বর্তমান বিশ্বের মুখের ক্যান্সার একটি ভয়াবহ সমস্যা। কারণ উন্নত বিশ্বে বা উন্নয়নশীল দেশে এর হার খুব উচ্চ। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভূটান সহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মুখের ক্যান্সারের হার প্রায় ৪০% । পক্ষান্তরে ইংল্যান্ড, আমেরিকার মতো উন্নত দেশেমুখ গহ্বরের ক্যান্সারের হার বর্তমানে ১-২% এর বেশি নয়। এর কারণ মানুষের জীবন যাত্রার মান, খাদ্যাভাস এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা এর সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার বিভিন্ন জরিপ অনুযায়ী দেখা যায় যে, ধূমপান, মদ্যপান, পান-সুপারির সাথে জর্দ্দা খাওয়া, দাঁতের গোড়ায় গুল লাগানো, তামাক পাতা বা সাদা পাতা চিবানো, হুক্কা খাওয়া, নড়বড়ে কৃত্রিম দাঁত ব্যবহার করা, ভাঙ্গা বা ধারালো দাঁতের আঘাতে ক্ষত কিংবা মুখের মধ্যস্থিত দীর্ঘ মেয়াদী ক্ষত বা ইনফেকশন ইত্যাদির সাথে নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে মুখের ক্যান্সারের।
উন্নয়নশীল দেশে উল্লেখিত চিহ্নিত কারণগুলো বহুকাল ধরেই বিদ্যামন। আমাদের দেশে যাদরে নুন আনতে পান্তা ফুরায় তাদের মধ্যে এসব বদ অভ্যাসের হার খুবই বেশি। পান বিড়ির অভ্যাস এর মধ্যে প্রধান। এর ফলে মুখের ক্যান্সারও তাদের মধ্যেই বেশি। পান বিড়ির অভ্যাস এর মধ্যে প্রধান। উন্নত বিশ্বে বিশেষ করে ইংল্যান্ডে ওয়েলসে অবশ্য একটি বিষয় লক্ষ্যণীয় তাহলো-মহিলাদের মধ্যে মুখের ক্যান্সারের হার ক্রমান্বয়ে বাড়তির দিকে। একটি গবেষণামূলক সমীক্ষায় দেখা যায় ইংল্যান্ডে ষাটের দশকের চেয়ে আশির দশকে মহিলাদের মুখের ক্যান্সরের কারণে মৃত্যুর হার ৪০% বেশি। এ ছাড়া কম বয়সী ছেলেদের মধ্যেও এর হার কম নয়। এর একটি বড় কারণ হলো বিচ্ছিন্ন জীবনাচরণ, বিবাহ বিচ্ছেদ, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে স্বাচ্ছন্দ্যের অভাব, হতাশা ইত্যাদির কারণে সেখানকার মহিলা এবং কমবয়সী ছেলেরাও ধূমপান, মদ্যপান ইত্যাদিতে ভীষণভাবে আসক্ত হয়ে পড়েন।
আবার বাংলাদেশসহ অন্যান্য এশীয় দেশ থেকে যারা অভিবাসী হয়ে সেখানে বসবাস করছে তাদের মদ্যেও পান খাওয়ার বদ অভ্যাসখানা বহাল তবিয়তে থেকে যাওয়ায় মুখের ক্যান্সারের হার বাড়ছে বলে উক্তগবেষণা রিপোর্ট প্রকাশ পায়। ১৯৯০ সালে যুক্তরাজ্যে প্রায় ২০০০ নতুন মুখের ক্যান্সার রোগী সনাক্ত করা হয়, খাদ্যের মধ্যে ১০০০ জন সে বছরই মৃত্যুবরণ করে। অবশ্য এ মৃত্যু হার রোগীর বয়স বাড়ার সাথে খুবই সঙ্গতিপূর্ণ। এদের মধ্যে অধিকাংশ রোগীর বয়সই ৫০ বছরের উর্ধ্বে । প্রকৃত পক্ষে মুখের ক্যান্সার বিশ্বব্যাপী মহিলাদের চেয়ে পুরুষদের মধ্যেই বেশি। অবশ্য ইংল্যান্ডে ১৯৪০ সালে ৫ জন পুরুষের বিপরীতে ১ জন মহিলার মুখে ক্যান্সার পাওয়া যেত। ১৯৯০ সালে তা পরিবর্তিত হয়ে ২ জন পুরুষের বিপরীতে ১ জন মহিলার মুখে ক্যন্সার লক্ষ করা যায়।
