ব্রেস্ট ইমপ্ল্যান্টের জানা-অজানা

ডা: উমা নাগ: আমাদের দেশে মুখে কেউ স্বীকার না করলেও আজকাল অনেক নারীই কিন্তু করিয়ে থাকেন ব্রেস্ট ইমপ্ল্যান্ট। এছাড়া পাশের দেশ ভারত সহ অন্যান্য উন্নট দেশগুলতে আসলে এটা নিয়ে খুব বেশী রাখঢাক এখন নেই। খুবই সাধারণ অপারেশনের মাধ্যমে স্তনে সিলিকন ইমপ্ল্যান্ট ভরে স্তনকে আকারে বৃদ্ধি ও সুগঠিত করে দেয়াটাই হচ্ছে সোজা ভাষায় ব্রেস্ট ইমপ্ল্যান্ট। এর উদ্দেশ্য একটাই, সৌন্দর্য বৃদ্ধি। কিন্তু এই সৌন্দর্য বৃদ্ধির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া গুলো কী কী? স্তনে অপারেশনের পর কি বাচ্চাকে দুধ খাওয়াতে সমস্যা হয়? স্তনের আকার কি নষ্ট হয়ে যেতে পারে? ঝুঁকিগুলো কী কী? এই সমস্ত প্রশ্নের জবাব নিয়ে আজকের ফিচার।

ব্যাপারটি আসলে কী?:

সিলিকনে তৈরি বেলুনের মাঝে সিলিকন ভরে তৈরি করা হয় স্তনে ভরার ইমপ্ল্যান্ট গুলো। নানান আকারের ইমপ্ল্যান্ট তৈরি হয়, যার যা প্রয়োজন। এক পর্যায়ে মনে করা হচ্ছিল যে সিলিকনের কারণে হতে পারে স্তন ক্যান্সার। তখন সিলিকন বেলুনের মাঝে সাধারণ স্যালাইন ওয়াটার ভরেও ইমপ্ল্যান্ট তৈরি করা হয়েছে। তবে অনেক কিছু মিলিয়ে এই সিলিকন ইমপ্ল্যান্টই গ্রাহকদের বেশী পছন্দ। যদিও সিলিকন থেকে ক্যান্সার হবেই না, এমনটা জোর দিয়ে বলা যায় না। স্তনের নিচের ভাঁজে কেটে এই ইমপ্ল্যান্টগুলো বসিয়ে দেয়া হয়। ভাঁজের মাঝেই অপারেশনের দাগ হারিয়ে যায়। অপারেশনের পর মোটামুটি ২০/২৫ বছর এই ইমপ্ল্যান্টগুলো ঠিক থাকে। তবে মোটামুটি ১০ বছর পেরিয়ে গেলেই সমস্যা দেখা দিতে পারে। মাঝে মাঝেই ডাক্তারি পরীক্ষা করিয়ে নিশ্চিত হয়ে নেয়া ভালো যে ইমপ্ল্যান্ট কোথাও লিক করছে কিনা। লিক করলে অবিলম্বে বদলে নিতে হবে, দেরি করা চলবে না।

