বাংলাদেশে ফিজিওথেরাপি পেশার একাল-সেকাল

বাংলাদেশে ফিজিওথেরাপি পেশার একাল-সেকাল (world physiotherapy day)

জীবন ও জীবিকার জন্য, ভাব আদান-প্রদানের জন্য যোগাযোগের জন্য শরীরকে সচল, গতিশীল ও কর্মক্ষম রাখতে শারীরিক মুভমেন্টের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত যে কোন বয়সে যে কোন কারণে শারীরিক মুভমেন্টের সমস্যাগুলির ক্রমবর্ধমান উর্দ্ধগতিকে কেন্দ্র করে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার গুরুত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে খুবই দ্রুততার সঙ্গে। বিশ্বব্যাপী নন-কমিউনিক্যাবল ডিজিজেস, অবেসিটি, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, স্ট্রোক, বাত, ব্যথা, প্যারালাইসিস, ক্যান্সার ও অন্যান্য রোগজিনত কারণে মুভমেন্টে সমস্যাগ্রস্থ ও শারীরিক অক্ষম রোগীদের অতি দ্রুত বৃদ্ধিকে একবিংশ শতাব্দীতে স্বাস্থ্য সেবার সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা ও শিক্ষার আধুনিকায়নের মাধ্যমে এর যথাযথ প্রয়োগের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ এ রোগসমুহের মহা প্রাদুর্ভাবের পাশাপাশি একদিকে যে হারে দিনে রাতে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে প্রাকৃতিক ও মানুষ সৃষ্ট দুর্যোগ লেগেই আছে, এমনি অবস্থায় এ ধরনের রোগীদের সংখ্যা যে ভয়াবহ রুপ নিচ্ছে তাতে কোন সন্দেহ নাই। এই সংখ্যা যে কত তারও কোন সঠিক পরিসংখ্যান নেই, যদিও কিছু পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, বাংলাদেশের শতকরা ১০ ভাগ মানুষ শারীরিক প্রতিবন্ধী।

মুক্তিযুদ্ধের র্দীঘ ৩০ বৎসর পূর্বে পাকিস্তানের এই অংশে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা শিক্ষার কোন সুব্যবস্থা না থাকায় আমাদের দেশের জনসাধারন র্দীঘকাল থেকে এই চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত ছিল।

অপরদিকে, পাকিস্তানের অপর অংশে লাহোর ও করাচিতে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা শিক্ষার ব্যবস্থা থাকায় ঐ অংশে এর প্রসার ঘটে এবং মাঝে মধ্যে ২/১ জন বাঙ্গালী আন্তঃপ্রাদেশিক বৃত্তি গ্রহন করে ফিজিওথেরাপি শিক্ষার সুযোগ পেলেও পূর্ব পাকিস্তানে ফিজিওথেরাপিষ্টদের জন্য কোন সরকারি/বেসরকারি চাকুরির ব্যবস্থা না থাকায় তারা তখন দেশে চিকিৎসা সেবা প্রদান করতে ব্যর্থ হয় ফলশ্র“তিতে অনেকেই বিদেশে চলে যায়। বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) ১৯৬০ সালে দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে ফিজিওথেরাপি বিভাগ চালু হয়।

১৯৭১ সনে মহান মুক্তিযদ্ধের অবসানের পর হাজার হাজার যুদ্ধাহত পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা ও জনসাধারনের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে ফিজিওথেরাপিষ্টদের প্রয়োজন দেখা দিলে জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহবানে বিভিন্ন দেশ থেকে স্বেচ্চাসেবী ফিজিওথেরাপিষ্ট এসে সাময়িকভাবে চিকিৎসা কার্য পরিচালনা করা হয় এবং জরুরীভিত্তিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট ও অষ্ট্রেলিয়ার ফিজিওথেরাপি সিলেবাসের সমন্বয়ে একটি সিলেবাস প্রণয়ন করে সরকারি অনুমতি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা অনুষদের অধীনে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসাপাতালে তদানীন্তন পরিচালক Dr.R.J.Gust সাহেব ১৯৭৩ সনে ২৫জন ছাত্র-ছাত্রী ভর্তির মাধ্যমে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা শিক্ষার ডিগ্রি চালু করেন।

তখন থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন ফ্যাকাল্টি হতে এমবিবিএস ও বিডিএস এর ন্যায় ফিজিওথেরাপি বিষয়ে গ্রাজুয়েশন ডিগ্রি (বিএসপিটি) এর অগ্রযাত্রা শুরু হয়, যাহা বর্তমানে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পূনবার্সন প্রতিষ্ঠান (নিটর) এ পরিচালিত। পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারী হাসপাতালে ফিজিওথেরাপি বিভাগ চালূ হয়।যেখানে দেশী-বিদেশী ফিজিওথেরাপিষ্টরা কর্মরত ছিলেন। তারপর বিদেশীদের চলে যাওয়া আর দেশি ফিজিওথেরাপিষ্টদের সবাই ক্রমান্বয়ে অবসর গ্রহণ করেন। তাই সরকারী হাসপাতালগুলোতে ফিজিওথেরাপি বিভাগ লক্ষ্য করা যায়, ১/২ জন ছাড়া সরকারী নিয়োগপ্রাপ্ত ফিজিওথেরাপিষ্ট নেই। যদিও বর্তমানে বাংলাদেশে ১২০০ জনের অধিক বিএসপিটি/ বিপিটি ডিগ্রীপ্রাপ্ত ফিজিওথেরাপিষ্টগণ বেসরকারী পর্যায়ে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা প্রদান করে যাচ্ছেন।

