অনুমতি থাকতে হবে। কিছু পরীক্ষা করে ফিটনেস দেখতে হয়। এনজিওপ্লাস্টি করার ৪ থেকে ৬ ঘন্টা পূর্বে কিছু খাওয়া যাবে না। এনজিওগ্রাম এর মত এনজিওপ্লাস্টির জন্য প্রয়োজন আধুনিক ক্যাথল্যাব। ক্যাথল্যাবে নেয়ার পর রোগীকে এক্সরে টেবিলে শোয়ানো হয়।

আয়োডিন সলিইশান দিয়ে এনজিওপ্লাস্টি করার স্থান পরীক্ষা করিয়ে নেয়া হয়। রোগী নিজেও দেখতে পারেন রক্ত নালীতে ওষুধ দেয়া হচ্ছে ও স্টেন্ট লাগানো হচ্ছে। এনজিওপ্লাস্টি শেষে রোগীকে অবজারবেশনে রাখা হয়। বেশি করে পানি খেতে বলা হয় যার ফলে শরীর থেকে রেডিও ওপেক ডাই বরে হতে পারে। এনজিওপ্লাস্টি করার পর রোগীকে এমনভাবে শুয়ে থাকতে বলা হয়, যাতে ডান অথবা বাঁ পা যেখান দিয়ে এনজিওপ্লাস্টি করা হয়েছে তা নাড়া যাবে না। পা নাড়ালে ফিমোরাল আর্টারী পাংচার এরিয়া থেকে রক্তপাত হতে পারে। ডান পান না নেড়ে থাকা রোগীর জন্য একটু কষ্টকর।

পিটিসিএ-এর জন্যে প্রয়োজন করোনীরী স্টেন্ট ও পিটিসিএ বেয়ারে মেটেল, স্টেট, কোবাল্ট ক্রোমিয়াম স্টেন্ট, ড্রাগ ইলুটিং স্টেট। শুধুমাত্র একটি বা দুটো করোনারী ধমনী আক্রান্ত হলে, রোগীর উপসর্গ থাকলে এবং ব্লকটি পিটিসিএ করারমত উপযুক্ত হলে পিটিসিএ করা উচিত। বর্তমানে তিনটি করোনারী ধমনী আক্রান্ত হলেও পিটিসিএ করা হয়। বয়স বেশি হলে ল্পেট ভেন্ট্রিকুলার কার্যক্ষমতা কমে গেলে, বুকে ব্যথা থাকলে, মহিলা রোগী হলে, বেশি করোনারী ধমনী আক্রান্ত হলে ও সাথে অন্য কোন জটিল রোগ থাকলে পিটিসিএ করা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়।পিটিসিএ করার পর রোগীকে কিছু ওষুধ দেয়া হয়, যা নিয়মিত খেতে হয়। এসপিরিন জাতীয় ওষুধ নিয়মিত খেতে হয়ে। চর্বি কমানোর ওষুধও খেতে হয় । রক্তের কোলেস্টোরলের স্বাভাবিক মাত্রা বজায় রাখার জন্যে খাদ্য অভ্যাসে কিছুটা পরিবর্তন আনতে হয়।

এক্ষেত্রে বরকেত্র টোটাল কোলেস্টারল ১৫০ মি. গ্রাম/ডিএল-এর কম, এলডিএল ৭০মি. গ্রাম/ডিএল এর কম, এইচডিএল ৪০মি.গ্রাম/ডিএল-এর বেশি ও ট্রাইগ্লিসারাইড ১৫০ এর কম রাখতে হয়। এর জন্য প্রয়োজন দৈনিক টোটাল ক্যালরির ৭% এর কম সম্পৃক্ত চর্বি ও ২০০ মি. গ্রাম এরকম কোলেস্টারলের খাওয়া। দৈনিক ১০-২৫ গ্রাম ফাইবার জাতীয় খাবার খেতে হবে। মাখন, ঘি, বাটার অয়েল বর্জন করতে হবে। দুগ্ধ ও দুদ্ধজাত খাবার, মিষ্টি, পেস্ট্রি, কেক, পায়েশ ইত্যাদি খাওয়া যাবে না। গরু, খাসি, হাঁস এবং প্রাণিজ চির্ব ও চর্বিযুক্ত মাংস পরিত্যাগ করতে হবে। মগজ, হাড়ের ভিতরের মজ্জা, চামড়া, ভুঁড়ি ইত্যাদি যে কোন প্রাণিরই হউক না কেন, তা ত্যাগ করতে হবে। ডিমের কুসুমটুকু কাওযা যাবে না। নারিকেল না খাওয়াই ভালো । মিঠা পানির তৈলাকত্ মাছ যেমন পাঙ্গাস, বোয়াল, রুই, কাতলা এগুলো এড়িয়ে চলাই ভালো।

