গর্ভাবস্থায় মায়ের মৃত্যুর কারণ ও প্রতিকার

গর্ভাবস্থায় মায়ের মৃত্যুর কারণ ও প্রতিকার

প্রসবকালে জটিলতা পরিহার করার একজন গর্ভবতীকে নিয়মিতভাবে অ্যান্টিনেটাল চেকআপ রাখা একান্ত প্রয়োজন, যাতে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ প্রসূতিকে সময়মতো হাপাতালে বা মাতৃমঙ্গল কেন্দ্রে প্রসবের ব্যবস্থা করা যায়।

মা হওয়া প্রতিটি মেয়ের জীবনের ঐকান্তিক ইচ্ছা ও কামনা। মাতৃত্বে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। উন্নত দেশগুলোতে বর্তমানে মায়ের মৃত্যুহার খুবই কম, পরিসংখ্যান অনুযায়ী শতকরা ০.০২ ভাগ অর্থ্যাৎ প্রতি হাজারে মাত্র দু’জন। অথচ আজে আমাদের দেশে শতকরা ৫ থেকে ৬ ভাগ বা প্রতি হাজারে ৫০ থেকে ৬০ জন মহিলা মাতৃত্ব বরণ করতে গিয়ে অকালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। এ দেশে এখানো একজন মা গড়ে পাঁচ থেকে ছয়টি সন্তানের জন্ম দিয়ে থাকেন।

মায়ের মৃত্যুর প্রধান কারণ:

১. একলাম্পসিয়া(Eclampsia) বা গর্ভাবস্থায় খিঁচুনি রোগ।
২. সেপটিক অ্যাবরশন (Septic abortion) বা গর্ভাপাত পরবর্তী সংক্রমণ ও প্রদাহ।
৩. গর্ভাবস্থায় বা প্রসবোত্তর রক্তস্রাব।(Hemorrhage)
৪. বাধাপ্রাপ্ত প্রসব(Obstructed labor)
৫. প্রসবোত্তর সংক্রমণ ও প্রদাহ (Puerperal sepsis)

প্রথমোক্ত কারণটি হচ্ছে সবচেয়ে মারাত্মক ও গুরুত্বপূর্ণ। প্রসূতি-মৃত্যুর প্রতি ১০০ জনের মধ্যে প্রায় ৩০ জনই মারা যান এ ঘাতক ব্যাধির কারণে। এ ঘাতক ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার পূর্বলক্ষণকে বলা হয় প্রি-একলাম্পাসিয়া। এ রোগটি সাধারণত গর্ভাবস্থার শেষ দিকে বা সাত মাসের পর দেখা দেয়।
এ সময় প্রসূতির পা ফুলে যায়, এমনকি সমস্ত শরীরও ফুলে যেতে পারে। ওজন অস্বাভাবিক রকম বৃদ্ধি পায়। প্রস্রাবের সাথে অ্যালবুমিন দেখা দেয় এবং রোগীর উচ্চ রক্তচাপ দেখা দেয় এসব গর্ভবতীর এ রকম সঙ্কটজনক পরিস্থিতির সুচিকিৎসা না করালে পরবর্তীকালে তারা একলাম্পাসিয়া নামক এ বিভীষিকাময় রোগের শিকার হয়।

এরপর আসছে সেপটিক অ্যাবরশন কথা। আমাদের দেশে আজ পরিকল্পিত পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা খুবই সহজলভ্য। প্রতিটি শহর, জেলা, থানা, এমনকি গ্রামেও পরিবারকল্যাণ ব্যবস্থার বিভিন্ন প্রকল্প বা সংস্থা আছে। তবুও অনেকেই এ ব্যবস্থা সম্বন্ধে অজ্ঞ। যার পরিপ্রেক্ষিতে অনাকাঙ্খিত বা অপরিকল্পিতভাবে গর্ভসঞ্চার ঘটে যায়। তখন এ অনাকাঙ্খিত সন্তানের বোঝা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য অনেকেই অশিক্ষিত ও অনাকাঙ্খিত দাইয়ের হাতে যেনতেনভাবে গর্ভপাত করানোর ঝুঁকি নিতে হয়। ফলে এসব মহিলার অনেকেই মারাত্মক রকমের জননেন্দ্রিয়ের সংক্রমণের শিকার হন। অত্যধিক রক্তক্ষরণে এবং মারাত্মক সংক্রমণ ও প্রদাহে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৬০ থেকে ৮০ হাজার মহিলা মৃত্যু বরণ করে। যারা মৃত্যুর মরণ ছোবল থেকে বেঁচে যায তারাও চিররোগা ও ভগ্নস্বাস্থ্যের শিকারে পরিণত হয় এবং ধুঁকে ধুঁকে জীবনের বাকি দিনগুলো দুর্বিষহ কষ্ট ও যাতনার মধ্য দিয়ে যাপন করে।

