
স্থায়ীভাবে চিকন হবার রহস্য
পির-রিভিউড জার্নালের প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, আমেরিকার সাইকোলজিস্টরা আবিষ্কার করেছেন, অল্প কিছু দিনের খাবার নিয়ন্ত্রণ স্বাস্থ্য এবং ওজনের উপর সাময়িক প্রভাব ফেললেও দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমাধান দেয় না। তারা আরো আবিষ্কার করেন, অল্প কিছুদিন খাবার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সাময়িক সমাধান না নিয়ে শুধু মাত্র খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর উপায়ে কাঙ্ক্ষিত ওজন পাওয়া এবং তা স্থায়ী করে নেওয়া যায়। এখানে আপনার জন্য ১০টি জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের পরামর্শ দেওয়া হলো, যা আপনার দীর্ঘস্থায়ী সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করবে। একদম শেষে বোনাস হিসাবে রয়েছে একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকা।
Please Subscribe Us!১. ধীরে খান এবং ভালো ভাবে চিবান
গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দ্রুত খাবার খান তাদের ওজন খুব দ্রুত বেড়ে যায়। অন্য দিকে ধীরে এবং ভালো ভাবে চিবিয়ে খাবার খাওয়ার অভ্যাস খুব অল্পতেই পেট ভরিয়ে দেয়। খাবার ভালো ভাবে চিবিয়ে খাওয়ার ফলে খাদ্যগুলো ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র কণায় ভেঙ্গে পেটে যায়, ফলে খাবারে উপস্থিত সব উপাদানের পুষ্টিগুণ শরীর খুব ভালো ভাবে গ্রহণ করতে পারে। এতে দেহের মেটাবোলিজম বৃদ্ধি পায়, দেহ থাকে মেদহীন ঝরঝরে। কিন্তু দ্রুত খাবার খেলে এই সুফল পাওয়া যায় না। ফলে দেহের মেটাবোলিজম ধীর হয়ে যায় এবং দেহে প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হয়ে মেদবহুল হতে শুরু করে, অর্থাৎ ওজন বেড়ে যায়। ধীরে ধীরে ভালোভাবে চিবিয়ে খাওয়ার জন্য ছোট্ট একটা কৌশল করা যেতে পারে। খাবার মুখে দিয়ে পূর্ব নির্ধারিত সংখ্যা অনুযায়ী চিবাতে পারেন। মনে মনে সংখ্যা গুনতে গুনতে অভ্যাস হয়ে গেলে পরে আর এভাবে গুনে গুণে চিবাতে হবে না।
২. পানি খাবেন নিয়মিত
সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে পানি খাওয়া জরুরি। খাবার খাওয়ার ৩০ মিনিট আগে পানি খেলে পেট ভারা ভারা অনুভূতি তৈরি করে এবং অল্প খাওয়ার অভ্যাস তৈরি করে দেয়, এতে দেহের ওজন কমতে শুরু করে। কারণ আপনি যখন পেট ভারার জন্য খাবার খাবেন তখন পরিমাণে বেশি খেয়ে ফেলা স্বাভাবিক, কিন্তু যখন খেতে বসে দেখলেন আগে থেকেই পেট খানিকটা ভারা, তখন আপনি স্বাভাবিক ভাবে কম খাবেন। এতে আপনার দেহে অতিরিক্ত ক্যালোরি যোগ হবে না। এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা খাবার খাওয়ার ৩০ মিনিট আগে পানি খেয়ে নেন অন্যদের তুলনায় তাদের অতিরিক্ত ওজন ৪৪% বেশি হ্রাস পায়।
