ক্যান্সারের সাথে বসবাস

ক্যান্সারের সাথে বসবাস

হিস্টোপ্যাথলজি ল্যাব এর Gross Station এ আমি আর মৃদুল দা গ্রস দিচ্ছিলাম, মানে বিভিন্ন সার্জিক্যাল বায়োপ্সি স্যাম্পল্গুলোর নেকেড আই এক্সামিনেশন আর এর সাথে কেটে কুটে ব্লক তৈরী করা স্লাইড প্রিপারেশন এর  টিস্যু প্রোসেসিং এর জন্য। দিতে দিতে একটা স্যাম্পল বের করলাম প্লাস্টিক এর কনটেইনার থেকে ইউটেরাস উইথ বোথ এডনেক্সা। সার্ভিক্সের মুখে বড় একটা গ্রোথ বা টিউমার। মিজারমেন্ট নিয়ে কাটতে যাবো তখনই দাদা বলল এই টিউমার এর মধ্যেই বেটা ইন্টারকোর্স করছে। দাদা কি বলতেছে বুঝি নাই প্রথমে। টিউমারটা ছিল  ৮ বাই ৪ সেমি। বললাম মানে কি? দাদা আবার রিপিট করল। তখনও মাথায় ঢুকছিল না। দাদা রিকুইজিশন পেপার দেখে বলল ফিটাস ইন সাইটু।এরকম স্যাম্পল প্রথম পেলাম তাই একটু ধাক্কা খেলাম।

বাইরে কালবৈশাখী ঝড়!  মুষুলধারে বৃষ্টি হচ্ছিল আর অন্ধকার তখন। গ্রস রুম আর এই সিচুয়েশন এ আমি দাদাকে রিকোয়েস্ট করে বললাম দাদা এ আমি পারব না আপনি কাটেন। ওটা স্কিপ করে পরেরগুলো শেষ করে দাদা ইউটেরাসটা যখন কাটছিল তখন ফুললি ওয়েল ডেভেলপড ফিটাস বের হয়ে আসল। আগেও অনেকবার এরকম ফিটাস দেখছি কিন্তু এইটার জন্য কেমন যেন লাগছিল।

ব্লক দেওয়া শেষে দাদাকে বললাম-

“আচ্ছা দাদা, ওই ফিটাস টার ধর্মানুযায়ী সতকার করা উচিত না?

আমার তো ভাল লাগছে না।”

দাদা বলল……’কি যে বল না তুমি!??’

“Moon, You are a doctor! and all the religions come from darkness!”

একমত নই দাদার এই কথার সাথে।

দুদিন পর স্লাইড আন্ডার মাইক্রোস্কোপ ডায়গনসিস হল Invasive Squamous Cell Carcinoma. ভাবছিলাম কেস হিস্ট্রি প্রেজেন্ট করার জন্য রোগীর ডিটেইলস হিস্ট্রি নিবো। কাজের চাপে হাসপাতালে আর যাইতে পারি নাই রোগীর কেস হিস্ট্রি নিবার জন্য। রোগীর হাজব্যান্ডকে ফোনে ডাকলাম ফাইলগুলা আনার জন্য। ফাইল চেক করে দেখলাম আল্ট্রাসনো রিপোর্ট,  ৪ মাসের ফিটাস।

লোকটাকে জিজ্ঞেস করলাম পেটে বাচ্চা আসার আগে আপনি কোন কিছু বুঝতে পারছিলেন বা আপনার ওয়াইফ এর কোন সমস্যা হচ্ছিল???

বলল -‘না’!

ডিরেক্টলি আর জিজ্ঞেস করি নাই।

মাতৃজঠরের মত নিরাপদ জায়গা শিশুর জন্য আর নেই। ইনভ্যাসিভ কার্সিনোমা গর্ভাশয় পর্যন্ত যাইতে পারে নাই। ক্যান্সারের সাথে থাকলেও শিশুটি নিরাপদ ছিল ঠিকই কিন্তু পরপারে চলে যেতে হল ‘মা’কে বাচানোর তাগিদে!! যদিও এটা খুব ইনয়েভিয়েটেবল ছিল যে যেভাবে গ্রোথটা বাড়তেছিল তাতে প্রেগনেন্সিটা কন্টিনিউ হতো কিনা যথেষ্ট সন্দেহ ছিল প্লাস ‘মা’ এর শরীরে যাতে ক্যান্সার ছড়িয়ে না পরে মানে মেটাস্টাসিস না হয় তাই এই পন্থার অবলম্বন।

জরায়ু মুখ ক্যান্সার বা সার্ভাইক্যাল ক্যান্সার এর ইন্সিডেন্স ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। Cervical Cancer সেকেন্ড মোস্ট কমন এবং ফিফথ মোস্ট ডেডলি ক্যান্সার। বাংলাদেশের প্রায় ৫৬ মিলিয়ন নারী সার্ভাইক্যাল ক্যান্সারের ঝুকিতে আছে।বছরে বাংলাদেশে এর জন্য মৃত্যু হার ৬৫৮২ জন আর ১১৯৫৬ জন নারী প্রতিবছর আক্রান্ত হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রতি ৫ টি ক্যান্সারে একটি সার্ভাইক্যাল বা জরায়ু মুখ ক্যান্সার।

জানুয়ারি  মাস ছিল Cervical Cancer সচেতনতার মাস। লিখাটা আর্কাইভ করা ছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*