সুবিধা-অসুবিধা: ব্রেস্ট ইমপ্ল্যান্টের সুবিধা যে সৌন্দর্য বৃদ্ধি, সে কথা তো সকলেই জানেন। অসুবিধার দিকটিও জেনে রাখুন।
১. ইমপ্ল্যান্টের পর আপনি শতভাগ নিশ্চিত, বিষয়টি মোটেও তেমন নয়। প্রতিনিয়তই আপনাকে ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে থাকতে হবে।
২. যার যার শরীর নিজের গঠনের সাথে সমঝোতা করে নিয়েই বড় হয়। হুট করে স্তন আকারে বড় ও ভারী হয়ে গেলে মারাত্মক পিঠে ব্যথা সহ কোমরে ও কাঁধেও ব্যথা হতে পারে।
৩. স্তনের ওপরে খুব বেশী চাপ পড়ে এমন কাজ করতে ডাক্তাররাই সাধারণত মানা করে থাকেন।
৪. এই অপারেশনের পর সংক্রমণের সম্ভাবনা খুব বেশী থাকে। তাই খুব সাবধানে থাকতে হয় প্রথম ৭ দিন।
৫. যদিও ছোট অপারেশনের, কিন্তু ৩ সপ্তাহ পর্যন্ত খুব সাবধানে জীবন যাপন করতে হয়।
৬. ইমপ্ল্যান্ট করার সময় মিল্ক ডাকট কাটা পড়ে যেতে পারে যদি দক্ষ সার্জন না হন। সেক্ষেত্রে বাচ্চাকে দুধ খাওয়াতে সমস্যা হবে।
৭. বড় ইমপ্ল্যান্ট হলে সময়ের সাথে সাথে শেপ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে ঝুলে পড়ার সমস্যা দেখা দেয়।
৮. অপারেশনের পর স্তনের টিস্যু শক্ত বা আড়ষ্ট হয়ে যাওয়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে।
৯. অনেকেই মনে করেন স্তন বড় করার পর সন্তান কে দুধ খাওয়ানো যায় না। এটি অবশ্য ভুল ধারণা। স্তনের ভাঁজের নিচে কাটলে দুধ খাওয়াতে বা দুধের মান এবং পরিমাণে কোন পার্থক্য হবে না। তবে নিপলের আশেপাশে কাটা হলে সমস্যা দেখা দিতে পারে।

দিন শেষে বিষয় এটিই যে দেহটি আপনার, সিদ্ধান্ত নিতে হবে আপনাকেই। হুজুগে গা না ভাসিয়ে বুঝেশুনে ঠিক করুন আপনি কী করবেন।

ব্রেস্ট ইমপ্ল্যান্ট করালে কি স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি থাকে?:

ব্রেস্ট ইমপ্ল্যান্ট এখনকার আলোচিত বিষয়। একজন চিত্রনায়িকা ব্রেস্ট ইমপ্ল্যান্ট করে আসার পর এই বিষয়টি নিয়ে অনেকের কৌতুহল লক্ষ্য করা গেছে। তার দাবি, ব্রেস্ট ইমপ্ল্যান্টের মাধ্যমে তিনি ট্যাবু ভাঙ্গার চেষ্টা করেছেন। কারণ, স্তন শরীরেরই একটি অঙ্গ। অন্যান্য অঙ্গের ন্যায় এই অঙ্গের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করার চেষ্টা দোষের কিছু নয়। যাই হোক, সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে কেউ যদি ব্রেস্ট ইমপ্ল্যান্ট করতে চায়, এটা তার ব্যাপার। তবে, যেহেতু এই বিষয়টিকে ট্যাবু ভাঙ্গা হিসেবে দেখানো হচ্ছে, তাই কেউ যদি ভাবেন ট্যাবু ভাঙ্গতে হলে ব্রেস্ট ইমপ্ল্যান্ট করা যেতেই পারে, তাদের জন্য এই লেখা। মেডিক্যাল সাইন্স ব্রেস্ট ইমপ্ল্যান্টকে কিভাবে দেখে, এবং এটার কোন ক্ষতিকর দিক আছে কিনা সেটা জেনে নেয়া দরকার সবার জন্যেই। ব্রেস্ট ইমপ্ল্যান্ট নিয়ে হাসাহাসি করুন আর যা-ই করুন এই বিষয়টিকে হালকাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই। এটা অনেক ব্যয়বহুল অপারেশনই শুধু নয়, এই কাজ করলেই যে ফলাফল ঠিকঠাক থাকবে তারও গ্যারান্টি পাওয়া যায় না।

ডা: উমা নাগ

প্রসূতি ও স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ

ডিপিআরসি হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনষ্টিক ল্যাব লিমিটেড

বিকাল ৫ টা- সন্ধা ৭টা পর্যন্ত (শনি, সোম, বুধবার)

ফোন: ০৯৬৬৬৭৭৪৪১১

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*