হেপাটাইটিস-বি প্রেক্ষিত বাংলাদেশ-(পর্ব-২)

পোস্ট টি ভালো লাগলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন
  • 33
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
    33
    Shares

হেপাটাইটিস-বি প্রেক্ষিত বাংলাদেশ-(পর্ব-২)

হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসের জটিলতা:

বি-ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তি পূর্ণবয়স্কের ক্ষেত্রে ৯০-৯৫ শতাংশ এবং শিশুর ক্ষেত্রে ১০-১৫ শতাংশ এমনিতেই পূর্ণ নিরাময় হয়। অবশিষ্টদের ক্ষেত্রে আকস্মিক লিভার অকার্যকর হয়ে যাওয়া, অ্যাকিউট হেপাটাইটিস, ক্রনিক হেপাটাইসি, সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সার হতে পারে।

হেপাটাইটিস-বি ক্যারিয়ার:

‘হেপাটাইটিস-বি ক্যারিয়ার’ এ শব্দটি সাধারণ্যে বেশ পরিচিত। আমাদের দেশে প্রায় এক কোটি লোক বি-ভাইরাস বহন করে চলছেন এবং এদের অনেকেই ক্যারিয়ার। সে জন্য এ বিষয়টি জানা অতীব প্রয়োজন। অন্য দিকে এ ধরনের রোগীদের বিষয়ে সমাজে কিছু অবৈজ্ঞানিক ও উদ্ভট চিকিৎসা ব্যবস্থা চালা আছে। অনেকেই স্বাভাবিক কাজকর্ম বন্ধ করে দিয়ে মাসের পর মাস পূর্ণ বিশ্রামে থাকার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। আবার কেউ কেউ মাছ-গোশত খাওয়া বন্ধ করে রাতারাতি নিরামিষভোজী হয়ে যান। কেউ তো আরো একটু এগিয়ে হলুদ, মরিচ, ঝাল, মসলা, তেল বাদ দিয়ে পেঁপে সিদ্ধ খাওয়ার কঠিন তপস্যায় নেমে পড়েন। প্রকৃতপক্ষে এগুলো প্রয়োজন নেই।

সাধারণত কারো রক্তে এইচবিএসএজি (HBsAg) ছয় মাসের বেশি সময় ধরে পজিটিভ থাকলেই তাকে বি-ভাইরাস ক্যারিয়ার বলা হয়। তবে যাদের বি-ভাইরাসজনিত ক্রনিক লিভার ডিজিজ আছে তাদেরও বি-ভাইরাস পজিটিভ হয়। কিন্তু শুধু যাদের বি-ভাইরাস পজিটিভ, কিন্তু কোনা রোগ বা লক্ষণ প্রকাশ পায়নি তাদেরকেই বি-ভাইরাস ক্যারিয়ার বলা হয়।
কারা বি-ভাইরাস ক্যারিয়ার

বি-ভাইরাসের ক্যারিয়ার বলতে হলে নির্ধারিত শর্ত পরিপূর্ণ করতে হয়। শর্তগুলো হলোঃ

১. ছয় মাসের বেশি সময় ধরে এইচবিএসএজি (HBsAg) পজিটিভ।
২. এইচবিএসএজি (HBeAg) নেগেটিভ এবং অ্যান্টি এইচবিই (HBe) পজেটিভ।
৩. বি-ভাইরাসের ডিএনএ (HBV-DNA) নেগেটিভ।
৪. লিভার এনজাইম তথা এসজিপিটি (SGPT) স্বাভাবিক।
৫. লিভার বায়োপসিতে হেপাটাইটিসের চিহ্ন না থাকা।

সাধারণভাবে চিকিৎসকেরা শুধুই-অ্যান্টিজেন নেগেটিভ হলেই লিভারের রোগ নেই বলে নিশ্চিত হন। এটা ঠিক নয়, বরং এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ ই-অ্যান্টিজেন নেগেটিভ হয়েও লিভারে মারাত্মক রোগ ক্রমবর্ধমান হারে চলতে পারে। গ্রিসে এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, শতকরা ৯০ ভাগ ক্রনিক লিভার রোগী ই-অ্যান্টিজেন নেগেটিভ। আমাদের দেশেও এ রোগ নির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দু। এটি পজিটিভ হলে লিভার আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে আর নেগেটিভ হলে রোগীকে বলা হবে ক্যারিয়া।

ক্যারিয়ারের ভবিষ্যৎ ও তার চিকিৎসা:

