আমি মশলা খাওয়া পুরোপুরি ছেড়ে দিয়েছি ডাক্তার, এই ঘোষণা ইশি খোসলা প্রায়ই শোনেন। এটা অপরাধের বোঝা হালাকা করার মতো একটা ব্যাপার, আর ত্যাগের ইঙ্গিত দিয়ে যেন সে অপরাধ মিটিয়ে ফেলা। খোলসা দিল্লীর এসকর্টস একজন পুষ্টিবিদ। তার কাছে যেসব লোক ঐ কথা বলেন তারা মূলত হৃদরোগী, যাদের সবেমাত্র ওপেন হার্ট সার্জারি হয়েছে, অন্যদের হৃদযন্ত্রের সমস্যঅ নির্ণয় করা হয়েছে।
মশলা বিহীন খাদ্য উপমহাদেশীয় রুচিবোধের কাছে অপ্রিয়। তবে কখোনোই মনে করবেন না যে, বিশ্ব্রে বহু লোক এসব মশলার আস্বাদন ছাড়াই চলে। য্ইা হোক, কেউ অসসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে মরিচ খাওয়া থেকে বিরতক রাখাকে প্রচলিত প্রজ্ঞা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আমরা যখন কোর্মা বা দুধ পোলাও এর দায়ির সদ্দাম সম্ভার এবং হালকা হলুদ ডাল পরিত্যাগ করে আত্তত্যাগের হাওয়া গ্রহণ করি, তখণ তাতে বিস্ময়ের কিছু থাকে না। তবে এসময় এরকম রান্না-বান্না পরিত্যাগ করার প্রয়োজন নেই। পাশ্চাত্যে নতুন গবেষণা এবং ভারতে প্রাথমিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, খারাপ হাওয়া তো দূরের কথা মশলাপতি এমন সব রাাসায়নিক দ্রব্য নিঃসরণ করে যা দেহে সুস্থ ও সবল রাখে এবং রোগ-সৃষ্টিকারী নোংরা জীবাণু ধ্বংস করে। খোলসা বলেন, আমি আমার রোগীদেরকে বলি থাকি, তারা যেমন স্বাচ্ছন্দে লবন খান ঠিক, তেমনি যেন মশলা যোগ করে তাদের হালকা, সিদ্ধ খাবার খান।
এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের করনেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রতি এক সমীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে, আমরা মশলার উপকারিতামূলক প্রতিক্রিয়া উপলব্ধি করতে না পারলেও আমাদের শরীর দীর্ঘকাল ধরে এটা উলব্ধি করে এসেছে, উষ্ণ গ্রীষ্ণকালীন অঞ্চলে মশলা যুক্ত খাবার প্রতিনিয়ত খাওয়া হয়, কেননা এখানেই সংক্রামণ রোগের জীবাণু বেশি। ভারতে মশলা নিয়ে গবেষণা একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক প্রাণী পরীক্ষা মশলার স্বাস্থ্যগত উপকারিতা ইঙ্গিত বাহী। বিজ্ঞানীরা প্রচিলিত প্রত্যেক মশলার যৌগ বা সক্রিয় গুণাগুণ নির্ণয়ে চেষ্ঠা চালাচ্ছেন, যাতে করে এগুলো আধুনিক এলোপ্যাথিক ওষুধে ব্যবহার করা যায়।
মহিশুরের সেন্ট্রার ফুড টেকনোলজিক্যাল এন্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিএটিআরআই)পরিচালক ভি প্রকাশ বলেন, মশলা ব্যবহারের প্রকৃত কারণ স্বাদগন্ধ, সুগন্ধ, রঙিন এবং কখনো কখনো খাদ্য উপাদান বিন্যাস করণ হলেও মশলা ও ওষুধি গুণাগুণেরন মধ্যে একটি শক্তিশালী সম্পর্ক রয়েছে। উক্ত ইনস্টিটিউটে ইঁদুর ও হ্যামস্টারের উপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে, হলুদ কারফিউমিন ও ক্যাপসাইসিন পিত্তথলির পাথর প্রায় ৪০ শতাংশ সংকুচিত করতে পারে। ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা ইঁদুরে ক্যান্সারযুক্ত টিউমার সৃষ্টি করেও দেখতে পান যে, হলুদ হিং ও রসুন তাৎপর্যপূর্ণভাবে ঐ টিউমারগুলোর আকার কমাতে পারে। অন্যান্য গবেষণায় আভাস দেয়া হয়েছে যে, লবঙ্গ হচ্ছে অন্যতম সবচেয়ে শক্তিশালী ফ্যাংগাস নাশক মশলা। এটা তিন সপ্তাহেরও বেশি সময়ের জন্য ফ্যাংগাসের বৃদ্ধি রোধ করতে পারে। দারুচিনি, সরিষা ও রসুন হচ্ছে এরকম কয়েকটি শক্তিশালী প্রতিরোধক।