সর্বোপরি মুখের ক্যান্সারের রোগীর জীবনকাল মাত্র ৫০% ক্ষেত্রে ৫ বছরের বেশি নয়। অবশ্য তাও নির্ভর করে মুখের কোন স্থানে ক্যান্সার হয়েছে তার উপর। এর মধ্যে ঠোঁটের ক্যান্সার রোগীর আয়ুষ্কাল সবচেয়ে বেশি এবং মুখগহ্বর তলায় ক্যান্সার রোগীর আয়ুষ্কাল সবচেয়ে কম। মুখের ক্যান্সার রোগীর ৫ বছর জীবনকালের উপর ইংল্যান্ডে ও ওয়েলসে পরিচালিত এক তুলনামূলক গবেষণা সমীক্ষার রিপোর্ট পাঠকদের উদ্দেশে নিম্নে তুলে ধরা হলো:
মুখের ক্যান্সারের স্থান : শতকরা হার ৫ বছর জীবনকাল :
পুরুষ/মহিলা
১. ঠোঁট ৯৪% / ৭১%
২. জিহ্বা ৩৭% / ৪৩%
৩. দাঁতের মাঢ়ি ৪১% / ৫৮%
৪. মুখগহ্বরের তলদেশ ৩৯% / ৫২%
৫. মুখের অন্যান্য স্থান ৫১% / ৫৬%
সূত্র: ইংল্যান্ড এন্ড ওয়েলস ক্যান্সার রিসার্স ফ্যাক্টসিট, ১৪.৩.১৯৯০)
উক্ত গবেষণা রিপোর্টে মুখের ক্যান্সারের প্রধান কারণ সমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
১. টোবাকো (ধূমপান, তামাক, জর্দ্দা, সাদাপাতা ইত্যাদি)
২. মদ্যপান
৩. পুষ্টিহীনতা, যেমন লৌহের ঘাটতি
৪. ক্যান্ডিডা নামক ছত্রাকের সংক্রমণ (মুখগহ্বরে)
৫. কতিপয় ভাইরাল ইনেফেকশান
৬. শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার পরিবর্তন ইত্যাদি
মুখের ক্যান্সার দেখতে কেমন ?
প্রকৃতপক্ষে মুখের ক্যান্সার নানা রূপে দেখা যায়। স্থান ভেদে রুপান্তর ভীষণভাবে লক্ষণীয়। ছোট একটি লাল দানাদার দাগ থেকে শুরু করে মুখেল ঝিল্লী আবরণীর বড় ক্ষত বা ঘা কিংবা নডুলার প্যাচ রূপেও মুখের ক্যান্সার আবির্ভূত হতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় মুখের ক্যান্সার সৃষ্টি হয় স্বাভাবিক ঝিল্লী আবরণীতে এক ধরনের সাদা ক্ষত (লিউকোপ্লাকিয়া) থেকে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে, মুখের ক্যান্সার প্রাথমিক অবস্থায় ব্যথাহীন থাকে। এ কারণেই রোগীরা যখন আমাদের কাছে আসেন তখন ক্যান্সার বহুদূর বিস্তৃত, শেষ পর্যায়ে পৌছে গেছে। এমন কি মুখ থেকে ক্যান্সার কোষ রকত্ ও লিমূনোডের (গ্রান্ড) মাধ্যমে শরীরের দূরবর্তী গুরত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রতঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছে। তখন চিকিৎসকদের কিছুই করার থাকেনা। তাই রোগীদের উচিত মুখের যে কোনো ক্ষত যদি তা দু/সপ্তাহে ভালো না হয় এবং ব্যথাহীনভাবে রয়ে যায় তবে দ্রুত চিকিৎসকদের পরামর্শ গ্রহণ করো। কারণ প্রাথমিক পর্যায়ে মুখের ক্যান্সার ধরা পড়লে তা চিকিৎসায় ভাল হয়ে যায়।