যত লোক বি-ভাইরাসে আক্রান্ত হয় তাদের শতকরা এক ভাগ লোক ক্যারিয়ার হিসেবে আজীবন বি-ভাইরাস বহন করে থাকেন। এসব ক্যারিয়ার সাধারণত তেমন কেনো অসুবিধা ছাড়াই জীবন কাটাতে পারেন। বি-ভাইরাস সাধারণত নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকে। এক সময় এদের ‘হেলদি ক্যারিয়ার’ বলা হতো। তবে যেকোনো সময় বি-ভাইরাস পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠার আশঙ্কা থাকে। এ জন্য এখন এদের নিষ্ক্রিয় ক্যারিয়ার Inactive carrier বলা হয়। সক্রিয় হয়েছে কি না এটা দেখার জন্য ৬-১২ মাস পরপর লিভার বিশেষজ্ঞের তত্ত্ববধানে দু-একটি পরীক্ষা করাতে হয়। এ প্রক্রিয়াটি সারা জীবনই চালিয়ে যেতে হবে। ৪০ বছরেরর বেশি যাদের বয়স, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে হয়। ক্যারিয়ারদের শতকরা এক ভাগ লোক প্রতি বছর বি-ভাইরাস নেগেটিভ হয়ে যায়। এরা অত্যন্ত সৌভাগ্যবান। এদের আর কোনো বিপদের আশঙ্কা নেই বললেই চলে।

বি-ভাইরাসের ক্যারিয়াররা নিজেদের জন্য তেমন বিপজ্জনক না হলে অন্যদের জন্য অসুবিধার কারণ হতে পারে। অর্থাৎ তাদের থেকে বি-ভাইরাস অন্যদের ছড়াতে পারে। এদের শরীরে বি-ভাইরাস নিষ্ক্রিয় থাকলেও যখন অন্যদের শরীরে বি-ভাইরাস ছাড়াবে তখন অন্যদের মারাত্মক লিভার রোগসহ মৃত্যুও হতে পারে। এ জন্য এসব লোকদের ক্ষেত্রে রক্ত দেয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তাছাড়া ক্যারিয়ারদের স্ত্রী, সন্তানসহ নিকটস্থ সবাইকে হেপাটাইটিসের ভ্যাকসিন দেয়া প্রয়োজন। তবে বি-ভাইরাস ক্যারিয়ার হওয়া এবং জন্ডিস হওয়া সমার্থক শব্দ নয়। বি-ভাইরাস ক্যারিয়ার অর্থ হলো বি-ভাইরাস বহন করছেন, কিন্তু এখনো লিভারে কোনো রোগ তৈরি হয়নি।

অতএব বিশ্রামে থাকা, নিরামিষ খাওয়া কিংবা বেছে চলা একেবারেই নেরর্থক। এখানে চিকিৎসার মূল বিষয় হলো কখনো বি-ভাইরাস সক্রিয় হচ্ছে কি না তা নিয়মিত খতিয়ে দেখা এবং সক্রিয় হলে তার দ্রুত সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা করা। বি-ভাইরাস ক্যারিয়াররা কখনো বিদেশে চাকরির জন্য যেতে পারেন না।
তাই বলে বি-ভাইরাস ক্যারিয়ারদের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। এ বিষয়ে যার তার সাথে আলাপ করা উচিত নয়। কারণ না জেনেই তারা বিভিন্ন ভুল পরামর্শ দিতে পারে এবং আপনাকে অন্য চোখে দেখতে পারে, বরং একজন লিভার বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে নিয়মিত পরামর্শ নেয়াই জরুরি ও বুদ্ধিমানের কাজ।

হেপাটাইটিস-বি সম্পর্কে যা না জানলেই নয়:

পৃথিবীতে লিভারের সবচেয়ে বেশি প্রচলিত ও সংক্রামিত ক্ষতিকর রোগ হলো হেপাটাইটিস-বি যা হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস দ্বারা সংক্রামিত হয় এবং লিভার কোষকে আক্রমণের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে সিরোসিস, লিভারের ক্যান্সার প্রভৃতি রোগ সৃষ্টি করে তার কর্মক্ষমতাকে কমিয়ে দেয়। রোগাক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত এবং শরীরবৃত্তীয় কিছু তরলের মাধ্যমে এই ভাইরাস ছড়াতে পারে। বেশির ভাগ জনসাধারণ হেপাটাইটিস-বি রোগটির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সক্ষম এবং রোগ সৃষ্টিকারী ভাইরাসটিকে রক্ত থেকে পরিশোধনের মাধ্যমে নির্মূল করতেও সমানভাবে সক্ষম। তার পরও শতকরা ৫-১০ ভাগ যুবক, ৩০-৫০ ভাগ কিশোর এবং ৯০ ভাগ শিশু এই ভাইরাস থেকে মুক্তি পেতে পারে না এবং ফলে দীর্ঘদিন ধরে রোগাক্রান্ত অবস্থায় থাকে। দীর্ঘ দিন ধরে রোগাক্রান্ত জনগোষ্ঠী ভাইরাসটিকে অন্যদের শরীরে স্থানান্তরের মধ্যেমে সংক্রমণকারীর ভূমিকা পালন করে এবং পরবর্তী জীবনে তাদের হেপাটাইটিস-বি হওয়ার ঝুঁকিকে আরো বাড়িয়ে দেয়।

হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসটি এইডস রোগ সৃষ্টিকারী HIV ভাইরাসটির তুলনায় ১০০ গুণ বেশি ক্ষতিকর এবং দ্রুত বিস্তারকারী এক ভয়াবহ শক্তিশালী জীবাণুর নাম। তার পরও হেপাটাইটিস-বি সফল এবং কার্যকরভাবে টিকা প্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভ। সারা বিশ্বে ৪০০ মিলিয়ন মানুষ, যারা হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস দ্বারা ক্রনিক ইনফেকশনে আক্রান্ত তাদের ক্ষেত্রে টিকার কোনো ফলপ্রসূ ব্যবহার শুরু হয়নি। আমরা আশায় বুক বাঁধি, স্বপ্ন দেখতে পছন্দ করি, যার কারণেই মানুষের অদম্য আগ্রহ ও প্রচেষ্টা আজ ক্রনিক হেপাটাইটিস-বি এর বিরুদ্ধে কার্যকর কিছু চিকিৎসা উদ্ভাবনে সক্ষম হয়েছে, যা মানুষের নতুনভাবে বাঁচার আশা উজ্জ্বল করে তুলছে।

হেপাটাইটিস-বি এর সাথে জীবনযাপন জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হলে কী হতে পারে:

হেপাটাইটিস-বি একটি নীরব ঘাতক হিসেবে পরিচিত। কারণ বেশির ভাগ রোগীই রোগের কোনো লক্ষণ প্রকাশ ছাড়াই স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারে। শতকরা ৯০ ভাগ স্বাস্থ্যবান ব্যক্তিই এই ভাইরাস থেকে মুক্তি পেতে পারেন এবং তাদের দেহে প্রতিরোধকারী অ্যান্টিবডি তৈরি হয় রোগাক্রান্ত হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে। যেসব রোগী রোগ থেকে পূর্ণভাবে নিষ্কৃতি লাভ করেন তারা কখনো অন্যের জন্য রোগ বিস্তারকারী হন না। আবার রোগাক্রান্ত রোগীর শতকরা ১০ ভাগ কিছু কারণে ভাইরাসটি থেকে মুক্ত হতে পারে না এবং তারা ক্রনিক হেপাটাইটিস রোগে ভোগে।

সম্পূর্ণ রোগমুক্ত কি না তা জানতে হলে করণীয়:

রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে একজন চিকিৎসক সহজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন তার রোগী সম্পূর্ণরূপে হেপাটাইটিস-বি থেকে মুক্ত অথবা রোগী দীর্ঘদিন ধরে হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত আছে কি না। একন চিকিৎসক তিন ধরনের রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে হেপাটাইটিস-বি সম্পর্কে একটি পরষ্কার ধারণা পেতে পারেন, যা দ্বারা তিনি আক্রান্ত রোগীর বর্তমান অবস্থা সহজেই ব্যাখ্যা করে বোঝাতে সক্ষম হন।

আরও পড়ুনঃ হেপাটাইটিস-বি প্রেক্ষিত বাংলাদেশ-(পর্ব-১)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ten + 5 =

x

Check Also

পুরুষের বন্ধ্যাত্ব রোগে চিকিৎসা

পোস্ট টি ভালো লাগলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন153         153Sharesযেসব পুরুষ বন্ধ্যত্বের সমস্যায় ভোগেন তাদের অন্তত ...

সাপে কাটলে কী করণীয়

পোস্ট টি ভালো লাগলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন250         250Shares ছবিঃ Shape Magazine সাপে কাটলে প্রথমেই ...

শিশু ওয়ার্ড না থাকায় আক্রান্ত শিশুদের মহিলা ওয়ার্ডে রেখে চলছে চিকিৎসা

পোস্ট টি ভালো লাগলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন60         60Shares জাহিদুর রহমান তারিক, ঝিনাইদহঃ ঝিনাইদহ জেলার ...

তত্বাবধায়কের প্রচেষ্ঠায় পাল্টে গেছে নওগাঁ সদর হাসপাতালের চিত্র !

পোস্ট টি ভালো লাগলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন49         49Sharesজি,এম মিঠন, নওগাঁ: নওগাঁ সদর হাসপাতালে লেগেছে ...

কাঁচা কলার যত গুণ

পোস্ট টি ভালো লাগলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন21         21Sharesডা. শিব্বির আহমেদ: পেটের অসুখে উপকার পাওয়া ...

বিশ্ব এইডস দিবস উপলক্ষে র‌্যালী ও আলোচনা সভা

পোস্ট টি ভালো লাগলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন          আসাদুল ইসলাম সবুজ, লালমনিরহাট: ১লা ডিসেম্বর বিশ্ব ...