এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের বিরাট অংশে ডায়াবেটিস উপসর্গবিহীনভাবে উপস্থিত থাকতে পারে। তাদের ক্ষেত্রে ডায়াবেটিসের আগাম বা উপসর্গপূর্ব নির্ণয়ের জন্য বিশেষ ল্যাবরেটরি পরীক্ষার প্রয়োজন।
ডায়বেটিস কী?
ডায়াবেটিস হলো মানবদেহে গ্লুকোজের বিপাকক্রিয়ার অস্বাভাবিকতাজনিত রোগ, যাতে ইনসুলিন নামক হরমোনের স্পল্পতা কিংবা অভাবের ফলে অথবা ক্ষেত্রেবিশেষে মানব কোষকলায় ইনসুলিনের সক্রিয়তা হ্রাস বা লোপ পাওয়ার ফলে মানবরক্তে গ্লুকোজের মাত্রা সার্বক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মাত্রায় থঅকে, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ডায়াবেটিস মেলাইটাস (Diabetes Mellitius) নামে পরিচিত এর মধ্যে ইনসুলিনের স্বল্পতাবা অভাবজনিত কারণে যে ডায়াবেটিস দেখা যায় তা টাইপ-১ (Type-1) ডায়াবেটিস নামে পরিচিত। অপর দিকে মানব কোষকলায় ইনসুলিনের সক্রিয়তা হ্রাস বা লোপ পাওয়ার ফলে তথা ইনসুলিনের আপেক্ষিক অভাবের ফলে সৃষ্ট ডায়বেটিস টাইপ-২ (Type-2) ডায়াবেটিস নামে পরিচিত।
ডায়াবেটিসের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও বাংলাদেশ
২০১৩ সালে এক জরিপ মোতাবেক নতুন-পুরনো মিলিয়ে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬.৯ শাতাংশ মানুষ (প্রায় ৩৮২ মিলিয়ন) ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। এভাবে চলতে থাকলে আগামী ২০৩৫ সালে এই সংখ্যা দাঁড়াবে ৫৯২ মিলিয়ন যা সমকালীন বিশ্বের মোট ঝুঁকিপূর্ণ জনসংখ্যার ৮ শতাংশ। আর স্থান বা জনসংখ্যা ভেদে এই ডায়াবেটিসের শতকরা ৮৫ থেকে ৯৫ ভাগই টাইপ-২ ডায়াবেটিস। একই জরিপ মোতাবেক বাংলাদেশের মোট ঝুঁকিপূর্ণ জনসংখ্যার (নতুন ও পুরনো মিলিয়ে) প্রায় ৬.৩ শতাংশ মানুষ ( প্রায় ৫.১ মিলিয়ন) ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।
কেন ডায়াবেটিসের আগাম বা উপসর্গপূর্ব শনাক্তকরণ অতীব জরুরি?
সাধারণত একজন ডায়াবেটিক রোগী ঘনঘন মূত্র ত্যাগ, অতিরিক্ত পিপাসা, অবসাদ বা দুর্বলতা, ক্ষুধা বৃদ্ধি বা ক্ষুধামন্দা, শরীরের ওজন অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি বা হ্রাস পাওয়া, শরীরে ঘন ঘন রোগজীবাণুর সংক্রমণ, আক্রান্ত ক্ষত সহজে না শুকানো, বন্ধ্যত্ব এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে ঘন ঘন গর্ভপাত, যোনিপথে অতিরিক্ত চুলকানো প্রভৃতি এক বা একাধিক উপসর্গে আক্রান্ত হতে পারে। ফলে তারা সহজেই চিকিৎসকের শরাণাপন্ন হতে পারে। কিন্তু এক সমীক্ষায় দেখা যায়ু, ডায়াবেটিসে আক্রান্তরোগীদের বিরাট অংশে ডায়াবেটিস উপসর্গবিহীনভাবে উপস্থিত থাকত পারে। তাদের ক্ষেত্রে ডায়াবেটিসের আগাম বা উপসর্গপূর্ব নির্ণয়ের জন্য বিশেষ ল্যাবরেটরি পরীক্ষঅর প্রয়োজন, যাব ডায়াবেটিসের স্ক্রিনিং টেস্ট তথা OGTT (Oral Glucose Tolerance Test ) নামে পরিচিত। এই টেস্টের মাধ্যমে ডায়াবেটিস আগাম নির্ণয়ের মাধ্যমে এর যথাযথ চিকিৎসার দ্বারা মানবদেহে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিক রেখে ডায়াবেটিসের মাত্রা ও জটিলতার প্রতিরোধ কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে এর প্রকোপ অনেকাংশে দীর্ঘায়িত করা সম্ভব। কেননা মানবদেহে ডায়াবেটিস সক্রিয় বা সুপ্ত যে অবস্থাতেই থাকুক না কেন, এই রোগে রক্তে উচ্চমাত্রার গ্লকোজের উপস্থিতির কারণে ক্ষুদ্র ও বৃহৎ রক্তনালীতে বিরূপ প্রভাবের ফলে মানুষ আক্রান্ত হতে পারে স্ট্রোক, হৃদরোগ, পায়ের পচন, রেনাল ফেইলিউর, অন্ধত্ব প্রভৃতি এক বা একাধিক জটিলতায়। ২০১৩ সালের এক সমীক্ষায় দেখা যায়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে ডায়াবেটিস অসংক্রামক রোগ মানব মৃত্যুর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কারণ। যার মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ১.২ মিলিয়ন।
কী এই OGTT (Oral Glucose Tolerance Test ) বা পরীক্ষা ?