মুখের ক্যান্সার নির্ণয়:
মুখের ক্যান্সার নির্ণয়ে রোগের ইতিহাস, লক্ষণ সমূহ জানা যেমন প্রয়োজন তেমনি প্রয়োজন চিকিৎসকের একাগ্রতা ও দূরদর্শিতা কারণ সামান্য একটু ক্ষার কোনো ব্যথা-যন্ত্রণা নেই তা থেকে ক্যান্সারে রূপান্তরের পূর্বাভাস একজন সচেতন, বিচক্ষণ এবং রোগীর প্রতি দরদি মানসিকতা সম্পন্ন চিকিৎসকের পক্ষেই উপলক্ষি করা সম্ভব। তবে সর্বাবস্থায় অনুমান করা সম্বব নাও হতে পারে। কারণ আমাদের দেশে ভীষণ ব্যস্ত চিকিৎসকদের সময় কোথায় রোগের ইতিহাস শোনা কিংবা ভালোভাবে রোগীকে পরীক্ষা করার ? সে এক ভিন্ন প্রসঙ্গ। এমনও রোগী দেখা যায় যাকে ব্যস্ত চিকিৎসকগন কিছু না বলে বার বার বলে বিদায় করলেও পরবর্তীতে তা ক্যান্সারে রূপান্তর ঘটেছে। সে যাই হোক, মুখের কোনো ক্ষত ক্যান্সার কিনা তা নিশ্চিত রূপে বলতে হলে সেক্ষেত্রে অবশ্যই বায়োপসি করা প্রয়োজন।
মুখের ক্যান্সার চিকিৎসা :
পরীক্ষায় নিশ্চিত হবার পর মুখের ক্যান্সার চিকিৎসার ধরন বিশ্বব্যাপী একই রকম। অর্থাৎ এক্ষেত্রে সার্জারী, কেমোথেরাপি, রেডিও থেরাপি ইত্যাদি প্রয়োগ করা হয় শরীরের অন্যান্য স্থানের ক্যান্সার চিকিৎসার মতোই। আজকাল অবশ উন্নত বিশ্বে কিছু কিছু ক্ষেত্রে লেজার থেরাপি জিন থেরাপি ইত্যাদির কথাও শোনা যার মুখের ক্যান্সার চিকিৎসায়।
প্রতিরোধ মূলক ব্যবস্থা :
১. ধুমপান, মদ্যপান, পান-সুপারি, জর্দ্দা, দাঁতের গোড়ায় গুল লাগানো ইত্যাদি করুন।
২. নিয়মিত মুখ দাঁতের স্বাস্ত্য পরিচর্যায় যত্নবান হউন।
৩. প্রতি ছয়মাস অন্তর মুখ ও দাঁত পরীক্ষা করান।
৪. মুখ গহ্বরে কোন ক্ষত দেখা দিলে দ্রুত তা চিকিৎসককে দেখান।
৫. ভাঙ্গা, ধারালো দাঁতের ব্যবহার গোড়া থাকলে তার প্রতিকার করুন।
৬. নড়বড়ে কৃত্রিম দাঁত ব্যবহার বন্ধ করুন এবং আপনার নিকটস্থ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
৭. দাঁতের যেকোনো চিকিৎসা করাতে গিয়ে মুখ গহ্বরের ঝিল্লী আবরনী (দাঁতের মাড়ি, তালু, গাল, মুখ গহ্বরের তলদেশ, জিহ্বা, গলা, ঠোঁট ইত্যাদি) পরীক্ষা করার জন্য আপনার চিকিৎসককে অনুরোধ করুন।
৮. মুখে কোনো সন্দেহজনক কিছু দেখা দিলে তা দ্রুত বায়োপসি করিয়ে নিশ্চিত হউন। কারণ (Stitch in Time Saves Nine) সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়।
medicalbd সাস্থের সকল খবর।