৩. লাল প্লেটে খাবার পরিবেশন
নিশ্চয়ই অবাক হলেন, কিন্তু এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, একই খাবার লাল রঙ বাদে অন্য সব প্লেটে পরিবেশন করলে লাল প্লেটে পরিবেশিত খাবারের চেয়ে বেশি খাওয়া হয়। এর সম্ভাব্য কারণ হতে পারে লাল রঙের সাথে বন্ধ, থামানো, নিষেধ ইত্যাদি নেতিবাচক ক্রিয়া জড়িত।
৪. চিনিযুক্ত পানীয় পরিহার
খাবারে উপস্থিত চিনি ডায়াবেটিস এবং স্থূলতার মত শারীরিক সমস্যার জন্য দায়ী প্রধান আসামী। এক ক্যান কোমল পানীয় খেলে আপনার শরীরে ৫২ গ্রাম চিনি ঢুকে পড়ে, যা আমাদের প্রতিদিনের নির্দিষ্ট চাহিদা (পুরুষের-৩৭.৫ গ্রাম, নারীর-২৫ গ্রাম) এর চেয়ে অনেক বেশি। এর পরিবর্তে গ্রিন টি, কফি বা তাজা ফলের রস খাওয়ার অভ্যাস করা স্বাস্থ্যকর।
৫. অমনোযোগী হয়ে খাবেন না
>টিভি দেখতে দেখতে কিংবা খেলা দেখার সময় খাবার খালে হয় অনেক বেশি খাওয়া হয়ে যায়, অথবা খুব অল্পতেই পেট ভরে যায়। এই উভয় অবস্থাই আমাদের দেহে অপুষ্টির জন্য দায়ী। তাই ‘মন লাগিয়ে খাবার খেলে, পুষ্টিগুণ শরীরে লাগে’ এই সূত্রটি মাথায় রাখবেন সবসময়। ২৪টি গবেষণার একটি তুলনামূলক তথ্য বিচারে জানা গেছে, যারা খাবার সময় অন্যান্য কাজে বেশি মনোযোগী থাকেন তারা অন্যদের তুলনায় কমপক্ষে ১০% বেশি খাবার খেয়ে থাকেন।
৬. প্রতিদিন ২টি ডিম
ইন্টারন্যাশনাল ওবেসিটি জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে জানা যায়, যদি সকালের নাস্তায় কম ক্যালোরির খাবারের সাথে একটি ডিম খান তাহলে অন্যদের তুলনায় আপনার অতিরিক্ত ওজন কমার সম্ভাবনা অনেক বেশি রয়েছে। কারণ ডিমের হাই প্রোটিন দীর্ঘক্ষণ আপনার পেট ভরিয়ে রাখবে এবং অহেতুক এটা সেটা খেয়ে শরীরে অতিরিক্ত ক্যালোরি বাড়ানোর হাত থেকে বাঁচাবে।
৭. সকালের নাস্তা বাদ দেবেন না
সকালে কাজে বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার তাড়া থাকে বলে অনেকই নাস্তা না করে বেরিয়ে পড়েন। একদিন দু দিন করে এটা একসময় অভ্যাসে পরিণত হয়। এই অভ্যাসের প্রভাব আমাদের পুরো শরীর ও স্বাস্থ্যের উপর পড়ে। সকালের নাস্তা আপনাকে সারাদিনের জন্য শক্তিই কেবল দেয় না, ডায়াবেটিস, স্থূলতা, হৃদরোগ ইত্যাদির হাত থেকেও রক্ষা করে। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ওজন কমাতে চান তাদের সকালে নাস্তা করা জরুরি। কারণ গবেষকরা বলছেন, যারা এক মাসে ২৮ পাউন্ড ওজন কমিয়েছেন তাদের প্রত্যেকেই সকালে নাস্তা করেছেন, একদিনের জন্যও বাদ দেননি।
Please Subscribe Us!৮. খিদে পেলে চুইংগাম চিবান
