ডায়াবেটিস এর শারীরবৃত্তীয় কারণ এবং সনাক্তকরণ পদ্ধতি

পোস্ট টি ভালো লাগলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন
  • 113
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
    113
    Shares

ছবি: ডায়াবেটিস সনাক্তকরণ পদ্ধতি

ডায়াবেটিস সনাক্তকরণের প্রাচীন ও আধুনিক প্রযুক্তি: প্রাচীনকালে বালির সঙ্গে প্রস্রাব মিশিয়ে উত্তপ্ত করে ডায়াবেটিস সনাক্ত করা হতো। আবার অনেক সময় মাটির পাত্রে প্রস্রাব রেখে দেখা হতো কোন তলানি পড়ে কি না বা পিঁপড়া আসে কিনা। কিন্তু বর্তমানে ডায়াবেটিস সনাক্তকরণ অনেক সহজ হয়ে গিয়েছে। বর্তমানে আধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে অত্যন্ত সুনিপুনভাবে রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা নির্ণয় করে ডায়াবেটিস সনাক্ত করা হয়। ডায়াবেটিস সনাক্তকরণের আধুনিক পদ্ধতি সমূহ:

  • যদি ডায়াবেটিস উপসর্গ দেখা দেয় এবং দিনের যে কোন সময় রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ২০০ মি.গ্রা/ডে.লি ১১.১ মিলি. মোল/লি এর বেশি থাকে।
  • যদি সকালে নাস্তার পূর্বে গ্লুকোজের মাত্রা ১২৬ মি.গ্রা/ডে.লি. বা ৭ মিলি মোল/লি এর বেশি হয়। OGTT (Oral Glucose Tolerance Test) এর মাত্রা যদি দুই ঘন্টার ব্যবধানে ২০০ মি.গ্রা/ডে.লি. বা ১১.১ মিলি. মোল/লি. এর বেশি হয় তবে ডায়াবেটিসের উপস্থিতি নির্দেশ করে।

ডায়াবেটিস হওয়ার শরীরবৃত্তিয় কারণসমূহ: সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় আমাদের দেহের রক্তরসে গ্লুকোজের পরিমাণ খুব বেশি পরিবর্তিত হয় না। আমরা যখন খুব বেশি পরিমাণ গ্লুকোজ গ্রহন করি তখন বা দ্রুত রক্তরসে মিশে রক্তের গ্লুকোজ লেভেল বাড়িয়ে দেয়। তখন দেহের রক্তরসের গ্লুকোজ লেভেল নিয়ন্ত্রণ করার জন্য অগ্ন্যাশয় হতে ইনসুলিন উৎপন্ন হয় এবং ইনসুলিন পেশী কোষ ও চর্বি কোষ ও চর্বি কোষের ভিতর গ্লুকোজ প্রবেশ করানোর মাধ্যমে রক্তরসের গ্লুকোজ লেভেল নিয়ন্ত্রণ করে। তাই আমাদের রক্তরসে গ্লুকোজের মাত্রা ঠিক রাখতে অগ্ন্যাশয় হতে ইনসুলিনের পর্যাপ্ত উৎপাদন ও ইনসুলিনের প্রতি পেশী কোষ ও চর্বি কোষের সংবেদনশীলতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নিম্নে ডায়াবেটিস হওয়ার শরীরবৃত্তীয় কারণসমূহ বর্ণনা করা হল-

ক) পেশী কোষ ও চর্বি কোষের ইনসুলিনের প্রতি সংবেদনশীলতা কমে যাওয়া: আমরা অনেকেই ধারণা করি যেমন, টাইপ-২ ডায়াবেটিস বা ইনসুলিন অনির্ভর ডায়াবেটিস নাগাদ অগ্ন্যাশয়ের বিটা কোষ হতে অপর্যাপ্ত পরিমাণ ইনসুলিন উৎপন্নত হওয়ার জন্য হয়ে থাকে। কিন্তু ধারণাটি ঠিক নয়। আমেরিকা, ইংল্যান্ডসহ বিশ্বের অনেক দেশে পরিচালিত অসংখ্য গবেষণা হতে জানা যায় যে, ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের পেশী কোষ ও চর্বি কোষসমূহের ইসুলিনের প্রতি সংবেদশীলতা ডায়াবেটিসে কমে যায় বা হারিয়ে যায়। আর এই সংবেদনশীলতা কমে যওয়া বা হারিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তির দেহে ডায়াবেটিস হওয়ার পূর্বের এ অবস্থাটিকে প্রি-ডায়াবেটিক কন্ডিশন নামে অভিহিত করেছেন। প্রি-ডায়াবেটিক কন্ডিশনে অনেকের রক্ত পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে, তদের রক্তরসে গ্লুকোজের পরিমাণ স্বাভাবিক থাকলেও ইনসুলিনের পরিমাণ বেশি। এর কারণে হলো পেশী কোষ ও চর্বিকোষের সংবেদনশীলতা কমে যাওয়ায় রক্ত হতে গ্লুকোজ । ঐ সব কোষে প্রবেশ করানোর জন্য অগ্ন্যাশয়ের বিটা কোষ বেশি পরিমাণ ইনসুলিন উৎপন্ন করে। কিন্তু পরবর্তীতে ধীরে ধীরে কোষের সংবেদনশীলতা আরও কমে যাওয়া এবং দেহে ডায়াবেটিসের সৃষ্টি হয়। অর্থ্যাৎ কোসের ইসুলিলেনর প্রতি সংবেদনশীলতা কমে যাওয়া টাইপ-২ ডায়াবেটিস মেলাইটাস হওয়ার একটি প্রধান কারণ। গবেষণা হতে আরও জানা যায় যে কোসের ইনসুলিনের প্রতি সংবেদনশীলতা হ্রাস পাওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে অতিমাত্রায় তেল ও চর্বিজাতীয় খাবার (ফাস্ট ফুড, হার্ড ফুড, রিচফুড প্রভৃতি) গ্রহণ। তাই ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করতে আমাদের সবার আগে চর্বিজাতীয় খাবার, যে কোন প্রকার লাল মাংস, ফাস্ট ফুড, হার্ড ফুড, রিচ ফুড, গ্রহণ বন্ধ করতে হবে এবং অধিক পরিমাণ শাক-সবিজ খেতে হবে।

