মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অতি সম্প্রতি জাতীয় ঘুম সচেতনাত সপ্তাহ পালিত হয়েছে। এ উপলক্ষে পরিচালিত একটি জরিপ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আমেরিকানারা ঘুম, জীবনে ঘুমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এবং পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া জনিত বিড়ম্বনা ইত্যাদি সম্পর্কে দুঃখজনকভাবে অজ্ঞ। এই অজ্ঞতা কতটা মারাত্মক? নিম্নে বর্ণিত তথ্যে তার অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে:
প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তিদের প্রতিদিন গড়ে ৮/৯ ঘন্টা ঘুম প্রয়োজন। কিন্তু অধিকাংই মাত্র ৭/৯ ঘন্টা ঘুম প্রয়োজন। কিন্তু অধিকাংশ মাত্র ৭ ঘন্টা ঘুমাতে পারে। ১৯৯৭ সালের শেষ দিকে এবং ১৯৯৮ সালের গোড়ার দিকে এ ব্যাপারে ১০২৭ জন প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তির উপর জরিপ চালানো হয়। তাদের এক- তৃতীয়াংশ এক কর্ম সপ্তাহে ছয় ঘন্টা বা তার কম ঘুমিয়েছেন।
জরিপকৃতদের দুই-তৃতীয়াংশ জানায় তাদের ঘুম সম্পর্কিত সমস্যা রয়েছে, যেমন- নিদ্রাহীনতা, নাকডাকা বা পায়ের অস্থিরতা সম্পর্কিত লক্ষণাবলী। এর ফলে পা অনিয়ন্ত্রীভাবে কাঁপে এবং পেশীর সমস্যা দেখা দেয়। কিন্তু শতকরা পাঁচ ভাগ লোক এ ব্যাপারে চিকিৎসক বা ঘুম বিশেজ্ঞর সাথে পরামর্শ করেছেন। এক- তৃতীয়াংশের বেশি বলেন, তারা দিনের বেলায় এতোই নিদ্রালু হয়ে পড়েন যে, তাতে তাদের কাজকর্ম ব্যাহত হয়। তেইশ শতাংশ বিগত বছরে গাড়ি চালানোর সময় ঘুমিয়ে পড়ার কথা স্বীকার করে। জাতীয় মহাসড়ক ট্রাফিক নিরাপত্তা প্রশাসনের হিসেবে অনুযায়ী তন্দ্রাচ্ছন্দ চালকরা প্রতি বছর ১ লাখ সড়ক দুর্ঘটনা, ১ হাজার ৫শত যানবাহন সংশ্লিষ্ট মৃত্যু এবং ৭১ হাজার জখমের জন্য দায়ী।
কোনো ব্যক্তির ঘুমের চাহিাদ জীববিদ্যাগতভাবে নির্ণীত হয়।কাজকর্ম চালিয়ে যাওয়ার জন্য ঘুমের প্রয়োজন হয়। কারো প্রয়োজন হয় ১০ ঘন্টা, তবে অধিকাংশ প্রাপ্ত বয়স্ক লোকের বেলায় প্রতিরাতে কমপক্ষে ৮ ঘন্টা ঘুমের প্রয়োজন হয়।
প্রকৃতপক্ষে ১৯০০ শতাব্দীর গোড়ার দিকে বৈদ্যুতিক বাল্বের ব্যাপক ব্যবহার এবং টেলিভিশন ও ইন্টারনেটের মতো ঘুম নাশক বস্তুও আবির্ভাবের আাগে প্রাপ্তবয়স্করা গড়ে প্রতিরাতে ৯ ঘন্টা করে ঘুমাতে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, যখন সময়ের সকল বাধা-বিপত্তি অপসারন করে লোকদেরকে তাদের ইচ্ছেমতো ঘুমাতে দেওয়া হয়, তখন তারা বানরকুলের মতো প্রতি ২৪ ঘন্টায় ১০.৩ ঘন্টা ঘুমায়।
বৃটিশ কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ু-মনোবিজ্ঞানী ড. স্টানলি কোরেন হিসেবে করে দেখেছেন, উচ্চ প্রযুক্তকির ঘুড়ির কাটায় বাধা জীবনধারার সুবাদে আমেরিকানদের ঘুমের ঘাটতি বর্তমানে বাড়ছে। যার পরিমাণ বছরে ৫শ ঘন্টা। ডেট্রয়েটের হেনরী ফোর্ড হেলথ সায়েন্স সেন্টারের ঘুম বৈকল্য কেন্দ্রের ড. নাওমি ব্রেসলও ও তার সহকর্মীরা গত শরতে এই মর্মে রিপোর্ট করেন যেমন, মাত্র এক ঘন্টার ঘুম ঘাটতির পরই দিবাকালীন নিদ্দ্রালুতার বৃদ্ধি নির্ণয় করা যেতে পারে।
১ হাজার ৭ জন তরুণ প্রাপ্ত বয়স্কেদের মধ্যে সমীক্ষা চালিয়ে এক গবেষক দেখতে পান যে, দিনের বেলায় ঐসব লোকের তন্দ্রাচ্ছন্ন হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, যারা অবিবাহিত ও পূর্ণ কর্মঘন্টা কাজ করে, ঘুমের ঘোরে যাদের নাক ডাকে এবং যাদের বড় ধরনের বিষণ্ণতার ইতিহাস রয়েছে।
