ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতা হলো একধরনের ইমোশনাল ইলনেস, যা বিভন্নভাবে মানুষকে প্রভাবিত করে। ব্যক্তির মন-মেজাজের সাথে রয়েছে এর নিবিড় সম্পর্ক। মানসিক রোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ রোগ হলো এই বিষণ্ণতা। ডায়াবেটিস, অর্থ্রাইটিস, শ্বাসকস্ট, ক্যান্সার, স্ট্রোক, হৃদরোগ, মৃগীসহ বিভিন্ন জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি রোগাক্রান্তদের ক্ষেত্রে বিষণ্ণতায় ভোগার আশঙ্কা বেশি। তা ছাড়া সাময়িক অবস্থাগত কারণ যেমন- বেকারত্ব, দারিদ্র্য, একাকিত্ব, পারিবারিক ও সম্পর্কের অবনতি, গর্ভকালীন ও প্রসবপরবর্তী সময়, বিবাহ-বিচ্ছেদ, প্রবাস জীবন, অভিবাসন, মাদক সেবন ইত্যাদি কারণে বিষণ্ণতা আসতে পারে।
ডিপ্রেশন আবেগজনিত এমন এক মেন্টাল ডিসঅর্ডার, যার অশুভ প্রভাবে মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তোলে। আমাদের মতো দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে এ রোগ অবিশ্বাস্যভাবে বেড়েই চলছে। ক্রমবর্ধমান বিষণ্ণতা গোটা জনসমাজকে ভবিষ্যতে উদ্বিগ্ন করে তোলার জন্য যথেষ্ট। এ দেশে মানসিক রোগী মানে তথাকথিত ‘পাগল’ যা কিনা অন্যদের হাসির পাত্র হয়ে থাকে। সাধারণ মানসিক সমস্যাগুলোকে আমাদের দেশের অন্যদের হাসির পাত্র হয়ে থাকে। সাধারণ মানসিক সমস্যাগুলোকে আমাদের দেশের মানুষ খুব একটা গুরুত্বের সাথে দেখে না। অন্য দিকে এ রোগে আক্রান্ত ভুক্তভোগীর বিভিন্ন মানসিক প্রতিক্রিয়ার ওপর সামাজের বিভিন্ন ধরনের অবৈজ্ঞানিক ও অযৌক্তিক চিন্তাধারা রোগীর যন্ত্রণা আরো বিষময় করে তোলে।
বিষণ্ণতার ফলাফল বেশ ভয়াবহ। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে, অলস সময় কাটায়, জীবনের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে উদ্দেশ্যবিহীন জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, কাজকর্মে নিস্তেজ ও শক্তিহীন হয়ে পড়ে। মারাত্মক ডিপ্রেশন ও অবিরত স্ট্রেসের কারণে সৃষ্ট মনোদৈহিক চাপ সহ্য করতে না পেরে কখনো সৃষ্ট মনোদৈহিক চাপ সহ্য করতে না পেরে কখনো কখনো পাগল হয়ে যায়। জীবনদশায় এ মানসকি চাপ সহ্য করতে না পেরে পরিণামে তা আত্মহত্যায় বাধ্য করে। বর্তমানে এটি একটি সামাজিক ব্যাধি হিসেবে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। একটি আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, আমেরিকায় প্রতি ২০ জনে একজন আমেরিকান মারাত্মক ধরনের ডিপ্রেশনে ভুগে থাকে এবং এ সংখ্যা ক্রমান্বয়ে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েই চলছে। শিশুদের মধ্যে ২ শতাংশ এবং তরুণ-তরুনীদের মধ্যে প্রায় ৫ শতাংশ ডিপ্রেশনে ভুগে থাকে। ৬৫ বছরের অধিক বয়সী বৃদ্ধ ও বৃদ্ধারা অন্যদের চেয়ে চার গুণ বেশি ডিপ্রেশনে ভূগে থাকেন।
যে কেউ জীবনের যেকেনো সময় এতে আক্রান্ত হতে পারে। ধর্ম-বর্ণ, আর্থসামাজিক অবস্থান যা-ই হোক না কেন, কেউ কেউই বিষণ্ণতার কুপ্রভাব থেকে ঝুঁকিমুক্ত নয়। এমনকি শিশুদের মধ্যেও এটি দেখা দিতে পারে। পুরুষদের তুলনায় নারীদের বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরিপ অনুযায়ী, আমাদের দেশে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ নারী-পুরুষের বিষণ্ণতা রয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সে বিষণ্ণতার লক্ষণ প্রথমবারের মতো প্রকাশ পায়। এ ছাড়া ১৫ থেকে ১৮ বছর এবং ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে এর ঝুঁকির হার কিছুটা বেশি।