হায়দ্রাবাদের জাতীয় পুষ্টি ইনস্টিটিউটে (এনআইএন) পরিচালিত প্রাণী সমীক্ষায় অনুরুপ প্রতিশ্রুতি তুলে ধরা হয়েছে। রসুন, পেঁয়াজ, লাল মরিচ ও আদা একত্রে মিলে ধমনীর জন্য একটি বিরাট গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে। এগুলো ধমনী প্রাচীরকে এমন সব উপাদান জমা থেকে পরিষ্কার রাখে যেগুলো রক্তনালীকে সরু করে দিতে পারতো এবং রক্ত জমাটের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিত। তবে এগুলো একান্তই প্রাথমিক পদক্ষেপ। এনআইএস- এর পরিচালক কমল কৃষ্ণস্বামী সাবধান করে দিয়ে বলেন, ”আমাদের প্রাণী ভিত্তিক সমীক্ষা পুরোপুরি ইতবাচক, তবে সেটা যথেষ্ট নয়”। আমরা যা পেয়েছি সেটা মানব স্বাস্থ্যের উপর প্রভাবের ব্যাপারে খুবই অগ্রগণ্য, তবে আরও বহুদূর যেতে হবে।
প্রাণীর বেলায় যা কাজ করে তা মানুষের বেলায় সবমসয় কাজ করে না, তবে প্রাণীর সমীক্ষা হচ্ছে উৎসাহব্যঞ্জক প্রথম পদক্ষেপ। মানব সমীক্ষা এখন সাফল্যের কাছাকাছি। অন্ধ্র প্রদেশের শ্রীকাকুলামে এনআইএন পরিচালিত একটি পাইলট সমীক্ষায় মুখের ক্যান্সারের পূর্বলক্ষণ স্বরুপ সৃষ্টক্ষত হলুদের ট্যাবলেট প্রয়োগে আরোগ্য হয়।
অবশ্য সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারী ২৫ জনের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশের ঐ আরোগ্য। এই সমীক্ষা এতই ছোট আকারের যে, এ থেকে হলুদ যে সত্যিই ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এরকম সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় না এবং এটা একটি ইতিবাচক নির্দেশক।
বিজ্ঞানীরা তাদের সমীক্ষা প্রতিষ্ঠা করলেও ভারতের প্রচলিত মশলাগুলোকে অণু-অণুতে ভেঙ্গে শূণ্য পর্যায়ে নিয়ে গেলে প্রকৃত কোনো উপাদান আরোগ্য সাধন করে সে বিষয়েও নতুন অন্তদৃষ্টি জাগ্রত হবে। সেটা হলো কেন ভারতীয়দের বিভিন্ন গোষ্ঠী তাদের রুচিমাফিক মশলা ভোগ করে। কিছু কিছু মশলা, যেমন সুনির্দিষ্টভাাবে বলতে গেলে, আদা, মেথি, সরিষা ও পেঁয়াজ দেহের পরিপাকতন্ত্রকে বেশি বেশি পিত্তরস অম্ল উৎপাদনের তাকিদ দেয়। অন্যান্য মশলা আদা, পুদিনা, ও পিপারাইন (মরিচের সক্রিয় উপাদান) আগ্নাশয় রস উৎপাদনে উদ্দীপনা যোগাতে পারে। যখন এসব রস প্রবাহিত হয় তখন এগুলো আমিষ, শর্করা ও চর্বি ভাঙতে শুরু করে। মস্তিষ্ক সহজবোধ্য পরিভাষায় এসব কর্মকান্ডকে ভাষান্তরিত করে ঠিক এভাবে: “আমি ক্ষুধার্ত।” শরীর এই প্যাভলোভিয়ান প্রক্রিয়ার সাথে এতই অভ্যস্থ হয়ে ওঠে যে, সে বিশেষ রসের প্রবাহ পেতে শুধুমাত্র অনুকুল মশলার সরবরাহ পাওয়ার প্রয়োজন অনুভব করে। সে কারণে বাঙালিরা এ্যালিমিসো-থায়োসিনেটের (সরিষা) গন্ধ পেলে ক্ষুধা অনুভব করে এবং অস্ত্রের অধিবাসীরা ক্যাপসাইসিন থেকে পরিপাক উদ্দীপনা পায়।