খ) ইনসুলিনের উৎপাদন কমে যাওয়া: টাইপ-২ ডায়াবেটিস মেলাইটাসের আরেকটি বড় কারণ হলো অগ্ন্যাশয় হতে পর্যাপ্ত পরিমাণ ইসুলিন উৎপন্ন না হওয়া। ইনসুলিনের উৎপাদন ক্ষমতা কমে যাওয়ার দুটি কারণ থাকতে পারে। একটি হলো উৎপন্ন না হওয়া। ইনসুলিনের উৎপাদনকারী বিটা কোষসমূহের পরিমাণ ধীরে ধীরে কমে যাওয়া বা কোষসমূহের মৃত্যুবরণ করা। অপরটি হলো প্রি-ডায়াবেটিক কন্ডিশনে পেশী কোষ ও চর্বি কোষের ইনসুলিন প্রতি সংবেদনশীলতা কমে যাওয়ার পর অগ্ন্যাশয়ের বিটা কোষ কর্তৃক দীর্ঘসময় অতিরিক্ত ইসুলিন উৎপাদনের ফলে এক সময় বিটাকোষসমূহ ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং ইনসুলিন উৎপাদন কমিয়ে দেয়। এই কারণসমূহের ফলশ্রুতিতে দেখা দেয় ডায়াবেটিস। তবে টাইপ-১ ডায়াবেটিস মেলাইটাসের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বা একমাত্র বড় কারণ হলে অগ্ন্যাশয়ের বিটা কোষসমূহের নিষ্ক্রিয়তা বা মৃত্যু। টাইট-১ ডায়াবেটিস মেলাইটাস এক প্রকার অটো-ইমিউন ডিজিজ, যেখানে নিজের বিটাকোষসমূহ নিজ শরীরের এন্ডিবড়ি দ্বারা আক্রান্ত হয়ে ধ্বংস প্রাপ্ত হয়। ফলে দেহে ব্যক্তিদের পুরোপুরিভাবে ইসুলিনের উপর নির্ভরশীল থাকতে হয়।

গ) লিভার বা যৃকত হতে গ্লুকোজে নি:সরণ: শরীরে ডায়াবেটিস হওয়ার বা ডায়াবেটিসের জটিলতা বৃদ্ধি হওয়ার আরেকটি শরীরবৃত্তিয় কারণ হলো আমাদের লিভার হতে সঞ্চিত গ্লুকোজের নি:সরণ। আমরা যখন শর্করা বা চিনি জাতীয় খাবার গ্রহণ করি তখন এই শর্করা আমাদের রক্তরসে মিশে যায়। দেহে প্রয়োজনীয় শর্করার অতিরিক্ত অংশ লিভার গ্লাইকোজেন রূপে জমা থাকে। এই গ্ল্যাইকোজেন আমাদের উপোসকালীন সময় গ্লাইকোজেন ফসফোরাইলেজ এনজাইমের মাধ্যমে ভেঙ্গে গ্লুকোজে পরিণত হয় এবং লিভার হতে রক্তরসে নি:সৃত হয়। আর এই গ্লুকোজই উপোসকালীন সময় আমাদের দেহের প্রয়োজনীয় শক্তির যোগান দেয়। কিন্তু ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদেরর রক্তরসে অতিরিক্ত পরিমাণ গ্লুকোজ থাকা সত্বেও গ্লাইকোজেন ফসফরাইলেজ এনজাইমের কার্যকারিতার ফলে লিভার হতে আরও গ্লুকোজ নি:সৃত হয়। ফলে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ আরও বেড়ে যায় এবং ডায়াবেটিসের মাত্রা ও জটিলতা বৃদ্ধি পায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

two × 3 =