বাঙালিরা কেন এত অবসাদে ভোগে

বাঙালিরা কেন এত অবসাদে ভোগে

অবসাদ। চার অক্ষরের এই শব্দটা যেকোনো সময়েই আমাদের সুস্থ স্বাভাবিক জীবনকে তছনছ করে দিতে পারে। এক লহমায়। জীবনে ঘটে যাওয়া কোনো দুর্ঘটনা কিংবা কোনো সম্পর্কের টানপোড়েন যেকোনো সময়েই কোনো মানুষকে অবসাদগ্রস্থ করে দিতে পারে। যারা খুব নরম মনের মানুষ তারাই কিন্তু এই মানসিক রোগের শিকার হন খুব তাড়াতাড়ি। অবসাদকে যারা মনের জোরে দূরে সরিয়ে দিতে পারেন তারা জীবনটাকে নিজের মতো করে উপভোগ করতে পারেন সর্বক্ষণ।

ঘটনাচক্রে এ বছর বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার থিম ছিল ‘ডিপ্রেশন’ লেট‘স টক। অথচ এ ব্যাপারে দেখা যাচ্ছে গোটা দেশের তুলনায় বাংলার অবস্থা কিছুটা হলেও খারাপ। সারা দেশে যেখানে প্রায় ১৫% অবসাদগ্রস্থ চিকিৎসার আওতায় রয়েছে, সেখানে এ রাজ্যের শতকরা ১০ জন মাত্র তাদের অবসাদের চিকিৎসা করাচ্ছেন বলে উছে এসেছে। সমীক্ষায়। মানসিক অবসাদের নিরিখে পশ্চিমবঙ্গে রোগীর সংখ্যা জাতীয় গড়ের প্রায় দ্বীগুন। মোট জনসংখ্যার ৪.৩৩% মানুষ অবসাদে ডুবে আছে। বর্তমানে প্রতি ২৩ জনের মধ্যে একজন অবসাদের শিকার। এ রাজ্যের সংখ্যাটা ৪০ লাখ ছুঁই ছুঁই্ রাজ্যের চার জেলায় সমীক্ষা চালিয়ে গত এপ্রিলে এই তথ্য প্রকাশ করেছিল ইনস্টিটিউট অফ সাইকিয়াট্রি সংক্ষেপে আইওপি।

মনেব্যাধিতে দেশের মধ্যে চতুর্থ স্থানে বাংলা। সে তথ্য গত বছরেই কেন্দ্রিয় স্বাস্থ্য মন্ত্রক প্রকাশ করেছিল। ১০ অক্টোবর ২০১৬-তে প্রকাশিত হয়েছিল ন্যাশনাল মেন্টাল হেলথ সার্ভের রিপোর্ট। তাতে জানা গিয়েছিল, দেশের ২.৭% মানুষ অবসাদের শিকার।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে বাংলাার মানুষজন কেন এভাবে গভীর অবসাদে তলিয়ে যাচ্ছে। বিশেজ্ঞরা মনে করছেন, বুনিয়াদি শিক্ষা দীক্ষা, মনোবিকাশ ও মনের বিস্তারের দিক থেকে বাঙালিরা আর পাঁচটা রাজ্যের চেয়ে এগিয়ে থাকার পরও প্রাপ্তির ঝুলি তাদের না ভরে ওঠার জন্যই তারা বেশি সংখ্যায় অবসাদের শিকার। যদিও আর্থ সামাজিক কারণের পাশাপাশি রাজ্যের আবওয়া, জলবায়ু, পরিবেশ, খাদ্যভ্যাস এবং সর্বোপরি জিনগত প্রভাবকেই অবসাদের কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অবসাদের শেষ ধাপেই থাকে নিজেকে শেষ করে দেওয়ার আকাঙ্খা। আর সেই কারণেই এ রাজ্যে আত্মহত্যা চারে থাকলে গত ক‘বছর।

২০১৫-১৬ সালে এন.এম.এইচ.এস এর সমীক্ষায় পূর্ব ভারতের নোডাল সেন্টাল ছিল আই.ও.পি। সমীক্ষায় গ্রাম, শহর, নগর ও পার্বত্য এলাকাকে রাখতে গিয়ে বাছা হয়েছিল চারটি জেলার (উত্তর ২৪ পরগনা, বর্ধমান, দক্ষিণ দিনাজপুর, দার্জিলিং) বিভিন্ন এলাকা, যে জায়গাগুলোর নাগরিক জীবনের প্রতিফলন মেলে। সেই সমীক্ষায় উঠে এসেছে, অবসাদের শিকড় একাকিত্বের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সেই জন্যই সম্ভবত ষাটোর্ধ্বদের মধ্যে অবসাদের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। অবসাদের হার ৯.৪২%। অবসাদের অসুখে এগিয়ে শহরাঞ্চল (৫.৭৯%)। তেমনই এগিয়ে রয়েছেন মহিলারা(৬.২১%)। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সমীক্ষায় প্রকাশ, সব অসুখকে সংখ্যায় টপকে গিয়েছে অবসাদ। আগেবসর্বস্বতায় বাঙালি যে দেশের মধ্যে পয়লা নম্বরে তাও এবার জানা গেল। জিন এবং আর্থ সামাজিক পরিবেশেই সম্ভবত এর মূল কারণ।

অবসাদ থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র উপায় সচেতনতা। নিজে সচেতন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের অন্য সদস্যদেরও সর্তক রাখা দরকার। অবসাদ বোঝার উপায়গুলো হল, কমপক্ষে টানা দু’সপ্তাহ মন খারাপ, কোনো কিছুতেই আনন্দ খুঁজে না পাওয়া, কাজে উৎসাহ হারানো, অল্পতেই পরিশ্রান্ত হয়ে পড়া, ঘুম ও খিদে আচমাক খুব বেড়ে বা কমে যাওয়া, নিজেকে শেষ করার ইচ্ছা, সবেতে নেতিবাচক চিন্তা, হীনমন্নতা ও নিরাশবোধ, নিজেকে শেষ করার ইচ্ছা ইত্যাদি। এইসব উপসর্গগুলো কারোর মধ্যে দেখা দিলে বাড়ির অন্যান্য সদস্যদের উচিত আক্রান্ত ব্যাক্তিটিকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া। তবেই আবেগ প্রিয় বাঙালিরা মনে ‘অবসাদ’ থাবা বসবার আগেই সেই থাবার কবল তেকে মুক্তি পেয়ে আনন্দে জীবন কাটানো যাবে।

আরও পড়ুনঃ বিষন্নতা ইমোশনাল ইলনেস প্রাকৃতিক সমাধান।

গণ সচেতনতায় ডিপিআরসি হসপিটাল লিমিটেড

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*