এরপর আসে গর্ভাবস্থায় এবং প্রসবোত্তর রক্তস্রাবের কথা। গর্ভাবস্থায় ২৮ সপ্তাহের পর যোনিপথে রক্তস্রাব হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে, তাকে বলা হয় ‘অ্যান্টিপারটেম হেমারেজ’ (Antepartem hemorrhage) । এ অবস্থা হতে পারে প্রধানত দুটি কারণে- প্রথমত, রোগিনী উচ্চ রক্তচাপে ভুগলে ও তার প্রস্রাবে অ্যালবুমিন থাকলে বা প্রি-একলাম্পটিক টকসিমিয়াতে ভুগলে। এ দুটি অবস্থার সুচিকৎসা সম্ভব উপযুক্ত সময়ে নিয়মিত ‘এ্যান্টিনেটাল চেকআপের মাধ্যমে’। প্রসবোত্তকালে রক্তক্ষরণ হওয়ার প্রধান কারণ হলো গর্ভফুল মাতৃজঠরে আটকে যাওয়া। সন্তান প্রসব হওয়ার পর গর্ভফুর বের হয়ে আসতে আধা ঘন্টার চেয়ে বেশি সময় পার হলে আমরা তাকে বলি রিটেইসড প্লাসেন্টা (Retained placenta)

এ রকম অবস্থায় রোগিনীকে নিকটস্থ কোনো হাসপাতাল বা মাতৃমঙ্গল কেন্দ্রে স্থানান্তিরিত করে তার রক্তাসল্পতা থাকলে তাকে জরুরি ভিত্তিতে রক্ত সঞ্চালনের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি তাকে অজ্ঞান করে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে গর্ভফুল বের করে নিয়ে আসতে হবে। এ সময় যাতে সংক্রমণ না হয় তার জন্য উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক দেয়া একান্ত প্রয়োজন।

প্রসবকালে জটিলতা পরিহার করার জন্য একজন গর্ভবতীকে নিয়মিতভাবে অ্যান্টিনেটাল চেকআপ রাখা একান্ত প্রয়োজন, যাতে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ প্রসূতিকে সময়মতো হাসপাতালে বা মাতৃমঙ্গল কেন্দ্রে প্রসবের ব্যবস্থা করা যায়।

প্রসবোত্তর সংক্রমণ প্রতিরোধ করা খুব সহজ যদি প্রতিটি শহর, গ্রাম ও উপজেলা পর্যায়ে টিবিএ‘র (Traditional Birth Attendant) ব্যবস্থা করা যায় এবঙ ধাত্রীদেরকে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে প্রসব সম্পর্কে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যায়।

প্রতিটি ঘরে পরিবার কল্যাণের কথা পৌঁছে দিতে পারলে এবং প্রতিটি গর্ভবতী উপযুক্ত অ্যান্টিনেটাল চেকআপ দিতে ও প্রসবের সুষ্ঠু ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে আমরা আমাদের দেশে এসব প্রতিরোধযোগ্য রোগে মায়ের মৃত্যুর হার অনেকটা কমিয়ে আনতে পারি।

আরও পড়ুনঃ সাদাস্রাব স্বাভাবিক/অস্বাভাবিক (পর্ব- ১)

গণ সচেতনতায় ডিপিআরসি হসপিটাল লিমিটেড

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*