বেশিরভাগ লোক শুধুমাত্র কিছুটা ক্লান্তি অনুভব করাকালীন অপর্যাপ্ত ঘুমের প্রতিক্রিয়া কমিয়ে আনার চেষ্টা করলেও ঘুম বঞ্চিত লোকদের উপর সমীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে, তারা কম দক্ষ এবং বেশি খিটখিটে।
বিশ্রাম ঘুমের যথাযথ বিকল্প নয়। আপনি যদি ক্লান্ত অবস্থায় অথবা একটি উষ্ণ ও অন্ধকার কক্ষে শান্তভাবে থাকাকালীন অথবা সঙ্গীত বা বক্তৃতা শোনার সময় তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন, তাহলে বুঝতে হবে আপনি ঘুম বঞ্চিত। ওয়াশিংটনের অলাভজনক সংস্থা ন্যাশনাল স্লীপ ফেডারেশন জানায়, ক্লান্তি ঘুমের কারণ ঘটায় না, বরং ঘুমের স্বরুপ উদঘাটন করে মাত্র। জৈবিক ঘটনাপ্রবাহের বিত্তিতে দুপুর ১টা থেকে ৪টা এবঙ রাত ২টা থেকে ভোর ৬টার মধ্যবর্তী সময়ে ঘুমঘুম ভাব অনুভব করা স্বাভাবিক। বিকেলের শান্ত সময়ে বহু আমেরিকান যখণ ক্যাফেইন পানীয় পানের জন্য পৌছে, বহু দেশে তখন দিবানিদ্রার সময়। আপনার তখন কাপ হাতে নেওয়ার পরিবর্তে বিছানায় যাওয়াই উত্তম।
ফাউন্ডেশন তাই ঘুম বঞ্চিতদের জন্য নিম্ন বর্ণিত ব্যবস্থাপত্র দিয়ে থাকে, শেষ বিকেলে ও সন্ধ্যায় ক্যাফাইন, নিকোটিন ও এলকোহল এড়িয়ে চলুন, নিয়মিত ব্যায়ম করুন, তবে শুতে যাওয়ার কমপক্ষে ৩ ঘন্টা আগে এটা করুন, আয়েশের সাতে ঘুমানোর সময়সূচী প্রতিষ্ঠা করুন, শুধুমাত্র ঘুমানো ও যৌনকর্মের জন্য আপনার বিছনা ব্যবহার করুন, পড়াশুনা বা টেলিভিশন দেখার জন্য বিছানা ব্যবহার করবেন না, আধাঘন্টার মধ্যে আপনি ঘুমিয়ে না পড়লে বিছানা থেকে উঠে পড়ুন, প্রতিদিন এমনিকি সপ্তাহান্তেও একই সময়ে ঘুমাতে যান ও জেগে উঠুন এবং আপনার যদি রাতে ঘুমিয়ে পড়ায় সমস্যা থাকে তাহলে দিবানিদ্রা এড়িয়ে চলুন।
অপরদিকে জনপ্রিয় বিশ্বাসের বিপরীতে একটি তথ্য হচ্ছে, প্রাপ্ত বয়স্কদের অধিকতর বৃদ্ধ হওয়াকালীন ঘুমের চাহিদা হ্রাসা পায় না। তবে বৃদ্ধ লোকদের ঘুম নানা করণে বাধাগ্রস্থ হয়। যেমন- বাথরুম ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা, ব্যথা এবং জটিল পীড়ার অন্যান্য অসুবিধা। যারা রাতে কম ঘুমান তাদেরকে ঘাটতি পুষিয়ে নিতে দিনে বেশি ঘুমাতে হয়।
যে লাখ লাখ লোক নিদ্রাহীনতা, উচ্চশব্দে নাকডাকা এবং পায়ের অস্থিরতা সংক্রান্ত লক্ষণাবলীর মতো ঘুম বৈকল্যে ভুগছেন এবং যাদের ঘুমচক্র বেতাল হয়ে গেছে তাদের জন্য স্লীপ ফাউন্ডেশনের সুপারিশ হলো একজন ঘুম বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ করুন। উদাহরণ স্বরুপ বলা যায়, উচ্চশব্দে নাকডাকা ঘুমের ঘোরে শ্বাস বন্দের একটি লক্ষণ হতে পারে। প্রতিরাতে বহুবার এই শ্বাসরোধের ঘটনা ঘটতে পারে যা সংশিষ্ট ব্যাক্তি বোঝাতে পারেন। উক্ত শব্দের এই নাকডাকা প্রবণতা গুমকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে এবং দিবাকালীন ভীষণ নিদ্রালুতার কারণ ঘটায়।
ঘুমের ঘোরে শ্বাসরোধ প্রবণতার চিকিৎসা করা না হলে মারাত্মক দুর্ঘটনা, উচ্চ রক্তচাপ এবং আকস্মিক মৃত্যু হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের শত শত মেডিকেল সেন্টারে স্লীপ ক্লিনিক আছে এবং ওয়াশিংটনস্থ ন্যাশনাল স্লীপ ফাউন্ডেশন সরকারীভাবে স্বীকৃত সেন্টারগুলো তথ্য যোগায়। মনে রাখবেন ঘুম সমস্যা ব্যর্থতার খেসরারত অনেক বেশি হতে পারে।
medicalbd সাস্থের সকল খবর।