তবে মশলার ভূমিকা বুঝা এবং আধুনিক চিকিৎসায় এগুলোর ব্যবহার মোটেও সহজ নয়। মি: প্রকাশ বলেন “ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্মরণ রাখা দরকার। সেটা হচ্ছে, আমাদের স্বাস্থ্যের উপর যেসব মশলার প্রভাব রয়েছে সেগুলো কখনোই একা কাজ করে না”। সেগুলোর সম্মিলিত প্রতিক্রিয়াই হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ। আপনি সকালে রসুনের বড়ি বা লাল মরিচের ক্যাপসুল খেয়ে এমটা বিশ্বাস করতে পারেন না যে, আপনি ঐদিনের জন্য ঠিক থাকবেন। আরেকটি সাবধান বাণী হচ্ছে, কোনো মশলারই এমন একটি ওষুধ নয় যা শল্য চিকিৎসা বা এন্টিবায়োটিকের স্থান দখল করতে পারে।
তবে আপনাকে এই মর্মে আশ্বাস দেয় যেতে পারে না, খাদ্যে স্বাভাবিক দৈনন্দিন মাত্রা সুস্পষ্টভাবে উপকারী। মি: প্রকাশ ব্যখ্যা দিয়ে বলেন, “বড় কথা হচ্ছে, প্রাণীতন্ত্রে আমাদের সকল পরীক্ষা-নিরীক্ষা মশলার স্বাভাবিক মাত্রা দিয়ে করা হয়।” এর অর্থ হচ্ছে, লোকদেরকে হলুদ বা মরিচের বড়ি খেতে উৎসাহিত না করে তাদেরকে খাদ্যের সাথে মশলা খেতে উৎসাহিত করা সহজ। অবশ্যই ভারতের মশলা সমৃদ্ধ খাবারে কোনো সমস্যা হবেনা, কেবলমাত্র মশলাযুক্ত কিছু খাবারই প্রয়োজন।
মি: খোলসা বলেন, “জেনে রাখা ভালো যে, দাদীর নিয়মনীতি বর্তমানের বৈজ্ঞানিক সমর্থন পাচ্ছে।” সময় নির্বাচন যথার্থ। আরোগ্য সাধনের বিকল্প ও প্রাকৃতিক পন্থা বিগত দশক ধরে পুনরুজ্জীবত হয়েছে।
তবে এখন যা প্রয়োজন তা হচ্ছে অধিকতর শক্তিশালী পরিসংখ্যান ও বৈজ্ঞানিক সমর্থন। বিজ্ঞানীদের খাদ্যভ্যাস ও মশলা এবং সুনির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর উপর এগুলোর প্রভাব বিষয়ক ডাটাবেজের অভাব রয়েছে। যার মূল কারণ হচ্ছে, ভারতীয় খাবারে মশলা খুব অল্প পরিমাণে ব্যবহার হয়। এতে আপনার খাবার থেকে একটি মশলার প্রভাব আলাদা করা কঠিন।
গবেষকরা যখন আঞ্চলিক খাদ্যাভ্যাস ও মশলার ধরণ উপলব্ধি করতে পাবেন না, তখন তারা বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী কি খায় এবং তাদের খাদ্য তাদেরকে কোনো সমস্যা বা বৈকল্য থেকে রক্ষা করে তার মধ্যে পারস্পারিক সম্পর্কের রেখা টানতে পারে না। সুতরাং শুরুতে জনগন, তাদের খাদ্যাভ্যাস ও তাদের ভোগ্য মশলার জরিপ শুধুমাত্র পুষ্ঠিবিদ ও বিজ্ঞানীদের জন্যই বিরাট কাজে আসবে না বরং ওষুধ কোম্পানিগুলোর জন্যও বিরাট কাজে লাগবে। মি: প্রকাশ বলেন, আগমী দিনের ওষুধ হতে পারে মশলা ও হারব, সুতরাং শিল্পকে এরকম গবেষণায় প্রকৃতপক্ষে আরও আগ্রহ দেখাতে হবে।
মশলার গুণ
লাল মরিচ: লাল মরিচ ঘর্মকালীন ত্বকে বায়ু সঞ্চালনের আয়োজন করে। রক্ত পাতলা এবং রক্ত জমাট ধীরগতিসম্পন্ন করে।
রসুন: ধমনী পরিষ্কার রাখে এবং ত্বকের সংক্রমণ আরোগ্য করে। শরীর থেকে সীসাও পরিষ্কার করে।
হলুদ: ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে এমন উন্মুক্ত মৌলিক উপাদান থেকে শারীরকে মুক্ত রাখে।
মেথী বীজ: বহুমূত্র রোগে রক্তে শর্করা কমায়। বহুমূত্রজনিত ছানি রোধ করে।
তেঁতুল: ফ্লুওরাইড আটক করে। যেসব এলাকায় ফ্লুওরাসিস জনস্বাস্থ্য সমস্যা, যেসব এলাকায় খুবই উপকারী।
আদা: জীবাণুর বিরুদ্ধে কার্যকর কাশির আক্ষেপ ও বুকের রক্তাধিক্য হ্রাস করে।
ফেনেল: প্রদাহ নাশক। হজমক্রিয়ার ভূমিকা পালনের গুণাবলীর জন্যও এটি সুপরিচিত।
medicalbd সাস্থের সকল খবর।