OGTT (Oral Glucose Tolerance Test ) হলো ডায়াবেটিসসহ রক্তে গ্লুকোজের বিপাকক্রিয়ার অন্যান্য অস্বাভাবিকতা নির্ণয় Gold Standard বা নিশ্চিত মান ল্যাবরেটরি পরীক্ষা হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরীক্ষা । এই বিশেষ পরীক্ষার আগের তিন দিন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিয়ন্ত্রণবিহীনভাবে শর্করাজাতীয় খাবার খাবেন। পরীক্ষার আগের দিন সারারাত একনাগাড়ে ৮ ঘন্টা উপবাস থাকবেন। ৩০ মিনিট বিশ্রাম নেবেন খালি পেটে রক্ত দেয়ার আগে। পরে ৭৫ গ্রাম গ্লুকোজ ৩০০ মি.লি. পানিতে মিশিয়ে ওই দ্রবণ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি পান করার দুই ঘন্টা পর পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন। এভাবে খালি পেটে এবং গ্লুকোজ খাবার ২ ঘন্টা পরে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ রক্ত দেবেন। ওই পরীক্ষায় রক্তে প্রাপ্ত গ্লুকোজের বিভিন্ন মাত্রার বুঝন প্রক্রিয়াসহ সংশ্লিষ্ট করণীয়তার ছক:
কাদের ক্ষেত্রে ডায়াবেটিসের উপসর্গ না থাকলেও OGTT সতর্কতা স্বারূপ Screening Test হিসেবে করা গুরুত্বপূর্ণ?
নিন্মলিখিত ব্যক্তিরা Screening Test হিসেবে OGTT করানোর আওতায় পড়বেন:
ক. ওজন আধিক্যতা (BMI : ২৩ কেজি/মিটার২) এশিয়ানদের ক্ষেত্রে BMI : ২১ কেজি/মিটার২) বা স্থলতায় BMI : ২৫ কেজি/মিটার২), এশিয়ানদের ক্ষেত্রে (BMI : ২৩ কেজি/মিটার২) আক্রান্ত ব্যীক্তরা, যাদের ক্ষেত্রে নিন্মলিখিত এক বা একাধিক ঝুঁকি বিদ্যমান:
যাদের রক্তে গ্লুকোজায়িত হিমোগ্লবিনের (HbAIc)-এর মাত্রা > ৫.৭%।
আগের পরীক্ষায় যারা IGT বা IFG উভয় প্রকার সমস্যায় আক্রান্ত।
যাদের First degree relatives (বাবা,মা, ভাই ও বোন)-এর এক বা একাধিকজন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।
কিছু বিশেষ গোত্র বা রেসের ব্যক্তিরা যথা-আফ্রিকান বা এশিয়ান সাংশোদ্ভুত আমেরিকান, আমিরকান আদিবাসী, ল্যাটিন আমেরিকান, প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জবাসী।
সেসব মহিলা যাদের গর্ভাবস্থায় ডায়ারেটিসে (যা জেসটে শনাল ডায়াবেটিস নামে পরিচিত) আক্রান্ত থাকার ইতিহাস রয়েছে।
যারা আগে বা বর্তমানে ইসকায়েমিক হার্ট ডিজিজ, স্ট্রোক বা এথেরো-এসক্লেরোসিসের কারণে পায়ে পচনসহ এক বা একাধিক রোগে আক্রান্ত।
উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত ব্যক্তি ( যাদের রক্ত চাপ >১৪০/৯০ mm of Hg)
যাদের রক্তে HDL কোলেস্টেলের মাত্রা < ৩৫ সম/mg/dL কিংবা ট্রাইগ্লিসারাইড নামক চর্বির মাত্রা > ২৫০ mg/dL ।
পলিসিস্টিক ওভারি রোগে আক্রান্ত মহিলা।
পরিশ্রমবিহীনভাবে জীবনযাপনে অভ্যস্ত ব্যক্তিগণ।
যারা অত্যধিক স্থুলতা বা অন্যান্য শারীরিক সমস্যা; যেমন- Acanthoris nigrican প্রভৃতিতে আক্রান্ত।
খ. যাদের বয়স ৪৫ বছর বা তার বেশি
medicalbd সাস্থের সকল খবর।