অসময়ে খিদে পেলে চিনিমুক্ত এবং পুদিনার সুগন্ধযুক্ত চুইংগাম চিবাতে পারেন। পুদিনার সুগন্ধি জিহ্বার স্বাদ কমিয়ে দেয় এবং খাওয়ার ইচ্ছা দমন করে। রোদি আইল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকগণ বিভিন্ন দিক পর্যবেক্ষণ করে জানিয়েছেন, যে ব্যক্তি চুইংগাম চিবান সে দুপুরের খাবার অন্যদের তুলনায় কম খাবার খান এবং দিনের অন্যান্য সময়ও অতিরিক্ত খেয়ে স্বাস্থ্যের ক্ষতি ডেকে আনেন না।
৯. আলোকোজ্জ্বল স্থানে খাবেন
আলোকোজ্জ্বল পরিবেশে খাবার খাওয়ার অভ্যাস আপনাকে স্বাস্থ্যকর খাবার নির্বাচনে উদ্বুদ্ধ করবে। আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা গবেষণা প্রতিবেদন বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, যারা অন্ধকার পরিবেশে খাবার খেয়ে অভ্যস্ত তারা দিনের আলোতে খেতে অভ্যস্তদের তুলনায় প্রায় ৩৯% বেশি খাবার গ্রহণ করেন।
১০. তিন বেলার পরিবর্তে ছয় বার
বারবার খাবার খান। দিনে তিন বেলার পরিবর্তে ছয় বার খাওয়া দাওয়া করার অভ্যাস করুন। প্রচলিত ৩ বেলা খাবার খাওয়ার ঐতিহ্য ঠিক রেখে এর মাঝে আরো তিন বার খাওয়ার চেষ্টা করুন। এটা বাস্তব সত্য যে, বারবার খাবার খাওয়ার অভ্যাস আপনাকে একবারে অতিরিক্ত খাবার খেয়ে ফেলার হাত থেকে রক্ষা করবে। পুষ্টিবিদরা বলেন, একটানা ৩ ঘণ্টা না খেয়ে থাকলে রক্তে চিনির মাত্রা কমতে শুরু করে। এবং ৪ ঘণ্টা পার করে দিলে ইতিমধ্যে আপনার দেহ সব খাবার হজম করে ফেলে, এবং ৫ ঘণ্টা অতিক্রান্ত হওয়ার পর শরীরে খাবার চাহিদা এতটাই বেড়ে যায় যে, আপনি সামনে যা পাবেন তাই গোগ্রাসে গিলতে শুরু করবেন, যা অবশ্যই স্বাস্থ্যে জন্য ভালো নয়।
Please Subscribe Us!বোনাস: ডায়েটের পূর্ণ তালিকা
আপনি প্রতিদিন কোন কোন খাবার কি পরিমাণে খেতে পারবেন সেটা জেনে নিন।
১. বাদাম দিনে ৫০ গ্রাম।
২. সিমের বিচি, ছোলা, বিভিন্ন ধরণের ডাল- দিনে ৭৫ গ্রাম।
৩. মাছ দিনে ২৮ গ্রাম।
৪. ডিম প্রতিদিন ১৩ গ্রাম (সপ্তাহে একটি অথবা দুটি ডিমের বেশি নয়)
৫. মাংস লাল মাংস দিনে ১৪ গ্রাম এবং মুরগীর মাংস দিনে ২৯ গ্রাম।
৬. কার্বোহাইড্রেট অর্থাৎ শস্যজাতীয় খাবার যেমন রুটি এবং চাল দিনে ২৩২ গ্রাম খাওয়া যাবে। এছাড়া আলুর মতো অন্যান্য শ্বেতসার সবজি দিনে ৫০ গ্রাম।
৭. ডেইরি বা দুগ্ধজাত খাবার দিনে ২৫০ গ্রাম। যা কিনা এক গ্লাস দুধের সমান।
৮. শাকসবজি দিনে ৩০০ গ্রাম এবং ফল ২০০ গ্রাম। এছাড়া এই ডায়েটে চাইলে ৩১ গ্রাম চিনি এবং ৫০ গ্রাম তেল যেমন জলপাই তেল যোগ করা যাবে।
এখন সিদ্ধান্ত আপনার, ডায়েট করে সাময়িক সমাধান নেবেন নাকি খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করে দীর্ঘমেয়াদী সুফল ভোগ করবেন। আপনার মতামত জানাতে নিচের কমেন্ট বক্সে লিখুন।
medicalbd সাস্থের সকল খবর।