যুগের সাথে তাল মিলিয়ে পরিবর্তন হচ্ছে আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থারও। বর্তমানে বিষণ্ণতা নিয়ে ঘাবড়ানোর কোনো কারণ নেই। বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসাব্যবস্থার মাধ্যমে এ রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। বিষণ্ণতায় মস্তিষ্কের সেরোটনিন নামক রাসয়নিক পদার্থের গুণগত ও পরিমাণগত তারতম্য ঘটে। প্রচলিত চিকিৎসায় নানা পদের অ্যান্টিডিপ্রেসিভ কেমিক্যাল ড্রাগ বাজারে বিদ্যমান। এগুলো দীর্ঘ দিন সেবনে রোগীর মধ্যে বিরূপ প্রভাব দেখা যায়। অন্য দিকে এ রোগের চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন ধরনের কার্যকর ও নিরাপদ ভেষজ ওষুধও বর্তমানে বাজারে বিভিন্ন ডোজেস ফর্মে পাওয়া যাচ্ছে।
দিন দিনি মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ভেষজ ওষধের গ্রহণযোগ্যতা ব্যাপক হারে বাড়ছে। ডিপ্রেশনের ওপর অধিক কার্যকর আঞ্চলিক ভেষজ হলো: (Rauwolfia serpentina) যার স্থায় নাম সর্পগন্ধা। এর মূল থেকে প্রায় ৫০টির মতো ইন্ডোল অ্যালকালয়েড পৃথক ও শনাক্ত করা হয়েছে।যেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো- অ্যাজমোলিন, সারপেনটাইন, সারপেনটিনাইন প্রধান।সর্পগন্ধার মূল থেকে আগরণ বা রাসায়নিক উপায়ে সংশ্লেশণ করে অ্যালকালয়েড রিসারপিন একক হিসেবে বা অন্য কোনো রাসায়নিক উপাদানের সাথে সংমিশ্রিত হয়ে দুনিয়াব্যাপী উচ্চ রক্তচাপ, অনিদ্রা, উন্মাদ চিকিৎসায় ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে পর্যবেক্ষণে বিভিন্ন কেসস্টাডি করে দেখা যায়, সর্পগন্ধার মূলের চেয়ে পৃথককৃত রিসারপিন অপেক্ষাকৃত বেশি কার্যকর, কিন্তু এর বিরুপ প্রতিক্রিয়াটি মারাত্মক ও দীর্ঘস্থায়ী।
তাই ভেষজবিজ্ঞানীদের অভিমত হলো, সরাসরি এর মূল থেকে তৈরিকৃত প্রাকৃতিক ওষুধ ট্যাবলেট ফিশার (ট্যাবলেট ফ্রিটেনস ২৫০মিগ্রা.) কার্যকর হিসেবে ব্যবহার করা। তা ছাড়া মুড নিয়ন্ত্রণকারী অন্য ন্যাচারাল ওষুধের মধ্যে অন্যতম হলো জিংকো বিলোবাযুক্ত ট্যাবলেট জিংগোবা ৪০মিগ্রা. সেন্ট জন্স ওর্ট এক্সট্রাক্ট যুক্ত ক্যাপসুল এনজর্ট ৩০০ মিগ্রা. ইত্যাদি সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের পরামর্শক্রমে নিরাপদভাবে দীর্ঘমেয়াদি ওষুধ হিসেবে সেবন করা যায়। বিভিন্ন কেসস্টাডি করে দেখা গেছে, কেবল বিষণ্ণতাবিরোধী ওষুধ প্রয়োগ করে আশানুরূপ ফল পাওয়া যায় না। তবে ওষুধের সাথে ধারণা ও আচরণগত পরিবর্তন, অর্থাৎ সাইকোথেরাপি প্রয়োগের ফলে বেশ চমকপ্রদ ফলাফল পাওয়া যায়। তাই বিষণ্ণতায় প্রয়োজন মুড রেগুলেটরি মেডিসিন ও সাইকোথেরাপির সমন্বিত প্রচেষ্টা। পাশাপাশি রোগীকে দেয়া দরকার পারিবারিক, সামাজিক ও মানসিক সাপোর্ট।
পরিশেষে বলা যায়, সমসাময়িক পেক্ষাপটে ডিপ্রেশন জনসাধরনের গুরুত্বপূর্ণ একটি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, যা (WHO) ( বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা) তাদের এজেন্ডায় (Public Mental Health Problem হিসেবে বেশ গুরত্বের সাথেই আমলে নিয়েছে। এ রোগটি যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, এত অদূর ভবিষ্যতে এটা (epidemic) বা মহামারী আকারে রূপ নেয়অর আশঙ্কা রয়েছে। তাই এক সামাজিকভাবে প্রতিরোধ করা দরকার। একে অপরের সুখ দুঃখ শেয়ারিং করে নিলে পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক বন্ধন আন্তরিকতাপূর্ণ ও সুদৃঢ় হবে। তাই তো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশ্ব দিবসে স্লোগান ছিল।
medicalbd সাস্থের সকল খবর।