খোলসযুক্ত জলজ প্রাণি যেমন চিংড়ি খাওয়া উচিত হবে না। কখনোই পেট পুরে খাওয়া যাবে না। পেট পুুরোপুরি ভরার অনুভূতি হওয়ার আগে খাওয়া বন্ধ করতে হবে। উচ্চ রক্তচাপ থাকলে খাওয়ার সময় পাতে কাঁচা লবণ, লবণ দিয়ে সংরক্ষিত খাবার, যেমন-চিপস, আচার, চানাচুর, লোনা মাছ এসব একদম খাওয়া যাবে না। তাই টেবিল থেকে লবণ দানিটি সরিয়ে ফেলাটাই বরং ভালো। তাছাড়া রান্নায়ও অতিরিক্ত লবণ ব্যবহার করা যাবে না।
যে কোন মূল্যে ধূমপান ত্যাগ করতে হবে। সাদাপাতা, জর্দা, নাস্যি, পান ইত্যাদি পরিহার করতে হবে। পরিমিত ব্যায়াম ও কায়িক পরিশ্রম করতে হবে। শারীরিক পরিশ্রম কতটুকু করা যাবে তা ইটিটির মাধ্যমে নির্ধারণ করে নেয়া প্রয়োজন। তবে রোগী বেশি অসুস্থ থাকলে সে ক্ষেত্রে ব্যায়াম ও পরিশ্রমের ব্যাপারে অনেক বিধি-নিষেধ মানতে হবে। তাই তখন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের কথামত চলতে হবে।

হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে জেনে নিতে হবে, কতটুকু হাঁটা-চলা রোগীর জন্যে নিরাপদ হবে। রোগী কতটা পর্যন্ত নিজে নিজে সিঁড়ি ভেঙ্গে উঠতে পারবেন, আদৌ সিঁড়ি বেয়ে উঠতে পারবে কিনা এ বিষয়গুলো চিকিৎসকের কাছ খেকে পরিষ্কারভাবে জেনে নেয়া বাঞ্চনীয়। তবে কমপক্ষে দৈনিক ৩০ থেকে ৬০ মিনিট করে সপ্তাহে ৩-৪ বার হাঁটা, জগিং, সাইকেল চালনা অথবা অন্যান্য মুক্ত বাতাসে ব্যায়াম করা যেতে পারে। উত্তম হলো সপ্তাহে প্রতিদিন এ পরিমাণ ব্যায়াম করা। বাড়তি ওজন অবশ্যই কমাতে হবে। ওজন কমানোর জন্য চর্বিযুক্ত খাবার সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে খাবার গ্রহণ করতে হবে। শরীরের ওজন স্বাভাবিক রাখার মাত্রা হলো বিএমআই ১৮.৫-২৪.৯ কেজির মধ্যে রাখা। আর কোমরের ব্যাস পুরুষের ক্ষেত্রে ৪০ ইঞ্চি বা তার কম রাখতে হবে। উক্ত রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস অবশ্যই নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। রক্তপাচ ১৪০/৯০ এর কম রাখতে হয়। তবে হার্ট ফেলিউর কিডনীজনিত সমস্যা অথবা ডায়াবেটিস থাকলে ১৩০/৮০ এর কম রক্তচাপ রাখতে হয়।

আরও পড়ুনঃ প্রেসমেকার কি, কখন দরকার?

গণ সচেতনতায় ডিপিআরসি হসপিটাল লিমিটেড

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*