ফিজিওথেরাপিষ্ট কে? এবং ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা কে দিবেন

সে ব্যাপারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), ওয়ার্ল কনফেডারেশন অব ফিজিওথেরাপি (WCPT), বাংলাদেশ সরকারের ১৯৮৫ সনের গ্যাজেট নোটিফিকেশন, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক সাময়িক সুর্নিদিষ্ট নীতিমালা থাকা সত্বেও একশ্রেণী স্বার্থন্বেশী মহল বিভিন্ন হাসপাতালে ফিজিওথেরাপিষ্ট নিয়োগের পরিবর্তে শুধুমাত্র ফিজিওথেরাপি সহকারী কিংবা এটেনডেন্ট নিয়োগ দিয়ে কতগুলি যন্ত্রপাতির ব্যবহার শিখিয়ে ফিজিওথেরাপির নামে শুধুমাত্রকতিপয় ইলেক্ট্রোথেরাপি চালিয়ে যাচ্ছে, যেগুলোর বেশীরভাগেরই কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। জেনে না জেনে যন্ত্রের ব্যবহারে একদিকে রোগীরা যেমন বিভিন্ন রকম পাশ্বপ্রতিক্রিয়ার শিকার হচ্ছে। অন্যদিকে না বুঝে যত্রতত্র ফিজিওথেরাপি গ্রহণ করে রোগীরা শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। একশ্রেণী সুবিধাবাদী গোষ্ঠী কিছু যন্ত্রপাতি কিনে ফিজিওথেরাপির নামে রোগীদের সাথে প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছে, যা এ পেশা ও পেশাজীবিদের সম্মান ক্ষুন্ন করছে প্রতিনিয়ত।ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার এই অব্যবস্থা এবং চিকিৎসক স্বল্পতার জন্য দেশের ভূক্তভোগী রোগীরা ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার জন্য পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত সহ থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে পাড়ি জমায়। এতে বিদেশে, দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার যেমন দ্বৈন্যতা প্রকাশ পায় তেমনি বৈদেশিক মূদ্রার ও অপচয় হয়।

বাংলাদেশের জনগোষ্ঠির একটা বড় অংশ বয়স্ক নাগরিক, যারা হাড়-জোড় ও মাংস পেশীর ক্ষয়জনিত কারনে বিভিন্ন রকম ব্যথা বেদনায় আক্রান্ত হয়ে কষ্টকর জীবন-যাপন করেন। অন্যদিকে যারা বিভিন্ন রকম কৃত্রিম, প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা জনিত ও জন্মগত কিংবা বিভিন্ন রকম রোগে আক্রান্ত হয়ে শারীরিক ভাবে অক্ষম এই বিপুল পরিমাণ অক্ষম জনগোষ্ঠিকে সুস্থ্য, গতিশীল ও স্বাভাবিক কর্মক্ষম জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য যেখানে বিশ্বব্যাপি ফিজিওথেরাপি-ই-বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত অন্যতম চিকিৎসা পদ্ধতি সেখানে বাংলাদেশে এই চিকিৎসা সেবা সিমাহীন দৈন্যদশা ও চরম অবমূল্যায়নের শিকার।

স্বাস্থ্য সেবায় প্রকৃত উন্নয়নের জন্য ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার কোন বিকল্প নেই। সারা বিশ্বে চিকিৎসা বিজ্ঞানের সকল বিষয়ের সাথে সাথে ফিজিওথেরাপি তার নিজস্ব ভাবমূর্তি নিয়ে অগ্রসরমান। ফিজিওথেরাপিষ্ট ও ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার উন্নয়নে বর্তমান সরকার জাতীয় স্বাস্থ্য নীতিতে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা পেশাকে অন্তর্ভূক্ত করেন।

আরও পড়ুনঃ ফিজিওথেরাপি’র ইতিহাস লিখেছেন- ডা. মোঃ সফিউল্যাহ্ প্রধান।

ডা. মোঃ সফিউল্যাহ্ প্রধান

পেইন প্যারালাইসিস ও রিহেব-ফিজিও বিশেষজ্ঞ
যোগাযোগঃ-ডিপিআরসি হাসপাতাল( ২৯ প্রবাল হাউজিং,রিং-রোড,শ্যামলী,ঢাকা-১২০৭)
সিরিয়ালের জন্য ফোনঃ-  +8801997702001; +8801997702002
www.dprcbd.com
www.bdtodays.com
www.shafiullahprodhan.com
www.medicalbd.info
www.dhakatv.info

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*