প্রাকৃতিক দুর্যোগ পরবর্তী আঘাত এবং তার চিকিৎসা – ডা. মোঃ সফিউল্যাহ্ প্রধান

প্রাকৃতিক দুর্যোগ পরবর্তী আঘাত

প্রাকৃতিক দুর্যোগ একটি স্বাভাবিক ঘটনা। পরিবেশ, জলবায়ুর কারনে ভৌগলিক পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট পরিবেশগত অনাকাঙ্খিত ঘটনাকেই প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলে। এর মধ্যে বন্যা, ঘুর্নিঝড়, জলোচ্ছাস, ভুমিকম্প ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এইসব প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে সৃষ্ট ধ্বংস যজ্ঞ অনেক সময় ভয়াবহ আকার সৃষ্টি করে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন সমস্যার মধ্যে আঘাত থেকে সৃষ্ট শারীরিক সমস্যা উল্লেখযোগ্য।

প্রশ্ন : সাধারনত শারীরিক আঘাতগুলো কিভাবে হয় ?

উঃ  ঘুর্নিঝড়, ভূমিকম্প , জলোচ্ছাস তো বলে কয়ে আসেনা। পরিবেশগত তারতম্যের ফলে এর সৃষ্টি হয়। তবে আঘাত হয় সাধারনত বাহ্যিক কোন শক্তি বা গতির ফলে। এই গতি বাতাস থেকে হতে পারে, গাছপালা, ঘরবাড়ি বা দালানকোঠা ভেঙ্গে সৃষ্ঠ আঘাত থেকে হতে পারে।

প্রশ্ন : সাধারনত আঘাতের ফলে কি কি সমস্যা দেখা দিতে পারে।

উঃ আঘাতের তারতম্যের উপর প্রধানত তার ভয়াবহতা নির্ভর করে। আঘাতের ফলে শরীরের বিভিন্ন অংশের হাড় ভেঙে যাওয়া, মাংশপেশী কেটে ছিড়ে যাওয়া বা থেতলে যাওয়া, বিভিন্ন ধরনের স্নায়ু বা নার্ভ ইনজুরি হতে পারে।

প্রশ্ন : এসবের ভিতর কোন আঘাতগুলো বেশী হতে পারে।

উঃ আঘাতের ভিতর হাড় ভাঙ্গার  আঘাতটাই প্রধানত হয়ে থাকে। সাধারনত শরীরের লম্বা হাড়  এবং মেরুদন্ড ও মাথায় আঘাতের ঘটনাই বেশী ঘটে থাকে।

প্রশ্ন : হাড় ভেঙ্গে গেলে প্রাথমিক চিকিৎসা কি করতে হবে।

উঃ হাড় ভাঙ্গলে সাধারনত ভাঙ্গা অংশটি যতদুর সম্ভব কম নড়া চড়া করতে হবে।ভাঙ্গা অংশের দুই পাশে যেকোন ধরনের শক্ত বস্তু যেমন : বাশের কাঠি বা কাঠ দিয়ে হালকা করে বেধে নড়াচড়া বন্ধ করতে হবে এবং দ্রুতসম্ভব তাড়াতাড়ি হাসপাতাল বা ডাক্তারের শরনাপন্ন হতে হবে।

প্রশ্ন  :  গাছপালা বা অন্য কিছুর আঘাতে হাড় না ভেঙ্গে থেতলে গেলে সেক্ষেত্রে কি চিকিৎসা দিতে হবে।

উঃ  আপনি সুন্দর প্রশ্ন করেছেন। আঘাত লাগলে যে হাড় ভেঙ্গে যাবে এমনটা ঠিক নয়। অনেকসময় আঘাতের ফলে শরীরের বিভিন্ন অংশ থেতলে বা ফুলে যেতে পারে। এইসব ক্ষেত্রে থেতলানো অংশে নড়াচড়া কম করা এবং ঠান্ডা পানির শেক সহ ব্যথানাশক ঔষধএ উপকারে আসে। তবে যদি থেতলে কেটে গিয়ে থাকে সেক্ষেত্রে পরিষ্কার কোন গামছা বা গজ দিয়ে ক্ষতস্থানকে চেপে ধরে রেখে যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালে নিতে হবে।

প্রশ্ন  : অনেক সময় আঘাতের ফলে দেখা যায় রোগীরা হাত পা নাড়তে চাড়তে পারেনা , এটা কেন হয় এবং এর চিকিৎসা কি ?

উঃ অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করেছেন। মেরুদন্ড মানুষের মাথার নীচ থেকে কোমর পর্যন্ত ছোট ছোট হাড় দিয়ে তৈরী লম্বা হাড়াকৃতির অঙ্গ।এর ভিতরের ফুটো দিয়ে মস্তিস্ক থেকে মেরুরজ্জু মেরুদন্ডে প্রবেশ করে, যার মাধ্যমে সারা শরীরে জালিকার মাত নার্ভ বা স্নায়ু  বিস্তৃতি ঘটে। মাথা ও মেরুদন্ডের আঘাতের ফলে মেরুরজ্জু বা মগজের ক্ষতি সাধন হয়ে বিভিন্ন শারীরিক অক্ষমতা বা পঙ্গুত্ব তৈরী করতে পারে। শরীরের কোথায় আঘাত লেগেছে বা ভেঙ্গে গেছে তার উপর বিভিন্ন শারীরিক অক্ষমতা বা পঙ্গুত্ব হতে পারে। মাথায় আঘাত লেগে মস্তিস্কের ভিতর রক্ত ক্ষরন হয়ে বা জমে গিয়ে শরীরের একপাশ বা চার হাত পা বা যেকোন এক হাত বা পা পেরালাইসিস অথবা অবস হয়ে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে ।

তার সাথে বিভিন্ন শারীরিক ও মানষিক সমস্যা তৈরী হয় । যেমন : প্রস্রাব, মলত্যাগে নিয়ন্ত্রণ না থাকা ,দৃষ্টি শক্তির সমস্যা ,বাক শক্তির সমস্যা, নিকট আত্মীয় সজনদের চিনতে না পারা, উদ্বিগ্ন, অবশাদ  সহ বিভিন্ন মানষিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। আর এসকল শারীরিক ও মানষিক সমস্যা দীর্ঘ মেয়াদি হতে পারে। এ জাতীয় রোগীকে পূর্ণবাসন চিকিৎসার মাধ্যমে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তাছাড়া মেরুদন্ডের বিভিন্ন জায়গায় ঘাড় কোমর আঘাত পেলে কশেরুকা ভেঙ্গে গেলে বা স্পাইনাল কর্ডে আঘাত পেলে শারীরিক বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন : প্যারাপ্লেজিয়া বা দুই পা প্যারালাইসিস বা অবশ হয়ে যাওয়া । অনেক সময় পুরোপুরি অবশ না হয়ে আংশিক অবশও হতে পারে। এ সকল রোগীকেও পূনর্বাসন চিকিৎসার মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

প্রশ্ন  : তাহলে  যেহতু শারীরিক আঘাতের ফলে আমাদের শরীরের মারাত্মক ক্ষতি সাধিত হয়, তা থেকে আমারা নিজেকে রক্ষা করতে পারি।

উঃ যেহেতু প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলে কয়ে আসেনা হঠাৎই সংঘটিত হতে পারে তারপরও আমাদের সবাইকে এরকম দুর্যোগের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে এবং কি কি সমস্যা দেখা দেয়  তার যথাযথ ধারনা রাখতে হবে।আমাদের সবাইকেই পরিবেশ রক্ষায় পরিবেশের বিপর্যয় রোধকল্পে সচেতন হতে হবে। অযথা গাছপালা কাটা, নদীনালা ,সমুদ্রে রাসায়নিক বর্জ ফেলা , কলকারখানা, যানবাহন ইত্যাদির পরিবেশ বিপর্যয়ে ধূয়া নির্গমন ইত্যাদি বন্ধ করতে হবে। উন্নত বিশ্বকে পারামানবিক প্রতিযোগীতা কমাতে হবে। তাহলে পরিবেশের উষ্ঞতা কমে আসবে।

তবে সাধারনত প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগে পরিবেশ ও আবহাওয়া বিভাগ বিভিন্ন সতর্ক বার্তা দিয়ে থাকে সে সম্পর্কে সাধানর জনগনকে জানাতে হবে। প্রচার মাধ্যম ও স্থানীয় জনগনকে প্রাকৃতিক দুর্যোগে করণীয় কি বা আগাম সতর্কতা জানাতে হবে। মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে  স্থানান্তর করতে হবে। ভূমিকম্প হলে শক্ত খুটি বা পোলের পাশে আশ্রয় নিতে হবে ইত্যাদি।

ডা. মো: সফিউল্যাহ্ প্রধান

পেইন প্যারালাইসিস ও রিহেব-ফিজিও বিশেষজ্ঞ
যোগাযোগ:- ডিপিআরসি হাসপাতাল লি: (১২/১ রিং-রোড, শ্যামলী, ঢাকা-১২০৭)
শ্যামলী ক্লাব মাঠ সমবায় বাজারের উল্টো দিকে
সিরিয়ালের জন্য ফোন: ০১৯৯-৭৭০২০০১-২ অথবা ০৯ ৬৬৬ ৭৭ ৪৪ ১১

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*